প্রতীকী ছবি

  • প্রকাশ : বুধবার ২৬ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৯:২৩ এএম

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ বুধবার। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম এবং ওফাতের পুণ্য স্মৃতিময় দিন। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে, আরবি বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে তাঁর জন্ম হয়। ৬৩ বছরের জীবনে ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির পথ দেখিয়ে একই তারিখে তিনি পৃথিবী ছেড়ে যান। 


আরব দুনিয়া যখন আইয়ামে জাহেলিয়াত বা পাপাচারের অন্ধকারে ডুবে ছিল, তখন আলোকবর্তিকা হয়ে জন্ম হয় আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর। মক্কার কুরাইশ গোত্রের সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। অল্প বয়সেই তিনি সত্যবাদিতা ও সততার প্রতীক হয়ে ওঠেন; শান্তি প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত হন। ক্ষমাশীলতা, দানশীলতা ও সহিষ্ণুতায় তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন। দীর্ঘ ২৩ বছর ইসলামের বার্তা প্রচার করেন। শুধু আধ্যাত্মিক শিক্ষা নয়; মদিনায় কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। 


সারাবিশ্বের ইসলাম ধর্মাবলম্বীর মতো বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরাও যথাযোগ্য মর্যাদায় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও মৃত্যুর দিনকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) হিসেবে পালন করেন। অনেকে নফল নামাজ আদায় করেন। কেউ কেউ রোজা রাখেন। রাসুল (সা.)-এর সম্মানে কোরআনখানি, মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো সাজানো হয়েছে কালেমাখচিত পতাকা ও জাতীয় পতাকায়। 


ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশ ও মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তারা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিংসা-বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহার করে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। 


ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। বন্ধ থাকবে সংবাদপত্রও। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন আলোচনা সভা, মিলাদ, দোয়া মাহফিলসহ বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে গতকাল মঙ্গলবার বাদ মাগরিব থেকে শুরু হয়েছে পক্ষকালব্যাপী আয়োজন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।


নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে বিএনপি। সিরাতুন্নবী (সা.) নামে জামায়াত এবং দলটির বিভিন্ন সংগঠন মাসব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে। আজ বাদ আসর বাংলামটরে দলীয় কার্যালয়ে মেহফিলে ইশক রাসুল (সা.) এবং নাত-সন্ধ্যার আয়োজন করেছে এনসিপি। 


অন্যান্য বছরের মতো এবারও আশেকানে মাইজভান্ডারি জশনে জুলুসের আয়োজন করছে। আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে।



সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:৩৭ এএম

ইসলামে নেতৃত্ব একটি পবিত্র আমানত এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। রাসুল (সা.) ছিলেন সামগ্রিক আধ্যাত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের অধিকারী। জীবনের সব ক্ষেত্রে তিনি আদর্শ।


তিনি প্রত্যেক মুসলিমকে নেতৃত্বের দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত করে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৩৮)


নবীজির জীবনে নেতৃত্বের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য ছিল। সেখান থেকে অন্যতম ও মৌলিক কয়েকটি গুণাবলি এখানে তুলে ধরা হলো।


১. সততা ও বিশ্বস্ততা


নবীজির সততা ও বিশ্বস্ততা ছিল সর্বজনস্বীকৃত। তাঁর পরম শত্রুও তাঁকে মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি এবং আল-আমিন (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। ব্যবসায়িক লেনদেন থেকে শুরু করে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত তিনি সততা ও বিশ্বস্ততার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।


এ বিষয়ে সতর্ক করে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যার বিশ্বস্ততা নেই, তার ইমান নেই; আর যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তার ধার্মিকতা নেই।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৩৮৩)


২. দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি


আবু জর (রা.) বলেন, আমি বললাম, ‘আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আমাকে কোনো (রাষ্ট্রীয়) পদে নিযুক্ত করবেন না?’


তখন তিনি তাঁর হাত দিয়ে আমার কাঁধে চাপ দিলেন এবং বললেন, ‘আবু জর, তুমি তো একজন দুর্বল মানুষ (নেতৃত্বের ভার বহন করার ক্ষেত্রে) আর দায়িত্ব হলো একটি আমানত। আর কেয়ামতের দিন এটি হবে শুধুই লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ। তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে ন্যায়ের সঙ্গে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং অর্পিত সব হক ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৫)


৩. স্পষ্টভাষী


রাসুল (সা.) সাবলীল ও স্পষ্টভাবে কথা বলতেন ও যোগাযোগ করতেন, যাতে শ্রোতারা সহজে তাঁর উদ্দেশ্য ও বক্তব্য বুঝতে পারে। এ সম্পর্কে আনাস (রা.) বলেন, ‘নবীজি যখন কোনো কথা বলতেন, তখন তিনি তা (প্রয়োজনবোধে) তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন, যাতে তাঁর কথাটি সঠিকভাবে বোঝা যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫)


৪. বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ


রাসুল (সা.) ছিলেন অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার অধিকারী। হিজরতের আগে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে কোরাইশদের মধ্যকার বিরোধ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মেটানো এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সন্ধি তাঁর অনন্য প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করে।


এ জন্যই তিনি বলেছেন, ‘প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য ও বিচক্ষণতা হলো মুমিনের হারানো ধন। যেখানেই সে তা পাবে, সেটির সবচেয়ে বেশি হকদার হবে সে-ই।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৬৮৭)


৫. ন্যায়বিচার নিশ্চিতকারী


ইনসাফ ছিল রাসুলের নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তিনি সামাজিক অবস্থান, বংশীয় মর্যাদা বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে কখনো কোনো বৈষম্য করেননি। আইনের দৃষ্টিতে ধনী-দরিদ্র, মুসলিম-অমুসলিম সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে আপন পরিবারের ওপরও আইন প্রয়োগের দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছিলেন।


