ড. ঈশিতা দস্তিদার
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা ও প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় ১৮ মাস ধরে সমাজকে বিপর্যস্ত হতে দেখলাম আমরা। পুরোনো সামাজিক সহনশীলতার অবশেষটুকু যেন অতি অল্প সময়ে কেউ জোর করে নাই করে দিল। কেউ যেন স্বাভাবিকতার মোড়কে প্রান্তিক সংস্কৃতি, ধর্ম, আচার, অভ্যাস ও চর্চা, ভাষা, পছন্দ-অপছন্দ, অভিরুচি–সব কিছুকে গলা টিপে ধরে রাখল। নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়গুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রয়োজন অস্বীকার করার পাশাপাশি পদ্ধতিগতভাবে দীর্ঘমেয়াদি বৈষম্য সৃষ্টির লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক কাঠামোকে এলোমেলো করে দেওয়া হলো। ফেটে যাওয়া কাচের মতো বিবিধ বিশ্বাস, রীতিনীতি ও চর্চা, নিস্তরঙ্গ সহজ-সরল জীবনযাপন ও জীবনবোধ মিলেমিশে শত সংকটেও খড়কুটোর মতো ভেসেছিল বাংলাদেশ। স্বৈরাচার তাড়াতে গিয়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের খানিক ভঙ্গুর ভিতটুকু ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
জাতীয় ঐক্য ভাঙার দায় কার?
চব্বিশের জুলাইয়ের দিনগুলোতে ঘরে ঘরে মানুষ জেগে উঠেছিল অপশাসন আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ–কে আন্দোলিত হয়নি সে দিনগুলোতে? গান-কবিতা, স্লোগানে স্লোগানে মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সংগীত, নজরুল-রজনীকান্তের গানে-সুরে নতুন করে আত্মান্বেষণে নেমেছিল মানুষ। দেয়াললিখন-গ্রাফিতিতে নতুন বাংলাদেশের গল্প বলতে চেয়েছিল নতুন প্রজন্ম। স্বপ্ন দেখছিল দুঃসময় পেরিয়ে নতুন এক ভোরের। কিন্তু মানুষের সেই অঙ্গীকার বা স্বপ্নের কথা কতটা শুনতে পেল শাসকরা কিংবা রাষ্ট্রকাঠামো? কী পেলাম আমরা ১৮ মাসে?
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘অরাজনৈতিক’ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নতুন সরকার গঠিত হলো বটে, তবে আন্দোলনকালে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য ভেঙেচুরে বিশেষ বিশেষ দিকে পক্ষপাত প্রবল হয়ে উঠতে থাকল। গণঅভ্যুত্থানের অংশীদার সবারই নিজস্ব দর্শন ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার পরিপন্থি ছিল না রাজপথের সে লড়াই। অথচ ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ভাস্কর্যের ওপর হামলে পড়ল কিছু লোক। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টের জন্য তাদের শাস্তি না দিয়ে নীরবে উৎসাহিত করা হলো। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ প্রলম্বিত হতে হতে ঢাকার কারওয়ান বাজার পর্যন্ত পৌঁছাল। কে কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করল তাহলে?
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে প্রথম আঘাত আসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। অভিযোগ জানানোর জন্য প্রশাসনকে পাওয়া গেল না। বলা হলো, পুলিশ প্রশাসন এখনও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এক-দুটি ঘটনায় গ্রেপ্তার, মামলা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি নির্বিকার ভঙ্গি পরবর্তী হামলা ও হত্যাকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করে দিল। প্রশাসনের শিথিলতায় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এ দেশের সংখ্যালঘু সমাজ গত ১৮ মাস যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেল,
তাকে শুধু নীরব এথনিক ক্লিনজিংয়ের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া ভারতীয় মিডিয়ার প্রোপাগান্ডাকেই যেন সত্য প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছিল সরকার। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রার্থীদের অনেকেই স্থানীয় সংখ্যালঘু ভোটের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরলেন, মহোৎসব বা নামযজ্ঞের উৎসবে পাত পেড়ে প্রসাদ খেলেন। অনেকে তা করে ভোটের বৈতরণিও পার হলেন। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী নির্যাতন-নিপীড়নের স্মৃতি সংখ্যালঘুদের স্বস্তি দিচ্ছিল কী?
গত সেপ্টেম্বর মাসে খাগড়াছড়ির গুইমারায় যা হয়েছে, তার কতটা আমরা এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছি? অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ঢাকা শহরেই আদিবাসীদের ওপর যে হামলা হয়, তার কোনো বিচার হয়েছে কী? বান্দরবানে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) মতো নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান দমনের প্রক্রিয়ায় আদিবাসীরা নতুন করে বাস্তুচ্যুত হলেন। হাজতে বেশ কয়েকজন মারা যাওয়ার পরও মুক্তি পায়নি রৌসাং লিয়ান বমসহ গণগ্রেপ্তার হয়ে বিনা বিচারে দুই বছরের বেশি সময় কারাবন্দি থাকা বেথেলপাড়ার বম নারী ও পুরুষের অনেকে। নির্বাচন কী কাঙ্ক্ষিত মোড় ঘোরাবে?
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে চব্বিশের জুলাই পর্যন্ত সব আন্দোলন- সংগ্রামে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, নেতৃত্বও দিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে যে মেয়েরা ছিল সম্মুখসারিতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী গত ১৮ মাসে তাদের কোনো ক্ষেত্রেই সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হলো না। উমামা ফাতেমার মতো সাহসী নারী কর্মীরা অন্তরালে চলে গেলেন। অথচ নারীবিদ্বেষী দুর্জনেরা আসর জমিয়ে বসেছে। অশোভন আচরণকারী ও প্রকাশ্যে নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনাকারী পুরুষদের ফুলমালায় শোভিত করা, নারী কমিশনের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে কুৎসিত ভাষায় গালাগাল করা, অনলাইনে গণহারে স্লাটশেমিং ইত্যাদি অন্তর্ভুক্তিমূলক যাবতীয় বক্তব্যকে ম্লান করে দিল। ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশে’র কথা বলা মানুষগুলো বিগত মাসগুলোতে পুরোদমে সম্ভাব্য সকল প্রকারে নারীদের বাদ দেওয়ার রাজনীতি করে গেলেন। নারীবিরোধী উগ্রতাকে দেখেও না দেখার ভান করে বৈধতা দিয়ে গেছে সরকার। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো মবরূপী ‘প্রেশার গ্রুপ’ আতঙ্কে থাকে নিয়মিত এখন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান বোঝা গেল না। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় হরহামেশা জেলেদের ধরে নিয়ে আটক করা হচ্ছে, অথচ বাংলাদেশ সরকারের আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সুনর্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ দেখা গেল না। ভারতীয় সীমান্তে হত্যাকাণ্ডও বন্ধ হলো না। আকস্মিক বন্যায় প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ বিপর্যয় রোধে আন্তঃদেশীয় আলাপচারিতার ও সমঝোতার খবর নেই। অথচ সারাক্ষণ ভারতবিরোধী যুদ্ধংদেহী বাগাড়ম্বর চালিয়ে যাওয়া হলো। সাড়ে ৩০০-এর বেশি কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে গত ১৮ মাসে। কর্মহীন কয়েক লাখ শ্রমিকের পেটের ভাত, কৃষকের ন্যায্যমূল্যের দাবির প্রতি মনোযোগের চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে আওয়াজ তোলা হলো তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণের।
বোঝা দুরূহ নয়, এসব ছিল লোকরঞ্জনবাদী ফ্যাশনের শাসন ব্যবস্থায় মানুষকে জুলাইয়ের প্রত্যাশা থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিমুখে নেওয়ার সচেতন প্রয়াস। প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আমরা বিগত ১৮ মাসের ভুল যাত্রায় মোড় বদল ঘটাতে পারব কিনা?
