চলতি সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান। এর মধ্য দিয়ে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের বিষয়ে বেইজিংয়ের নেওয়া বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে।
গত সোমবার সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) সঙ্গে টেলিফোনে আলাপের সময় শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যে 'শান্তি পুনরুদ্ধারে সহায়ক সকল প্রচেষ্টার' প্রতি চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং 'রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে' চীনের অবস্থান তুলে ধরেন।
ওই ফোনালাপ নিয়ে চীনের দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, শি বলেছেন, 'হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিক পথ অক্ষুণ্ন রাখা উচিত, কারণ এটি আঞ্চলিক দেশগুলোর এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা করে।'
গত সাত সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের জেরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি অচল হয়ে পড়েছে। তবে বিবৃতিতে যুদ্ধে জড়িত প্রধান পক্ষগুলোর কারও নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান এই প্রণালি দিয়ে বেশিরভাগ নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয় এবং এর জবাবে ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের সব সমুদ্রবন্দরে অবরোধ আরোপ করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে, শি জিনপিংয়ের এই সংযত বিবৃতির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের চরম বৈপরীত্য দেখা গেছে। একই দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, 'আমি একটি যুদ্ধে বড় ব্যবধানে জিতছি, সবকিছু খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে' এবং ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে একটি 'চুক্তিতে' না পৌঁছানো পর্যন্ত এই নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি এ বিষয়েরও ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে চীন কীভাবে বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যে নিজেকে অধিকতর দায়িত্বশীল হিসেবে তুলে ধরেছে। যদিও বেশিরভাগ সময়েই বেইজিং সামনের সারিতে বা কেন্দ্রে থাকার চেয়ে নেপথ্যে থাকতেই বেশি পছন্দ করে।
অ্যাব্বা ইবান ইনস্টিটিউট ফর ডিপ্লোমেসি অ্যান্ড ফরেন রিলেশনস-এর এশিয়া-ইসরায়েল পলিসি প্রোগ্রামের প্রধান গেদালিয়াহ আফটারম্যান বলেন, 'চীন কোনো নাটকীয় পদক্ষেপ নিয়ে নয়, বরং অপেক্ষা করা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সুযোগ বুঝে অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে লাভবান হচ্ছে। আর তারা মার্কিনিদেরই এই ঝামেলার মোকাবিলা করতে দিচ্ছে।'
অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার দীর্ঘদিনের নীতি এবং ইরান যুদ্ধে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে কার্যকরী সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে বেইজিং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেকে একটি যুক্তিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।
ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চীন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং তারা দেশটির উৎপাদিত তেলের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কিনে থাকে। এছাড়া ২০২১ সালে তেহরানের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি একটি 'বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে' স্বাক্ষর করেছিল চীন।
একই সঙ্গে বেইজিং গত এক দশক ধরে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়েরই অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার।
চীনের ঝেজিয়াং ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির মেডিটেরানিয়ান রিম ইনস্টিটিউটের ডিন মা জিয়াওলিন বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে চীনের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এই দেশগুলো নিজেদের মধ্যে শত্রু হলেও, তারা সবাই আমাদের বন্ধু।'
আফটারম্যানের মতে, চীনের এই অহস্তক্ষেপ নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতির কারণেই সম্ভবত চলতি মাসের শুরুতে তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিল, যেখানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে 'সমন্বিত প্রতিরক্ষামূলক প্রচেষ্টা' চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছিল। সিরিয়া এবং মিয়ানমারের মতো সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরূপ উদ্যোগেও চীন ভেটো দিয়েছে।
তাইওয়ান-ভিত্তিক সোসাইটি ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো চ্যাং চিং বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যের বিপরীতে—ওই অঞ্চলে বেইজিংয়ের শীর্ষ অগ্রাধিকার এখনো অর্থনীতি। তিনি বলেন, শান্তি ব্যবসার জন্য ভালো, আর যুদ্ধ তা নয়।