নিজেই বলেছেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল শুধু এই কারণে যে যখন তাদের মধ্যে কোনো সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ চুরি করত, তখন তারা তার ওপর দণ্ডবিধি কার্যকর করত; আর যখন কোনো প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যদি (নবী-কন্যা) ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৮৭)


৬. দয়ালু ও সহানুভূতিশীল


সহানুভূতি ও দয়া ছিল নবীজির নেতৃত্বের প্রধানতম ভূষণ। তিনি সাহাবিদের ক্ষুদ্রতম দুঃখ বা কষ্টও অনুভব করতেন এবং তাঁদের জন্য চিন্তিত থাকতেন।


কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের নিকট একজন রাসুল এসেছেন, তোমাদের যা কিছু কষ্ট দেয়, তা তার নিকট খুবই কষ্টদায়ক। সে তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি করুণাসিক্ত, বড়ই দয়ালু।’ (সুরা তওবা, আয়াত: ১২৮)


৭. পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া


পেশাদার জীবনে একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে কাজ করা রাসুলের নেতৃত্বের মৌলিক নীতি। তিনি সাহাবিদের সঙ্গে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত পরামর্শের (শুরা) মাধ্যমে গ্রহণ করতেন।


আবু হোরাইরা (রা.) বলেন, ‘আমি নবীজির চেয়ে অন্য কাউকে তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে বেশি পরামর্শ করতে দেখিনি। নবীজির এই আদর্শের পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ বলেছেন, ‘এবং তাদের (মুমিনদের) কাজসমূহ সম্পন্ন হয় নিজেদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৩৮)।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৭১৪)


৮. যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন


পেশাগত ক্ষেত্রে যেকোনো কাজের সফলতা নির্ভর করে সঠিক ব্যক্তিকে উপযোগী দায়িত্ব দেওয়ার ওপর। মহানবী (সা.) যোগ্যতা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতেন। অযোগ্য লোকের হাতে দায়িত্ব অর্পণ সমাজ বা জাতির ধ্বংস ডেকে আনে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।


এক বেদুইন নবীজিকে প্রশ্ন করল, ‘কেয়ামত কবে হবে?’ তিনি বললেন, ‘যখন আমানত (সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা) হারিয়ে যাবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা কোরো।’ বেদুইন লোকটি পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কীভাবে আমানত হারিয়ে যাবে?’


নবীজি উত্তর দিলেন, ‘যখন কোনো দায়িত্বশীল পদ বা ক্ষমতা অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে অর্পণ করা হবে, তখন তুমি কেয়ামতের প্রতীক্ষা কোরো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯)


৯. সেবামূলক নেতৃত্ব


নবীজির দৃষ্টিতে নেতৃত্ব হলো মানুষের সেবা করার সুবর্ণ সুযোগ। একজন নেতা নিজেকে প্রভু ভাববেন না, বরং অধীনস্থদের কল্যাণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সেবক মনে করবেন।


তিনি বলেছেন, ‘সফর অবস্থায় দলের নেতাই হলেন মূলত তাঁদের সেবক। সুতরাং যে ব্যক্তি সেবা করার মাধ্যমে অগ্রগামী হয়, অন্য কোনো আমল দিয়ে তাকে ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়—একমাত্র শহীদ হওয়া ছাড়া।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস: ৮০৫০)


১০. দলগত কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ


তিনি সাহাবিদের শুধু আদেশ করতেন না, বরং নিজে দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে কাজ করে জীবন্ত আদর্শ স্থাপন করতেন। মসজিদে নববি নির্মাণ বা খন্দকের যুদ্ধের পরিখা খননে তিনি সাহাবিদের সঙ্গে সমানভাবে মাটি কেটেছেন এবং পাথর বহন করেছেন।


বারা (রা.) বলেন, ‘খন্দকের যুদ্ধের দিন আমি নবীজিকে মাটি বহন করতে দেখেছি। মাটি বহন করতে করতে তাঁর পেট ধুলাবালিতে সম্পূর্ণ ঢেকে গিয়েছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১০৪)


১১. মার্জিত পদ্ধতিতে ভুল সংশোধন


কারও ভুলত্রুটি জনসমক্ষে বা সরাসরি নাম উল্লেখ করে লজ্জিত না করে মার্জিত ও পরোক্ষভাবে সংশোধন করার এক অনন্য শিক্ষা মহানবী (সা.) দিয়েছেন। তিনি ভুলকারীর নাম প্রকাশ না করে সবার উদ্দেশে নসিহতের মাধ্যমে বা ব্যক্তিগতভাবে বুঝিয়ে দিতেন।


আয়েশা (রা.) বলেন, একবার নবীজি নিজে কোনো কাজ করলেন এবং অন্যদের সেটা করার অনুমতি দিলেন। তা সত্ত্বেও একদল লোক তা থেকে বিরত রইল। এ সংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছলে তিনি ভাষণ দিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসার পর বললেন, ‘কিছু লোকের কী হয়েছে, তারা এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে চায়, যা আমি নিজে করছি। শপথ কোদার, আমি আল্লাহ সম্পর্কে তাদের থেকে বেশি জানি এবং আমি তাদের চেয়ে অনেক অধিক তাঁকে ভয় করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১০১)


১২. অধীনস্থদের প্রতি সহানুভূতি


অধীনস্থদের সঙ্গে অত্যন্ত মানবিক আচরণ করা এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজের বোঝা না চাপানো নববি আদর্শের অংশ। অধীনস্থদের ভাইয়ের মর্যাদা দিয়ে তাদের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে ও কষ্টের খেয়াল রাখতে হবে।


আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি ১০ বছর নবীজির খেদমত করেছি। কিন্তু তিনি কখনো আমার প্রতি “উফ” শব্দটিও করেননি। এ কথা জিজ্ঞাসা করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৩৮)


রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মনে রেখো, তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের আশ্রয়ে রেখেছেন। সুতরাং এমন কোনো ভাইয়ের অভিভাবকত্ব বা পরিচালনার ভার যদি কারও ওপর অর্পিত থাকে, তবে সে যেন তাকে তাই খাওয়ায় যা সে নিজে আহার করে, আর তাকে তেমনই পোশাক পরতে দেয় যেমনটা সে নিজে পরিধান করে। তোমরা তাদের ওপর তাদের সাধ্যাতীত কোনো কষ্টের কাজ চাপিয়ে দিও না। যদি কখনো কঠিন কাজের দায়িত্ব দাও, তবে নিজেরা হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের সহযোগিতা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০)


শেষকথা


নবীজির নেতৃত্বের এসব মৌলিক গুণ যেকোনো যুগের নেতৃত্ব, শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার জন্য এক কালজয়ী রূপরেখা। সততা, ইনসাফ, কল্যাণকামিতা ও সেবাবোধের সমন্বয়ে গঠিত তাঁর এই আদর্শ অনুসরণ করলেই সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৩:০২ পিএম

জীবন মানেই চড়াই-উতরাই। কখনো সাফল্য আমাদের আনন্দিত করে, আবার কখনো ব্যর্থতা বা বিপদ আমাদের চারপাশ অন্ধকার করে দেয়। এই কঠিন সময়ে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন পবিত্র কোরআনের বাণী হতে পারে পরম নির্ভরতা ও মানসিক শক্তির উৎস।


বিপদের দিনে মনকে শক্ত রাখতে সহায়ক এমন ১০টি আয়াতের কথা বলা হলো:


১. সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা তিনি দেন না


আপনার ওপর যে পরীক্ষা এসেছে, তা সইবার ক্ষমতা আপনার আছে বলেই আল্লাহ তা নির্ধারণ করেছেন।


উচ্চারণ: লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উস'আহা।


অর্থ: আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। (সুরা বাকারা আয়াত: ২৮৬)


২. কষ্টের পরেই আসে স্বস্তি


বিপদ স্থায়ী নয়; স্রষ্টা দুবার অভয় দিয়ে বলেছেন যে, অন্ধকারের পরেই আলোর দেখা মিলবে।


উচ্চারণ: ফা ইন্না মা'আল উসরি ইউসরা, ইন্না মা'আল উসরি ইউসরা।


অর্থ: নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে। (সুরা শারহ, আয়াত: ৫-৬)


৩. মুমিনের নেই পরাজয়


সাময়িক ব্যর্থতায় হীনম্মন্য হওয়া সাজে না; বিশ্বাসে অটল থাকাই বিজয়ের প্রথম শর্ত।


উচ্চারণ: ওয়ালা তাহিনু ওয়ালা তাহযানু ওয়া আনতুমুল আ'লাউনা ইন কুনতুম মুমিনীন।


অর্থ: তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখ করো না। তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মুমিন হও। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৯)


৪. ধৈর্য ও নামাজই পরম শক্তি


যখন নিজের সামর্থ্য ফুরিয়ে আসে, তখন ধৈর্য এবং নামাজের মাধ্যমেই অসীম শক্তির উৎস খুঁজে পাওয়া যায়।


উচ্চারণ: ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আমানুস তা'ঈনু বিসসাবরি ওয়াসসালাহ, ইন্নাল্লাহা মা'আস সাবিরীন।


অর্থ: হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। (সুরা বাকারা আয়াত: ১৫৩)


৫. আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন


একাকীত্ব বা অসহায় বোধ করার প্রয়োজন নেই; বিপদের চরম মুহূর্তেও মহান প্রতিপালক আপনার পাশেই আছেন।


উচ্চারণ: লা তাহযান ইন্নাল্লাহা মা'আনা।


অর্থ: দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৪০)


৬. নিরাশ হওয়া বারণ


ভুল বা পাপে জীবন জর্জরিত হলেও স্রষ্টার দয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ঠিক নয়। তাঁর রহমতের দুয়ার সব সময় খোলা।


উচ্চারণ: কুল ইয়া ইবাদিয়াল্লাযিনা আসরাফু আলা আনফুসিহিম লা তাকনাতু মির রাহমাতিল্লাহ।


অর্থ: বলো, হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ! আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)


৭. প্রভু আপনাকে ত্যাগ করেননি


প্রার্থনা কবুল হতে দেরি হওয়া মানে এই নয় যে আল্লাহ আপনাকে ভুলে গেছেন। তিনি ধৈর্যশীলদের জন্য সেরা পুরস্কার জমা রাখেন।


উচ্চারণ: মা ওয়াদ্দা'আকা রাব্বুকা ওয়া মা কলা।


অর্থ: তোমার প্রতিপালক তোমাকে ত্যাগ করেননি এবং বিরূপও হননি। (সুরা দুহা, আয়াত: ৩)


৮. আল্লাহর সাহায্যই যখন মূল ভরসা


জাগতিক সব শক্তি এক হলেও আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো বিজয় সম্ভব নয়, আবার তিনি পাশে থাকলে কোনো পরাজয় নেই।


উচ্চারণ: ইন ইয়ানসুরকুমুল্লাহু ফালা গালিবা লাকুম।


অর্থ: যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে কেউ তোমাদের পরাজিত করতে পারবে না। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬০)


৯. তাকওয়ায় মেলে সংকট মুক্তি


সততার পথে অবিচল থাকলে এমন সব অচেনা পথ দিয়ে সমাধানের পথ খোলে, যা ভাবনার অতীত।


উচ্চারণ: ওয়া মান ইয়াত্তাকিল্লাহা ইয়াজ'আল লাহু মাখরাজা।


অর্থ: যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সংকট থেকে উত্তরণের) পথ খুলে দেন। (সুরা তালাক, আয়াত: ২)


