ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ২১ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১০:০১ এএম

সাহস, আত্মত্যাগ, দৃঢ়তা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন সাহাবি জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ফুফাতো ভাই, ঘনিষ্ঠ সাহাবি এবং জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির একজন। বদর, উহুদ, খন্দক, ইয়ারমুকসহ গুরুত্বপূর্ণ সব যুদ্ধে তিনি বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে নিজের হাওয়ারি বা একান্ত সহচর ও সাহায্যকারী হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।


জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)-এর বংশ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বংশের সঙ্গে মিলিত হয়েছে কুসাইয়ের মাধ্যমে। সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন তার মা। 


মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অংশ নেওয়া কোনো যুদ্ধেই তিনি অনুপস্থিত ছিলেন না। ইসলাম গ্রহণের পর তাকে নির্যাতনেরও শিকার হতে হয়। 


বর্ণিত আছে, তার চাচা তাকে চাটাইয়ে পেঁচিয়ে আগুনের ধোঁয়া দিতেন এবং বলতেন, কুফরিতে ফিরে যাও। জবাবে জুবায়ের (রা.) বলতেন, আমি কখনো কুফরি করব না।


নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা


সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর পথে সর্বপ্রথম তরবারি বের করেন জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)।

একদিন জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.) শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি শুনতে পেলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিহত হয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে খোলা তরবারি হাতে নিয়ে ছুটতে লাগলেন। পথিমধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে তার দেখা হলো।


রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে, জুবায়ের? তিনি বললেন, শুনেছি আপনি নিহত হয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাহলে তুমি কী করতে? জুবায়ের (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম, আমি মক্কার সবাইকে আক্রমণ করতে বেরিয়ে পড়তাম। তখন নবীজি (সা.) তার জন্য কল্যাণের দোয়া করেন। 


সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (রহ.) বলেন, আমি আশা করি, আল্লাহর কাছে জুবায়ের (রা.)-এর জন্য নবীজি (সা.)-এর সেই দোয়া কখনো বিফলে যায়নি।


হাবশা ও মদিনায় হিজরত


সাহাবিদের ওপর কুরাইশের নির্যাতন যখন চরমে পৌঁছাল, তখন সাহাবিদের হাবশায় হিজরতের পরামর্শ দেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। সেখানে ন্যায়পরায়ণ শাসক নাজাশির আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ ছিল। ফলে সাহাবিরা সেখানে নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে থাকেন।


এভাবে তারা নিরাপদ ও স্থিতিশীল জীবনযাপন করছিলেন। একপর্যায়ে হাবশার এক ব্যক্তি নাজাশির সঙ্গে রাজক্ষমতা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এতে মুসলমানরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় সাহাবিরা নীল নদের অপর পারে নাজাশি ও ওই ব্যক্তির মধ্যে চলমান সংঘর্ষের খবর জানতে চাইলেন।


উম্মে সালামা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা বললেন, কে এমন ব্যক্তি আছেন, যিনি গিয়ে তাদের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করে আমাদের কাছে খবর নিয়ে আসবেন? জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.) বললেন, আমি যাব। তারা বললেন, তাহলে তুমিই যাও। তখন তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে কম বয়সীদের একজন।


তার জন্য একটি মশক ফুলিয়ে দেওয়া হলো। তিনি সেটি বুকে বেঁধে সাঁতার কেটে নীল নদের সেই অংশে পৌঁছালেন, যেখানে দুই পক্ষের লোকজন একত্র হয়েছিল। এরপর তিনি সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেন।


উম্মে সালামা (রা.) বলেন, তখন কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে উব্দেগ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম আমরা। এমন সময় জুবায়ের (রা.) ফিরে এলেন। তিনি নিজের কাপড় নাড়িয়ে বলতে লাগলেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। নাজাশি বিজয়ী হয়েছেন। আল্লাহ তার শত্রুকে ধ্বংস করেছেন এবং তার দেশে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছেন।


হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে আসার পর জুবায়ের (রা.) প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সান্নিধ্যে থেকে ইসলামের শিক্ষা, আদেশ ও নিষেধ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন জুবায়ের (রা.)-ও মদিনায় হিজরতকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।


বদর যুদ্ধে জুবায়ের (রা.)