লেখক: ড. ঈশিতা দস্তিদার, নৃবিজ্ঞানী ও লেখক
বঙ্গভবন
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া পদে নতুন অভিভাবক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সাংবিধানিক নিয়মে স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় সবার নজর এখন বঙ্গভবনের পরবর্তী স্থায়ী বাসিন্দার দিকে। ঘটনাটি খানিকটা আকস্মিক। আমরা দেখতে পেলাম শেখ হাসিনার শেষ আমল থেকে যিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন, তিনি ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে, সংবিধান অনুযায়ী এই পদের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে বিদ্যমান জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
হঠাৎ করে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করার আগে পুরো বিষয়টি দেখে মনে হচ্ছিল, বর্তমান সংসদে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংশোধনীগুলো গৃহীত হওয়ার পর বিএনপি নতুন রাষ্ট্রপতির ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করবে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ফলে প্রক্রিয়াটি কিছুটা এগিয়ে এসেছে। এতে যা বোঝা যাচ্ছে বা আমি যেভাবে অনুমান করছি, বিএনপির নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে হয়তো একটি বার্তা দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের সরকারের ইচ্ছাকে ব্যক্ত করা হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি বেশ তড়িঘড়ি করে পদত্যাগ করলেন। প্রথমত আমি বলতে চাই যে, শেখ হাসিনার সবচেয়ে অনুগত একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি যেভাবে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, তা ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য।
অবিশ্বাস্য এই অর্থে যে, আওয়ামী লীগের প্রথম সারির রাজনীতিবিদদের সবাইকে বাইরে রেখে এমন একজনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, যা মানুষকে বেশ বিস্মিত করেছিল। বিষয়টি একদিকে যেমন হাসি-তামাশার খোরাক জোগায়, অন্যদিকে তেমনি বিস্ময় ও উদ্বেগেরও সৃষ্টি করেছিল। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বোঝা গিয়েছিল যে, এসব পদের ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাহী প্রধান বা সরকারি দল ১০০ ভাগ আনুগত্য দাবি করে; ৯৯ পেলেও সেটাকে যথেষ্ট বিবেচনা করা হয় না।
সম্ভবত মো. সাহাবুদ্দিন সেই ১০০ ভাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলেই ওই পদে আসতে পেরেছিলেন। আমাদের গণঅভ্যুত্থানের পর এটা খুবই প্রত্যাশিত ছিল যে, তিনি নৈতিক দায়দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করবেন। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেননি। বরঞ্চ একটি জটিল ও কঠিন সময়ে কিছুটা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও আমরা তার কোনো পদত্যাগ দাবি করিনি। এই বিবেচনা থেকেই দাবি করা হয়নি যে, সে সময় একটা সহিংসতার আশঙ্কা ছিল, অভ্যন্তরীণ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল এবং একটি সাংবিধানিক শূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। অভ্যুত্থানের পরপরই রাজনৈতিক নৈরাজ্যের সুযোগ নিয়ে অনেকেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে নেমে পড়েছিলেন। সেই জায়গা থেকে আমরা রাষ্ট্রপতির পদে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পরিবর্তন দেখতে চাইনি।
তবে তার পক্ষ থেকে নিজের মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পদত্যাগ করার একটা দায়িত্ব ছিল। পরবর্তীকালে অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা ছাত্ররা যখন তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ও বিক্ষোভ করল, তখন বিএনপিসহ আমরা অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একমত হইনি। এর কারণ ছিল, তখন দেখা যাচ্ছিল অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ক্ষমতা প্রলম্বিত ও দীর্ঘায়িত করতে চায় এবং গোটা নির্বাচনকে অনিশ্চিত সময়ের জন্য ঝুলিয়ে দিতে চায়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে তাকে কে প্রতিস্থাপন করবেন, রাষ্ট্রপতি পদে কাকে বসানো হবে—এ নিয়ে বহু ধরনের তৎপরতা চলছিল।
এমনকি এটা নিয়ে আরেকটি দ্বিতীয় বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সমীকরণ তৈরির বহুমাত্রিক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। সম্ভবত সেই আশঙ্কা থেকেই বিএনপি বা অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তখন আর পরিবর্তন দেখতে চায়নি। পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনের পর তিনি এক বিরল সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হিসেবে পরপর তিনজন সরকার প্রধান বা নির্বাহী প্রধানকে শপথ পড়ালেন—শেখ হাসিনা, মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমান। এরপর এখন তিনি বিদায় নিয়েছেন। তবে আমি মনে করি, এই পদের যে একটি নৈতিক জায়গা রয়েছে, তা তিনি বহু আগেই হারিয়েছিলেন। তার কথাবার্তা ও আচরণের মধ্যেও কোনো সঙ্গতি ছিল না।
শেখ হাসিনার সময়ে তার যে বক্তব্য ছিল, মুহাম্মদ ইউনূসের সময়ে তা পরিবর্তিত হয়েছে, আর শেষ কয়েক মাসে তিনি তো একেবারে ১৮০ ডিগ্রি উল্টো দিকে গিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, সংসদে ভাষণ দিয়েছেন। অবশ্য, সংসদে রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দেন, সেটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হতে হয়। যে ভাষণে সরকারের গুণকীর্তন এবং মন্ত্রণালয়গুলোর ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সারসংক্ষেপ থাকে। রাষ্ট্রপতি মূলত এটি দেখে দেখে পাঠ করেন মাত্র। ফলে তার ওই ভাষণটি আদৌ তার নিজের কি না, সেটি অন্য তর্ক। কিন্তু তারপরও যেহেতু এটি রাষ্ট্রপতির ভাষণ বলেই গৃহীত এবং স্বীকৃত, এটি সংসদের কার্যবিবরণিতে রাষ্ট্রপতির ভাষণ হিসেবেই উল্লেখিত থাকবে। কিন্তু চাইলে তিনি তখনও পদত্যাগ করতে পারতেন।
যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন এবং এর ফলে বাংলাদেশের জন্য এখন একটি নতুন পর্যায় ও পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে।ভবিষ্যতের কথা বলতে গেলে, সংসদের আগামী অধিবেশন পর্যন্ত হয়তো পরবর্তী নির্বাচিত একজন স্থায়ী রাষ্ট্রপতির জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ইতিমধ্যে আমার ধারণা, জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত যে কমিটি গঠিত হয়েছে এবং ‘জুলাই সনদ’-এ যেখানে বিএনপিসহ আমরা অধিকাংশ দল একমত হয়েছি, সে সংক্রান্ত একটি সংবিধান সংশোধন বিল তারা উত্থাপন করবেন। এটি হয়তো সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী আকারে আসবে, যেখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছুটা বৃদ্ধি বা তাকে ক্ষমতায়ন করার বেশ কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে। এসব প্রস্তাবে বিএনপিসহ আমাদের অনেকেরই এক ধরনের সহমত রয়েছে।