১০. যা নির্ধারিত, তা-ই হবে


ভবিষ্যৎ নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা উচিত। কারণ তিনিই আমাদের পরম অভিভাবক।


উচ্চারণ: কুল লাই ইউসিবানা ইল্লা মা কাতাবাল্লাহু লানা হুওয়া মাওলানা।


অর্থ: বলো, আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া আমাদের কিছুই ঘটবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৫১)


সংকটকালে এই আয়াতগুলো আমাদের মনে আত্মবিশ্বাস ও প্রশান্তি ফিরিয়ে আনে। জীবনের প্রতিকূলতায় ভেঙে না পড়ে ধৈর্যের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়াই প্রকৃত মানুষের পরিচয়। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ০৯ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১:৩৪ পিএম

মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করাই একজন মুমিনের পুরো জীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। মানুষ আল্লাহকে যত বেশি স্মরণ করে, তাঁর আনুগত্যে নিজেকে সঁপে দেয় এবং তাঁর প্রিয় কাজগুলোয় আত্মনিয়োগ করে, আধ্যাত্মিক জগতের সিঁড়ি বেয়ে সে ততই রবের নিকটবর্তী হতে থাকে। তবে ইসলামি জীবনবিধানে সব আমলের গুরুত্ব ও মর্যাদা এক স্তরের নয়। শরিয়তে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট আমল ও কর্মপন্থা রয়েছে, যা বান্দাকে অতি দ্রুত আল্লাহর রহমত ও ভালোবাসার পরম সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়।


আল্লাহর নৈকট্যের প্রকৃত অর্থ কী


আমলের পর্যালোচনায় যাওয়ার আগে ‘আল্লাহর নৈকট্য’ (কুরবে ইলাহি)-র তাৎপর্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহর নৈকট্য কোনো স্থানিক বা ভৌগোলিক নৈকট্য নয়। কারণ, মহান আল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট স্থান, দিক বা সীমানার মুখাপেক্ষী নন। তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে।


ইসলামি আকিদার দৃষ্টিতে বান্দার আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার অর্থ হলো—বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি, রহমত, ভালোবাসা ও বিশেষ অনুগ্রহের প্রকাশ ঘটা এবং বান্দার মর্যাদা আল্লাহর দরবারে সুউচ্চ হওয়া।


১. ফরজ বিধানের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন


আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার পথের প্রথম এবং অলঙ্ঘনীয় ধাপ হলো তাঁর নির্ধারিত ফরজ বিধানগুলো যথাযথভাবে আদায় করা।


‘হাদিসে কুদসি’তে মহান আল্লাহ–তাআলা নৈকট্য লাভের এই প্রাথমিক ভিত্তি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘আমার বান্দা আমার নৈকট্য লাভের জন্য যা কিছু করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো তা, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)


দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, সামর্থ্যবানদের জন্য জাকাত ও হজ এবং শরিয়তের যাবতীয় হারাম বিষয় থেকে বেঁচে থাকা—এগুলো হলো ইমানের মেরুদণ্ড।


কোনো ব্যক্তি যদি ফরজ আমলগুলোয় অবহেলা করে শুধু নফল বা অন্যান্য বাহ্যিক আমলে মগ্ন থাকে, তবে তা দিয়ে কখনোই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়। ফরজ হলো ভবনের মূল ভিত্তির মতো; ভিত্তি মজবুত না হলে ওপরের কোনো কাঠামোরই স্থায়িত্ব থাকে না।


২. নফল আমলের নিয়মিত চর্চা


ফরজ বিধানগুলো সতর্কতার সঙ্গে পালন করার পর বান্দাকে আল্লাহর একান্ত প্রিয় বানায় ঐচ্ছিক বা নফল ইবাদত। উপরিউক্ত হাদিসে কুদসিতেই মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘এবং আমার বান্দা ক্রমাগত নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে—যতক্ষণ না আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)


তাহাজ্জুদ নামাজ, চাশত-ইশরাকের নামাজ, নফল রোজা, দান-সদকা ও পবিত্র কোরআন পাঠ বান্দার অন্তরে আল্লাহর প্রতি বিশেষ ভালোবাসা তৈরি করে।


বিশেষ করে নামাজের মধ্যে সেজদা হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে কার্যকর ও চূড়ান্ত মুহূর্ত। রাসুল (সা.) করেছেন, ‘বান্দা সিজদাহরত অবস্থাতেই তার মহান প্রতিপালকের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়; সুতরাং তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)


৩. ইখলাস বা খাঁটি নিয়ত


আমল কম হোক বা বেশি, আল্লাহর কাছে তা কবুল হওয়ার একমাত্র শর্ত হলো ‘ইখলাস’ বা খাঁটি নিয়ত। মানুষের চোখে অত্যন্ত চমৎকার ও বড় আমলও যদি লোকদেখানো (রিয়া), প্রশংসা কুড়ানো বা পার্থিব স্বার্থের উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে আল্লাহর দরবারে তার কোনো মূল্য থাকে না; বরং তা শিরকে আসগার বা গোপন পাপে পরিণত হয়।


আল্লাহর কাছে যাওয়ার পথ কেবল শারীরিক কসরত নয়, এটি অন্তরের পরিচ্ছন্নতার সফর। প্রতিটি আমলের শুরুতে ও শেষে হৃদয়কে এই বিশ্বাসে স্থির রাখতে হবে যে, আমার এই কাজ কেবল আমার রবের সন্তুষ্টির জন্যই নিবেদিত।


৪. সার্বক্ষণিক সংযোগ: আল্লাহর জিকির ও ধ্যান


বান্দা ও স্রষ্টার মধ্যকার অদৃশ্য সেতুবন্ধন হলো আল্লাহর জিকির। আল্লাহ–তাআলা কোরআনে এক পরম প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘোষণা করেছেন, ‘অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব; আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)