জুবায়ের (রা.) ছিলেন দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী ও সাহসী যোদ্ধা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো যুদ্ধেই তিনি অনুপস্থিত ছিলেন না। প্রতিটি যুদ্ধ ও সংঘাতে তাকে সাহস, বিরল বীরত্ব, পূর্ণ নিষ্ঠা এবং সত্যের বিজয়ের জন্য আত্মনিবেদনের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়।


আল্লাহর পথে তিনি নিজের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করেছিলেন। এর বিনিময়ে আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করেছেন।


বদর যুদ্ধে তার মাথায় হলুদ পাগড়ি ছিল। উরওয়া (রহ.) থেকে বর্ণিত, বদরের দিন জুবায়ের (রা.)-এর মাথায় হলুদ পাগড়ি ছিল। জিবরাইল (আ.) তার আকৃতিতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এটি ছিল এমন এক মর্যাদা, যার তুলনায় পুরো দুনিয়ার সম্পদও তুচ্ছ। 


খন্দক যুদ্ধে নবীজির সহচর জুবায়ের


রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে দাওয়াতের পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)। অল্প বয়স থেকেই ইসলামের দায়িত্ব বহনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। আহজাবের যুদ্ধে জুবায়ের (রা.)-এর ভূমিকা তার সাহস, সাহায্যের মানসিকতা ও ব্যক্তিত্বের অনন্য পরিচয় বহন করে।


খন্দকের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, বনু কুরাইজা সম্পর্কে কে আমাকে খবর এনে দেবে? জুবায়ের (রা.) বললেন, আমি যাব। তিনি ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলেন এবং তাদের সম্পর্কে খবর নিয়ে ফিরে এলেন। এরপর নবীজি (সা.) দ্বিতীয়বার একই কথা বললেন। জুবায়ের (রা.) আবার বললেন, আমি যাব। তিনি আবার গেলেন। 


তৃতীয়বারও রাসুলুল্লাহ (সা.) একই কথা বললে তিনি বললেন, আমি যাব। তখন নবীজি (সা.) বললেন, প্রত্যেক নবীর একজন হাওয়ারি থাকে, আর আমার হাওয়ারি হলো জুবায়ের।


হাওয়ারি বলতে বোঝায়, আমার ঘনিষ্ঠ সহচর, সাহায্যকারী ও একান্ত অনুগত সাহাবি। ঈসা (আ.)-এর সাহাবিদেরও হাওয়ারি বলা হয়। অর্থাৎ হাওয়ারি হলো এমন এক নিষ্ঠাবান সাহায্যকারী, যে সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়।


ইয়ারমুকের যুদ্ধে জুবায়ের (রা.)


উরওয়া থেকে বর্ণিত, ইয়ারমুকের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা জুবায়ের (রা.)-কে বললেন, আপনি কি একবার শত্রুদের ওপর আক্রমণ করবেন না? আমরা আপনার সঙ্গে আক্রমণ করব। তিনি বললেন, আমি যদি আক্রমণ করি, তাহলে তোমরা কি সত্যিই আমার সঙ্গে থাকবে? তারা বললেন, অবশ্যই থাকব।


জুবায়ের (রা.) শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি তাদের সারি ভেদ করে এত দূর চলে গেলেন যে তার সঙ্গে আর কেউ ছিল না। এরপর তিনি ফিরে এলেন। সাহাবিরা তার ঘোড়ার লাগাম ধরে তাকে থামালেন। তার কাঁধে দুটি আঘাতের দাগ ছিল। এর একটি বদরের দিনকার আঘাত।


উরওয়া বলেন, আমি ছোটবেলায় সেই আঘাতের দাগে আঙুল ঢুকিয়ে খেলতাম। সেদিন তার সঙ্গে তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরও ছিলেন। তখন তাঁ বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। জুবায়ের (রা.) তাকে ঘোড়ায় বসিয়ে একজন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে দেন।


মিসর বিজয়ে জুবায়ের (রা.)


আমর ইবনে আস (রা.) যখন মিসর বিজয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন তার সঙ্গে থাকা বাহিনী মিসর বিজয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই তিনি ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর কাছে আরও সৈন্য পাঠানোর অনুরোধ করেন।


ওমর (রা.) আমরের বাহিনীর সংখ্যা কম হওয়ায় উদ্বিগ্ন হলেন। তিনি জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)-এর নেতৃত্বে আরও ১২ হাজার সৈন্য পাঠান। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ওমর (রা.) চার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। এই বাহিনীতে বিশিষ্ট্য সাহাবিদের ছিলেন জুবায়ের, মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ, উবাদা ইবনে সামিত ও মাসলামা ইবনে মুখাল্লাদ। 


ওমর (রা.) চিঠিতে লিখেছিলেন, আমি তোমাকে চার হাজার সৈন্য দিয়ে সাহায্য করছি। তাদের প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে এমন একজন রয়েছেন, যিনি এক হাজার সৈন্যের সমান।


জুবায়ের (রা.) আমরের কাছে পৌঁছে দেখলেন, তিনি বাবিলিয়নের দুর্গ অবরোধ করেছেন। জুবায়ের (রা.) ঘোড়ায় চড়ে দুর্গের চারপাশের পরিখা ঘুরে দেখলেন এবং পরিখার চারদিকে সৈন্যদের অবস্থান করালেন।