আমার ধারণা, রাষ্ট্রপতির কাজ এখনকার মতো কেবল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অভ্যর্থনা জানানো, মিলাদ মাহফিল করা এবং প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তার আরও কিছু নতুন দায়িত্ব ও কর্তব্যের জায়গা তৈরি হবে। আমি দেখতে চাইব এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন রয়েছে এবং জনগণের সঙ্গে যার একটি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। যিনি গত কয়েক দশকের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে চিন্তার দিক থেকে ও শারীরিকভাবে ধারণ করবেন এবং দেশের মানুষের সঙ্গে যার একটি আত্মিক ও স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে।
সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের পরীক্ষায় যিনি উত্তীর্ণ এবং ত্যাগী, সংগ্রামী ও আত্মনিবেদিত মানুষ হিসেবে যার সম্মান ও মর্যাদার জায়গায় বড় কোনো প্রশ্ন নেই—এমন ব্যক্তিকেই সেখানে প্রত্যাশা করি। আমি মনে করি, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে নিশ্চয়ই এরকম যোগ্য ব্যক্তিবর্গ আছেন এবং সেখান থেকেই নীতিনির্ধারকরা একজনকে নির্বাচিত করবেন। কোনোভাবেই সামরিক আমলাতন্ত্রের কাউকে আমি এই পদে দেখতে চাইব না। এটি একটি সর্বসাধারণের পদ এবং রাষ্ট্রের অভিভাবকের স্থান। এই পদটির ওপর আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত; পাশাপাশি নির্বাচিত নতুন রাষ্ট্রপতির অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে।
আশা করি, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় যুক্ত হবে এবং পরবর্তী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে আমি যেমনটি বলেছি, আমি দেখতে চাইব এমন একজন রাষ্ট্রপতি—যার শক্ত মেরুদণ্ড রয়েছে, সততা ও নিষ্ঠা রয়েছে এবং সকল রাজনৈতিক দল ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর কাছে যার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বিএনপি যদি প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারে, তবে এরকম যোগ্য, দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ব্যক্তিত্বকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আশা করছি সেভাবেই হয়তো কাজ এগোবে। হাতে ৯০ দিন সময় আছে। সেপ্টেম্বরে যে সংসদ অধিবেশন শুরু হবে, আশা করি সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে ৯০ দিন শেষ হওয়ার আগেই বর্তমান সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা একজন স্থায়ী রাষ্ট্রপতি পাব।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
সংগৃহীত ছবি
১৫ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আকস্মিকভাবে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের ঘোষণা দিলেন, তখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তেহরানের এক বিশাল কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের নৌ-অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছে এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি আবার বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া তেহরান পাবে বিরাট আর্থিক সুবিধা, সঙ্গে ছাড় করা হবে তার জব্দকৃত সম্পদ।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আগামীকাল শুক্রবার (১৯ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে এ সমঝোতা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে একদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চুক্তিতে সই করেছেন। ঐতিহাসিক ঘটনাটি স্মরণীয় করে রাখতে আগামীকাল সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যে তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সরাসরি সংঘাতের অবসান ঘটবে।
কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ চুক্তির পর বিশ্বরাজনীতিতেও এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম, দেশের শীর্ষ কূটনীতিক এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি এ চুক্তিকে কোনো সাধারণ আপস হিসেবে দেখছেন না; বরং তাঁরা এটিকে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘদিনের ‘ঐতিহাসিক প্রতিরোধের একটি বড় জয়’ হিসেবে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চুলচেরা বিশ্লেষণের আলোকে এই প্রতিবেদনে দেখা যাক, কীভাবে তেহরান নিজের সার্বভৌমত্ব ও সামরিক শক্তি বজায় রেখে এই চুক্তিতে পৌঁছাল এবং এর পেছনে তাদের বাস্তব অর্জনগুলো কী—
তিন মাসের যুদ্ধ
ইরানের ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধের মুখে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের আগ্রাসন ও রক্তক্ষয়ী এ সংঘাতের অবসান ঘটাতে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত বিধ্বংসী উপায়ে। যুক্তরাজ্যের ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি রিসার্চ ব্রিফিং’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একযোগে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। ওয়াশিংটন এ অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (মহাকাব্যিক তাণ্ডব)। এর মূল লক্ষ্য ছিল, ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং তাদের প্রতিরক্ষামূলক পারমাণবিক ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা। যুদ্ধের এই প্রাথমিক ধাক্কা তেহরানের জন্য কঠিন ছিল।
প্রথম দফার হামলাতেই ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। পাশাপাশি নিহত হন দেশটির শীর্ষস্থানীয় আরও কয়েকজন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা।
তবে এ চরম সংকটের মুহূর্তেও ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং খামেনির ছেলে মোজতবা আলী খামেনিকে দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিযুক্ত করে ইরানিরা জাতি হিসেবে দৃঢ় ঐক্য প্রদর্শন করেন।
মার্কিন–ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে ইরান যে পাল্টা আঘাত গড়ে তোলে, তা পশ্চিমাদের হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দেয়। ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, এমন কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি ছিল, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
ইরান সফলভাবে এ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যে প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো, তা ইরান বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের শত শত জাহাজ সাগরে আটকে পড়ে। বিশ্ব অর্থনীতিতে তৈরি হয় তীব্র সংকট। ওয়াশিংটন বুঝতে পারে যে সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে দমন করা অসম্ভব।
এরপর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। ইরান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের শর্তে অটল থেকে দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে এই সমঝোতা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে।
২৫ বিলিয়ন ডলার উদ্ধার ও পারমাণবিক সক্ষমতা রক্ষা
ইরানের বিজয়ের দাবির পেছনে অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি রয়েছে। এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর থেকে সম্পূর্ণ নৌ অবরোধ তুলে নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন মার্কিন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের ২৫ বিলিয়ন (২ ডলার ৫০০ কোটি) ডলারের জব্দকৃত তহবিল অবিলম্বে অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অন্যায় নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানের অর্থনীতির জন্য এই বিপুল পরিমাণ অর্থ এক বিশাল বড় শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘স্টিমসন সেন্টার’ তাদের জুনের মূল্যায়নে জানিয়েছে, এ চুক্তির ফলে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধোত্তর দেশ পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে আরও ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলার পাওয়ার পথ তৈরি করেছে। এটি তেহরানের একটি বিশাল কৌশলগত জয়।
