প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের প্রত্যেক গণতান্ত্রিক মানুষের কাছে আমি একটি কথা তুলে ধরতে চাই- আমাদের এই মহান স্বাধীনতা দিবসে আমাদের আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন হলেও সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
আমাদের সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে ফারাক থাকলেও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাই, একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করি তাহলে অবশ্যই আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। শুক্রবার বিকালে রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহান স্বাধীনতা দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে বিএনপির উদ্যোগে এই আলোচনা সভা হয়। আলোচনা সভার শুরুতে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন এবারের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার হোক- সমাজের একটি অংশ নয় বরং আমরা সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে আমরা ভালো থাকব। আসুন, আমরা প্রত্যেকে একসঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে খারাপকে দূরে ঠেলে দিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করব। এই হোক আমাদের আজকের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার প্রত্যাশা, প্রতিজ্ঞা।
প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি তুলে ধরে বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার আপনাদেরই সরকার, বর্তমানের গণতান্ত্রিক সরকার এদেশের মানুষের নির্বাচিত সরকার, বর্তমানের গণতান্ত্রিক সরকার এদেশের মানুষের প্রতিষ্ঠিত সরকার। এই সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে। জনগণের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করছি। প্রতিনিয়ত এই সরকার অক্লান্ত পরিশ্রম করছে, চেষ্টা করে যাচ্ছে।
অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, ভুলে গেলে দুচোখ অন্ধ
জিয়াউর রহমানসহ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরব গাঁথা নিয়ে আলোচনা হবে, গবেষণা চলবে এবং এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে আলোচনা-সমালোচনা কিংবা গবেষণার নামে এমন কিছু করা বা বলা অবশ্যই আমাদের জন্য ঠিক হবে না- যেটি আমাদের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ইতিহাসকে খাটো করতে পারে। সবাইকে এটা বুঝে চলতে হবে যে- অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ। আর অতীতকে যদি আমরা ভুলে যাই তাহলে আমাদের দুচোখ অন্ধ। সুতরাং আমরা যেমন অতীতকে একদম ভুলে যাবো না, ভুলে যাওয়া চলবে না; ঠিক একইভাবে নিকট অতীতেও অতীত নিয়ে এত বেশি চর্চা হয়েছে যেটা আমাদের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের একজন অনিবার্য চরিত্র
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অনিবার্য চরিত্র শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আমরা দেখেছি অতীতে যেভাবে শহীদ জিয়াউর রহমানকে তার অবদানকে তার কাজকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে এর থেকেই প্রমাণিত হয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অবশ্যই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অনিবার্য চরিত্র। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হঠাৎ করেই কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণাটি দেননি।
তিনি বলেন, শহীদ জিয়া প্রথম জীবনে অবশ্যই একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। তিনি একজন সামরিক সৈনিক ছিলেন। তবে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে স্বপ্ন সেটি যে তার মনের মধ্যে সেই বোধশক্তির পথ থেকে লালন করতেন এটি কিন্তু তার একটি লেখায় ফুটে উঠেছে। স্বাধীনতার চিন্তা চেতনা যে তিনি ধারণ করতেন, একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যে তার একটা দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতি ছিল সেটি আমরা তার একটি লেখা থেকেই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি। কথাগুলো আমার নয়, কথাগুলো কারো মনগাড়াও নয়। এই কথাগুলো আমরা তার নিজের লেখনী থেকে আমরা জানতে পারছি।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট বাঙালির হৃদয়ের লেখা একটি দিন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শহীদ জিয়ার নিজের লেখা একটি প্রবন্ধ আছে যার শিরোনাম ‘একটি জাতির জন্ম'। প্রবন্ধটি যথেষ্ট বড়। আমি খুব সংক্ষেপে সেই প্রবন্ধের দুই একটি লাইন আপনাদের সামনে বলব। যেখান থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে পুরো বিষয়টি। এই প্রবন্ধের মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি যে স্বাধীন বাংলাদেশ, সার্বভৌম একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন। বহু দিন যাবত শহীদ জিয়ার মনে লালন করছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধটি দৈনিক বাংলা পত্রিকার প্রথম ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধটি বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসের প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে ছাপা হয়েছিল। এই প্রবন্ধটি বা নিবন্ধটির শেষ প্যারায় শহীদ জিয়াউর রহমান লিখেছিলেন, তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট, ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। রক্তের আখরে বাঙালির হৃদয়ের লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে, এ দিনটিকে ভালোবাসবে। এই দিনটি তারা কোনদিন ভুলবে না, কোন দিন না- এভাবেই উনি লিখেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিটে কি হয়েছিল- আমি মনে করি স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেন এই তথ্যটি অবশ্যই তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে।
তিনি বলেন, শহীদ জিয়ার লেখা এই প্রবন্ধটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তখন মাত্র মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে। যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন তারা কিন্তু প্রত্যেকেই তখন বেঁচে ছিলেন। এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পরে কারো পক্ষ থেকেই আমরা কোনোরকম এমন কিছু আপত্তি বা এমন কিছু কথা পাইনি যা এই প্রবন্ধ বা লেখাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শহীদ জিয়ার এই প্রবন্ধটি যে শুধু ৭২ সালে ২৬ মার্চই প্রকাশিত ছিল তাও নয়। আবারও প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, শহীদ জিয়াকে খাটো করার জন্য বহু অপচেষ্টা হয়েছে। এখন আপনাদেরকে যে তথ্যটি আমি দেব- তার মাধ্যমে একদম সঠিক যুক্তিতর্কের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, শহীদ জিয়াকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আগেই আমি বলেছি যা সত্য তা সত্যই। শহীদ জিয়া যে মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম চরিত্র এটিকে লুকানোর কোনও উপায় নেই।
তারেক রহমান বলেন, শহীদ জিয়ার নিবন্ধনটি ১৯৭৪ সালে আবারও প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। তার লেখাটি একটি জাতির প্রবন্ধ, লেখাটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি অনন্য দলিল। ৭৪ সালেও আবার যখন প্রকাশিত হয়েছিল কারোরই কোনও আপত্তি ছিল না এবং শহীদ জিয়া তার লেখায় যা যা বলেছিলেন অবিকল ছিল।
সেই সময় সরকারে কারা ছিল রাজনৈতিকভাবে কারা কোথায় অবস্থান করছিল আমাদের কমবেশি প্রত্যেকেরই ধারণা আছে। কিন্তু সেই সময় তৎকালীন সরকার অথবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেউ শহীদ জিয়ার কোনও লেখার প্রবন্ধটির কোনও বক্তব্যকে কেউ কোনোভাবেই খণ্ডন করেননি, চেষ্টাও তারা করেননি। কারণ সেই সময় যারা ছিলেন তারা জানতেন শহীদ জিয়ার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ প্রবন্ধে উল্লিখিত সত্য সেগুলো।
২০২৪ সালে দেশ এবং স্বাধীনতা রক্ষা করেছি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ ধরেও বিশ্বের যেখানে যারা স্বাধীনতার লড়াই করেছেন সংগ্রাম করেছেন একমাত্র তাদের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব স্বাধীনতার মূল্য কতখানি। আমরা যদি একটু পাশে তাকাই তাহলেই দেখতে পারবো স্বাধীনতার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারছে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনের মানুষ। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে আমরা ২০২৪ সালে দেশ এবং স্বাধীনতা রক্ষা করেছি।
শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ছিল স্বাধীন সার্বভৌম নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের যারা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির ভিতরে থেকেও, বিভিন্ন অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেও কীভাবে প্রতিরোধ গড়েছিলেন, কীভাবে স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। আমরা আমাদের বহু সহকর্মীকে সেদিন হারিয়েছি। প্রতিটি প্রাণের স্বপ্ন আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, স্বপ্ন ছিল, আকাঙ্ক্ষাও ছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণেই তারা সাহসের সঙ্গে সেদিন লড়াই করেছিল ৭১, ৯০, ২৪ এ। ১৯৭১ থেকে আজ পর্যন্ত সকল প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক তাঁবেদার মুক্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভায় আরও অংশ নেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ওয়াকিল আহমেদ, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এ সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
রোববার দিনগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে টোকিওর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান।
বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান সহযোগিতা পর্যালোচনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন তিনি এবং জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
সফরের কর্মসূচিতে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইউনিক্লোর সদরদপ্তর ও টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে।