অবরোধ দীর্ঘ হতে হতে সাত মাসে পৌঁছাল। তখন জুবায়ের (রা.)-কে বলা হলো, দুর্গের ভেতরে প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বললেন, আমরা তো আঘাত ও মহামারির মুখোমুখি হতে এসেছি।


আমর ইবনে আসের জন্য বিজয় বিলম্বিত হচ্ছিল। তখন জুবায়ের (রা.) বললেন, আমি নিজেকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করছি। আশা করি, এর মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করবেন।


তিনি একটি মই এনে দুর্গের পাশের হাম্মাম মার্কেটের দিকের দেয়ালে সেটি ঠেকিয়ে দিলেন। এরপর তিনি মই বেয়ে ওপরে উঠলেন এবং সৈন্যদের বললেন, তোমরা যখন আমার তাকবির শুনবে, তখন সবাই একসঙ্গে তাকবির দেবে।


হঠাৎ তারা দেখল, জুবায়ের (রা.) দুর্গের চূড়ায় উঠে গেছেন। তার হাতে তরবারি এবং তিনি তাকবির দিচ্ছেন। তাকে অনুসরণ করে সৈন্যরা মইয়ের ওপর উঠতে শুরু করল। তখন আমর ইবনে আস (রা.) তাদের থামালেন, কারণ তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, বেশি লোক উঠলে মইটি ভেঙে যেতে পারে।


রোমানরা যখন দেখল, আরবরা দুর্গ দখল করে ফেলেছে, তখন তারা সেখান থেকে সরে গেল। এভাবেই বাবিলিয়নের দুর্গ মুসলমানদের জন্য খুলে গেল। এই দুর্গ বিজয়ের মধ্য দিয়ে মিসর বিজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। জুবায়ের (রা.)-এর অসাধারণ সাহসই মুকাওকিসের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের সরাসরি কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 



সর্বশেষ সব খবর

মো. রাশেদ খাঁন। ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১:৫১ এএম

বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম এত সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও পূর্ণ নিরাপত্তায় দেশব্যাপী সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উদযাপন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন।


বুধবার (২১ অক্টোবর) রাতে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। পোস্টে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম এত সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও পূর্ণ নিরাপত্তার সহিত দেশব্যাপী সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনেরা তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা উদযাপন করেছে।’


‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এভাবেই হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ নানা ধর্ম গোষ্ঠীর মানুষেরা নিরাপদে থাকবে, নিরাপদে ধর্ম পালন করবে, উৎসব করবে’ বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে সব ধর্মের মানুষ নিরাপদে থাকেন, এটা আবারও প্রমাণ হলো। প্রমাণিত হলো যে, ফ্যাসিবাদী জমানায় রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য ও আওয়ামী লীগের প্রভু রাষ্ট্রের আশীর্বাদ পেতেই মন্দিরে পরিকল্পিত হামলা হয়েছে।’


রাশেদ খাঁন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘ধন্যবাদ জানাই, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। তার সঠিক তত্ত্বাবধানে পুলিশ-প্রশাসন, এসআরবি, আনসার-ভিডিপিসহ সমস্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে ও রাত জেগে পাহারা বসিয়ে সমস্ত ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।’

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : সোমবার ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১০:০৮ এএম

মুহাম্মদ (সা.) নিজের প্রাত্যহিক আচরণে এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ ও বিজ্ঞানসম্মত জীবনপদ্ধতি বাস্তবায়ন করে গেছেন, যা মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গের সুস্থতা নিশ্চিত করে। তিনি স্বাস্থ্যকে ইমানের পর মানুষের সবচেয়ে বড় নেয়ামত হিসেবে ঘোষণা করেছেন।


তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সুস্বাস্থ্য (আফিয়াত) প্রার্থনা করো। কেননা, ইমানের পর সুস্বাস্থ্যের চেয়ে উত্তম কোনো বস্তু কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৫৮)


রাসুলের জীবন থেকে ছয়টি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস আলোচনা করা হলো: 


১. খুব সকালে জেগে ওঠা


নবীজির জীবনের রুটিন ছিল রাতের প্রথম প্রহরে দ্রুত ঘুমাতে যাওয়া এবং শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদ ও ফজরের জন্য জেগে ওঠা। তিনি কখনো ইশার নামাজের পর অপ্রয়োজনীয় আলাপ–আলোচনা পছন্দ করতেন না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৮)


উম্মতের জন্য ভোরের কল্যাণ কামনা করে রাসুল (সা.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মতের সকালের প্রহরে (ভোরের সময়ে) বরকত দান করুন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৬)