আবার ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার শর্তও এ চুক্তিতে রয়েছে। চুক্তির অনুলিপি অনুযায়ী, ইরান এখন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাধীনভাবে তেল বিক্রি করে সরাসরি রাজস্ব আদায় করতে পারবে। সেই অর্থ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করবে।
পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও ইরান তার মূল নীতি ধরে রাখতে পারছে। ইরান আরও ৬০ দিনের আলোচনার মেয়াদে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে বর্তমান স্তর বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে।
কিন্তু ইরানের সবচেয়ে বড় বিজয়—তার মাটির নিচে সুরক্ষিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের শক্তিশালী মজুত ধ্বংস বা দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো কোনো শর্ত এ পর্যন্ত তেহরানের ওপর চাপাতে পারেনি।
বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী নিউজউইক একটি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বরাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্যও দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, গত তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শত চেষ্টা এবং বিমান হামলার পরও ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমা তৈরির মূল সক্ষমতা (মাটির নিচের সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে থাকা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত) সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ রয়েছে; অর্থাৎ বিপুল ক্ষয়ক্ষতির চেষ্টা করেও মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি স্পর্শ করতে পারেনি।
তেহরানের কূটনৈতিক সাফল্য ও জাতীয় সংহতির জয়
সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও গণমাধ্যম একে প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যটি এসেছে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদির কাছ থেকে।
তিনি ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ইরান এ চুক্তিকে নিজেদের বড় বিজয় হিসেবে দেখছে।’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের ১৪ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘারিবাবাদি আরও স্পষ্ট করেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া জোরাল প্রতিরোধ ও পাল্টা সামরিক জবাবই মূলত মার্কিন প্রশাসনকে আলোচনার টেবিলে আসতে এবং তেহরানের দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য করেছে।
একই সুর শোনা গেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সমান্তরাল বিবৃতিতে। ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক দাবি করেছেন, ‘ইরানি জাতি শুধু সাম্প্রতিক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধেই নয়, কৌশলগত নানা ক্ষেত্রেও এমন গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।’
সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ঘোষণা করেছে, চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা বন্ধ হবে। এটি মূলত ইরানের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, কোনো বিদেশি শক্তির চাপে নেওয়া পদক্ষেপ নয়।
উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘারিবাবাদি আরও বলেন, ‘এ অর্জন শুধু সামরিক শক্তির নয়; বরং এটি ইরানিদের জাতীয় সংহতি, স্থিতিস্থাপকতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণেরই ফসল।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এ চুক্তিকে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক সফল প্রতিরক্ষামূলক জয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ফক্স নিউজ ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানায়, তেহরানের রাস্তাঘাটে বড় বড় প্রচারপত্র বা বিলবোর্ড টানানো হয়েছে। সেখানে লেখা: ‘হরমুজ প্রণালি চিরকাল ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে’ এবং ‘ট্রাম্প আসলে ইরানের কোনো ক্ষতি করতে পারেননি।’
ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ এ অবস্থানকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক দিক থেকে বড় শক্তির আস্ফালন দেখালেও, যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানি বীরদের অসীম সাহসের কারণেই তাদের কাছ থেকে নিজেদের অনুকূলে চুক্তি আদায় করা সম্ভব হয়েছে; অর্থাৎ, ইরান কোনো চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করেনি, বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।
ওয়াশিংটনের প্রচার বনাম বাস্তব চিত্র
স্বভাবতই, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করতে এই চুক্তিকে ভিন্নভাবে রং দেওয়ার চেষ্টা করছে। হোয়াইট হাউসের একটি অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন দাবি করছে, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ করেছে তারা।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় মুহূর্ত হিসেবে দাবি করেন। তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরাও স্বীকার করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবি মূলত একটি রাজনৈতিক অপপ্রচার।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত ‘ফার্স নিউজ এজেন্সি’ স্পষ্ট করে দিয়েছে, নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের পর ইরান নিজস্ব নিয়ম ও সার্বভৌম ক্ষমতায় শুল্ক আদায়ের মাধ্যমেই হরমুজ প্রণালি পরিচালনা করবে। যুক্তরাষ্ট্র এখানে কোনো শর্ত চাপাতে পারেনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে যে প্রচণ্ড নিষেধাজ্ঞা এবং বোমাবর্ষণের মুখেও ইরানের সমাজ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, তা পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করেছে যুদ্ধ থামিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে।
পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ লিসা দফতরি ফক্স নিউজে গভীর হতাশার সঙ্গে স্বীকার করেছেন, ইরান প্রকৃতপক্ষে এ চুক্তিকে একটি ‘কৌশলগত বিরতি’ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তারা তাদের কোনো মৌলিক সক্ষমতাই ত্যাগ করেনি।
অন্যদিকে পশ্চিমা মদদপুষ্ট কিছু নির্বাসিত ইরানি বিরোধী গোষ্ঠীও ক্ষোভ ঝেড়ে বলেছে, এ চুক্তির মাধ্যমে ইসলামিক রিপাবলিক আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
এক নতুন মধ্যপ্রাচ্যের উদয়
সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ সমঝোতা চুক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের এক বিশাল কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। বিশ্বের পরাশক্তি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সামরিক জোটের যৌথ আক্রমণ সহ্য করেও ইরান তার পারমাণবিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকে সচল করার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল পুনরুদ্ধার করছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