জিকির মানুষের অন্তরকে জীবন্ত ও সতেজ রাখে। প্রাত্যহিক শত ব্যস্ততার মধ্যও যার জিহ্বা আল্লাহর তাসবিহ, তাহমিদ ও ইস্তিগফারে সিক্ত থাকে এবং যার অন্তরে সর্বদা আল্লাহর নজরদারির অনুভূতি জাগ্রত থাকে, সে কখনো আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।


৫. উত্তম চরিত্র ও সৃষ্টির সেবা


ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর নৈকট্য কেবল জায়নামাজ কিংবা মসজিদের চার দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। মানুষের সঙ্গে নম্র আচরণ, সত্যভাষণ, পিতা-মাতার নিঃস্বার্থ সেবা, আত্মীয়দের খোঁজখবর রাখা, আমানত রক্ষা এবং সততার সঙ্গে হালাল উপার্জন করাও মহান রবের নৈকট্য পাওয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।


মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি ইবাদত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৫৭৮৭; সহিহুল জামে, হাদিস: ১৭৬)


একজন মুমিন যখন নিজের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করে, তখন তার জীবনের প্রতিটি কর্মই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একেকটি সোপানে পরিণত হয়।


আল্লাহর নৈকট্যের পরম পুরস্কার


বান্দা যখন ফরজ ও নফলের সমন্বয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, তখন মহান আল্লাহ তাকে এমন এক মর্যাদায় ভূষিত করেন, যার কোনো তুলনা নেই। হাদিসে কুদসির শেষাংশে আল্লাহ–তাআলা সেই পরম পুরস্কারের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘অতঃপর আমি যখন তাকে ভালোবেসে ফেলি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে; আমি তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে; আমি তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে এবং আমি তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে হাঁটে। সে যদি আমার কাছে কোনো কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি; আর সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)


এই হাদিসের ব্যাখ্যায় হাদিসবেত্তারা বলেছেন, এর অর্থ হলো, আল্লাহ–তাআলা তখন বান্দার যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে পাপের পথ থেকে রক্ষা করেন এবং তাকে সর্বদা নিজের পছন্দের পথে চলার বিশেষ তাওফিক ও হেফাজত দান করেন। তার দৃষ্টি কেবল হালাল ও কল্যাণময় বিষয় দেখে, তার শ্রবণ কেবল ভালো কথা শোনে এবং তার হাত-পা কেবল পুণ্যের কাজেই অগ্রসর হয়।


শেষ কথা


আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ কোনো জটিল রহস্যময় বিষয় নয়; এটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ এক জীবনাদর্শ। এর সূচনা হয় যাবতীয় ফরজ ও ওয়াজিবের যথাযথ আদায়ের মাধ্যমে, এর প্রবৃদ্ধি ঘটে নিয়মিত নফল ইবাদত ও জিকিরের সুবাসে, আর এর পূর্ণতা পায় উত্তম চরিত্র ও নিঃস্বার্থ সৃষ্টির সেবায়।


ইখলাসপূর্ণ অন্তরে এই পথ অনুসরণ করলেই বান্দা ইহকালে অর্জন করতে পারে রবের বিশেষ অভিভাবকত্ব এবং পরকালে লাভ করতে পারে তাঁর চিরস্থায়ী দিদার ও অনাবিল বেহেশত।

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ০৯ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১১:০৫ এএম

সফল মানুষদের দৈনন্দিন রুটিন নিয়ে আজকাল কত আলোচনা হয়। কারও সফলতার মূলমন্ত্র রাতে দ্রুত ঘুম। কারও নিয়মিত জার্নাল লেখা। কারও বড় বড় স্বপ্ন দেখা। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষটির সফল জীবনের রহস্য কী ছিল, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন?


নবুয়তের শুরুর দিনগুলোতে নবীজির কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশ বারবার আসত, তা ছিল রাতের ইবাদত বা কিয়ামুল লাইল।


যিনি সারা দিন মানুষের জন্য কাজ করেন, ইসলামের দাওয়াত দেন, যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, অন্য সব ইবাদত বাদ দিয়ে তাঁকে কেন রাতের ইবাদত করতে গুরুত্বের সঙ্গে বলা হলো? কারণ, যে শক্তি দিয়ে দিনের বিশাল দায়িত্ব পালন করতে হয়, সেই শক্তি তৈরি হয় রাতের ইবাদতে।


কোরআনের নির্দেশনা


রাতে দাঁড়িয়ে ইবাদত করাই ছিল আল্লাহর প্রথম নির্দেশগুলোর একটি। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে বস্ত্রাবৃত, রাতে দাঁড়াও, তবে অল্প সময় বাদে। অর্ধরাত অথবা তার চেয়ে একটু কম অথবা তার চেয়ে একটু বেশি। আর কোরআন পাঠ করো ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ১-৪)


এই আয়াতে আল্লাহ নবীজিকে ডেকেছেন মুজ্জাম্মিল বলে; যার অর্থ যিনি কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে নেন। ওহির প্রথম অভিজ্ঞতার পর মহানবী (সা.) যখন চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ–তাআলা তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে নামাজে দাঁড়াতে বললেন।


লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তাঁকে প্রথমেই জনসমাবেশে ভাষণ দিতে বলেননি, যুদ্ধে যেতে বলেননি, রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশও দেননি। শুধু বলেছেন, রাতের ইবাদতে দাঁড়াও।


