ব্রিটিশ শাসনামলের আইন ব্যবস্থা ও বিচার প্রশাসনের উপযোগিতা শীর্ষক আলোচনা

গত ২৪ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় বাংলাদেশ ল অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে ‘ভারতবর্ষে স্বাধীন দেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের আইন ব্যবস্থা ও বিচার প্রশাসনের উপযোগিতা’ শীর্ষক ভার্চয়াল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় কলকাতা থেকে যুক্ত হয়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি জনাব অশোক কুমার গাঙ্গুলী বলেন ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; ভাষা একটা জাতির বিবর্তন, ঐতিহ্য ও সামগ্রিক ধ্যান-ধারণার মূর্ত প্রতীক। ভাষা অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত। সঞ্চালক জায়েদ বিন নাসেরের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ১৮৫৭ সনে সিপাহী বিদ্রোহের পর রাণী ভিক্টোরিয়া শাসনভার নেওয়ার পর ব্রিটিশরা বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে।

ব্রিটিশরা নিজেদের দেশের আইন এখানে এনে প্রয়োগ করে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন তৎকালীন সময়ে ইংরেজীতে প্রণীত আইন এখানাকার মানুষ কতোটা বুঝবেন, মানতে পারবেন এবং এ অঞ্চলের মানুষের কতোটা উপকারে আসবে তা ব্রিটিশ শাসকরা চিন্তাভাবনা করে নি। বুঝুক বা না-ই বুঝুক যাঁদের উপর আইন প্রযোজ্য হবে এবং যাঁরা আইনের আওতায় আসবেন তাঁদের কথা চিন্তা করা হয় নি এবং ঔপনিবেশিক শাসকরা মানুষের অধিকারের কথা না ভেবেই প্রভুত্বের শাসন জারি রাখার জন্যই এরকমটা করেছে। পশ্চিমবঙ্গে নিম্ন আদালতে বাংলার প্রচলন থাকলেও ভারতের সংবিধানের ৩৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রীম কোর্টে ইংরেজী প্রচলিত আছে। তবে প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে রাজ্যপাল অন্য ভাষায় কার্যক্রম চালু করতে পারেন। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশের নেতারা যোগাযোগের সুবিধার জন্য ইংরেজী ব্যবহার করতেন এবং এরকম ব্যবহারকে দাসত্বের প্রতীক হিসেবে মনে করতেন না বলে মনে করেন অশোক গাঙ্গুলী। বাংলাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাংলাদেশকে কৃতিত্ব দিয়ে গর্ববোধ করার কথা বলেন বিচারপতি অশোক। বাংলাদেশের সুপ্রীম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জনাব জেড.আই. খান পান্না আলোচনায় অংশ নিয়ে এ বিষয়ে বলেন বহুজাতিক ও বহুভাষী ভারতে প্রত্যেকের মাতৃভাষা বা একটি ভাষার প্রচলন ও প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। জনাব পান্না বলেন ভারতে সম্ভব না হলেও বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা প্রতিষ্ঠা হওয়া উচিত। আদালতের কার্যক্রমে বিচারপ্রার্থী কোনো ভাষা না বুঝলে মাতৃভাষা বা বোধগম্য হয় এমন ভাষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ ভারতে আছে বলে জানান জনাব অশোক।

