ল অ্যালায়েন্সের আলাপে বক্তারা

বাক্-স্বাধীনতার অধিকারের সংকুচিত হওয়া দেশের ভবিষ্যতের জন্য শুভ সংকেত নয়

বাংলাদেশ ল' অ্যালায়েন্সের আয়োজনে গত ১৩ মে ২০২২ তারিখে "৫০ পেরিয়ে সংবিধানের ৩৯ এ কোথায় দাড়িয়ে স্বদেশ?" শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ল' অ্যালায়েন্সের সভাপতি জায়েদ বিন নাসেরের সঞ্চালনায় আলাপে অংশ নিয়ে প্রথম আলোর যুগ্ন সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন দলীয়, সংকীর্ণ এবং গোষ্ঠী স্বার্থকেন্দ্রিক আইন জনগণের জন্য মূলত কোনো কাজে আসে না। স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বাধীনতা থাকতে হয়, তা নাহলে স্বাধীনতা যথার্থতা পায় না।

জনগণের প্রতি যাদের বিশ্বাস থাকে না তারা স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ করে৷ এরকম সরকারের জনগণের প্রতি বিশ্বাস থাকতে পারে না। ২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উপযোগিতা ও প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আইনজীবী, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিকরা যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন তা আমলে নেওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।

বিরোধী দলে থাকতে কোন রাজনৈতিক দল যে অধিকারের কথা বলেন সরকারে আসলে তারাই সেগুলো পদদলিত করেন। ব্রিটিশ আমলে করা অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ এর অধীনে নিজ সহকর্মী রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তথ্যের প্রয়োজনে সাংবাদিকরা যখন পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন তখন এরকম আইনকে অস্ত্র হিসেবে অপব্যবহার ঘটছে।

সাংবাদিকদের হয়রানি ও অপদস্থ হওয়ার ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মতামত প্রকাশ করেন তিনি। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস থাকলেও বর্তমান সরকারের আচরণ যথেষ্ট উদ্বেগের এবং এসময়টায় ভয়-ভীতির রাজত্ব কায়েম হয়েছে বলে মনে করেন সোহরাব হাসান; যেটা আওয়ামী লীগের মত ঐতিহ্যবাহী দল থেকে প্রত্যাশিত নয়, যোগ করেন তিনি। সাংবাদিক, আইনজীবীসহ অন্যান্য পেশাজীবীদের দলমুখিতা, আনুগত্যবাদ দেশের পক্ষে ক্ষতিকর বলে মনে করেন তিনি। 

আরেক আলোচক ব্যারিষ্টার এম. সরোয়ার হাসান বলেন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় না থাকলে বাক্-স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করা সম্ভব হয় না। আর সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া গণতান্ত্রিক পরিবেশ কখনই তৈরি হতে পারে না। উল্লেখ্য সিজিএস-এর গবেষণা বলছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে সব থেকে বেশী মামলা রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। এছাড়া আইনজীবী, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ নানান শ্রেণীপেশার মানুষের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা হয়েছে। আইনের অপপ্রয়োগের বরাত দিয়ে সরোয়ার বলেন এই অপপ্রয়োগ নির্ভর করছে আইনের প্রয়োগ যিনি করছেন তার উপর। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, যার ফলস্বরূপ আইনের অপপ্রয়োগ রোধ করা যায় না বলে মত দেন তিনি। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় ঘুরপাক খায়। ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হবার পরও কোন মিডিয়া সেটি প্রকাশ করতে সাহস পায়নি বলে হতাশা ও আক্ষেপ জানান তিনি। 

মতামত প্রকাশ ও বাক্-স্বাধীনতার অধিকার ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে বলে মত দেন সোহরাব হাসান ও এম. সরোয়ার হোসেন। লিখতে গিয়ে, বলতে গিয়ে বারবার ভাবতে হয়; এবং সময়ের সাথে সাথে বাক্-স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অধিকার খর্ব হওয়ার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এই ভাবনার পরিসর বড় হচ্ছে ও প্রকাশের ক্ষেত্র ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে বলে মনে করেন উভয় আলোচক। 

ব্রিটিশ আমলের রাষ্ট্রদ্রোহিতার আইন প্রসঙ্গে সরোয়ার হোসেন বলেন সরকারের বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রবিরোধী হয়ে যাওয়া না৷ এ প্রসঙ্গে ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের সমসাময়িক সক্রিয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশের বিচারালায়ের দুর্নীতির কথা উল্লেখ করেন তিনি। সব প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নিয়েই এসব ব্যাপারে কাজ করার কথা বললেও বাস্তব প্রেক্ষাপট পাল্টায় না বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

মৌলিক মানবাধিকার খর্ব হলেও বিচার বিভাগ স্বপ্রণোদিত হয়ে দক্ষিণ এশীয় অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সেভাবে কাজ করছে না বলে মনে করেন তিনি। জনগণকে সম্মিলিতভাবে এসব অনাচার মোকাবিলা করার কথা বলেন সরোয়ার হোসেন। কোন বিশেষ পেশার সাথে জড়িত মানুষের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হলে তা রক্ষায় সামগ্রিকভাবে অন্যান্য শ্রেণিপেশার মানুষেরও সম্পৃক্ত হওয়া উচিত বলে মনে করেন সোহরাব হাসান। সাংবাদিক আক্রান্ত হলে আইনজীবীদের সাংবাদিকদের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে; ঠিক একইভাবে আইনজীবীরা আক্রান্ত হলেও অন্য সবার তাঁদের পাশে দাঁড়ানো উচিত বলে মত দেন এই প্রবীণ সাংবাদিক। জনগণের যেন সবই সয়ে যাচ্ছে, এমন অবস্থায় সামগ্রিকভাবে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা বলেন এম. সরোয়ার হোসেন।

পৃথিবীব্যাপী দুর্বৃত্তের সংখ্যা ভাল মানুষের তুলনায় অনেক কম বলে মত দেন সোহরাব হাসান। তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেন তবে ভাল মানুষের চাইতে তারা অধিক সুসংগঠিত ও ক্ষমতাবান হওয়ায় মুষ্টিমেয় হওয়া সত্ত্বেও তাদেরই ক্ষমতার দাপট দেখতে হয়৷ সোহরাব হাসান তরণ প্রজন্মের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেন। একসময় বলা হত তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন তরুণ প্রজন্মের এরকম সক্রিয়তা এবং ন্যায্যতার পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থানই বাংলাদেশকে সামনে পথ দেখাবে।


মিডিয়া এর সাম্প্রতিক