আধুনিক ঘুম ও নিউরোবায়োলজি অনুযায়ী, মানবদেহে একটি নিজস্ব জৈবিক ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ রয়েছে। ভোরের নির্মল বাতাসে ওজোন ও বিশুদ্ধ অক্সিজেনের মাত্রা সর্বোচ্চ থাকে, যা ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে।


দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার ফলে দেহে কর্টিসল হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও মানসিক বিষণ্নতা তৈরি করে।


২. পেটের এক–তৃতীয়াংশ নীতি


অতিভোজন ও অপরিমিত খাদ্য গ্রহণই আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ জটিল রোগের মূল কারণ। মহানবী (সা.) খাদ্য গ্রহণের এমন এক বৈপ্লবিক ফর্মুলা দিয়েছিলেন, যা বর্তমান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির মূল স্তম্ভ।


রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র মানুষ কখনো ভর্তি করেনি। মানুষের মেরুদণ্ড সোজা রাখার জন্য কয়েক লোকমা আহারই যথেষ্ট। যদি খেতেই হয়, তবে সে যেন পেটের এক–তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক–তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি এক–তৃতীয়াংশ শ্বাস–প্রশ্বাসের জন্য ফাঁকা রাখে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)


পেট পুরোপুরি ভর্তি না করে এক ভাগ খালি রাখলে খাদ্য পরিপাক দ্রুত ও সহজ হয়, অম্লতা (অ্যাসিডিটি) প্রতিরোধ হয় এবং পরিপাকতন্ত্রে অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। এ ছাড়া তিনি কখনো আহারে কোনো ত্রুটি ধরতেন না; পছন্দ হলে তৃপ্তি ভরে খেতেন, আর রুচি না হলে শান্তভাবে তা এড়িয়ে যেতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪০৯)


৩. ধীরে–সুস্থে ও বসে তিন শ্বাসে পানি পান


তৃষ্ণার্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ঢকঢক করে দ্রুত পানি পান করা আধুনিক গ্যাস্ট্রিক রিফ্লাক্স ও খাদ্যনালির বিভিন্ন সমস্যার কারণ। মহানবী (সা.) দাঁড়িয়ে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০২৪)


রাসুল (সা.) সর্বদা বসে, পাত্রের বাইরে নিশ্বাস ছেড়ে, ধীরে ধীরে তিন শ্বাসে পানি পান করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৩১)


দাঁড়িয়ে দ্রুত পানি পান করলে পানির তীব্র স্রোত খাদ্যনালি দিয়ে সরাসরি পাকস্থলীর দেয়ালে আঘাত হানে, যা সময়ের ব্যবধানে পরিপাকতন্ত্রের সংবেদনশীল আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বসে ধীরে ধীরে পানি পান করলে স্নায়ুতন্ত্র শিথিল থাকে এবং কিডনি রক্ত থেকে বিষাক্ত উপাদান ফিল্টার করার পর্যাপ্ত সময় পায়।


৪. দাঁতের যত্নে মিসওয়াক ব্যবহার


দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষায় মহানবী (সা.) ছিলেন সচেতন পথপ্রদর্শক। তিনি প্রতিটি অজুর সময়, নামাজে দাঁড়ানোর আগে, ঘুম থেকে ওঠার পর এবং ঘরে প্রবেশ করার মুহূর্তে নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহার করতেন।


তিনি বলেছেন, ‘মিসওয়াক হলো মুখ পরিষ্কারকারী এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫)


অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যদি আমার উম্মতের ওপর কষ্টকর মনে না করতাম, তবে প্রতি ওয়াক্তের নামাজের আগেই তাদের মিসওয়াক করা বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৭)


প্রাকৃতিক জয়তুন বা পিলুগাছের ডালে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান, যা মাড়ির প্রদাহ ও দাঁতের ক্ষয়রোধে কৃত্রিম টুথব্রাশের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। মুখের ব্যাকটেরিয়া রক্তে ছড়িয়ে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, যা নবীজি (সা.) শতাব্দী আগেই প্রতিরোধ করেছিলেন।


৫. দুপুরে সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম


দুপুরের খাবারের পর কিংবা জোহরের পর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সামান্য গা এলিয়ে দেওয়া ছিল নবীজি (সা.)–এর নিয়মিত অভ্যাস, যাকে আরবিতে বলা হয় ‘কায়লুলাহ’। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা কায়লুলাহ গ্রহণ করো। কেননা, শয়তান কখনো কায়লুলাহ করে না।’ (তাবারানি, হাদিস: ২৮৩৫)


