ইশরাক হোসেন।
অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের জন্ম দেওয়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে।
শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন ইশরাক হোসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র ছিল। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে ঘটনার এক দিনের মাথায় ইশরাককে মন্ত্রিসভা ছাড়ার নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপি ও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকবিরোধী উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজে অস্ত্র হাতে অভিযানে নামা গ্রহণযোগ্য নয়। মাদক দমনে প্রশাসনকে সক্রিয় করার পরিবর্তে তিনি কেন নিজেই অস্ত্র হাতে অভিযানে নামলেন, সেই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী যখন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিস্থিতি দেখতে আকস্মিক পরিদর্শন করছেন, তখন একজন প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন সদস্যও বলেন, ঘটনাটি শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে থাকেনি; প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদেরও বিব্রত করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায় মন্ত্রিসভাকেও নিতে হবে।
শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থান আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশনা দেন তিনি। কোথাও পরিস্থিতির উন্নয়নে সময়ও বেঁধে দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই পরিদর্শনের দিনই বিকেলে ঘটে ইশরাকের অস্ত্রকাণ্ড। দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইশরাকের কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের ইতিবাচক আলোচনা অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়।
এমন পটভূমিতে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাকে সরকারের সদস্যদের আচরণ ও জবাবদিহির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অস্ত্র হাতে কী করেছিলেন ইশরাক
শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তাঁর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে বলছেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’
এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরতে দৌড়ান। তাঁদের একজন এক তরুণকে লাথি দেন। কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার।’ আরেকটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দিতে দেখা যায়।
ঘটনাস্থলে প্রতিমন্ত্রীর নিজের নিয়োগ দেওয়া দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও ছিলেন। নিজের নিয়োগ দেওয়া দেহরক্ষীদের কাছেও অস্ত্র ছিল। ভিডিওর কিছু অংশে ইশরাকের হাতে থাকা পিস্তল অস্পষ্ট করে দেওয়া হলেও অন্য অংশে অস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা যায়। গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে, একজন প্রতিমন্ত্রী এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে পারেন কি না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তির সৃষ্টি হতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। আজ রোববার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘ষোলকলা পূর্ণ করা হবে’ হুঁশিয়ারি প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের
আত্মরক্ষায় অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার দাবি
অস্ত্রকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার মধ্যে আজ রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিবৃতি দেন ইশরাক হোসেন। এতে তিনি দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। কর্মসূচিটি পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে নেওয়া হয়েছিল।
ইশরাকের ভাষ্য, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ পেয়ে তিনি আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি।
বিবৃতিতে ইশরাক দাবি করেন, অভিযানের আগে তিনি জানতে পারেন, মাদক কারবারিরা ছাদ থেকে গুলি চালাতে পারে। একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি এবং তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
ইশরাক বলেন, তাঁর হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত। আত্মরক্ষার জন্যই সেটি প্রদর্শন করা হয়েছিল এবং এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
