চসিক সচিব আশরাফুল আমিন
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) আবাসিক প্লট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিধিমালা লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের এক বিস্ময়কর চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন তৎকালীন চউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি পদ ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি প্রথমে নিজের নামে প্লট বরাদ্দ নেন এবং পরবর্তীতে সেটি গোপনে অন্যের কাছে হস্তান্তর করেন।
অনুসন্ধানী নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চউকের আবাসিক প্লট বরাদ্দ প্রবিধানমালা ১৯৯৮-এর ৫ ধারা অনুযায়ী, প্লট বরাদ্দের আগে অন্তত চারটি জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বাধ্যতামূলক। কিন্তু ২০০৯, ২০১৩ ও ২০১৮ সালে অনন্যা ও কল্পলোক আবাসিক এলাকায় প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সেই বিধান সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়। কোনো উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে তৎকালীন আওয়ামী সরকারের সাবেক সাত মন্ত্রী, আট সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত ১৫ নেতা, ১১ সাংবাদিক, সিডিএর ১০ বোর্ড সদস্য এবং ৬২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে এসব মূল্যবান প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এই তালিকায় ৫২তম আবেদনকারী হিসেবে নাম আসে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য নির্ধারিত নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি ‘বিশেষ বিবেচনা’ ক্যাটাগরির সুবিধা নেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০০৮ সালে অনুমোদিত অনন্যা আবাসিক প্রকল্পের মূল নীতিমালায় ‘Genuine & Deserving’ বা ‘বিশেষ বিবেচনা’ নামে কোনো কোটা ছিল না। কিন্তু ২০১৩ সালের ২১ অক্টোবর চউকের ৪০৫তম বোর্ড সভায় বিধিবহির্ভূতভাবে এই নতুন ক্যাটাগরি যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুবিধায় প্লট বরাদ্দের পথ তৈরি করা হয়।
একই প্রক্রিয়ায় ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর আশরাফুল আমিনকে অনন্যা আবাসিক এলাকার ৩ দশমিক ৮০ কাঠার ‘ডি-৩১৪এ’ নম্বর প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে সাধারণ নিয়মে আবেদন করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেকে ‘উচ্চপদস্থ ও বিশেষ বিবেচনা’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন।
প্লট বরাদ্দে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও গুরুতর। সংশ্লিষ্ট সময়ে ওই এলাকায় প্রতি কাঠা জমির বাজারমূল্য ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে মাত্র ৬ লাখ টাকা কাঠা দরে প্লট হস্তান্তর করা হয়। এতে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইনজ্ঞদের মতে, পুরো ঘটনাটি ‘বেনামি লেনদেন’-এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ। অভিযোগ রয়েছে, প্লট বরাদ্দ কমিটির আহ্বায়ক ও তৎকালীন চউকের প্রভাবশালী বোর্ড সদস্য ইউনুস গণি চৌধুরীর সঙ্গে যোগসাজশে আশরাফুল আমিন এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। বোর্ড সদস্য হিসেবে সরাসরি প্লট নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা থাকায় ইউনুস গণি চৌধুরী আশরাফুল আমিনকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন বলে নথিপত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ রেজিস্ট্রির আবেদন করার মাত্র ১২০ দিনের মধ্যে একই বছরের ১১ আগস্ট চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়, যা সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার তুলনায় অস্বাভাবিক দ্রুত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হলফনামায় আশরাফুল আমিন উল্লেখ করেছিলেন যে, তার বা তার পরিবারের নামে চট্টগ্রামে কোনো প্লট নেই এবং ব্যক্তিগত আবাসনের প্রয়োজনেই তিনি প্লটটি গ্রহণ করছেন।
তবে অভিযোগ অনুযায়ী, রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার পরপরই তিনি প্লটটি ইউনুস গণি চৌধুরীর স্ত্রী জাকিয়া বেগমের নামে হস্তান্তর করেন। ফতেয়াবাদ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ২৭৬০ নম্বর দলিল অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট এই হস্তান্তর সম্পন্ন হয়।