তাই এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়তো একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। গত তিন মাসের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানকে বাদ দিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে কোনো সমীকরণ মেলানো সম্ভব নয়।
দৃঢ়তা, সঠিক কৌশল ও ঐক্যবদ্ধ জাতিতে ভর করে একটি দেশ যেকোনো পরাশক্তির চাপ মোকাবিলা করেও তার অধিকার আদায় করে নিতে সক্ষম—এটিও প্রমাণ করেছে তেহরান।
{তথ্যসূত্র: বিবিসি, ফক্স নিউজ, আল–জাজিরা, এবিসি নিউজ, আউটলুক ইন্ডিয়া, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস ও অ্যাক্সিওস}
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সম্পর্কে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর (CWCCI) প্রেসিডেন্ট আবিদা সুলতানা বলেছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত এবারের বাজেটকে সামগ্রিকভাবে একটি ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে নারী উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র, কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (CMSME) এবং রপ্তানিমুখী নারী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের জন্য আরও সুস্পষ্ট নীতি সহায়তা ও প্রণোদনার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য করমুক্ত বার্ষিক আয় সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে ৭০ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের করের চাপ হ্রাস পাবে এবং আরও বেশি উদ্যোক্তা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আসতে উৎসাহিত হবেন। একইসঙ্গে বাজেটে এসএমই উদ্যোক্তা তহবিল হিসেবে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা
বরাদ্দের প্রস্তাব প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই তহবিলের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তারা সহজতর অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ লাভ করবেন, যা CMSME খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আবিদা সুলতানা আরও বলেন, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসার জন্য টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ নির্ধারণ এবং স্থানীয় লেনদেনে ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব নতুন প্রজন্মের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে। এছাড়া ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ডিজিটাল সেবায় নিয়োজিত নারীদের জন্য উৎসে কর প্রত্যাহারের উদ্যোগ ডিজিটাল অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ওপর কর ও শুল্ক সুবিধা প্রদানের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সবুজ অর্থনীতি ও জলবায়ু সহনশীল ব্যবসার ক্ষেত্রে এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। নারী উদ্যোক্তারা কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, সবুজ প্রযুক্তি, ই-কমার্স, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ গ্রহণ করতে পারবেন।
তিনি আরো বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থায়নে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এখনও ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ও জামানতবিহীন অর্থায়নের বিষয়ে বাজেটে আরও সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে তা অধিকতর কার্যকর হতো। একইসঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুল সংখ্যক নারী উদ্যোক্তাকে কর ও নিবন্ধন ব্যবস্থার আওতায় আনতে সহজীকরণ প্রয়োজন।
CWCCI-এর পক্ষ থেকে তিনি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বতন্ত্র কর রেয়াত, জামানতবিহীন ও স্বল্পসুদে নারী উদ্যোক্তা তহবিল সম্প্রসারণ, সরকারি ক্রয়ে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ন্যূনতম ১০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ, প্রতিটি জেলায় Women Business Facilitation Center ও Women Business Incubation Center প্রতিষ্ঠা, গ্রিন ফাইন্যান্সে বিশেষ প্রণোদনা এবং নারী পরিচালিত স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগের জন্য Innovation Fund গঠনের দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, চিটাগাং উইম্যান চেম্বার দীর্ঘদিন ধরে নারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এবারের বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে নারী নেতৃত্বাধীন শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।
সর্বোপরি আবিদা সুলতানা আশা প্রকাশ করেন যে, বাজেটে ঘোষিত উদ্যোগসমূহের দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, CMSME খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য আরও বেগবান হবে।
বৈশ্বিক শিক্ষা সংস্কার, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পাঠদান নিয়ে যখন উৎসবমুখর আলোচনা চলছে, তখন একটি নিষ্ঠুর নীরবতা চেপে বসে থাকে- সেই লক্ষশিশুর নীরবতা, যারা দারিদ্র্যের নির্মম নিষ্পেষণে বইখাতা ফেলে চিরতরে স্কুলের আঙিনা থেকে বিদায় নেয়। একেই বলে "নীরবে ঝরে পড়া"।
নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে না। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়- এটি একটি ব্যর্থতার দলিল, একটি স্বপ্নের মৃত্যু। এই ট্র্যাজেডি কেবল ব্যক্তিগত নয়। এটি জাতীয় মানবসম্পদের অপচয়, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পায়ে বাঁধা সবচেয়ে ভারী শিকল।
১৯৯০ সালে বৈশ্বিক প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ, যা ২০২০-এর দশকে ৯১ শতাংশ ছাড়িয়েছে- পরিসংখ্যানে এটি অগ্রগতির চিত্র। কিন্তু ভর্তি হওয়া আর শিক্ষা সমাপ্ত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। ইউনেস্কোর ২০২৫ সালের বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ২৭২ মিলিয়ন শিশু ও কিশোর বিদ্যালয়ের বাইরে, যা আগের অনুমানের তুলনায় ২১ মিলিয়ন বেশি । এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী (৬-১১ বছর) শিশু রয়েছে ৭৮ মিলিয়ন। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার আগেই ঝরে পড়ে। সাব-সাহারান আফ্রিকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ; সেখানে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত- যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশের চিত্র বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ; এটি একটি প্রশংসনীয় অর্জন। অথচ সমাপনী হার এখনো ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ১৫-২০ শতাংশ শিশু পঞ্চম শ্রেণির সনদ অর্জনের আগেই স্কুলের আঙিনা ছেড়ে বিদায় নেয়। ভর্তি ও সমাপনীর এই ব্যবধানটিই প্রমাণ করে যে শুধু স্কুলে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়- শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
দারিদ্র্যের বহুমাত্রিক ফাঁদ
দারিদ্র্য কেবল অর্থের অভাব নয়; এটি একটি জটিল ও আন্তঃসম্পর্কিত প্রতিবন্ধকতার জাল, যার প্রতিটি সুতো শিশুকে শিক্ষা থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। দারিদ্র্য কিভাবে শিশুদের স্কুলছুট করে, তা বোঝার জন্য এর বহুমাত্রিক প্রভাব বিশ্লেষণ জরুরি।