বিবৃতিতে ইশরাক আরও দাবি করেন, অভিযানে চার-পাঁচটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয়েছে। সেখান থেকে মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মুঠোফোন জব্দ করা হয়। ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। এসব তথ্য উপেক্ষা করে কয়েকটি গণমাধ্যম ঘটনার খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মাদকবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তবে ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শনিবার ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে জানাননি। তাঁরা পরে বিষয়টি জানতে পারেন। ইশরাকও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার ১০ মিনিট পর পুলিশকে আসতে বলেন তিনি।
এর আগে পদত্যাগ করেন মিষ্টি
ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার আগে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম আসায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদ ছাড়তে হয়েছিল।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজনের নাম সামনে আসে। ঘটনা নিয়ে সরকার ও দলের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়। মিষ্টির রাজনৈতিক দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। যদিও তিনি হামলা-ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। পরে তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়।
মিষ্টির পদত্যাগের আড়াই সপ্তাহের মধ্যে এবার অস্ত্রকাণ্ডে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা ছাড়ার নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী। দুটি ঘটনাতেই দল ও সরকারকে বিব্রত করা কর্মকাণ্ডের পর পদত্যাগের নির্দেশ এল।
বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেই বিএনপিই বিরোধীদলকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে এবি পার্টি আয়োজিত ‘জুলাই সনদের ১ বছর, প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যকালে এ মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, ‘দলটি রাতারাতি তাদের অতীত ভুলে গেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেই বিএনপিই বিরোধীদলকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।’
তিনি বলেন, সরকারি দলের ১৪৮ জন এমপিকে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বঞ্চিত হচ্ছে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তার।
এসময়, ১১ দলীয় জোটের নেতারা বলেন, সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে আধিপত্যবাদের সঙ্গে আপস করে দেশ পরিচালনা করছে বিএনপি।
জুলাই সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে, রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আলোচনা সভার আয়োজন এবি পার্টির, যেখানে উপস্থিত ছিলেন ১১ দলের শীর্ষ নেতারা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের নামে ১৭টি ধারা লঙ্ঘন করেছে বিএনপি।’
অভিযোগ করেন, তারেক রহমানকে ফিটনেসবিহীন গাড়িতে তুলে দিয়েছেন সালাউদ্দিন আহমেদ।
এলডিপি সভাপতি অলি আহমেদ বলেন, ‘অযোগ্য লোকদের দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে বিএনপি।’
সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা না করতে আলেমদের প্রতি আহ্বান জানান খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।
সভায় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু অভিযোগ করেন, ৩১ দফার অঙ্গীকার থেকেই সরে গেছে বিএনপি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানি সংকট সমাধানেও সরকার ব্যর্থ বলে দাবি করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে জাতিকে বিভক্ত না করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান নেতারা।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পথেই বিএনপি সরকার হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ক্ষমতায় বসে গত সাত মাসে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে বিএনপি সরকার। বিরোধী দলের সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় এখন থেকে সরকারকে নয়, দেশের ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবে জামায়াত।রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার এক বছর সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এ আয়োজন করে।
শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাতারাতি নিজেদের অতীত ভুলে গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত বিএনপি তাদের মতোই একটি রাজনৈতিক দল ছিল। কিছু বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও গণভোটের প্রশ্নে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল না। জামায়াত চেয়েছিল, গণভোট আগে হোক, যাতে এটি অনিশ্চয়তায় না পড়ে। কিন্তু বিএনপি তা চায়নি। বরং একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন একজন সংসদ সদস্যকে দুটি শপথ নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংসদ পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। তার অভিযোগ, ওই দিন থেকেই বিএনপি উগ্র আচরণ শুরু করেছে।বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিএনপি এখন দাবি করছে, জনগণ ভোট দিয়ে পাঁচ বছরের জন্য সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছে। কিন্তু গণভোটের রায়ও মূল্যায়ন করা হলে বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে আন্দোলনে যেতে হতো না। বিএনপিই বিরোধী দলকে আন্দোলনের পথে ঠেলে দিয়েছে।
সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের কাউকে তা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সরকারি দলের ২০৮টি আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, অথচ বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্যও বরাদ্দ পাননি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুরোনো রাজনীতির অবসান ও নতুন রাজনীতির সূচনা হবে বলে জনগণ আশা করেছিল। কিন্তু দেশকে আবারও পুরোনো ধারায় ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি মহিষের ওপরও কর আরোপ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘শত ইঞ্জিনিয়ারিং, চুরি-চামাড়ির পরও আমাদের বিরোধী দলে বসিয়েছে জনগণ। এসব আসনের ৮৯ জন এমপি দেশের ১৮ কোটি মানুষের পাহারাদার হয়ে কাজ করবেন ইনশা আল্লাহ।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি বদলে গেলেও আমরা আমাদের কথা বদলাবো না। জুলাই সনদ আর গণভোটের গণরায় আমরা আদায় করেই ছাড়বো।’নব্য ফ্যাসিবাদের পতন হবে বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, নানা লোভ-লালসা দেখানো হলেও জামায়াত সেসব প্রত্যাখ্যান করেছে। বিরোধী দল হিমালয়ের মতো অটল থেকে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাবে। চব্বিশের অভ্যুত্থান তাদের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা। তবে সরকারের পতন চাওয়ার চেয়ে তারা সরকারের সফলতা চেয়েছিলেন, কারণ সরকারের সফলতা মানেই দেশের সফলতা।
তিনি বলেন, ‘আমরা এতদিন সরকারকে সহযোগিতা করবো বলেছিলাম। আজ থেকে ঘোষণা দিচ্ছি ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবো। এই সরকার আমাদের সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ। বিরোধী দলের সহযোগিতা নেওয়ার তাদের কোনো যোগ্যতা নেই।’
ছবি : সংগৃহীত
সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিএনপির বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদের জানাজায় অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বুধবার (১৪ অক্টোবর) বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা শুরু হয়।
এর আগে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে সালাহউদ্দিন আহমেদ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। ফুসফুসের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
মঙ্গলবার রাতে এক শোকবার্তায় বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘সালাহউদ্দিন আহমেদ বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের একজন লড়াকু সৈনিক ও অকুতোভয় নেতা ছিলেন। দলের দুঃসময়ে তিনি সাহস, নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ তার রাজনৈতিক জীবন ও দলীয় কর্মকাণ্ড বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিএনপির এই ত্যাগী নেতার মৃত্যুতে দল একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতাকে হারাল, যা দলের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।’
তিনি বলেন, ‘শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যরা এই অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার শক্তি ও ধৈর্য ধারণের জন্য মহান আল্লাহর কাছে আমি প্রার্থনা করেছি।’
প্রসঙ্গত, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে ঢাকা-৪ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সালাহউদ্দিন আহমেদ ছিলেন বিএনপির বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক।
জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন হতে যাচ্ছে। দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তবে শীর্ষ দুই পদ-আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন বহাল থাকছেন।
এনসিপির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার কিংবা আগামীকাল বুধবার এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হবে। কমিটির এই পুনর্গঠনের পেছনে সংশ্লিষ্ট নেতাদের দক্ষতা (পারফরম্যান্স) বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুনর্গঠিত কমিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আবদুল্লাহ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের পদ পাচ্ছেন; আর সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে এনসিপিতে ১১টি শীর্ষ পদ দলটির নেতৃত্বের ‘সুপার ইলেভেন’ হিসেবে পরিচিত। পুনর্গঠনের পর তা ‘সুপার সিক্সে’ রূপ নেবে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন।
নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক ও আখতার হোসেনকে সদস্যসচিব করে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এনসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। ওই দিন থেকেই দলের মুখ্য সমন্বয়ক পদে পাটওয়ারী, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক পদে হাসনাত ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হিসেবে সারজিস দায়িত্ব পালন করে আসছেন; আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এনসিপিতে যোগ দিয়ে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পান সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ।
এনসিপির দলীয় সূত্র বলছে, এনসিপির এবারের পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান দেওয়া। দল গঠনের পর, গত জাতীয় নির্বাচনে এবং সাম্প্রতিক নানা রাজনৈতিক ইস্যুতে এই নেতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটার প্রতিফলন দলীয় পদেও দেখা যাবে।
শীর্ষ ফোরামে যাঁরা থাকছেন
দলের কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে এনসিপির তিনজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তাঁরা জানান, বর্তমানে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সংখ্যা ১৬। দলের আহ্বায়ক-সদস্যসচিব পদাধিকারবলে এই ফোরামের সদস্য৷ তাঁদের দুজনের সঙ্গে পুনর্গঠিত কমিটিতে পাটওয়ারী, হাসনাত, সারজিস ও আসিফ শীর্ষ পদে থাকছেন।
পর্ষদের অন্য ১০ সদস্যকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা হলেন আবদুল্লাহ আল আমিন, আরিফুল ইসলাম আদীব, আতিকুর রহমান মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ, আলী আহসান জুনায়েদ, সারোয়ার তুষার, আকরাম হুসাইন, সালেহউদ্দিন সিফাত, মাহমুদা আলম মিতু ও নুসরাত তাবাসসুম৷
উল্লেখ্য, বর্তমান সংসদে এনসিপির আটজন সদস্য প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁরা হলেন নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল আমিন, আতিকুর রহমান, হান্নান মাসউদ, মাহমুদা আলম ও নুসরাত তাবাসসুম। এর মধ্যে মাহমুদা ও নুসরাত সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য।
এনসিপি সূত্র জানায়, দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও যুগ্ম সদস্যসচিবদের বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হবে। তারা মূলত সহযোগী সংগঠন ও দলের বিভিন্ন সেল দেখভাল করবেন।
সুপার ইলেভেন থেকে সুপার সিক্স
এনসিপির বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোতে আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব এবং মুখ্য সমন্বয়ক, মুখ্য সংগঠক (২ জন); মুখপাত্র, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক (২ জন); জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব (২ জন) ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক-এই ১১টি পদ দলটির নেতৃত্বের ‘সুপার ইলেভেন’ হিসেবে পরিচিত। পুনর্গঠিত কমিটিতে ‘সুপার ইলেভেনের’ পরিবর্তে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বে থাকবেন ছয়জন। অর্থাৎ ‘সুপার ইলেভেন’ হচ্ছে ‘সুপার সিক্স’
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গত জানুয়ারিতে এনসিপির দলীয় কাঠামো পুনর্গঠনের আলোচনা প্রথম সামনে আসে। সে সময় বলা হয়েছিল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে গতিশীলতা বাড়াতে এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন দরকার। এ ছাড়া ২০২৭ সালের শুরুতে দলের প্রথম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনাও তখন জানা গিয়েছিল; কিন্তু সে সময় কমিটি পুনর্গঠন করা হয়নি।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘এনসিপি আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে কাজ শুরু করেছিল। পরবর্তী সময়ে অনেকেই আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অনেককে অ্যাকোমোডেট করার জন্য পরে কিছু পদ তৈরি করা হয়েছিল। এত দিন ধরে চলে আসা এই কাঠামো এখন পুনর্গঠন করা প্রয়োজন বলে দলের কাছে মনে হচ্ছে।’
এই পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নেতাদের পারফরম্যান্সকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মনিরা শারমিন বলেন, নিজেদের কার্যক্রমের মাধ্যমে এনসিপির অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন, অনেকে আবার সেভাবে সক্রিয় ছিলেন না। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই দলীয় কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সাবেক এমপি শাহরিয়ার আলম ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট খুব ভোরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি রাজশাহী ছেড়ে সড়কপথে গেদে সীমান্তে পৌঁছান। এরপর ভারতে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে থাইল্যান্ড হয়ে রাশিয়ায় চলে যান।