পরবর্তীতে জাকিয়া বেগম প্লটটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সিডিএ এভিনিউ শাখায় বন্ধক রেখে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে পুরো লেনদেনের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য আরও স্পষ্ট হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, ২০০৯, ২০১৩ ও ২০১৮ সালে প্লট বরাদ্দের সময় বাধ্যতামূলক গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়ায় সাধারণ নাগরিকরা আবেদন করার সুযোগই পাননি। তাদের ভাষ্য, উন্মুক্ত আবেদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে সাধারণ মানুষও সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু গোপনীয়ভাবে বরাদ্দ কার্যক্রম পরিচালনা করায় পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তারা আরও বলেন, অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিরা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় এবং প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় সম্ভাব্য হয়রানির আশঙ্কায় কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোঃ নুরুল করিম বলেন, অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অতীতে প্লট বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, চউক একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। এখানে সব বরাদ্দ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার কথা। যদি কেউ ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার করে থাকেন, তবে তদন্তসাপেক্ষে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই চউকের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
আসিফ আকবর । ছবি - সংগৃহীত
মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব ও হাইআতুল উলইয়ার কো-চেয়ারম্যান মাওলানা সাজিদুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
সাভারের বিরুলিয়া কালিয়াকৈরের আলোচিত তোহফাতুল জান্নাত মহিলা মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাটের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জোর জোর দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব ও হাইআতুল উলইয়ার কো-চেয়ারম্যান মাওলানা সাজিদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করেন। পরিদশন শেষে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে এই দাবি জানান সাজিদুর রহমান।
আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে হেফাজত মহাসচিব বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিচালকের বাসস্থানের আসবাবপত্র তছনছ করাসহ প্রতিষ্ঠানটির দরজা, জানালা, লাইট, ফ্যান, এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন ওয়াশরুমের ঝরনা, কল এবং ইলেকট্রিক লাইনের সব তারসহ ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের চিত্র আমরা দেখেছি। এতে কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে।’ সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করছি এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ।
আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই আইনিপন্থা। এসময় বেফাক মহাসচিব ও হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, ‘মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাওলানা আব্দুল বারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যায় বা দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগে একজন মানুষকে অপরাধী হিসেবে সমাজের সামনে চিত্রায়িত করা কোনো নিয়ম হতে পারে না। এ দেশে ইসলামী আইনের শাস্তি হয় না, আমরা দাবি করব এই ক্ষেত্রে ইসলামী আইনের কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা হোক।’
কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, আলেম-উলামা ও মুরুব্বিদের অবহিত করা যেত অথবা স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই মাদ্রাসাটিতে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত আসবাবপত্রসহ পরিচালক দম্পতির ব্যক্তিগত অর্থকড়ি ও স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে। এসময় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের নিরপরাধ স্ত্রীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান। সাম্প্রতিক ‘মব কালচার’ ও মাদ্রাসার ওপর আঘাত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী বলেন, ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দেশে এক ধরনের ‘মব’ সৃষ্টির অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই মব কালচারের বিরুদ্ধে দেশের সব নাগরিককে সচেতন হতে হবে। মানুষের জানমাল ও ইজ্জত রক্ষায় সরকারকেও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে মানুষকে বিমুখ করার জন্য এটি কিছু চক্রের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। মাদ্রাসা শিক্ষার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভক্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হচ্ছে। দেশি-বিদেশি খোদাদ্রোহী ও নাস্তিক্যবাদী গোষ্ঠীর চক্রান্তের অংশ হিসেবেই এসব অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে।
পরিদর্শনকালে আরও উপস্থিত ছিলেন হেফাজতের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা নাজমুল হাসান, ঢাকা জেলা উত্তরের উপদেষ্টা মাওলানা আশিকুর রহমান, মাওলানা আব্দুল্লাহ, মাওলানা আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাওলানা আফসার মাহমুদ, ঢাকা জেলা উত্তরের সভাপতি মাওলানা আলী আকবার কাসেমী, সেক্রেটারি মাওলানা আলী আজম, মুফতী মাহফুজুর রহমান, মাওলানা ফয়সাল মাহমুদ হাবিবী, মাওলানা আমিনুল ইসলাম কাসেমী, মাওলানা নাজমুল হাসান বিন নূরী, মাওলানা আহমাদ আল হাবিব, মাওলানা আলী আকরাম প্রমুখ।
আটক তরুণী ও জামায়াত নেতার ছেলে। ছবি : সংগৃহীত