শিশুশ্রম ও সুযোগ ব্যয়ঃ
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও ইউনিসেফের ২০২৪ সালের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে ৫৪ মিলিয়ন বিপজ্জনক কাজে নিযুক্ত। দরিদ্র পরিবারের কাছে একটি শিশু শুধু সন্তান নয়, সম্ভাব্য আয়ের উৎস। স্কুলের পরিবর্তে সে কৃষি, কারখানা বা গৃহকাজে যোগ দেয়। স্কুলে যাওয়া মানে একদিনের রোজগার হারানো- এই তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতির হিসেবে শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি অনেক ক্ষেত্রে হেরে যায়।
শিক্ষার প্রচ্ছন্ন ব্যয়ঃ
সরকারিভাবে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও খাতা, কলম, স্কুল পোশাক, যাতায়াত এবং প্রাইভেট টিউশনের খরচ মিলিয়ে শিক্ষা দরিদ্র পরিবারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন-আয়ের পরিবারের মোট আয়ের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত এই পরোক্ষ শিক্ষাব্যয়ে চলে যায়। এসব “লুক্কায়িত ব্যয়” অনেক পরিবারকে সন্তানদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করে।
ক্ষুধা ও অপুষ্টিঃ
ইউনিসেফের গবেষণা বলছে, অপুষ্ট শিশুদের অনুপস্থিতি বেশি, মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা দুর্বল এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যের মতো মৌলিক চাহিদার অভাব শিক্ষাকে পেছনে ফেলে। বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলের মতো কর্মসূচি এই সমস্যার আংশিক সমাধান হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা এখনো অপ্রতুল।
লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যঃ
দারিদ্র্যের আঘাত কন্যাশিশুদের ওপর দ্বিগুণভাবে পড়ে। নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোতে পুত্রসন্তানের শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেয়া হলেও মেয়েশিশুকে গৃহস্থালি কাজ বা বাল্যবিবাহের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা এখনো অনেক বেশি। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় এই প্রবণতা স্পষ্ট। অনিরাপদ যাতায়াত ও পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের অভাবও কন্যাশিশুদের ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
শিক্ষার নিম্নমানঃ
অপর্যাপ্ত শিক্ষক, দুর্বল অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ ও আনন্দের সাথে শিক্ষা কার্যক্রমের অভাবেও শিশুরা স্কুল থেকে আগ্রহ হারায়। ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট জানাচ্ছে, নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৭০ শতাংশ দশ বছর বয়সী শিশু একটি সহজ গল্প পড়ে বুঝতে পারে না- এটিকে বলা হয় "শিক্ষণ দারিদ্র্য" বা Learning Poverty।
যখন অভিভাবকরা দেখেন যে বছরের পর বছর স্কুলে গিয়েও শিশু কোনো কাজের দক্ষতা অর্জন করছে না, তখন তারা যুক্তিসংগতভাবেই শিশুকে স্কুল থেকে তুলে নেন।
বাংলাদেশের স্থানীয় বাস্তবতা
বাংলাদেশে ব্যানবেইস ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বিদ্যালয় ত্যাগের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিভাবকের আর্থিক অসচ্ছলতা (প্রায় ৪০% ক্ষেত্রে), ছেলেদের আয়-উপার্জনের চাপ এবং মেয়েদের গৃহস্থালির কাজে নিয়োগ। উপকূলীয় ও হাওর-বেষ্টিত এলাকায় মৌসুমী অভিবাসন শিশুদের শিক্ষায় বারবার ছেদ ফেলে, যা একসময় স্থায়ী ঝরে পড়ায় রূপ নেয়। পোশাকশিল্প ও কৃষিতে শিশুশ্রম এবং নদীভাঙন এলাকার বিশেষ ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য। উপবৃত্তি কর্মসূচি পরিস্থিতির উন্নতিতে সহায়তা করেছে; তবে গ্রামীণ, চরাঞ্চল ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ে এখনো বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ১৯৯০ সালে ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৯০ শতাংশে। কিন্তু ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে প্রবেশকারীদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার ২০০৯ সালের ৪২ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ২১ শতাংশে নেমে এলেও, প্রত্যন্ত ও দরিদ্র অঞ্চলে প্রাথমিক স্তর শেষ না করেই ঝরে পড়ার হার রয়ে গেছে উল্লেখযোগ্য। দারিদ্র্য, মৌসুমি অভিবাসন ও শিশুশ্রম (বিশেষত কৃষি ও পোশাকশিল্পে) এখানে অন্যতম বাধা ।
স্কুল থেকে ঝরে পড়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশাল। ইউনেস্কোর “দ্য প্রাইস অফ ইন্যাকশন” বলছে- ২০৩০ সালের মধ্যে মৌলিক দক্ষতাহীন ও ঝরে পড়া শিশুদের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি বছরে হারাবে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ফ্রান্স ও জাপানের জিডিপির চেয়েও বেশি। ঝরে পড়া মাত্র ১০% কমালেই বার্ষিক জিডিপি বাড়বে ১-২%।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব, শিক্ষার অতিরিক্ত এক বছর আয় বাড়ায় ৯-১০%।অথচ ঝরে পড়া শিশুরা আটকে যায় নিম্ন আয়, দুর্বল স্বাস্থ্য আর দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে- যা পরবর্তী প্রজন্মেও বয়ে যায়। জাতীয়ভাবে এর ফল: ধীর জিডিপি বৃদ্ধি, থেমে যাওয়া উদ্ভাবন আর ভঙ্গুর সামাজিক স্থিতি।
সংকট উত্তরণে করণীয়
সমাধানের জন্য দরকার সমন্বিত বহুমুখী পদক্ষেপ। শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা ও উপবৃত্তি বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর মধ্যাহ্নভোজ (স্কুল ফিডিং) কর্মসূচি, লিঙ্গসংবেদনশীল অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, জীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক পাঠ্যক্রম ও আনন্দের সাথে শিক্ষা- এই পদক্ষেপগুলো একত্রে কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
বিশেষতঃ দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য শর্তসাপেক্ষ উপবৃত্তি ও নগদ সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে, যেন শিক্ষার প্রচ্ছন্ন ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়। ক্ষুধামুক্ত শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী "মিড-ডে মিল" অত্যন্ত কার্যকর, যা শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে যাদুর মতো কাজ করে। পাশাপাশি শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য।
শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিউনিটি মনিটরিং জোরদার করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে শিশুবান্ধব ও কর্মমুখী করা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অর্থায়নে শিক্ষা নিশ্চিত করা; আনুষঙ্গিক শিক্ষা ব্যয় হ্রাস করা এবং নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা- বিশেষত মেয়েশিশুদের জন্য আলাদা স্যানিটেশন ও নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নীরবে ঝরে পড়া কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়- এটি বৈষম্য ও দারিদ্র্যের প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শুধু ভর্তি নিশ্চিত করলেই চলবে না; প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রেখে প্রাথমিক শিক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে হবে। কারণ একটি শিশুর ঝরে পড়া মানে শুধু একটি ফাঁকা বেঞ্চ নয়-একটি সম্ভাবনার মৃত্যু, একটি জাতির ভবিষ্যতের ক্ষয়। এই নীরবতা ভাঙতে এখনই দরকার সমন্বিত, জোরালো পদক্ষেপ।