জেড.আই. খান পান্না বলেন তড়িঘড়ি করে ব্রিটিশদের প্রথম দিকেই পুলিশ আইন প্রণয়ন ইঙ্গিত দেয় যে এটা মানুষের পক্ষে ছিলো না; বরং মানুষকে নিয়ন্ত্রণের জন্যই এই আইন হয়। জনাব জেড.আই. খান পান্না উপমহাদেশে পুলিশ আইনের আমূল পরিবর্তন হওয়ার দরকার বলে মত দেন। ব্রিটিশদের চোখে যেই ব্যক্তিবর্গ বিদ্রোহী তাঁরা আমাদের চোখে দেশপ্রেমিক এবং এঁদের দমাতে ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রণীত আইন পরিবর্তন হওয়া উচিত বলে মনে করেন জেড.আই. খান পান্না। তিনি বলেন মানবাধিকার রক্ষাসহ জনগণের পক্ষে আইন প্রয়োগের ব্যাপারে পুলিশ বাহিনীকে বাংলাদেশ ও ভারতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও উভয় দেশেই তা বাস্তবে পুরোপুরি প্রয়োগ হয় না এবং রাতারাতি এই মন-মানসিকতার পরিবর্তন হবে না; তবে এই বিষয়ে কাজ করে যেতে হবে। ব্রিটিশ আমলের আইনগুলো পুন:নিরীক্ষণের প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে জেড.আই. খান বলেন পিডিআর-এর মতো আইন স্বাধীন দেশে সম্পূর্ণ অনুপযোগী; এ রকম আইন থাকার কোনো দরকার নেই বলে মনে করেন তিনি। তিনি রাজনৈতিকভাবে ধর্মীয় অপব্যবহারের ব্যাপারে দৃষ্টিপাত করেন৷ ভারতীয় উপমহাদেশ এক দেশ না থাকলেও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা বলেন তিনি। ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী মূলত ব্রিটিশদের বিপক্ষে এক হয়ে প্রয়াস চালান। জনাব পান্নার মতে জনতার রায় কখনও ভুল হয় না; ৪৭ এ দেশভাগের ফলেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। 'ইয়র অনার' বলে সম্বোধন করায় ভারতের প্রধান বিচারপতির উষ্মা প্রকাশ করার কারণ নেই বলে মনে করেন অশোক গাঙ্গুলী। তাঁর মতে ভারতের প্রধান বিচারপতির অনুধাবন করতে হবে যে পদাধিকারী হিসেবে প্রধান বিচারপতি কোনো কিংস জাজ নয়, সাধারণ মানুষের করের টাকায় চলা সাংবিধানিক আদালতে বসে 'মাই লর্ড' সম্বোধন শুনতে চাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই; বরং এটা ঔপনিবেশিকতাবাদের ধারাবাহিকতা ও ঐতিহ্যের নির্দেশক। বাংলাদেশ ল অ্যালায়েন্সের সভাপতি জায়েদ বিন নাসেরের প্রশ্নের জবাবে অশোক গাঙ্গুলী বলেন রাষ্ট্রদ্রোহীতার আইন আবার সংবিধান অনুযায়ী চ্যালেঞ্জ হওয়ার দরকার। সরকারের যতো কঠোর সমালোচনাই হউক না কেনো যদি সহিংসতা ছড়ানো না হয় তবে সেটা রাষ্ট্রদ্রোহীতার আওতায় পরবে না বলে আদালতের মতামত উল্লেখ করেন তিনি। তবে এখন সবক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না বলেও মনে করেন অশোক কুমার গাঙ্গুলী। জরুরী অবস্থার আগ দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলাকে আমলযোগ্য করা দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করেন তিনি, যা কিনা ব্রিটিশ শাসনামলেও ছিলো না। কিন্ত এখনো তা ভারতে অ-জামিনযোগ্য অর্থাৎ আমলযোগ্য। ব্রিটিশ আইনগুলোর সাংবিধানিকত্ব পরীক্ষা করার উদ্যোগ না নেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে জনাব অশোক গাঙ্গুলী বলেন আদালত এবং আইন কমিশন সেভাবে পদক্ষেপ নেয় নি। আগের প্রজন্মের উপর সংস্কার না করার দায়বদ্ধতার ব্যাপারে তাঁরা সরাসরি কোনো উত্তর দেন নি।

ব্রিটিশ রাজার মতো স্বাধীন উপমহাদেশে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনাব অশোক গাঙ্গুলী বলেন ভারতে রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপাল এই অধিকার নিজের খেয়ালখুশি মতো চর্চা করতে পারেন না, এটা মন্ত্রীসভার সুপারিশক্রমে করতে হবে। বিভিন্ন মামলায় এটা প্রতীয়মান হয় যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার প্রয়োগ আদালতের পরীক্ষার উর্ধ্বে নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারপার্সন জনাব জেড.আই. খান পান্না সীমান্ত হত্যার বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অশোক গাঙ্গুলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিচারপতি অশোক প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার কথা বলেন এবং তাঁর মতে সীমান্ত বাহিনীর সদস্যরা বাঙ্গালী বিরোধী। জনাব পান্না ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর আইন প্রণয়নে প্রভুত্ব-দাসত্বের সম্পর্কের মানসিকতাকে ইঙ্গিত করেন। বিচারপতি অশোক গাঙ্গুলী ও জনাব জেড.আই. খান পান্না ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীন দেশগুলোর নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার কথা জানিয়ে আশু সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তনের কথা বলেন। বিত্ত নয়; সততা, নিষ্ঠা, মেধা ও দেশপ্রেমই যেনো নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আদর্শ ও মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় সেজন্য সাংবিধানিক কাঠামোর ভিতরে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে নেওয়ার কথা বলেন জনাব পান্না৷


অনুষ্ঠানের লিংক: https://www.youtube.com/watch?fbclid=IwAR3S7MOfBht478NpGDKNhh3ewkif8OufjcYZkTwoaYlxn13EJKSCINmpBNs&v=hbB2u2OQRQM&feature=youtu.be

দেশ এর সাম্প্রতিক