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা সফরের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, সফরকালে কৃষি, মৎস্য, দক্ষতা উন্নয়ন, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক সই কিংবা সহযোগিতার বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনায় স্থান পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গা সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
এ বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল আগামী বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত হবে। আজ শনিবার রাতে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের আহ্বায়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আখতারুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।
এর আগে ২৫ থেকে ২৯ অক্টোবরের মধ্যে ফল প্রকাশের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল শিক্ষা বোর্ডগুলো। এর মধ্যে ২৯ অক্টোবর ফল প্রকাশের জন্য চূড়ান্ত করেছে সরকার।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র বলেন, সাধারণত বৃহস্পতিবার ফল প্রকাশ করা হয়। ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার। এদিন ফল প্রকাশিত হবে।
জানতে চাইলে অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, তাঁরা ২৫ থেকে ২৯ অক্টোবরের মধ্যে ফল প্রকাশের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। সরকার ফল প্রকাশের জন্য ২৯ শে অক্টোবর দিনটি চূড়ান্ত করেছে।
এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল গত ২ জুলাই। এবার নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। অবশ্য পরীক্ষায় বেশ কিছুসংখ্যক পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৮ দলের ক্রিকেটার মেহেদী হাসান হৃদয়।
কয়েক মাস ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৮ দলের ক্রিকেটার মেহেদী হাসান হৃদয়। তবে শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী ব্লাড ক্যানসারের কাছে হার মানতে হলো এই সম্ভাবনাময় বাঁহাতি পেসারকে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হৃদয়। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
শোকবার্তায় বিসিবি জানায়, তরুণ ক্রিকেটার মেহেদী হাসান হৃদয়ের মৃত্যুতে তারা গভীরভাবে শোকাহত। লিউকেমিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে করতেই আজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। চট্টগ্রাম বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৮ দলের হয়ে খেলা হৃদয় ছিলেন একজন সম্ভাবনাময় বাঁহাতি পেস বোলার। তার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে বিসিবি।
অ্যাকিউট মায়েলয়েড লিউকেমিয়া (এএমএল) নামের রক্ত ও অস্থিমজ্জার দ্রুত বর্ধনশীল ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন হৃদয়। তার চিকিৎসার জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বিসিবি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। গত জুলাইয়ে হৃদয়ের চিকিৎসার জন্য পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয় বিসিবি। একই পরিমাণ অর্থ সহায়তা দেয় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ও।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এটি বর্তমানে পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও আশেপাশের এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর ও ঘণীভূত হতে পারে। আজ শনিবার এমন পূর্বাভাস জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বঙ্গোপসাগরের এই সুস্পষ্ট লঘুচাপটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে জানা গেছে। ঘূর্ণিঝড়টি তৈরি হলে এর সম্ভাব্য লক্ষ্যস্থল হতে পারে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ বা তামিলনাড়ু উপকূল। এর প্রভাবে আগামী মঙ্গলবার দেশের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। রাজধানী ঢাকাতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টি তৈরি হলে এর নাম হতে পারে ‘অর্ণব’।
আগামী সোমবার এটি উপকূলে আঘাত হানতে পারে। তবে বাংলাদেশে এর প্রভাব খুব বেশি অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা নেই। এর প্রভাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। ঢাকায় বৃষ্টি হতে পারে মঙ্গলবারের দিকে। তবে বৃষ্টির পরিমাণ খুব বেশি নাও হতে পারে।