ছবি : সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধের শুরুতে ডনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুতে অন্ধ ছিলেন। মূলত নেতানিয়াহুর উসকানিতে পড়েই তিনি ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন। হামলার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প ইরানি জনগণকে বলেন যে, বর্তমান কট্টরপন্থী শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার এটাই সেরা সুযোগ। ট্রাম্প চেয়েছিলেন হামলার মাধ্যমে ইরানের সরকার ফেলে দিতে। কিন্তু ইরান এই যুদ্ধকে দেখছে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে। ফলে সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, যদি তাদের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, তবে ইরানের দৃষ্টিতে সেটিই হবে তাদের বড় বিজয়।
মার্কিন-ইসরায়েলি এই হামলাতে ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা এবং আরও অনেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। তবে তৎক্ষণাৎ আরেকটি বাধা তৈরি হয়, তিনি মোজতবা খামেনি। এই যুদ্ধে মোজতবা তার স্ত্রী ও কিশোর পুত্রকে হারিয়েছেন, যে বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে।
মোজতবা খামেনি এমনই এক নেতা, যার সঙ্গে ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী ও অতলস্পর্শী সম্পর্ক ছিল। নেতৃত্বে তার আসীন হওয়ার অর্থ হলো, ইরান আরও সামরিক নির্ভর, আগ্রাসী এবং পশ্চিমা বিরোধী মনোভাব গ্রহণ করে।
অদ্ভুত হলেও সত্য ট্রাম্প একেই বলছেন শাসন পরিবর্তন। তার সংজ্ঞা অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে অ্যাডলফ হিটলারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে অ্যাডমিরাল কার্ল ডনিৎসের জার্মান রাষ্ট্রপ্রধান হওয়াটাও একটি শাসন পরিবর্তন ছিল।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরানে শাসন ব্যবস্থা বহাল তবিয়তে টিকে আছে এবং তা আরও কঠিন রূপ ধারন করছে।
ফলাফল, ইরানের স্কোর এক, ট্রাম্প শূন্য।
ইরানের হরমুজ অবরোধ
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধ ইরানের শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা সীমিত করবে। তিনি বলেন, “আমরা ধীরে ধীরে আমেরিকাকে ইরানের হুমকি দেয়ার সাহস অথবা শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতাকে ধ্বংস করব।”
এরপর তিনি বারবার দম্ভভরে দাবি করতে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের নৌবাহিনী, আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দিচ্ছে, এগুলোই তাদের কৌশলগত সাফল্য। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের কৌশলগত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
ইরানের পাল্টা নিশানায় ছিল উপসাগরীয় দেশগুলো। এমনকি আরও কঠিন সমস্যা হলো, ইরান এক শক্তিশালী ও নতুন ফ্রন্ট খুলেছিল এবং তা সুচারুভাবে ব্যবহার করছে। সেই ফ্রন্ট ছিল হরমুজ প্রণালি। এই গুটি খেলে, নৌবাহিনী বিধ্বস্ত হওয়া সত্ত্বেও ইরান এখন বিশ্ব অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।
নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বারবার আশ্বস্ত করেছিলেন, মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণে ইরানি শাসনব্যবস্থা এতটাই ভঙ্গুর হবে যে দেশটা হরমুজ প্রণালি অবরোধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু বেকুব নেতানিয়াহু বুঝে ওঠতে পারেননি, পৃথিবীর পাঁচ ভাগের এক ভাগ জ্বালানি এই পথ দিয়ে যায়। আর সাপের লেজ দিয়ে কান চুলকাতে গেলে সাপের কামড় খাওয়া অনিবার্য।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন, যুদ্ধকালে প্রণালিটির সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিকঠাক রাখা যাবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। হরমুজ বন্ধে ইরান যে বড় ঝুঁকি, সে কথা তিনি ভুলেননি। ট্রাম্প সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দেন এই ভেবে যে, তেমনটা ঘটার আগেই ইরানের বর্তমান সরকার তার পায়ে লুটিয়ে পড়বে। তখন ইরানকে বাধ্য করা হবে সব শর্ত মানতে। ইরান কোনো ঘটনাই না, ধ্বজভঙ্গ দেশ। এভাবে উন্মাদের মতো ট্রাম্প হিসাব কষেন।
কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টা দিকে মোড় নেয়। তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে এবং ট্রাম্প নিজেই এমন এক সংকট বিশ্বজুড়ে তৈরি করেন, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একই সঙ্গে ইরানের জন্য তৈরি হয় নতুন দর কষাকষির সুযোগ।
ফলাফল হল ইরানের স্কোর দুই, ট্রাম্প এখনও শূন্য।
কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়
ট্রাম্প ২০২৫ সালের জুন অভিযানে দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পিট হেগসেথ আরও এক কাঠি সরেস। শুধু পারমাণবিক স্থাপনাই নয়, ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষাও ধূলিসাৎ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ট্রাম্প এই অভিযানের সাফল্য নিয়ে কোনো দ্বিধা ছাড়াই বারবার নিজের জয়ের প্রতিধ্বনি করতে থাকেন। তার বক্তব্যে বারবার একই দাবি ঘুরে ফিরে আসে,
“এই হামলা তাদের সম্পূর্ণ সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতাকে অকার্যকর করে দিয়েছে।” (১৬ জুলাই)
“আমরা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি … ইরানের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক সক্ষমতা।” (১৮ আগস্ট)
“সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে আমি ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষাও নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।” (২০ সেপ্টেম্বর)
“আসলে তাদের কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি নেই। এটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।” (১৩ অক্টোবর)
“ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা আমরা খুব দ্রুত, জোরালো এবং শক্তিশালীভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।” (১৯ নভেম্বর)
“আমরা তাদের পারমাণবিক সক্ষমতাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।” (১১ ডিসেম্বর)
“আমরা ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে অকার্যকর করে দিয়েছি এবং এটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।” (৮ জানুয়ারি)
“…ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।” (২০ জানুয়ারি)
কিন্তু অবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ইরান যুদ্ধ শুরু করার যুক্তি হিসাবে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখনও ধ্বংস করা যায়নি। ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির দোরগোড়ায়। তাদের পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে দেয়া যাবে না। তাদের আটকাতে হবে, আমরা ইরানে অভিযান পরিচালনা করব।
অন্যদিকে, বোমা মারা কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে ঘোরতর প্রশ্ন আছে। অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা, যেখানে কিছু ইউরেনিয়াম মজুত থাকতে পারে। তবে এই স্থাপনাটি ভূগর্ভে এতই গভীরে অবস্থিত যে আমেরিকার ৩০,০০০ পাউন্ডের বাঙ্কার-বাস্টার বোমাও সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম না।