তিনি আরও বলেন, 'চীন শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করে। সংঘাতে কে জিতল, তা নিয়ে তাদের আসলেই মাথাব্যথা নেই। তাদের ইচ্ছা হলো মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির আশপাশে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা।'
বেইজিং-ভিত্তিক হুটং রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার ফেং চুচেং বলেন, যুদ্ধে আরও উত্তেজনা বাড়লে তা 'চীনের অর্থনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এমন মাত্রার হুমকি তৈরি করবে, যা তাদের সরাসরি জড়িত হতে বাধ্য করতে পারে। কারণ চীনের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ৪০ শতাংশেরও বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।'
চলতি মাসে নিজ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের উদ্দেশে লেখা এক গবেষণা নোটে তিনি বলেন, 'বেইজিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের কোনো সম্পৃক্ততা ইরান এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার যে প্রচেষ্টা তারা চালাচ্ছে, তা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।'
এদিকে বেইজিং এই যুদ্ধের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের সমন্বয়ে সাহায্য করতে 'সবার বন্ধু' হিসেবে তাদের অবস্থানকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আগ পর্যন্ত চীনের শীর্ষ কূটনীতিক– ওয়াং ই ২৬টি ফোনালাপ করেছেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বিশেষ দূত ঝাই জুন সংঘাতের মূল পক্ষগুলোর সঙ্গে প্রায় দুই ডজন বৈঠক করেছেন।
সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনালাপের আগে, গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট শি আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের সঙ্গেও একটি বৈঠকে অংশ নেন।
এত বিপুল কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ক্ষেত্রে বেইজিং যে ভূমিকা রেখেছিল, তার তুলনায় চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতায়—নিজেদের ভূমিকাকে অপেক্ষাকৃত ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে এর কারণ হলো, চীন একটি জটিল শান্তিচুক্তিতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চায়।
সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ড্রিউ থম্পসন বলেন, 'চীন শান্তি প্রক্রিয়ার দায়ভার না নিয়েই শান্তিস্থাপনকারী হওয়ার চেষ্টা করছে। মূল কথা হলো মধ্যপ্রাচ্য চীনের মূল স্বার্থের জায়গা থেকে অনেক দূরে, তাই সেখানে ব্যয় করার মতো তাদের রাজনৈতিক পুঁজিও সীমিত।'
তারপরও চীনের এই প্রচেষ্টাগুলো অলক্ষ্যে থেকে যাবে না বলে মনে করেন ঝেজিয়াং ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির মা জিয়াওলিন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, 'আমি মনে করি, বিশ্ব জানে কারা স্থিতিশীলতা দেয়, কারা নিরাপত্তা দেয় এবং কারা আন্তর্জাতিক আইন ও শাসন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে।'
পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, চীন পর্দার আড়াল থেকে হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেওয়ার বা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে। চলতি মাসের শুরুতে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছিল, চীন ইরানে ম্যান-পোর্টেবল এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম (ম্যানপ্যাডস)-এর একটি চালান পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সিএনএনের ওই প্রতিবেদনের পর চলতি মাসে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর আরেকটি অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ইরান চীনের একটি গুপ্তচর স্যাটেলাইট (কৃত্রিম উপগ্রহ) সংগ্রহ করেছিল এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র চালাতে সেটি ব্যবহার করেছে।
বেইজিংয়ের সিংহুয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির পোস্টডক্টরাল ফেলো জোডি ওয়েন আল জাজিরাকে বলেন, মে মাসে শি ও ট্রাম্পের মধ্যে একটি পরিকল্পিত বৈঠকের আগে বেইজিং এতটা 'অসতর্ক' হবে বলে তিনি মনে করেন না।
ওয়েন আল জাজিরাকে বলেন, 'চীন সরকারের কাছে চীন-ইরান সম্পর্কের পাশাপাশি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।'
শি জিনপিং একটি বাণিজ্য চুক্তি ও মার্কিন শুল্কের বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করার আশা করছেন। অন্যদিকে ইরানকে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের আলাদা হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া বেইজিং গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার পাশাপাশি দ্বিতীয় চীন-আরব শীর্ষ সম্মেলনের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আফটারম্যানের মতে, ইরান যুদ্ধে নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং এই যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতির কথা বিবেচনা করার সময় চীন এই সব কয়টি বিষয়ই বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখবে।