শাহরিয়ার বর্তমানে ভারতের কলকাতার নিউটাউনে সাড়ে তিন হাজার স্কয়ার ফুটের আলিশান একটি ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় স্ত্রী সিলভিয়া পারভীন লেনিকে নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। সেখানে গড়েছেন স্থায়ী নিবাস। তার জন্য হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাঠানো হচ্ছে। তার বিশাল ফ্ল্যাটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, এমপি, কেন্দ্র এবং রাজশাহী অঞ্চলের নির্বাসিত নেতারা নিয়মিত যাতায়াত করছেন। দেশকে অস্থিতিশীল করতে নেওয়া হচ্ছে নানা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে শাহরিয়ার চীন, রাশিয়া ও ব্রাজিল সফর করছেন।
রাজশাহীতে শাহরিয়ারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই রাজশাহীর তিনটি থানায় শাহরিয়ার আলমের বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছরের ২৪ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করে। এছাড়া শাহরিয়ারের ছয়টি ব্যাংক হিসাবে ২৬০ কোটি ৯৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
শাহরিয়ার বাঘার পার্শ্ববর্তী নাটোরের লালপুর উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মর্ত্তুজা বাবুর মেয়ে সিলভিয়া পারভীন লেনিকে ২০১৯ সালের দিকে বিয়ে করেন। এটি ছিল তার দ্বিতীয় বিয়ে। মন্ত্রিত্বের দাপট, দলীয় ক্ষমতা আর প্রভাব খাটিয়ে লেনির মা রোকসানা মর্ত্তুজাকে ২০২১ সালে লালপুরের গোপালপুর পৌরসভার মেয়র বানান শাহরিয়ার। লেনিকে লালপুরে কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি করে দেন। এছাড়া ঢাকার গুলশানে তাকে ৩৬০০ স্কয়ার ফুটের রাজকীয় একটি ফ্ল্যাট উপহার দেন।
দেশে বর্তমানে শাহরিয়ারের ব্যবসার বিশাল সাম্রাজ্য এবং আর্থিক বিষয়টি সামলাচ্ছেন তার আপন ভাই সাইফুল ইসলাম বাদল, ব্যবসায়িক পার্টনার বিএনপিপন্থি ব্যবসায়ী নাঈমুল বাশার চৌধুরী, মুহাম্মদ সাঈদ, রাজশাহীর ছাত্রলীগ নেতা হাসানুর সজল, বাঘা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা খাতুন লতার ছেলে তানজিম এবং চারঘাটের তসিকুল নামের এক ব্যক্তিসহ একটি শক্তিশালী চক্র।
যুগান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।
শাহরিয়ারের গার্মেন্ট ব্যবসা দেখছে শক্তিশালী চক্র
২০০৮ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর শাহরিয়ারকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কৌশলী শাহরিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার শুরু করেন। ঘটতে থাকে তার অর্থনৈতিক উত্থান। দ্রুত তার গার্মেন্ট ব্যবসা ফুলেফেঁপে ওঠে। প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান রেনেসাঁ গ্রুপ। তবে বর্তমানে গ্রুপটির মূল পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনার নেতৃত্বে (মালিকানায়) কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। গ্রুপটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিএনপিপন্থি ব্যবসায়ী নাঈমুল বাশার চৌধুরী। আর পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম মুহাম্মদ সাঈদ। এ প্রতিষ্ঠানটিতে শাহরিয়ারের ব্যবসা দেখভাল করছেন এমডি বাশার এবং পরিচালক মুহাম্মদ সাঈদ।
ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলস লিমিটেড দেশের আরেকটি শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটির মূল মালিক হলেন চারজন। এ প্রতিষ্ঠানটির এমডি শাহরিয়ার আলম। এই প্রতিষ্ঠানটিতেও শাহরিয়ারের অনুপস্থিতিতে তার প্রতিনিধিত্ব করছেন নাঈমুল বাশার চৌধুরী।
ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলস লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাউথইস্ট টেক্সটাইলস লিমিটেড। এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ারের রয়েছে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ। এখানেও তার পক্ষে আর্থিক বিষয় দেখভাল করেন নাঈমুল বাশার চৌধুরী। এ ব্যাপারে বক্তব্যের জন্য তার (নাঈমুল) দুটি নম্বরে ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। তবে রেনেসাঁ গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম পরিচালক মুহাম্মদ সাঈদ বলেন, ‘শাহরিয়ার আলম শেয়ারহোল্ডার। উনি এখন নেই। ব্যবসা চলছে। লোকজন কাজ করছেন।’ শাহরিয়ারের ব্যবসা দেখার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি ব্যবসাতে অনেকদিন থেকেই নেই। ব্যবসা আমরা চালাচ্ছি। এখন মিটিংয়ে আছি। পরে কথা বলব।’
শাহরিয়ারের ব্যক্তিগত ব্যবসা ও সম্পদ দেখছেন বাবা, ভাই ও রাজনৈতিক সহযোগীরা