অবশ্য ট্রাম্প দাবি করেন, প্রয়োজনে বাঙ্কারের ভেতরে ঢুকে পারমাণবিক সরঞ্জাম বের করে আনব। বাস্তবতা হলো, স্থলপথে এমন অভিযান চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে অংশ নেয়া সেনাদের জন্য বিপদের মাত্রা হবে অত্যন্ত উচ্চ এবং সফলতার কোনো নিশ্চয়তা নাই। বরং ফলাফলের অনিশ্চিত মডেলকে সমর্থন করে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পারমাণবিক হুমকি সত্যিই এড়ানো যাচ্ছে না।
চূড়ান্ত ফলাফল ইরান তিন, ট্রাম্প ডাহা শূন্য।
বিজয়ের ঘোষণা অথচ পরাজয়
ইরানি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আস্ফালন বৃথা। ইরানের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর হামলার হুমকি সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন তুললেও, এসব ইরানি নেতাদের ওপর সামান্যই প্রভাব রাখে। বরং এই হুমকিগুলো ইঙ্গিত দেয়, নিজের তৈরি ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে ট্রাম্প কতটা মরিয়া। আলোচনার কৌশল হিসেবে এই পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হয়।
ট্রাম্প ইরানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত কৌশলগত বিজয়ের দম্ভোক্তি করেন। কিন্তু তিনি একটি মৌলিক বাস্তবতা উপেক্ষা করেন যে, ইরান যুদ্ধে তিনি কার্যত পরাজিতই হয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং ট্রাম্পের আনকোরা চেলা চামুন্ডাদের দ্বারা কোনো চুক্তি হলে, তা গভীর ঝুঁকির জন্ম দেবে। এর পরিণতি হিসাবে শুধু আমেরিকা নয়, গোটা বিশ্বকেই চরম মূল্য চুকাতে হতে পারে।
লেখক: একজন আইনজীবী এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি আইন স্কুলের খণ্ডকালীন শিক্ষক।
চীন রাশিয়া ও ইরানের জাতীয় পতাকা
মার্কিন তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, রাশিয়া ইরানকে সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে, যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানের অবস্থান সম্পর্কেও তথ্য রয়েছে। এই বার্তার মধ্য দিয়ে তারা কৌশলগত জোটের চেয়ে বেশি কিছু উন্মোচন করেছে। তারা একটি নতুন ধরনের যুদ্ধের বন্দোবস্তও তুলে ধরেছে। এটি এমন এক যুদ্ধ, যেখানে সম্মুখ সারির সংঘাত অনুপস্থিত। ট্যাঙ্ক বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নয়; বরং রাডার, স্যাটেলাইট ও নিশানা বানিয়ে যুদ্ধ করা। আজ উপসাগরীয় অঞ্চলে উভয়পক্ষের যুদ্ধক্ষেত্র তড়িৎ চৌম্বকীয় বর্ণালিতে রূপ নিয়েছে। সর্বোপরি, তারা একে অপরকে অক্ষম করে দেওয়ার জন্য লড়াই করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন। পুতিন এখনও এই দাবি অস্বীকার করেই চলেছেন। রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে ইরানি ড্রোন ও গোলাবারুদ পেয়েছে। তারা দেখেছে যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দেশটির বিভিন্ন জায়গা নিশানা করে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে, যার মধ্যে পুতিনের বাসভবনের কাছাকাছি অবস্থানও রয়েছে। মস্কোর পক্ষে এসব মাথায় রেখে হিসাব করা কঠিন কাজ নয়।
জটিল সমস্যার সমাধানে গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পুতিন কেবল এটি ব্যবহার করছেন। সাবেক সিআইএ অফিসার ব্রুস রিডেল একবার দেখেছিলেন, আধুনিক যুদ্ধে স্থানাঙ্ক প্রায়ই বুলেটের চেয়ে বেশি মূল্যবান। যে জানে শত্রু কোথায়, সে জিতবে। এই স্বতঃসিদ্ধ ধারণাটি এখন উপসাগরজুড়ে কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে। রাশিয়ার গোয়েন্দা পাইপলাইন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সম্পদের অবস্থান নির্ণয় করতে সাহায্য করেছে ইরানকে, যা তেহরান একা অর্জন করতে পারেনি। ইরান কেবল সামরিক গোয়েন্দা উপগ্রহের একটি সীমিত নক্ষত্রপুঞ্জ দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করে, যা খোলা পানির ওপর দিয়ে দ্রুতগতিতে চলমান নৌসম্পদের অবস্থান নির্ণয় করতে পুরোপুরিভাবে সক্ষম নয়।
চীনের ভূমিকা নীরব। কিন্তু তাদের এই নীরবতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চীন বছরের পর বছর ধরে ইরানের ইলেকট্রনিক যুদ্ধক্ষেত্রের স্থলদৃশ্য পুনর্গঠনে কাজ করেছে। যেমন–দেশটি ইরানে উন্নত রাডার সিস্টেম রপ্তানি করেছে, মার্কিন জিপিএস থেকে চীনের এনক্রিপ্ট করা বেইডু-৩ নক্ষত্রমণ্ডলে ইরানি সামরিক নেভিগেশন স্থানান্তর করেছে। এ ছাড়া ইরানি বাহিনীর জন্য সংকেত গোয়েন্দা তথ্য এবং ভূখণ্ডের মানচিত্র চিহ্নিত করার জন্য চীন সম্প্রসারিত স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে। অবসরপ্রাপ্ত ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমোস ইয়াদলিন এ ব্যাপারে বলেছিলেন, প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যদি শনাক্তকরণ ও লক্ষ্যবস্তু বানাতে গিয়ে মিনিটও কমিয়ে আনতে পারে, তবে এটি আকাশে দ্রুত সময়ে আঘাত হানতে সহযোগিতা করে। চীন মিনিট কমানোর চেয়েও বেশি কিছু করেছে। এটি পুরো হামলার চেইনে নতুন করে আকার দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নিষ্ক্রিয় নয়। তারা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা দল ইরানি নেতৃত্বের গতিবিধি ট্র্যাক করছে, ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কমান্ড নোডের ম্যাপিং করছে। এ ছাড়া অপারেশনস রোয়ারিং লায়ন অ্যান্ড এপিক ফিউরির প্রথম পর্যায়ে ইরানি রাডার অবকাঠামো দ্রুত ও নির্ভুলভাবে ধ্বংস করছে, যা তেহরানের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা আসলে কতটা ভঙ্গুর তা প্রকাশ করে। ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর সাবেক কমান্ডার মেজর জেনারেল এইতান বেন-এলিয়াহু যেমন উল্লেখ করেছেন, রাডার ধ্বংস করা কেবল একটি মেশিনকে ধ্বংস করার জন্য নয়; এটি শত্রুকে অন্ধ করে দেয়। যুদ্ধের প্রথম ঘণ্টাগুলোতে তারা অনেক রাডার মুছে ফেলেছিল। তবুও আইআরজিসির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নায়েনি দাবি করেছেন, ইরান এই অঞ্চলজুড়ে প্রায় ১০টি উন্নত মার্কিন রাডার সিস্টেম ধ্বংস করেছে। এই বিবৃতি আংশিকভাবে সঠিক হলেও কীভাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েল, উপসাগরীয় রাজধানী ও তার বাইরে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছেছে তার আংশিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে সিবিএসের ৬০ মিনিটের অনুষ্ঠানে রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তা সম্পর্কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা সবকিছু ট্র্যাক করছি।’ এটি হয় একটি আশ্বাস বা সতর্কতা। সম্ভবত উভয়ই।
এখন ক্ষেপণাস্ত্রের মতোই ভয়াবহ রাডার রশ্মি। গোয়েন্দা তথ্য নির্ধারণী ভূমিকা পালন করে। এই সংকেত যুদ্ধে ইরান এমন সমতার জন্য লড়াই করছে, যা এর আগে কখনও ছিল না এবং প্রথমবারের মতো তারা এমন সহযোগী পেয়েছে, যারা এই সহায়তা দিতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য চ্যালেঞ্জ এখন কেবল তেহরানের ওপর আক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি নিশ্চিত করা যে, যখন ট্রিগারে একবার হাত চালানো হবে তখন ইরানই অন্ধভাবে গুলি চালাতে থাকবে। প্রশ্নটি আর এখানেই থেমে নেই যে উপসাগরীয় অঞ্চলে অগ্ন্যুৎপাত হবে কিনা। এটি ইতোমধ্যেই ঘটেছে। প্রশ্ন হলো, চূড়ান্তভাবে ধোঁয়া উঠলে কে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবে।
লেখক: বিশ্লেষক এবং সাংবাদিক