এরপর আল্লাহ বলেন, ‘আর কোরআন ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে পাঠ করো।’ এখানে তারতিল শব্দটি শুধু সুন্দর সুরে পড়ার কথা বলে না, বরং থেমে থেমে, অর্থ উপলব্ধি করে, হৃদয়ে অনুধাবন করে পড়ার শিক্ষা দেয়। এরপর আল্লাহ সেই কারণটি জানিয়ে দেন, কেন রাতের সময়কে বেছে নেওয়া হয়েছে। ‘নিশ্চয়ই রাতের ইবাদত মনকে অধিক দৃঢ় করে এবং কথা ও উপলব্ধিকে অধিক সুদৃঢ় করে।’


মুফাসসিররা বলেন, দিনের বেলায় নানা ব্যস্ততায় মানুষের মন বিক্ষিপ্ত থাকে। কিন্তু রাতের নীরবতায় সেই মন একাগ্র হয়। তখন দোয়া গভীর হয়, পাঠ হৃদয়ে পৌঁছে যায়, আত্মা সহজে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।


আধুনিক ভাষায় বললে, দিনের অসংখ্য নোটিফিকেশন, ব্যস্ততা আর আলোচনার ভিড়ে যে মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, রাত তাকে আবার জাগিয়ে তোলে।


হাদিসে রাতের নামাজ


মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)


অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)


এ এমন এক আমন্ত্রণ, যা পৃথিবীর কোনো রাজা তাঁর প্রজাদের কখনো দেননি।


সুরার শেষে স্বস্তির বার্তা


শেষের দিকে বলেন, ‘নিশ্চয়ই দিনের বেলায় তোমার রয়েছে দীর্ঘ ব্যস্ততা।’ দিন হলো কাজের জন্য, আর রাত হলো আত্মার পুনর্গঠনের জন্য। যিনি রাতের এই শক্তি অর্জন করতে পারেন, দিনের ঝড় তাঁকে সহজে ভেঙে দিতে পারে না।


এরপর আসে জীবনের আরেকটা মৌলিক শিক্ষা। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করো এবং সম্পূর্ণভাবে তাঁরই দিকে মনোনিবেশ করো।’


এর অর্থ সংসার ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং সব কাজের মাঝেও আল্লাহকে স্মরণ রাখা। যখন আল্লাহকে কেন্দ্র করে জীবন চলতে থাকে, জাগতিক চাপ ও ক্লান্তি কমে যায়।


তবে সুরা মুজ্জাম্মিলের শেষাংশ আমাদের জন্য স্বস্তির বার্তাও নিয়ে আসে। শুরুতে যে দীর্ঘ রাতের ইবাদতের নির্দেশ ছিল, পরে আল্লাহ বান্দাদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে বলেন, ‘অতএব কোরআন থেকে যতটুকু তোমাদের জন্য সহজ, ততটুকুই পড়ো।’


এটা আল্লাহর অসীম দয়ার প্রকাশ। তিনি কষ্ট দিতে চান না, তিনি চান ধারাবাহিকতা। তাই নবীজির মতো দীর্ঘ সময় নিয়ে নামাজে পাঠ করা সম্ভব না হলে অল্প সময়ও যথেষ্ট, যদি তা আন্তরিক হয়।


একই আয়াতে আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো।’ অর্থাৎ নফল ইবাদত কম করলেও ফরজ নামাজ, জাকাত এবং অন্যান্য মৌলিক দায়িত্বে কোনো অবহেলা চলবে না।


শেষে আল্লাহ এমন একটা প্রতিশ্রুতি দেন, যা প্রতিটি মুমিনের জন্য আশার আলো, ‘তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণই আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে আরও উত্তম ও আরও বড় প্রতিদান হিসেবে পাবে।’


আমরা অনেকেই মনে করি, রাতের কিছু ঘুম কমে গেলে হয়তো শরীরের ক্ষতি হবে। অথচ কোরআন শেখায়, আল্লাহর জন্য যে সময় ব্যয় করা হয়, তা কখনো হারিয়ে যায় না। তা দুনিয়ায় প্রশান্তি হয়ে ফিরে আসে, আর পরকালে অসীম পুরস্কার হয়ে অপেক্ষা করে।


আজ রাত থেকেই শুরু করুন


আল্লাহর নেতৃত্বের আলোয় আলোকিত হতে চাইলে কিয়ামুল লাইল, অর্থাৎ রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদের নামাজ আজ রাত থেকেই শুরু করতে পারেন। পুরো রাত নয়। দীর্ঘ তাহাজ্জুদও নয়।


ফজরের আধা ঘণ্টা আগে উঠে মাত্র দুই রাকাত নামাজ, কয়েকটি আয়াত পাঠ, কিছু ইস্তিগফার, আর মন খুলে আল্লাহর সঙ্গে কিছু কথা বিনিময়। কিছু আবেদন, কিছু নিবেদন।


নিশ্চয় সেই কয়েক মিনিটই আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ হয়ে থাকবে। যেদিন পৃথিবীর সব হিসাব শেষ হবে, সেদিন এই সামান্য বিনিয়োগ আপনার জন্য অকল্পনীয় লাভ ও আনন্দ বয়ে আনবে।

সর্বশেষ সব খবর

  • প্রকাশ : শুক্রবার ০২ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৪:৩৪ পিএম

মানের ৭০টির বেশি শাখা রয়েছে। এর প্রতিটি শাখাই একজন মুমিনের জীবনের কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস, কথা কিংবা কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে প্রথম, সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ইমানের ষাটের অধিক অথবা সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে। তার মধ্যে সর্বপ্রধান হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা হলো ইমানের একটি শাখা।’ (শুআবুল ইমান লি-বায়হাকি, ৮৮)


‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। এই বাক্যটি এই জন্য ইমানের সর্বপ্রধান শাখা, কারণ এর মাধ্যমেই একজন মানুষ ইমানের গণ্ডিতে প্রবেশ করে।


বিখ্যাত মুহাদ্দিস হুসাইন আল হালিমি (রহ.) এই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন:


১. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মাধ্যমে আমরা স্বীকার করি, এই বিশ্বজগতের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। এই পৃথিবী, আকাশ, মানুষ, প্রাণী—কোনোটিই নিজে নিজে অস্তিত্ব লাভ করেনি। সবকিছুর পেছনে একজন সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা রয়েছে।


২. সেই সৃষ্টিকর্তা একক ও মহাপরাক্রমশালী। তার কোনো শরিক নেই। যাবতীয় ভালো ও মন্দ তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, তার কোনো অংশীদার নেই, এবং তিনি স্ত্রী-সন্তান থেকেও পবিত্র। তিনিই একমাত্র উপাসনার যোগ্য।


৩. আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহকে তার সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তিনি মানুষের মতো নন, কোনো বস্তু বা দেহ নন এবং সৃষ্টিজগতের কোনো বৈশিষ্ট্য তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার অর্থ তাই শুধু অন্য উপাস্যকে অস্বীকার করা নয়; বরং আল্লাহকে সৃষ্টির ঊর্ধ্বে, অনন্য ও অতুলনীয় হিসেবে বিশ্বাস করাও এর অন্তর্ভুক্ত।


৪. আল্লাহ তাআলাই অনাদি ও অনন্ত। আল্লাহ ছাড়া যা কিছু আছে, এক সময় তার কিছুই ছিল না। আল্লাহই নিজের ইচ্ছায় সবকিছুকে অস্তিত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি শুধু এই মহাবিশ্বের কোনো একটি অংশের স্রষ্টা নন; বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের একমাত্র স্রষ্টা। তাই মহাবিশ্বের অস্তিত্বকে আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কোনো অনাদি কারণ বা সত্তার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ নেই। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মানুষকে এই বিশ্বাসই শেখায় আল্লাহ ছাড়া কোনো অনাদি সত্তা নেই, তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা।


৫. আল্লাহ এই পৃথিবীকে উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করেননি, আবার সৃষ্টি করে তাকে ছেড়ে দেননি। তিনিই তার সৃষ্টিজগৎ পরিচালনা করছেন। পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহ কোনো স্বাধীন প্রাকৃতিক শক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। নক্ষত্র, ফেরেশতা কিংবা অন্য কোনো সত্তাও স্বাধীনভাবে বিশ্ব পরিচালনা করে না। সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশে পরিচালিত হয়। তাই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার অর্থ হলো সৃষ্টি যেমন একমাত্র আল্লাহর, তেমনই তার পরিচালনাও একমাত্র আল্লাহর হাতে।


ব্যক্তি যখন এই পাঁচটি পয়েন্ট সামনে রেখে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আনবে, সেই সাথে বিশ্বাসের দায়িত্ব ও কর্তব্যও পালন করবে, তখন সে ইমানদার পরিচয় লাভ করবে। হাদিসে এমন ব্যক্তির জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন এরশাদ আছে: ‘যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস নিয়ে মারা যাবে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (শুআবুল ইমান লি-বায়হাকি: ৯৪)


আরও বলা হয়েছে, ‘যার জীবনের শেষ কথা হবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (শুআবুল ইমান লি-বায়হাকি, ৯৩)


এ কারণেই ইমানের ৭০টির বেশি শাখার মধ্যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-কে প্রথম ও সর্বোচ্চ বলা হয়েছে।

বিষয় :

সর্বশেষ সব খবর

প্রতীকী ছবি

  • প্রকাশ : শুক্রবার ০২ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৩:২১ পিএম

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, ইসলামের প্রথম যুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তরুণ সাহাবিরাই পালন করেছেন। আলী ইবনে আবি তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, ওসামা ইবনে জায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতো তরুণেরা নবীজির হাতে গড়ে উঠেছিলেন।


তাঁদের কেউ ছিলেন আলেম, কেউ প্রচারক, কেউ প্রশাসক, কেউ সেনাপতি। তাঁদের যোগ্যতা এক ছিল না। দায়িত্বও এক ছিল না। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যে রাসুল (সা.) এমন কিছু দেখেছিলেন, যা অন্যরা হয়তো তখনো দেখতে পায়নি।


তরুণদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাই মহানবীর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী। তিনি উপদেশ দিয়েছেন, আবার দায়িত্বও দিয়েছেন। ভুল শুধরে দিয়েছেন, আবার আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছেন। ইমান তৈরি করেছেন, আবার সেই ইমানের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগও দিয়েছেন।


১. ভালোবাসার মাধ্যমে তরুণের হৃদয় জয় করা


কোনো মানুষকে সংশোধন করতে হলে আগে তার হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়। রাসুল (সা.)  তরুণদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, যাতে তারা নির্ভয়ে তাঁর কাছে নিজেদের কথা বলতে পারত। এর একটি অসাধারণ উদাহরণ সেই যুবক, যে নবীজির কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিল।


সাহাবিরা তার কথায় ক্ষুব্ধ হলেন। কিন্তু নবীজি (সা.) তাকে ধমক দিলেন না। বললেন, ‘তাকে আমার কাছে আসতে দাও।’ এরপর তাকে কাছে বসিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এমনটা পছন্দ করবে?’


যুবক বলল, ‘না, আল্লাহর কসম।’ তিনি বললেন, ‘মানুষও তাদের মায়ের জন্য তা পছন্দ করে না।’ এরপর কন্যা, বোন, ফুফু ও খালার কথা উল্লেখ করলেন। প্রতিবার যুবক একই উত্তর দিল। শেষে রাসুল (সা.)  তার জন্য দোয়া করলেন।


বর্ণনাকারী আবু উমামাহ (রা.) বলেন, এরপর ওই যুবকের কাছে ব্যভিচারের চেয়ে অধিক ঘৃণিত আর কিছু ছিল না। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২১১)


২. প্রতিভা খুঁজে বের করে তাকে বিকশিত করা


প্রত্যেক মানুষ একই ধরনের যোগ্যতা নিয়ে জন্মায় না। কেউ জ্ঞান অর্জনে এগিয়ে, কেউ নেতৃত্বে, কেউ ভাষা ও লেখায়, কেউ দাওয়াতের কাজে। রাসুল (সা.) তরুণদের সবাইকে একই ছাঁচে গড়ে তোলেননি। তিনি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র যোগ্যতা চিনেছেন এবং সেই অনুযায়ী তাদের তৈরি করেছেন।


জায়েদ ইবনে সাবিত ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী তরুণ। রাসুল (সা.) তাঁর শেখার ক্ষমতা লক্ষ করেছিলেন। তাই তাঁকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। জায়েদ (রা.) বলেন, তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ভাষা শিখে ফেলেন। এরপর ইহুদিদের চিঠি নবীজির কাছে পড়ে শোনাতেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে তাদের চিঠি লিখতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১৫)


পরবর্তী সময়ে তিনি ওহি লেখকদের অন্যতম হন। কোরআন সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। ফরায়েজ শাস্ত্রেও তিনি বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।


আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মধ্যেও তিনি জ্ঞানের বিশেষ যোগ্যতা দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তাঁকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাঁকে কোরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৩)


পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও মুফাসসির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।


৩. আত্মবিশ্বাস তৈরি করা


তরুণ বয়সে আত্মবিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণ যদি মনে করে, ‘আমি পারি না’, তাহলে তার অনেক যোগ্যতাই অপ্রকাশিত থেকে যায়। রাসুল (সা.)  তাই প্রয়োজনমতো তরুণদের ভালো গুণের প্রশংসা করতেন।


আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ কতই না উত্তম মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত!’ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘এর পর থেকে তিনি খুব কমই রাতের নামাজ ছেড়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১২২)


এখানে নবীজি (সা.) সরাসরি ‘তুমি তাহাজ্জুদ পোড়ো না’ বলে ভর্ৎসনা করেননি। আগে তার ভালো দিকটি উল্লেখ করেছেন। তারপর উন্নতির একটি পথ দেখিয়েছেন। এ ধরনের প্রশংসা মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগায়। আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।


৪. তরুণদের হাতে বাস্তব দায়িত্ব তুলে দেওয়া


রাসুল (সা.) তরুণদের শুধু ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে প্রস্তুত করেননি; যোগ্যতা দেখলে তাদের বর্তমানেই দায়িত্ব দিয়েছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)।


নবীজি তাঁকে একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই বাহিনীতে বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক বড় সাহাবিও ছিলেন। ওসামা তখন তরুণ। কিছু মানুষ তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করলে নবীজি বললেন, ‘তোমরা যদি ওসামার নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করো, এর আগে তাঁর পিতার নেতৃত্ব নিয়েও আপত্তি করেছিলে। আল্লাহর শপথ, সে নেতৃত্বের উপযুক্ত ছিল। আর তার পরে ওসামাও আমার কাছে প্রিয় এবং নেতৃত্বের উপযুক্ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৩০)


এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। রাসুল (সা.) নেতৃত্ব শেখানোর জন্য ওসামাকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করাননি। তাঁর যোগ্যতার ওপর আস্থা রেখে বাস্তব দায়িত্ব দিয়েছেন। কেননা দায়িত্ব পালন করতে করতেই দায়িত্বশীলতা তৈরি হয়।


৫. পাঠশালা থেকে পাঠিয়ে দিতেন জীবনের মাঠে


শিক্ষা যদি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ না পায়, তাহলে তার প্রভাব সীমিত হয়ে যায়। রাসুল (সা.) তরুণদের জ্ঞান দিয়েছেন এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগও দিয়েছেন।


মুসআব ইবনে ওমাইর (রা.) ছিলেন তরুণ। হিজরতের আগে নবীজি তাঁকে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য।


মদিনায় গিয়ে তিনি মানুষের কাছে ইসলাম তুলে ধরেন। তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে সাদ ইবনে মুয়াজ ও উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের মাধ্যমে আরও বহু মানুষ ইসলামের দিকে আসে।


৬. ইমান ও চিন্তার ভিত শক্ত করা


তরুণকে দায়িত্ব দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার আগে তার চিন্তার ভিত শক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) তাই তরুণদের সঙ্গে এমন কথাও বলতেন, যা তাদের পুরো জীবনদর্শন গড়ে দিত।


আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন তখন কিশোর। এক সফরে তিনি নবীজির বাহনের পেছনে বসে ছিলেন। সেই সময় নবীজি (সা.) তাঁকে বললেন, ‘হে বৎস, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাব।’


এরপর বললেন, ‘আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। কিছু চাইলে আল্লাহর কাছে চাইবে। সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখবে, সমগ্র মানুষ তোমার উপকার করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে কিছু করতে পারবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬)


পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমে পরিণত হন।


৭. শুধু শিষ্য নয় শিক্ষক বানাতেন


নবীজির কাছে কয়েকজন তরুণ প্রায় ২০ দিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের পরিবারের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। এটা বুঝতে পেরে তিনি তাঁদের বাড়ি ফিরে যেতে বললেন।


কিন্তু তাঁদের যাওয়ার সময় বললেন, ‘তোমরা তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও, তাদের শিক্ষা দাও এবং তাদের সৎকাজের নির্দেশ দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭২৪৬)


লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাঁরা নবীজির কাছে এসেছিলেন শিখতে। আর ফিরে গেলেন শিক্ষক হয়ে।


এটাই নবীজির দীক্ষার বড় বৈশিষ্ট্য যে মানুষকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা নয়; তাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে সে নিজেই অন্যদের পথ দেখাতে পারে।

সর্বশেষ সব খবর