আওয়ামী লীগ শাসনমালে অংশীদারত্বে ব্যবসা ছাড়াও শাহরিয়ার ব্যক্তিগতভাবে গড়ে তোলেন নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান দেখভাল করছেন শাহরিয়ারের বাবা মো. শামসুদ্দিন, তার আপন ভাই সাইফুল ইসলাম বাদল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ও রাজশাহী জেলার সাবেক যুগ্ম সম্পাদক হাসানুর সজল, বাঘা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা খাতুন লতার ছেলে তানজিম এবং চারঘাটের তসিকুল নামের এক ব্যক্তিসহ একটি শক্তিশালী চক্র।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে রাজশাহী মহানগরীর অভিজাত এলাকায় দুইশ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহরিয়ার গড়ে তোলেন বারিন্দ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। এ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের এমডি শাহরিয়ারের বাবা হলেও এখন বিএনপিপন্থি সংগঠন ড্যাবের চিকিৎসকরা এটি নিয়ন্ত্রণ করছেন। চাউর রয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীতে শীর্ষ দুটি রাজনৈতিক দলের ফান্ডে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো ঝামেলা ছাড়া নির্বিঘ্নে ব্যবসা করছেন শাহরিয়ার।
রাজশাহীর বাঘার ব্যবসায়ী গোলাম হোসেন ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছিলেন না। ২০২০ সালে গোলাম হোসেনের শতকোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৪০ বিঘা জমি ক্ষমতা আর প্রতারণার মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে জোরপূর্বক নিয়ে নেন শাহরিয়ার। এরপর সেখানে গড়ে তোলেন বরেন্দ্র এগ্রো ফার্ম। গোলাম হোসেন সে সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও জমি উদ্ধার করতে পারেননি।
শাহরিয়ার এছাড়া কিনেছেন শতাধিক বিঘা জমি। রাজশাহী এবং ঢাকায় রয়েছে তার কয়েকটি প্লট ও ফ্ল্যাট। বাঘা ও চারঘাট উপজেলা সদরে শতকোটি টাকার মূল্যবান জমি কিনেছেন তিনি। পার্শ্ববর্তী লালপুর ও ঈশ্বরদীতে নামে-বেনামে শাহরিয়ারের জমি কেনার আরও তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার গুলশানে নিজের নামে দুটি এবং ছেলের নামে একটি ফ্ল্যাট কেনেন তিনি।
শাহরিয়ারের বাবা শামসুদ্দিন এবং ভাই সাইফুল ইসলাম বাদলসহ তার রাজনৈতিক সহযোগীরা ঢাকা ও রাজশাহীতে এসব সম্পদ দেখভাল করছেন। এ ব্যাপারে শামসুদ্দিন ও তার ছেলে বাদলকে একাধিকবার ফোন দিলেও তারা সাড়া দেননি।
হামলায় ভেঙে গেছে বাড়ির জানালা
রাজধানীর উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বাসায় হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
হামলার ব্যাপারে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেছেন, ‘সকালে নাশতা করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ করে চারদিক থেকে বাসায় ঢিল ছোড়া শুরু হয়। সকালবেলা হওয়ার কারণে তখন বাসায় তেমন কেউ ছিল না। জানালার কাচ ভেঙে ড্রয়িংরুমে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। বাসার গেটে তালা লাগানো থাকায় কেউ ভেতরে ঢুকতে পারেনি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ খালিদ মনসুর। তিনি বলেন, আজ বেলা ১১টার দিকে অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে বলা হয়, জি এম কাদেরের বাসায় হামলা হয়েছে। আমরা খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে গিয়েছি। তবে কাউকে পাইনি। সাধারণ জনতার ব্যানারে ৩০-৪০ জন ওই বাসায় হামলা চালিয়েছে। তারা বাইরে থেকেই ঢিল ছুড়ে ভাঙচুর করেছে। তবে ভেতরে কেউ ঢুকতে পারেনি। বর্তমানে সেখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।’
বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল
জিএম কাদেরের গ্রেপ্তার দাবিতে তাঁর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ‘স্বৈরাচারবিরোধী সাধারণ জনগণ’ ব্যানারে কিছু লোকজন। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি এবং ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তুলে তাঁর দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তারা। বিক্ষোভকারীরা বাসার সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং তাঁর বিচার দাবি করেন।
এ সময় ব্যানারে জিএম কাদেরের প্রতিকৃতি তুলে ধরা হয়। ব্যানারে লেখা ছিল—‘জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি করে ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনার সাথে যোগাযোগ; জিএম কাদেরের গ্রেপ্তার চাই’ এবং ‘ফ্যাসিবাদের ঠিকানা এই বাংলায় হবে না’।
বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে শত শত মানুষের প্রাণহানির বিনিময়ে অর্জিত পরিবর্তনের পরও জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।
তারা বলেন, বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টি বিগত সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বৈধতা দেওয়ার ভূমিকা পালন করেছিল। নতুন বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের কোনো দোসরকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন পেতে দেওয়া হবে না। বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে জিএম কাদেরকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।