তিনি বলেন, 'নিজেদের সম্পর্কগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে চীন দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছে। তারা যুদ্ধের পরের দিনটি নিয়ে ভাবছে... পুনর্গঠন প্রচেষ্টা, নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নতুন বিনিয়োগ নিয়ে ভাবছে। (পারস্য) উপসাগরের উভয় তীরেই চীন খুব সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে চায়।'
চীনের তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তিব্বত অঞ্চলে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।
চায়না আর্থকোয়েক নেটওয়ার্কস সেন্টার (সিইএনসি) বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে এ ভূমিকম্প হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
সিইএনসির তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল তিব্বতের উত্তরাঞ্চলের নাগচু এলাকার একটি উচ্চ পার্বত্য কাউন্টিতে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থলের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে ভূমির গড় উচ্চতা প্রায় ৪ হাজার ৮৬৪ মিটার।
চীনে ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে জানিয়েছে সিইএনসি। স্থানীয় এলাকায় কম্পনটি স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে। এর আগে ২০১০ সালে প্রতিবেশী ছিংহাই প্রদেশের ইউশু এলাকায় ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। ওই ঘটনায় অন্তত ২ হাজার ৬৯৮ জন নিহত হন এবং প্রায় ৩০০ জন নিখোঁজ ছিলেন।
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের রাজধানী তেহরানের উত্তরে তাজরিশ স্কয়ারে মঙ্গলবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে ব্যতিক্রমী এক শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। ব্যস্ত সড়কের পাশে স্থাপন করা ওই শিল্পকর্মে ট্রাম্পের আদলে এক অভিনেতাকে কারাগারের পেছনে দেখা যায়। বিলবোর্ডের মতো দেখতে শিল্পকর্মটিতে একটি কৃত্রিম কারাগার তৈরি করা হয়েছে। ট্রাম্পের ভূমিকায় অভিনয় করা ওই ব্যক্তি কারাগারের চারপাশে হাঁটেন এবং মাঝেমধ্যে ভেতরে বসেন।
শিল্পকর্মটিতে লেখা রয়েছে, ‘এই দৃশ্য না দেখা একটি অপরাধ।’ এর পাশে থাকা অন্যান্য বার্তায় দক্ষিণ ইরানের সিরকি এলাকায় সেপ্টেম্বরের শুরুতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, ওই হামলায় দুই নারী ও দুই শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ৬০ জনেরও বেশি মানুষ।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তেহরানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কারাগারে বন্দি অবস্থায় দেখিয়ে প্রতীকীভাবে তার প্রতি প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ
আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) প্রকাশিত ‘আইনের শাসন সূচক ২০২৬’-এ ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম।
উন্নতি সত্ত্বেও দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে দেশটি। সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ০ দশমিক ৩৯, যেখানে বৈশ্বিক গড় ০ দশমিক ৫৫। তবে এ বছর আইনের শাসন সূচকে বিশ্বের ১৫তম শীর্ষ অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অগ্রগতির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে দেশটি।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ অঞ্চলে শীর্ষে রয়েছে নেপাল।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে শুধু পাকিস্তান ও আফগানিস্তান।
আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশও সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ঘানা ৬২তম, কেনিয়া ১০০তম, লাইবেরিয়া ১০৩তম, সিয়েরা লিওন ১১০তম, নাইজেরিয়া ১২০তম এবং জিম্বাবুয়ে ১২২তম স্থানে রয়েছে।
বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। সূচকের শীর্ষ পাঁচে রয়েছে যথাক্রমে ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও লুক্সেমবার্গ।
সূচকে আটটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে দেশগুলোর আইনের শাসন মূল্যায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো- সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, বিধি-বিধানের প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার।
আটটি মানদণ্ডের মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং বিধি-বিধানের প্রয়োগ। বাকি পাঁচটি মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে।
মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল। এ খাতে ০ দশমিক ৩১ স্কোর নিয়ে ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে ১৩৩তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর সবচেয়ে ভালো অবস্থান মুক্ত সরকার মানদণ্ডে। এ খাতে ০ দশমিক ৪২ স্কোর নিয়ে ১২৮তম স্থানে রয়েছে দেশটি।
মোহাম্মদ সাদিক
আফগানিস্তানে বড় পরিবার এবং সন্তানের সংখ্যা অনেক এমন দম্পতির দেখা পাওয়া সাধারণ ঘটনা। তবে উরুজগান প্রদেশের মোহাম্মদ সাদিকের পরিবার সম্ভবত দেশটির অন্যতম বড় একটি পরিবার। মোহাম্মদ সাদিকের চার স্ত্রীর ঘরে ৫৮টি সন্তান রয়েছে এবং তার সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের জন্ম হয়েছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। এত বড় পরিবার চালানো তার জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, তার সমস্ত প্রচেষ্টা প্রতিদিন সন্তানদের খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবারের ছোট সন্তানরাও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
এই পরিবারের চার নারীও বছরের পর বছর গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব বহন করে আসছেন। মোহাম্মদ সাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের সময় তার চার স্ত্রীর বয়সই খুব অল্প ছিল, ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে ছিলেন তারা।
মোহাম্মদ সাদিক হাসতে হাসতে বলেন, কখনও কখনও তিনি তার সব সন্তানের নামও মনে রাখতে পারেন না। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি সন্তানদের গুনে দেখেন, সবাই বাড়িতে আছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য।
উৎসবের' আবহ
মোহাম্মদ সাদিকের মতে, ছোট সন্তানরা যখন তাকে ঘিরে জড়ো হয়, তখন তাদের বাড়ি কোলাহল, হাসি আর ব্যস্ততায় ভরে ওঠে, যেন সেখানে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। তবে এই পরিবারের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে গুরুতর আর্থিক সংকট। দারিদ্র্য কখনও কখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে কিছু সন্তানকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়।
পরিবারটিতে দিনে মাত্র দুইবার রান্না হয়, সকালে এবং সন্ধ্যায়। পরিবারের দুই জন নারী রান্নার দায়িত্ব পালন করেন।
৫৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তিনি বলেন, আরও সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল "নবীর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানো"।
তার এক মেয়ের বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মজার ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, "যে মৌলভি সাহেব বিয়ে পড়িয়েছিলেন, তিনি আমাকে আমার মেয়ের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে ভুলবশত আমার অন্য এক মেয়ের নাম বলে ফেলি। তখন মৌলভি সাহেব হেসে বললেন, আপনি বাড়ি গিয়ে আবার দেখে আসুন, ভুল নাম বলেছেন কি না।"
'নামটাও মনে থাকে না'
তিনি ব্যাখ্যা করেন, এত বেশি সন্তান থাকার কারণে সবার নাম মনে রাখা তার জন্য প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি অধিকাংশকেই "বাবা" বা "আমার সন্তান" বলে ডাকেন।
মোহাম্মদ সাদিক একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন, "এক রাতে আমরা সবাই খাবারের টেবিলের চারপাশে বসেছিলাম। আমি সন্তানদের গোনা শুরু করি এবং দেখি একজন নেই। আমি এটাও জানতাম না যে অনুপস্থিত সন্তানটি ছেলে না মেয়ে। পরে আমি তাদের মায়েদের জিজ্ঞেস করি। তখন একজন জানান, তিনি তার সন্তানকে তার নানির বাড়িতে পাঠিয়েছেন এবং সে রাতটা সেখানে কাটাবে।"
মোহাম্মদ সাদিকের প্রথম বিয়ে হয়েছিল যখন তার বয়স ছিল ২০ বছর। তরুণীদের বিয়ে করার কারণ সম্পর্কে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি বিয়ের জন্য তাকে কয়েক বছর ধরে কনের পরিবারকে দেওয়া অর্থ জমাতে হয়েছে।
এত বড় পরিবার ও সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার স্ত্রীরা খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন। শৈশব ও কৈশোরেই তারা বিয়ে, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান পালনের বিশাল দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা তাদের জীবনের স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে। মোহাম্মদ সাদিক এবং তার স্ত্রীরা জীবনে আরেকটি বড় ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে তারা ১৪ সন্তান হারিয়েছেন, যা যেকোনো বাবা-মায়ের জন্য গভীর বেদনার বিষয়।
স্বাস্থ্য সংকট ও আর্থিক অনটন
বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে বিয়ে এবং গর্ভধারণ মা ও অনাগত শিশু উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। বারবার গর্ভধারণ নারীদের জন্য আরও স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ হতে পারে।