আটক নারী উদ্যাক্তা সাথী আক্তার। ছবি: কালবেলা
ফেসবুক লাইভে বিএনপি সরকার ও দলটির নেতাকর্মীদের সমালোচনা করে মন্তব্য করার অভিযোগে ময়মনসিংহের ভালুকায় সাথী আক্তার নামে এক নারী উদ্যোক্তাকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার (২৫ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে উপজেলার স্কয়ার মাস্টারবাড়ী এলাকা থেকে স্থানীয়রা তাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
সাথী আক্তার ওই এলাকার ‘সাথী বিউটি পার্লার’-এর মালিক।
জানা গেছে, রোববার দুপুরে ‘সাথী মেকওভার’ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একের পর এক চুরির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। লাইভে সাথী জানান, তার দুটি শোরুম ও আশপাশের কয়েকটি দোকান থেকে বৈদ্যুতিক তার, এসির তার এবং বাসা থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়েছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি। চুরির ঘটনায় ব্যবসার নিরাপত্তা ও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন সাথী।
এ সময় ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা করে বিএনপি সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। তার লাইভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রাতে রাজনৈতিক কর্মী ও এলাকাবাসী তার পার্লারে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। একপর্যায়ে উত্তেজনা দেখা দিলে এবং পার্লারে ভাঙচুরের আশঙ্কায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে ভালুকা মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে সাথী আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে থানায় যায় পুলিশ।
ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জানান, পার্লারে হামলার আশঙ্কার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। ফেসবুক লাইভে সমালোচনার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা ও সমালোচনার অধিকার থাকলেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এড়াতে ওই নারীকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আইনজীবী শরিফুল আলম ও মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেহ উদ্দিন। ছবি : সংগৃহীত
গাজীপুরের টঙ্গীতে ছয় বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেপ্তার মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেহ উদ্দিনকে নির্দোষ দাবি করেছেন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট শরিফুল আলম।
তিনি বলেছেন, ‘আমার আসামি ইনোসেন্ট। আমার আসামির বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মোটেও সত্য নয়। ব্যাডটাচও হয় নাই, চুম্বনও দেয় নাই। কিন্তু মামলায় যেটা উল্লেখ হয়েছে, তা অতিরঞ্জিত।’
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামির জামিন শুনানি শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। এদিন গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক ওমর হায়দার উভয় পক্ষের শুনানি শেষে অভিযুক্ত শিক্ষকের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে আদালতের ইন্সপেক্টর আহসান উল্ল্যাহ চৌধুরী বলেন, গাজীপুরের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ওই মাদ্রাসাশিক্ষকের জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়। আদালত শুনানি শেষে তার জামিন নামঞ্জুর করেছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শরিফুল আলম বলেন, ‘আমার আসামি ইনোসেন্ট। আমার আসামির বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মোটেও সত্য নয়। মাদ্রাসায় প্রবেশ করে সেখানে অতর্কিত হামলা এবং মব সৃষ্টি করে মাদ্রাসায় ভাঙচুর করা হয়েছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করা হয়েছে।’ এই শিক্ষকের সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে বসে কথা বলা যেত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু তা না করে সেখানে তাকে চড়-থাপ্পড় মারা হয়েছে, বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। আপনারা ভিডিও ফুটেজ দেখেছেন। আমার আসামি যদি কোনো অন্যায়ও করে থাকেন, তাহলে তো আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। একটি প্রতিষ্ঠানে ১৫ জন লোক নিয়ে গিয়ে মব সৃষ্টি করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতে পারেন না।’
শিশুকে চুম্বন দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অভিভাবকের কথা হচ্ছে, আমার বাচ্চাকে চুম্বন দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাচ্চার বাবা-মা বলছেন, বিষয়টি তাদের বাচ্চা খারাপভাবে নিয়েছে।’
আইনজীবী শরিফুলের দাবি, ‘ব্যাডটাচও হয় নাই, চুম্বনও দেয় নাই। কিন্তু মামলায় যেটা উল্লেখ হয়েছে, তা অতিরঞ্জিত। আমরা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জেনেছি, সেখানে চুমু দিতে চাওয়ার কথা এসেছে।’
অভিযুক্ত শিক্ষকের আচরণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আইনজীবী বলেন, ‘দেড়-দুই বছর আগেও এই বাচ্চা শিক্ষকের ঘাড়ে উঠে বসেছে, দাড়ি টেনেছে। ছোট বাচ্চা তো। মানে স্যারের সঙ্গে সে খুব ফ্রি। স্যার হয়তো বলেছেন, তুমি ভালো রেজাল্ট করেছ, তোমাকে আমি একটা চুমু দেব। অথবা তোমাদের প্রত্যেককে একটা সারপ্রাইজ দেব, তোমাদের আরও বেশি স্নেহ করব।’