দুপুরের ১৫ থেকে ২০ মিনিটের এই ‘পাওয়ার ন্যাপ’ মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সতর্কতা বাড়ায় এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমিয়ে আনে। এটি কোনো অলস ঘুম নয়; বরং স্নায়ুর অবসাদ দূর করে বিকেলের কাজের নব উদ্যম তৈরির বৈজ্ঞানিক উপায়।


৬. নিয়মিত দ্রুত হাঁটা


মহানবী (সা.) কখনোই অলস জীবনযাপন করতেন না। তিনি দ্রুত ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপে হাঁটতেন। সাহাবি আবু হোরাইরা (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর নবীজির চেয়ে দ্রুত কাউকে হাঁটতে দেখিনি। তিনি যখন হাঁটতেন, মনে হতো যেন মাটি তাঁর জন্য গুটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা তাঁর সঙ্গে চলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠতাম, অথচ তিনি স্বাভাবিক গতিতেই হাঁটতেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬৪৮)


সাহাবি আলী (রা.) বলেন, ‘তিনি যখন পথ চলতেন, তখন মনে হতো যেন কোনো উঁচু পাহাড় থেকে নিচের দিকে নেমে আসছেন।’ (শামায়িলে তিরমিজি, হাদিস: ১১৮)


আধুনিক সময়ে একে বলা হয় ‘ব্রিস্ক ওয়াকিং’ বা দ্রুত হাঁটা। দৈনিক ২০–৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার অভ্যাস কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, ফুসফুসের ধারণক্ষমতা বাড়ায় এবং মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে মেদ জমতে বাধা দেয়।


এ ছাড়া নবীজি (সা.) তিরন্দাজ, কুস্তি ও দৌড় প্রতিযোগিতার মতো শরীরচর্চাকে উৎসাহিত করেছেন।

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৪:৪৪ পিএম

সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মদিনায় ওমরাহ ও ভিজিট ভিসায় আসা আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের জন্য ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের এক নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন থেকে সংক্ষিপ্ত মেয়াদের ভিসাধারীরা মসজিদে নববিতে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের অধীনে পবিত্র কোরআন শিক্ষা এবং ঐতিহাসিক মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আরবি ভাষা শেখার সুযোগ পাবেন।


আগে স্বল্পমেয়াদে মদিনায় আসা দর্শনার্থীদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। সম্প্রতি সৌদি আরব সরকারের নেওয়া নতুন এই সিদ্ধান্ত ওমরাহ ও জিয়ারতের সফরের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।


মসজিদে নববিতে বিনামূল্যে কোরআন শিক্ষা


মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে প্রতিদিন কোরআন পাঠদান কর্মসূচি পরিচালনা করছে দুই পবিত্র মসজিদের বিষয়াবলি সংক্রান্ত জেনারেল অথরিটি। 


নতুন নিয়মানুযায়ী, ওমরাহ বা যেকোনো ধরনের ভিজিট ভিসা নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা কোনো ধরনের ফি বা খরচ ছাড়াই এসব ক্লাসে অংশ নিতে পারছেন।


শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে এসব শিক্ষাক্রমকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। একদম শিক্ষানবিশদের জন্য রয়েছে বর্ণমালা ও সহিহ-শুদ্ধ কোরআন পাঠ শেখার ব্যবস্থা। উন্নত স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য তাজবিদ, হিফজ এবং কোরআনের তাফসির শেখার বিশেষ সুযোগ রয়েছে।


একটি নির্দিষ্ট অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে নিবন্ধন করে দর্শনার্থীরা নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অধীনে সরাসরি ক্লাসে যুক্ত হতে পারছেন।


মসজিদে নববিতে বসে জ্ঞানচর্চার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, কেউ যদি ভালো কিছু শেখা বা শেখানোর উদ্দেশ্যে তাঁর মসজিদে আসে, সে মহান আল্লাহর পথে লড়াইকারী মুজাহিদের সমতুল্য মর্যাদা লাভ করবে। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২)


মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ সপ্তাহের আরবি কোর্স


মসজিদে নববির কোরআন ক্লাসের পাশাপাশি অনারব দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ঐতিহ্যবাহী মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। ভিজিট ভিসাধারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছয় সপ্তাহের ‘আরাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স’ চালু করা হয়েছে।


নির্ধারিত ফির বিনিময়ে পরিচালিত এই কোর্সে আধুনিক শিখনপদ্ধতির মাধ্যমে আরবি পড়া, লেখা ও দৈনন্দিন কথোপকথনের দক্ষতা অর্জন করা যাবে।


একাধিক মডিউলে সাজানো এই কোর্সে ধাপে ধাপে ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি মসজিদে নববির খুব কাছেই অবস্থিত হওয়ায় দর্শনার্থীদের জন্য যাতায়াতও বেশ সুবিধাজনক।