আফগানিস্তান এমন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে, যেখানে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় নারীদের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে এখনো বেশি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকাগুলোতে, যেখানে মানসম্মত চিকিৎসাসেবার সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে, দারিদ্র্যও এই পরিবারের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে একসঙ্গে খাবার খান এবং গ্রীষ্মকালে উঠানে খান, কিন্তু মৌলিক সুবিধাগুলোরও তাদের সীমিত প্রাপ্যতা রয়েছে।
যে জায়গায় তারা গোসল করেন, সেটিই কাপড় এবং বাসন ধোয়ার জন্যও ব্যবহৃত হয়। একই স্থান শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
পরিবারের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে শুধু মোহাম্মদ সাদিক নন, তার অনেক সন্তানও কাজ করে। কেউ কেউ কাগজ, প্লাস্টিক এবং অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সংগ্রহ করে, যা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় অথবা বিক্রি করে পরিবারের খরচে অবদান রাখা হয়।
সব কষ্ট সত্ত্বেও এই পরিবার প্রতিদিনের চাহিদা মেটানোর জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি দিনই নতুন একটি চ্যালেঞ্জ, খাবার, আশ্রয় এবং সন্তানদের প্রয়োজন মেটানোর চ্যালেঞ্জ।
শীতের রাতে কখনও কখনও ছয় বা সাতজন মানুষ একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমান। সাধারণ গদি ছাড়া এই পরিবারের কোনো বিশেষ শোয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, মজবুত দরজাও নেই। প্রবেশমুখে শুধু পাতলা পর্দা ঝোলানো রয়েছে। জ্বালানির জন্য পরিবারটি মূলত কাগজ এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পোড়ায়।
মোহাম্মদ সাদিকের দুই ইচ্ছে
শীতের রাতে কখনও কখনও ছয় বা সাতজন মানুষ একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমান। সাধারণ গদি ছাড়া এই পরিবারের কোনো বিশেষ শোয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, মজবুত দরজাও নেই। প্রবেশমুখে শুধু পাতলা পর্দা ঝোলানো রয়েছে।
জ্বালানির জন্য পরিবারটি মূলত কাগজ এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পোড়ায়।
এসব কষ্টের মধ্যেও নিজে পড়াশোনা করতে না পারা মোহাম্মদ সাদিক বলেন, তিনি তার সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তবে সীমিত আয়ের কারণে তাদের শিক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মোহাম্মদ সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তিনি বলেন, প্রতি একটি গাড়ি বিক্রির জন্য তিনি মাত্র এক হাজার আফগানি কমিশন পান।
কিন্তু এত বড় পরিবারের চাহিদা তাদের সম্মিলিত আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। তাই মোহাম্মদ সাদিক সরকার, সহায়তা সংস্থা এবং আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান, যাতে তিনি তার সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন।
নিজের ইচ্ছের কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদ সাদিক বলেন, তার জীবনে মাত্র দুটি বড় ইচ্ছে রয়েছে।
"আমার প্রথম ইচ্ছা, আমার সন্তানরা শিক্ষা লাভ করুক, ধর্ম এবং পৃথিবী সম্পর্কে জানুক। দ্বিতীয়ত, তাদের যেন কখনও ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না হয় এবং তাদের পেট যেন ভরা থাকে।"
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোতে হুতিদের আক্রমণে অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার।
এর জেরে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, চলমান উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ায় নিকট ভবিষ্যতেও তেলের দাম চড়া থাকতে পারে।ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৩৫ ডলার বা ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ১১২ দশমিক ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ১৮ মের পর এটিই ব্রেন্ট ক্রুডের সর্বোচ্চ দাম।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৬৮ ডলার বা ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৮৩ ডলারে পৌঁছেছে।
পিভিএম অয়েলের বিশ্লেষক তামাস ভার্গা বলেন, ‘ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টাগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে... হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরব ও তার তেল অবকাঠামোতে হুতিদের হামলা নতুন করে চিন্তার কারণ হয়েছে। এসবের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সংঘাতের পূর্ববর্তী মাত্রার চেয়েও বেশি তেল রপ্তানির খবর পুরোপুরি ম্লান হয়ে গেছে।’তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এসব সংঘাত হ্রাসের কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে নিকট ভবিষ্যতে তেলের দাম চড়া থাকবে।’
এদিকে, মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকরা এক নোটে অনুমান করেছেন, গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে সৌদি আরবে নিজেদের কূটনৈতিক উপস্থিতি নিয়েও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন মিশনগুলোর কিছু কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মার্কিন মিশন থেকে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন।