মামলার বাদীপক্ষের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাদীপক্ষ আজকে অনেক দুর্বল। যার পরিপ্রেক্ষিতে আজ আদালতে বাদীপক্ষের আইনজীবী নিয়োগের পিটিশন দেওয়া হলেও তিনি দাঁড়াতে পারেননি। কাজেই সত্য-মিথ্যা আমরা বিজ্ঞ আদালতে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করব। আমি মনে করি, আমার আসামি নির্দোষ। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি এবং সেটা প্রমাণ করব।’
জামিন আবেদন নামঞ্জুরের বিষয়ে শরিফুল আলম বলেন, ‘আমি জামিন প্রার্থনা করেছি। আদালত স্বাভাবিকভাবেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারার মামলায় জামিন নামঞ্জুর করেছেন। পরবর্তীতে আমরা উচ্চ আদালতে যাব এবং সেখানে জামিন প্রার্থনা করব।’
ভুক্তভোগী শাহজালাল রুমি ও তার তালাবদ্ধ বাসা। ছবি: সংগৃহীত
কন্যাশিশুকে যৌন নিপীড়নের পর তার ‘ভবিষ্যতের চিন্তায়’ এবং লাগাতার হুমকি পাওয়ার পর গাজীপুর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন শাহজালাল রুমি। স্ত্রী এবং দুই সন্তানসহ তিনি ঠিক কোথায় আছেন তার কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
রুমি যে ভবনে বসবাস করেন সেখানকার কেয়ারটেকার কালবেলাকে জানিয়েছেন, গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদ্রাসার ওই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বর থেকে হত্যার হুমকি পাওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি গ্রেপ্তার আতঙ্কে ছিলেন রুমি। স্ত্রী, দুই সন্তান এবং শ্বশুর-শাশুড়ির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাসা ছেড়ে তিনি এখন অন্যত্র অবস্থান করছেন।
রোববার (২৫ অক্টোবর) টঙ্গীতে গিয়ে রুমির ফ্ল্যাটের দরজায় তালা দেখতে পান এই প্রতিবেদক। ভবনটির কেয়ারটেকার হাবিবুর রহমানের ভাষ্য, দুই থেকে তিন দিন ধরে রুমির পরিবারের সদস্যরা ভয়ে বাসায় থাকছেন না। যে মেয়েটির সঙ্গে এসব ঘটেছে, সেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। রুমি এখন মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছেন বলে আমাদের জানিয়ে গেছেন। রুমি পেশায় একজন ফেব্রিক ব্যবসায়ী। পাশাপাশি বডি বিল্ডিংয়ের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। ঢাকায় ব্যবসার সুবাদে তিনি তার বাবার ফ্ল্যাটে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। তার এক মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। মেয়ের বয়স আট বছর এবং ছেলের বয়স চার বছর। রুমির শ্বশুরের নাম হাজি মোহাম্মদ মোকাররম আলী। মাদ্রাসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংবাদ সম্মেলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে রুমি এবং তার পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। রুমি ফেসবুক লাইভে একাধিকবার তার ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। বিভিন্ন ব্যক্তি তাকে হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি দুই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সন্তানদের ভালোভাবে পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করার স্বপ্ন নিয়ে মেয়েকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন রুমি। কিন্তু সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা কখনো কল্পনাও করেননি বলে তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। ঘটনাটি সামনে আসার পর থেকে রুমি ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
পাল্টাপাল্টি মামলা, তদন্তে পুলিশ
মাদ্রাসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। একটি মামলা করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং অন্যটি করেছেন শিশুটির বাবা রুমি। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও বক্তব্য সামনে এসেছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মামলায় অর্থ আত্মসাৎ, ভাঙচুরসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে, রুমি তার মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চেয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফ হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘দুটি মামলাই আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করছি। তদন্ত সাপেক্ষে পুরো বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
তদন্তের স্বার্থে মামলার বিস্তারিত বিষয়ে আপাতত কিছু জানাতে চাননি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা।
মাদ্রাসা ও রুমির বাসায় গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড়
ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনায় আসার পর থেকে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা এবং রুমির বাসায় গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ঘটনার প্রকৃত তথ্য, দুই পক্ষের বক্তব্য এবং তদন্তের অগ্রগতি জানতে সাংবাদিকেরা সেখানে যাচ্ছেন।