এদিকে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টি নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণাধীন ৫১টি স্টেশনের কোনো স্টেশনেই শুক্রবার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়নি। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, গত কয়েক দিনে বঙ্গোপসাগরে একের পর এক লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব বেশি থাকায় বাতাস সাগরমুখী হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের স্থলভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা কমে যায়। দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য বাড়ছে। দিনের বেলায় গরম থাকলেও রাত ও ভোরের দিকে তাপমাত্রা কমে আসছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে শীতের আমেজ অনুভূত হতে শুরু করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগের দুই-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। এই সময়ে সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। সকাল ৬টার আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রামের আমবাগানে, ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আগামীকাল রোববার অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
সোমবার চট্টগ্রাম বিভাগের দু'এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।
মঙ্গলবার খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।
বুধবার রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।
বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস নেই
পাইপলাইনের জরুরি লিকেজ মেরামত কাজের জন্য আজ শনিবার টানা ৪ ঘণ্টা রাজধানীর বেশকিছু এলাকায় গ্যাস থাকবে না।
গতকাল শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পাইপলাইনের জরুরি লিকেজ মেরামত কাজের জন্য শনিবার দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজধানীর নতুন বাজার থেকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশের নর্দ্দা, কালাচাঁদপুর, বসুন্ধরা, জোহার সাহারা, ভাটারা ও বারিধারা জে ব্লকসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
সাময়িক এ অসুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্রাহকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
লাউ ও পেঁপে উৎপাদন
এক টাকায় চারটি লাউ। আর এক কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই থেকে তিন টাকায়। উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে ফসল তোলার শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচও উঠছে না। তাই জমিতে ফলনভরা লাউয়ের গাছ কেটে ফেলছেন কৃষক। পেঁপে পেকে নষ্ট হচ্ছে গাছেই। অথচ রাজধানীর বাজারে একটি লাউয়ের দাম ৪০ থেকে ৬০ টাকা, পেঁপেও বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ৩০ টাকায়।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এবার লাউয়ের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় দর পড়ে গেছে। কোথাও চারটি লাউ বিক্রি হচ্ছে এক টাকায়, কোথাও প্রতিটি লাউয়ের দাম দুই থেকে পাঁচ টাকা। অথচ স্থানীয় খুচরা বাজারে একটি লাউয়ের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত।
আটোয়ারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকার কৃষক দুলাল ইসলাম ৪০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন। তাঁর খরচ হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু এ পর্যন্ত লাউ বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র তিন হাজার টাকা। এই অর্থে শ্রমিকের মজুরি দেওয়াও সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
এই কৃষক আরও বলেন, দুই থেকে তিন হাজারটি লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংস কেনার টাকা হয় না। লোকসানের কারণে শেষ পর্যন্ত বাগান কেটে ফেলেছেন। কিছু লাউ গরুকে খাওয়াচ্ছেন। তাঁর প্রশ্ন, কৃষক এত কষ্ট করে ফসল ফলিয়ে দাম না পেলে চাষ করবেন কীভাবে?
একই উপজেলার ঝলঝলি উলারচাপ এলাকার কৃষক আনসারুল ইসলাম ১০ দিন ধরে লাউয়ের বাগানের পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন। সার-কীটনাশকের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বাড়লেও লাউয়ের দাম মিলছে সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা পর্যন্ত। একজন শ্রমিককে দিনে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দিতে হয়। এ অবস্থায় বাগানে পরিচর্যা চালিয়ে যাওয়াকে লোকসান আরও বাড়ানোর শামিল মনে করছেন তিনি।
পেঁপের বাজারেও একই চিত্র। ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় এবার প্রায় ৯০০ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
অনুকূল আবহাওয়া, উচ্চফলনশীল জাতের বিস্তার ও আবাদ বাড়ায় উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পেঁপে আসায় দাম নেমে গেছে অস্বাভাবিকভাবে।
সিংগাইরে জমিতে পেঁপে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা। এ দামে পণ্য বিক্রি করে জমির ভাড়া, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের খরচ তোলা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কৃষক গাছ থেকে পেঁপে তুলছেন না। কোথাও পাকা পেঁপে নষ্ট হচ্ছে। কোথাও গাছ কেটে বিকল্প ফসল চাষের প্রস্তুতি চলছে।
সিংগাইরের গোপালনগর গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন দুই বিঘা জমিতে পেঁপে চাষে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। কিন্তু ক্রেতারা কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকার বেশি দিতে চাইছেন না। এই দামে শ্রমিক ও ভ্যানভাড়া দেওয়াই কঠিন বলে জানান তিনি।