এরই মধ্যে বুধবার সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী। হামলার মধ্যে দাম্মামের একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে আঘাতের ঘটনায় অন্তত দুজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সৌদি আরবের একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিকেও বুধবার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। তবে এসব বিস্ফোরণের প্রকৃতি ও উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। নতুন এক বার্তায় সংস্থাটি বলেছে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনও বাণিজ্যিক জাহাজ মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে আবারও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং তেল অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে তেলের দামে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
সূত্র: রয়টার্স, দ্য স্টার
দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তজুড়ে আবারও বিশালাকার লাউডস্পিকার চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখলে দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং জানান, অক্টোবরের শেষ নাগাদ পুরো সীমান্তজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়াবিরোধী লাউডস্পিকার সক্রিয় করা হবে। এর আগে বুধবার রাতে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের সেনা দুর্গ ও প্রতিরোধব্যবস্থা পরিদর্শন করেন তিনি। খবর জাপান টাইমসের।
কিম ইয়ো জংয়ের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত সামরিক ইউনিটগুলো সীমান্তে নতুন অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সীমান্ত এলাকায় উসকানিমূলক বার্তা প্রচার এবং একাধিক স্থানে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সতর্কতামূলক গুলিতে উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড বা কোনো সেনাসদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে দক্ষিণ কোরীয় বাহিনীকে ‘বিনা দ্বিধায় ও নির্মমভাবে নির্মূল’ করা হবে।তবে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের পদক্ষেপকে ‘আইনসম্মত ও আত্মরক্ষামূলক’ বলে দাবি করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা ও একীভূতকরণ মন্ত্রণালয় উত্তর কোরিয়াকে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ কমান্ডের সহায়তায় অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোনে (ডিএমজেড) নিয়ন্ত্রণ জোরদারে সিউলের নেওয়া পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে বলেই কিম ইয়ো জং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। উত্তর কোরিয়া হুমকি বাস্তবায়ন করলে দক্ষিণ কোরিয়াও ‘সমানুপাতিক ও উপযুক্ত জবাব’ দেবে বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
কিম ইয়ো জংয়ের এই হুঁশিয়ারিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের দুই দেশের বৈরিতা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বছরের জুনে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধ যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হওয়ার পর থেকেই ডিএমজেড দুই দেশকে পৃথক করে রেখেছে। ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশই সীমান্তে প্রচারণার জন্য শক্তিশালী লাউডস্পিকার ব্যবহার করে আসছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মাইকে জনপ্রিয় কে-পপ গান ও জাতীয় সংবাদ প্রচার করা হতো, যা উত্তর কোরিয়ার অসন্তোষের কারণ ছিল।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর লি জে-মিয়ং আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে গত বছর সীমান্তে লাউডস্পিকারে প্রচার বন্ধ করেন এবং স্পিকারগুলো সরিয়ে ফেলেন। এর জবাবে উত্তর কোরিয়াও প্রচার বন্ধ রেখেছিল। তবে পিয়ংইয়ং আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ২০২৪ সাল থেকেই সীমান্তে স্থায়ী দেয়াল নির্মাণ, মাইন স্থাপন ও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই সেনা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় সিউল উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করলেও পিয়ংইয়ং তা অস্বীকার করে ঘটনাটিকে ‘বানানো গল্প’ বলে দাবি করেছে।
সিউলের কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিম উল-চুলের মতে, কিম ইয়ো জংয়ের হুমকির অর্থ এই নয় যে লাউডস্পিকারগুলো অবিলম্বে চালু হবে। তবে এই হুমকি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের প্রশাসনের সামনে বড় রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বিধা তৈরি করেছে।
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান