এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম
সরকার লংমার্চে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে লংমার্চের ৬ দফা এক দফায় পরিণত হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ-পূর্ব সমাবেশে বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, যতই বাধা আসুক না কেন, আমাদের এই লংমার্চ চট্টগ্রামেই পৌঁছাবে ইনশা আল্লাহ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা বাংলাদেশের মানুষ লংমার্চ টু ঢাকায় সবাই একত্রিত হয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে ছিল। এবার আমরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য বিভাগের উদ্দেশ্যে লংমার্চের যাত্রা শুরু করেছি, নতুন করে যারা স্বৈরাচার হতে যাচ্ছে সেই স্বৈরাচার হওয়ার পথ বন্ধ করার জন্য। আমাদের এই লংমার্চ চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, মাদকের বিরুদ্ধে লংমার্চ। এই লংমার্চ যারা তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের সিন্ডিকেট করে দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে তাদের বিরুদ্ধে লংমার্চ।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, যারা ৭০ শতাংশ জনগণের গণরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে এই লংমার্চ। ফলে আমরা জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা দলে দলে এই লংমার্চে অংশগ্রহণ করুন। এই লংমার্চ কোনো ১১ দলের লংমার্চ নয়, এই লংমার্চ বাংলাদেশের আপামর সাধারণ মানুষের লংমার্চ। আমরা লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে পালন করবো, যদি সরকার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে এই লংমার্চের ছয় দফা এক দফাতে পরিণত হবে, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ—এই ছয় দাবিতে লংমার্চ করছে ১১ দলীয় জোট।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ শুরুর আগে সকাল ৭টায় মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ১১ দলীয় উদ্বোধনী সমাবেশ হয়। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অংশ নেন।
লংমার্চ শেষ হবে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাপনী সমাবেশের মাধ্যমে। মাঝপথে পাঁচটি স্থানে পথসভা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন বলেই ইশরাক পদত্যাগ করেছেন।
আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) চট্টগ্রাম সফরে এসে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান।
মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে নেওয়ার বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, মাদক সমাজদেহকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইশরাকের যা করা দরকার ছিল, তিনি তা করেছেন। ওই অভিযানে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তবে ইশরাকের হাতে অস্ত্র না থাকলে ভালো হতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইশরাকের কাজকে সরাসরি নেতিবাচক বলার সুযোগ নেই। তবে একজন জনপ্রতিনিধি বা প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্র বহন করলে কিংবা কাউকে অস্ত্র দিয়ে লক্ষ্য করলে, তার উদ্দেশ্য ভালো হলেও অন্যরা সেটিকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের দৃষ্টান্ত হিসেবে নিতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো কাজের উদ্দেশ্য ভালো হলেই সব ক্ষেত্রে সেই কাজের পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। এ ধরনের বিষয় নাগরিক আচরণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মাদক নির্মূলের বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয়েছে। তবে তাদের লক্ষ্য শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়, তারা মাদক নির্মূল করতে চান। মাদকের বিস্তার রোধে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার
জামায়াতে ইসলামী কখনোই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেনি বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী কখনোই আওয়ামী লীগের সাথে জোট করেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরাতে বিএনপির বিরুদ্ধে সব বিরোধী দল মিলে লিয়াজোঁ কমিটি করেছিল।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ফ্যাসিস্ট কি তা ৭ মাসের মধ্যেই ভুলে গেছে বিএনপি। চাঁদাবাজি, লুটপাট, নিজ দলের লোক বসানো, জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাই ফ্যাসিবাদ। জামায়াতে ইসলামী জুলাইকে ধারণ করে রাজপথে আন্দোলন করছে। অথচ বিএনপি তা ধারণ না করে দমন-পীড়নের দিকে হাঁটছে।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, রাষ্ট্র, সরকার ও সরকারি দল গুলিয়ে ফেলছে বিএনপি। দুর্নীতি ও দলীয় কর্মীদের কথা বললে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হচ্ছে। জুজুর ভয় দেখিয়ে সরকার নিজেই স্বৈরাচারকে ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে, জামায়াত নয়। জুজুর ভয় দেখিয়ে সব বিরোধীদলকে পাল্টা দোষারোপ করেছে।
তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ; বিচার কার্যকরের পর সরকারের ঘুম ভেঙেছে। এটি পুরোপুরি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা।
ইশরাক হোসেন
প্রথমে পদত্যাগের নির্দেশ পাওয়ার খবরকে গুজব বলা, সংবাদমাধ্যমকে দোষারোপ করা, পরে দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা এবং মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার– ইশরাক হোসেনের এই প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুব স্বাভাবিক ঘটনা নয়।