অংশগ্রহণ করবেন কীভাবে


মসজিদে নববির ফ্রি কোরআন ক্লাস এবং মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় সপ্তাহের আরবি কোর্স-এই দুটি সুযোগ মিলিয়ে দর্শনার্থীরা প্রায় দুই মাসের এক অনন্য শিক্ষাসফরের সুযোগ পাচ্ছেন।


দুই থেকে তিন মাসের ভিজিট ভিসায় আসা পুণ্যার্থীরা কেবল ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘুরে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এই সময়টুকু জ্ঞানার্জনে কাজে লাগাতে পারবেন। নিচের লিংকে ক্লিক করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করে নিতে পারবেন।


মসজিদে নববির কোরআন ক্লাস: https://reg.qm.edu.sa/Minton/Account/NewRegistration 


মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স: https://ala.asaqefah.sa/ 


ওমরাহ ও মদিনা জিয়ারতে আসা হাজার হাজার আন্তর্জাতিক পুণ্যার্থী এই উদ্যোগের ফলে ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে মদিনায় প্রবেশ করলে খুব সহজেই এই ঐতিহাসিক শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া সম্ভব।


সূত্র: দি ইসলামিক ইনফরমেশন ডট কম

সর্বশেষ সব খবর

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১১:২৫ এএম

পরিস্থিতি সবসময় একরকম যায় না। কখনও এমন কিছুর মুখোমুখি হতে হয়, যার জন্য আমরা প্রস্তুত নই। তখন ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় হয় এবং মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার সঙ্গেই কেন এমন হয়?’


মুমিন হবে ইতিবাচক


মুমিনের জীবনদর্শন ভিন্ন রকম। সে জানে, মানুষ পরিকল্পনা করে, আর আল্লাহও পরিকল্পনা করেন। তবে আল্লাহর পরিকল্পনা  পূর্ণাঙ্গ, দূরদর্শী ও কল্যাণময়। এই আস্থা যদি অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যায়, তাহলে আর  ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয় না।


পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আবার কোনো বিষয়কে পছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)


কীভাবে আস্থা অর্জন করব


আল্লাহর সিদ্ধান্তে আস্থা রাখা কঠিন কোনো বিষয় নয়। পাঁচটি উপায় অনুসরণ করলে খুব সহজেই তা অর্জন করা যায়। 


১. মনে করুন, ‘আমি কিছুই জানি না’


মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ভবিষ্যত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়। আজকের ব্যর্থতাকে সে চূড়ান্ত ব্যর্থতা মনে করে বসে। অথচ সে জানে না, এই ব্যর্থতার ভেতরেই ভবিষ্যতের বড় কোনো কল্যাণ লুকিয়ে আছে। বিপদের সময় বারবার স্মরণ করুন, যে দরজাটি আজ বন্ধ হয়েছে, সেটিই হয়তো আপনার জন্য কল্যাণকর ছিল না। যে সুযোগটি হাতছাড়া হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারত।


কোরআনের এক আয়াত এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে, ‘আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)


২. দায়িত্ব পালন করুন


চেষ্টা করা আপনার দায়িত্ব, ফলাফল আল্লাহর হাতে। চাকরি চাইলে আবেদন করুন, প্রস্তুতি নিন, দক্ষতা বাড়ান। পরীক্ষায় ভালো করতে চাইলে পড়াশোনা করুন। ব্যবসা করতে চাইলে পরিকল্পনা করুন। সম্পর্ক ভালো রাখতে চাইলে আন্তরিক হোন। মোটকথা নিজের দায়িত্ব যথাযথ পালন করুন। চেষ্টা করার পর ফলাফল আশানুরূপ না হলেও মনে রাখুন, আপনার দায়িত্ব ছিল চেষ্টা করা, আপনি তা করেছেন। ফলাফল নির্ধারণ করা আপনার দায়িত্ব নয়।


হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তিকে তার উট ছেড়ে দিয়ে বলেছিল, ‘আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি।’ তখন নবীজি (সা.) তাকে বলেছিলেন, ‘আগে উটটি বেঁধে নাও, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)


৩. ‘যদি’ বলা কমিয়ে দিন


অতীতের কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব বেশি অনুশোচনা করা থেকে বিরত থাকুন। এর ফলে অনেক সময় মানুষ আল্লাহর উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।


> ‘যদি সেদিন এটা করতাম’


> ‘যদি ওই চাকরিটা নিতাম’


> ‘যদি তখন তাকে বিশ্বাস না করতাম’


এভাবে বর্তমানকে অতীতের ‘যদি’র কাছে বন্দী করে ফেলাটা অনুচিত। ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু অনুশোচনায় আটকে গেলে চলবে না। 


রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বলের তুলনায় আল্লাহর কাছে উত্তম ও অধিক প্রিয়। প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যাতে তোমার উপকার তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না। আর যখন কোনো বিপদ আপতিত তখন এভাবে বলো না, ‘যদি আমি এমন করতাম’ তাহলে এমন এমন হত।বরং এভাবে বলেবে, ‘আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে।’ কারণ ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের পথ খুলে দেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)


৪. আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা রাখুন


বিপদে পড়েলে অনেক সময় মনে হয়, ‘আল্লাহ হয়তো আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন।’


এই ধারণা মারাত্মক বিপজ্জনক। কারণ মুমিনের উচিত আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা। কেননা আল্লাহ-তাআলা কখনও বান্দাকে তার আপন অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন না। 


হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি সেরূপই, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাকে নিজে স্মরণ করি। আর যদি সে লোক-সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই, যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়; আমি তার দিকে দু হাত অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৫০৫)


তাই বিপদের সময় মনকে বলুন, আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে না। এই বিশ্বাস মনের অস্থিরতা কমিয়ে দেবে এবং আল্লাহ ওপর আস্থা রাখা সহজ হয়ে যাবে। 


৫. আন্তরিক দোয়া চালু রাখুন 


মুমিনের দোয়া তার শক্তিশালী হাতিয়ার। এর মাধ্যমে বান্দা নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে অসীম ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। দোয়ার পর  কোনো কিছু না পাওয়া মানেই আল্লাহ তা কবুল করেননি—এমন নয়। কখনো তিনি চাওয়া জিনিসটি দেন, অথবা তার চেয়ে উত্তম কিছু দেন, আবার কোনো অদৃশ্য ক্ষতি থেকে আপনাকে রক্ষা করেন। এ জন্যই ভরসা রাখতে হয়।


পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)


আল্লাহর সিদ্ধান্তে ওপর আস্থা রাখা একজন মুমিনের জন্য পরম অনন্দের বিষয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর আস্থা রাখে, সে ব্যর্থ হলেও ভেঙে পড়ে না, অপেক্ষা করেও হতাশ হয় না, কোনো কিছু হারালেও আল্লাহর প্রতি অভিযোগ তুলে না। 


কারণ সে জানে, আমার জন্য কোনটি কল্যাণকর আমার চেয়েও আল্লাহই ভালো জানেন। এই বিশ্বাসের নাম তাওয়াক্কুল। এখানেই লুকিয়ে আছে মুমিনের প্রশান্তির রহস্য।


সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১০:৪৯ এএম

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর)। আজ দুর্গাষষ্ঠী। মহাষষ্ঠীর অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। আগামী বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমী পর্যন্ত ছয় দিন মুখর থাকবে পূজামণ্ডপগুলো।


প্রচলিত নিয়মে দুর্গাপূজা মূলত মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে উদযাপিত হয়। তবে এ বছর মহাসপ্তমীর তিথি দুদিন পড়ায় শারদীয় দুর্গাপূজা এক দিন বেড়ে চলবে ছয় দিন ধরে। এ হিসাবে আগামী শনিবার মহাসপ্তমী, রোববার মহাসপ্তমী (অধিক পূজা), সোমবার মহাষ্টমী ও কুমারী পূজা এবং মঙ্গলবার মহানবমী শেষে বুধবার বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ছয় দিনের শারদীয় দুর্গোৎসব।


এবার দেবী দুর্গা আসছেন ঘোটকে (ঘোড়ায়)। বিদায় নেবেন নৌকায়। হিন্দু শাস্ত্রমতে, শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী বাপের বাড়ি বেড়াতে মর্ত্যলোকে আজ আসছেন। অসুর শক্তির কাছে পরাভূত দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হয়েছিলেন। এই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে একত্র হন দেবতারা। অসুর শক্তির বিনাশে অনুভূত হলো এক মহাশক্তির আবির্ভাব। দেবতাদের তেজরশ্মি থেকে আবির্ভূত হলেন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা।


বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে রেকর্ড সংখ্যক দুর্গাপূজা। এবার সারাদেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা গত বছরের চেয়ে ৪৯৬টি বেশি। তবে ঢাকা মহানগরীতে রাস্তার ওপর পূজা আয়োজনের অনুমতি না পাওয়ায় মণ্ডপের সংখ্যা ৩টি কমে দাঁড়িয়েছে ২৫৮টিতে। 


সর্বশেষ সব খবর

প্রতীকী ছবি

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:২৫ এএম

ফরজ নামাজের পর মহান আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ নামাজ তাহাজ্জুদ। নবীজি (সা.) বলেন, “ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদ।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)