সিংগাইরের আরেক কৃষক তাজুল সিকদার লোকসানের কারণে দুই বিঘা জমির পেঁপে গাছ কেটে ফেলেছেন। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে খরচের সামান্য অংশও ফেরত না পাওয়ায় অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন তিনি।
কৃষকদের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে পেঁপে চাষে আগ্রহ কমে যাবে।
এ দিকে ঢাকার পাইকারি বাজারেও এক সপ্তাহ ধরে কাঁচা পেঁপে কেজিপ্রতি চার থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে খুচরা বাজারে পেঁপের দাম কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
গত বছরের বেশি দামের অভিজ্ঞতায় এবার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় উৎপাদন এবং আগাম বিনিয়োগ বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু ফলন ও সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বাজারের হিসাব উল্টে গেছে।
কারওয়ান বাজারের পেঁপে ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান গত বছর ভালো দাম পাওয়ার অভিজ্ঞতায় এবার পাঁচ জেলার কৃষকদের তিন কোটি টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন। তাঁর আশা ছিল, এবারও বাজার ভালো থাকবে। কিন্তু দাম পড়ে যাওয়ায় সেই বিনিয়োগ ফেরত পাওয়া নিয়েই এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ওই ব্যবসায়ী জানান, কয়েক দিন ধরে তিনি পেঁপে কেজিপ্রতি ছয় থেকে সাত টাকায় বিক্রি করেছেন। এক পর্যায়ে দাম নেমে আসে চার টাকায়। অথচ চুয়াডাঙ্গা ও যশোর থেকে ঢাকায় পেঁপে আনতেই কেজিপ্রতি পরিবহন খরচ চার টাকার বেশি পড়ে। তিন কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়ার পর এর ৫০ লাখ টাকাও ফেরত পাবেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। ব্যাংক ঋণ ও সুদের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এই ব্যবসায়ী।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে তিন টন পেঁপে কারওয়ান বাজারে এনেছিলেন অজি উল্যাহ। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, জমির ভাড়া, বীজ, সারসহ উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ যোগ হয় আরও তিন টাকা।
অর্থাৎ ঢাকার বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি কেজি পেঁপেতে খরচ দাঁড়ায় ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ তাঁকে পেঁপে বিক্রি করতে হয়েছে কেজিপ্রতি ছয় থেকে আট টাকায়। প্রতি কেজিতে লোকসান হয়েছে অর্ধেকেরও বেশি।
কারওয়ান বাজারে ২০ বছর ধরে সবজি বিক্রি করছেন আবু বকর। তিনি জানান, পেঁপের দাম এতটা কমে যেতে তিনি আগে কখনও দেখেননি।
এদিকে আগাম শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করলেও সব পণ্যের দাম একসঙ্গে কমেনি। বগুড়ার মহাস্থান পাইকারি বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে পটোলের দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকা থেকে কমে ২৫-৩০ টাকা, করলার দাম ৫৫ থেকে ৪৫ টাকা, ফুলকপির দাম ৭০-৮০ থেকে ৬০ টাকা এবং মুলার দাম ৩৫ থেকে ২২ টাকায় নেমেছে। কিন্তু বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে পটোল ৫০-৬০ টাকা, করলা ৮০ টাকা এবং ফুলকপি ১৬০ টাকা দরে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, বাজারে শীতের সবজি চলে এসেছে। ফলে মানুষের এখন আগ্রহ আগাম শীতের সবজির দিকে। লাউ এবং পেঁপে সারাবছর পাওয়ার কারণে মানুষ এখন এই দুই সবজির দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এ ছাড়া পেঁপে ও লাউয়ের আবাদ ও উৎপাদন দুটিই বেড়েছে। অনেক জেলায় উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাতের পেঁপে ও লাউ চাষের বিস্তার ঘটেছে। বেশি জমিতে আবাদ ও ভালো ফলনের কারণে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, লাউ এবং পেঁপের বাজারের চিত্র কৃষিপণ্যের বিপণনব্যবস্থার একটি বড় সংকট সামনে এনেছে। উৎপাদন বাড়লেও সেই পণ্য লাভজনক দামে বিক্রি করার নিশ্চয়তা নেই কৃষকের। দ্রুত পচনশীল পণ্য দীর্ঘ সময় ধরে রেখে দাম বাড়ার অপেক্ষা করার সুযোগ কৃষকের নেই। বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দ্রুত বিক্রি করতে গিয়ে তাঁকে লোকসান মেনে নিতে হয়। সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দূরের বাজারে পণ্য পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে এই ঝুঁকি থেকেই যায়। কম দামে পণ্য পেয়ে ভোক্তার সাময়িক স্বস্তি মিললেও উৎপাদক যদি উৎপাদন খরচই তুলতে না পারেন, তাহলে পরের মৌসুমে সেই ফসল চাষে তাঁর আগ্রহ ও সক্ষমতা- দুটিই কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তিনি বলেন, ভারত ‘মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস’ নামে একটি স্কিম চালু করেছে, যা কৃষকের নিজের উৎপাদিত ফসলের নির্দিষ্ট দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। এ ছাড়া ‘ফসল বীমা কর্মসূচি’ও রয়েছে সেখানে। ভারতে প্রায় ২৩টি পণ্য সরকার কিনে নিয়ে মজুত করে। পরে যখন মৌসুম শেষ হয়, তখন সরকার বাজারে সেই পণ্য ছাড়ে। তাতে বাজার নিয়ন্ত্রিত থাকে। পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষিমূল্য কমিশন’ গঠনের প্রস্তাবও করেন এই বিশেষজ্ঞ।