দেশে এর আগে বিতর্কের মুখে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের নজির আছে। ২০২১ সালে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য এবং একই সময়ে ফাঁস হওয়া একটি অডিও কথোপকথন নিয়ে তীব্র বিতর্কের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন। দলের সাধারণ সম্পাদক সে তথ্য সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। এর মধ্যে মুরাদ হাসান ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম চলে যান এবং সেখান থেকে ইমেইলে মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান। মুরাদ হাসানের পদত্যাগ ও প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ইশরাক হোসেনের পদক্ষেপের বড় ফারাক আছে। তবে একমাত্র মিল, তারা কেউই নিজের দোষ স্বীকার করেননি।
২০১২ সালে তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সহকারীর গাড়িতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন। সে সময় তিনি ঘটনার দায় নিয়ে পদত্যাগের কথা বললেও নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছিলেন।
এ ধরনের পদত্যাগের রাজনৈতিক তাৎপর্য নির্ভর করে অভিযোগের প্রকৃতি, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী তদন্তের ওপর। এদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে দুটি পর্ব শেষ হয়েছে। একটি পর্ব বাকি থেকে গেছে। আওয়ামী লীগের ওই দুই নেতা মন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর রাজনীতি থেকে হারিয়ে গেছেন।
ইশরাক হোসেন এদের ঠিক উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ঢাকা-৬ আসনের এই সংসদ সদস্য ভবিষ্যতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত এবং অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তাঁর পক্ষে কাজ করবেন– এমন কথাও বলেছেন।
ইশরাকের গত দুদিনের ধারাবাহিক কথাবার্তায় তিনটি প্রবণতা দেখা যায়। নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছেন। ঘটনার ব্যাখ্যায় নিজের বয়ান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন এবং পদত্যাগের মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নির্বাচনী এলাকায় তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাকে দলের কাছে একটি বার্তা হিসেবে সামনে এনেছেন।
সংকটের মুখে একজন রাজনীতিক কী বলেন, কীভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং নিজের সিদ্ধান্তের দায় কতটা গ্রহণ করেন– এগুলো তাঁর নেতৃত্বের ধরন ও রাজনৈতিক চরিত্র বুঝতে সাহায্য করে। সদ্য সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনাটি এ বিবেচনায় একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে।
গত শনিবার ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতির ভিডিও তিনি নিজেই প্রকাশ করেন। গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সংবাদ সম্মেলনে তিনি পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেন। এর মাঝের সময়টায় তাঁর কর্মকাণ্ডকে পদত্যাগের নির্দেশের খবরের ফলে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে সমর্থকদের মনোবল অক্ষুণ্ন রাখার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে না। সংবাদ সম্মেলনে তাঁর সমর্থকদের উপস্থিতিও এমন সাক্ষ্য দিচ্ছে।
তবে বাস্তব সমস্যা হচ্ছে, প্রথমে একটি সংবাদকে ভিত্তিহীন বলে, পরে সেই সংবাদের মূল বার্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করায় ইশরাকের নিজের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে তাঁর বক্তব্যের নির্ভরযোগ্যতা নির্ধারণে এই পর্বটি প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেছেন, গেণ্ডারিয়ার অভিযানে তিনি নিজের নিরাপত্তার জন্য বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয়দের উদ্যোগে অভিযান পরিচালিত হয়েছিল এবং আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। তিনি আরও বলেন, অস্ত্র হাতে নিয়ে তিনি ভুল করেননি।
ইশরাক অভিযানের উদ্দেশ্য সামনে এনেছেন, কিন্তু অস্ত্র হাতে উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে তৈরি বিতর্কের দায় স্বীকার করেননি। ব্যাখ্যায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমের গুরুত্ব এবং নিজের নিরাপত্তাকে সামনে এনেছেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আত্মপক্ষ সমর্থনের পরিচিত কৌশল। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আচরণকে বৃহত্তর কোনো জনস্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করা। এর মাধ্যমে নিজের কর্মকাণ্ডের নৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থাকে। কিন্তু জনস্বার্থের উদ্দেশ্য থাকলেই যে সব কিছু গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে, তা ঠিক না।
একই উদ্দেশ্যে ইশরাক গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, অস্ত্র হাতে থাকার দৃশ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে চলে গেছে।
আসলে ইশরাক মাদকবিরোধী উদ্যোগের পক্ষে যে যুক্তি তুলে ধরেছেন, তা বিতর্কের সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তাই তাঁর অভিযান পরিচালনার প্রক্রিয়া, পুলিশের ভূমিকা এবং অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাই হবে যথাযথ পথ।
ইশরাকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তাঁর পরবর্তী কাজের ওপর। তিনি যদি মাদকবিরোধী উদ্যোগকে আইনি কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন এবং নিজের আচরণ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব দেন, তাহলে বর্তমান বিতর্ক থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান নেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজনে নিজের আচরণ পর্যালোচনা করা, জবাবদিহি মেনে নেওয়া এবং ক্ষমতার সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকাও জরুরি। ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনা তাঁকে সেই পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেছেন, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে আরও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবেন। মাদকবিরোধী কর্মসূচি জোরদার করা এবং সংগঠনের কার্যক্রম চালানোর কথাও বলেছেন। বলা যায়, এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পদত্যাগকে রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে নয়, বরং দায়িত্ব পালনের নতুন পরিসর হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। এটা করতে গিয়ে তিনি তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আপাতত মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে উপস্থাপন করেছেন।
এখন দেখার বিষয়, ইশরাক কি নিজের উদ্দেশ্যের প্রতি দৃঢ় থাকার পাশাপাশি সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিতে পারবেন? তিনি কি মাদকবিরোধী কাজকে ব্যক্তিগত উপস্থিতি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, আইনের শাসন এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারবেন?
বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন। আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পদত্যাগপত্রও জমা দিয়েছেন তিনি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পাশাপাশি জানা গেছে, আজই প্রকাশিত হতে পারে প্রজ্ঞাপন।
এর আগে, আজ বেলা ২টার দিকে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
নিয়ম অনুযায়ী, পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর সেটি রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেন। পরে এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে।
বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন আহমেদ আযম খান। আর প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ইশরাক হোসেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৬ জন পূর্ণ মন্ত্রী রয়েছেন।
এছাড়া প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ২৪ জন। ইশরাকের পদত্যাগের পর প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২৩ জনে।
এর আগে, শনিবার (১৭ অক্টোবর) পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় অস্ত্রহাতে এক মাদকবিরোধী অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব দেন ইশরাক হোসেন। এ সময় তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। ঘটনার সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হলে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।
এর পরিপ্রেক্ষিতে রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাক হোসেনকে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে সোমবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া
ফৌজদারি অপরাধ ঢাকতেই ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) এই মন্তব্য করেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, একজন এমপি বা মন্ত্রীকে যখন অস্ত্র নিয়ে মাদক নির্মূলে নামতে হয়, তার মানে দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফাংশন করছে না। দেশ এখন নো-গভর্নমেন্ট সিচুয়েশনে আছে।
তিনি বলেন, ইশরাকের সঙ্গে অস্ত্র নিয়ে আরও যারা ছিল, তাদের অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে কি না- তা খতিয়ে দেখতে হবে। এ ছাড়া স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে যে ছিল, তার বিষয়েও খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, একজন প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে যখন সুইপারের কাজ দেখতে হয়, তার মানে এর মাঝে যারা দায়িত্বশীল রয়েছেন, তারা কেউ কাজ করছেন না।
সৌদিতে বাংলাদেশি দুই নাগরিকের শিরচ্ছেদের ঘটনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলেন মন্তব্য করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ব্যর্থতার দায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে নিতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বিভিন্ন জায়গায় তার দলের নেতাকর্মীরা হামলা ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
ইশরাক হোসেনের প্রসঙ্গে পাটওয়ারী বলেন, ইশরাক ভাই নতুনভাবে রাজনীতিতে নেমেছেন। তার ভালো উদ্দেশ্য ছিল মাদকের বিস্তার বন্ধ করা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দোষ করেন, আরেকজনকে সেই পাপের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এটা আসলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতা।
হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বললেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ভালো নেই। গত তিন-চার মাসে বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, তাদের ক্ষোভ ও কষ্টের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পাটওয়ারী বলেন, সবকিছু করার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ কষ্ট না পান বা আহত বোধ না করেন।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে কথা বলার কারণে তাকে যেন শাহবাগী বা হিন্দুদের নতুন সংস্করণ বলে আখ্যা দেওয়া না হয়। ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসে তাদের উদ্বেগ ও অভিযোগ শোনারও আহ্বান জানান তিনি।