সাধারণত এশার ফরজ নামাজ আদায়ের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে কিছুটা ঘুমিয়ে নিয়ে এই নামাজ আদায় করতে হয়। বিশ্বাস করা হয়, এ সময়ে বান্দার যেকোনো কল্যাণকর আবেদন ও তওবা সরাসরি কবুল করা হয়।


কিন্তু আধুনিক যুগের ব্যস্ত জীবনযাত্রা, রাত জাগার অপসংস্কৃতি এবং অলসতার কারণে শেষ রাতে ঘুম থেকে ওঠা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কীভাবে প্রাত্যহিক জীবনের অংশ বানিয়ে নিয়মিত ও সহজে তাহাজ্জুদের জন্য জাগা যায়, তারই সহজ ও কার্যকরী ৬ উপায় তুলে ধরা হলো।


১. খাঁটি সংকল্প


তাহাজ্জুদ পড়ার ইচ্ছা শুধু কোনো দুনিয়াবি চাওয়া-পাওয়া পূরণের জন্য হওয়া উচিত নয়; বরং অন্তরের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সুদৃঢ় নৈকট্য লাভ।


জীবনের যেকোনো কঠিন মোড়ে আল্লাহর হেদায়েত চাওয়ার নিয়ত থাকলে অলসতা দূর হয়ে যায়। অন্তরে যদি খাঁটি সংকল্প থাকে, তবে বিশ্বজাহানের মালিকই বান্দার জন্য ঘুম ভাঙা সহজ করে দেন।


২. ঘুমানোর পূর্বে প্রার্থনা করা


রাতে ঘুমোতে যাওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে মহান আল্লাহর কাছে ব্যাকুল হয়ে দোয়া করা উচিত, ‘হে আল্লাহ! আমাকে শেষ রাতে আপনার দরবারে সেজদানত হওয়ার জন্য জাগিয়ে দিন’।


বান্দা যখন নিভৃতে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার আকুতি জানিয়ে দোয়া করে, তখন পরম করুণাময় সেই শুভ ইচ্ছা কখনো ফিরিয়ে দেন না। দোয়ার মাধ্যমে ঘুমের ওপর আত্মিক প্রভাব তৈরি হয়।


৩. ‘আর্লি বার্ড’ হওয়া


তাহাজ্জুদের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া। রাত জেগে অনর্থক সময় নষ্ট না করে এশার পর জলদি ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।


প্রতিটি মানুষের ঘুমের নির্দিষ্ট শারীরিক চাহিদা থাকে; কারো ৬ ঘণ্টা আবার কারো ৮ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। নিজের শারীরিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ঘুমানোর সময়সূচি নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে সকালে প্রফুল্ল মনে জাগা যায়।


অনেকে তাহাজ্জুদ পড়ে কিছু সময় ঘুমিয়ে পুনরায় ফজরে ওঠেন, আবার অনেকে একবারে জেগে তাহাজ্জুদ আদায় শেষে জিকির করে ফজরের নামাজ পড়েন—উভয় পদ্ধতিই সুবিধাজনকভাবে অনুসরণ করা যেতে পারে।


৪. অ্যালার্ম সেট করা


ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য অ্যালার্ম দিয়ে রাখা একটি চমৎকার কৌশল। প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে জেগে উঠলে শরীর ও মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই বায়োলজিক্যাল রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।


প্রথম কিছুদিন কিছুটা কষ্ট হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ম ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ভেঙে যাওয়া স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়।


৫. ওজু করে পবিত্র অবস্থায় ঘুমানো


রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অজু করে পবিত্রতা অর্জন করা সুন্নাহসম্মত একটি আমল। শরীর যখন পবিত্র থাকে এবং অন্তরে আল্লাহকে পাওয়ার বাসনা থাকে, তখন মহান আল্লাহ রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায়ের ইচ্ছা পূরণ করা অনেক সহজ করে দেন। ওজু অবস্থায় ঘুমালে বান্দার জন্য ফেরেশতারাও দোয়ায় রত থাকেন।


৬. ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হওয়া


যেকোনো নতুন অভ্যাসের ক্ষেত্রে শুরুতেই অতিরিক্ত কঠোর হওয়া ঠিক নয়। প্রথম প্রথম নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অল্প কয়েক রাকাত দিয়ে শুরু করতে হবে। হঠাৎ একসঙ্গে এত বেশি সময় বা রাকাত আদায় করা অনুচিত, যার ফলে পরবর্তীতে ফজরের নামাজই হাতছাড়া হয়ে যায় কিংবা কাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়।


মহানবী (সা.) বলেছেন, “রাতের বেলা নামাজ আদায় করো যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তবেই তোমরা পরম শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৮৫)


তবে যেকোনো ভালো আমল অল্প হলেও নিয়মিত বজায় রাখাই হলো নববি কৌশল।

সর্বশেষ সব খবর