ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ১৯ মে, ২০২৬, সময় : ৪:০৯ এএম

যুদ্ধ নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করাকে রোববার নিজেদের ইতিহাসের ‘উজ্জ্বল মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।


যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খানের মূল্যায়নও একই রকম।


তার ভাষায়, “আমার দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনে পাকিস্তানকে এত উঁচু অবস্থানে কখনও দেখিনি।”


পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের অতীত টানতে গিয়ে এই কূটনীতিক বলেন, “২০২২ সালে আমি যখন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ওয়াশিংটনে যাই, তখন পরিস্থিতি ছিল খুব কঠিন। অথচ এখন পাকিস্তান সেই কাজটি করছে, যা করার কথা জাতিসংঘের।”


যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘ড্রপ সাইট’ লিখেছে, ইরান যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হাজির হওয়াটা অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। কিন্তু দেশটি এখন বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে বড় ধরনের ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে।


পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসলেও তেহরান অবশ্য ইসলামাবাদকে খুব একটা ভরসা করে না।


রোববার ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই টুইটারে লেখেন, “পাকিস্তান আমাদের ভালো বন্ধু ও প্রতিবেশী। কিন্তু আলোচনার জন্য উপযুক্ত মধ্যস্থতাকারী নয়। মধ্যস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বাসযোগ্যতাও তাদের নেই।


“তারা সবসময় ট্রাম্পের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলে না।”


পাকিস্তান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভালোবাসার পাত্র হয়ে উঠল, সেই আলোচনায় ‘ড্রপ সাইট’ লিখেছে, এটা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক চাপ ও নানা কৌশলের গল্প। একই সঙ্গে তা পাকিস্তানের রাজনীতিতে দেশটির সামরিক বাহিনীর আধিপত্য ধরে রাখার দক্ষতার প্রমাণও।


ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের কাছে আসার ঘটনাক্রম হিসেবে ২০২২ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া; ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ‘কারচুপি করা’ এবং দেশটির সামরিক শক্তিকে আরো ক্ষমতাবান করার বিষয়গুলো সামনে এনেছে ‘ড্রপ সাইট’।


তবে নতুন এই সম্পর্ক আঞ্চলিক রাজনীতির অবয়বে পরিবর্তনের আশা জাগালেও তা দুর্বল ভিত্তির কারণে ধসে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।


পাকিস্তানকে নিয়ে এখন যেসব প্রশংসা সংবাদমাধ্যমে আসছে, সেগুলোর কারণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে ইরান যুদ্ধে তাদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাকে। কিন্তু এই গল্পের বুনন শুরু হয়েছে অনেক আগেই।


ইসলামাবাদে বার্নস


২০২১ সালের জুনে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ইসলামাবাদ সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা— সিআইএর পরিচালক উইলিয়াম জে. বার্নস।


ওই সময়ের খবর অনুযায়ী, তিনি ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার জন্য পুরো একটা দিন অপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু সেই বৈঠক আর হয়নি।


ইমরান খানের কার্যালয় ফোনে বার্নসকে জানিয়ে দেয়, কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী কেবল তার সমপর্যায়ের নেতার সঙ্গেই কথা বলবেন।


ওই সময় ইমরান খানের সমপর্যায়ের ব্যক্তি ছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, যিনি ওই বছরের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর ইমরান খানের ফোনালাপের অনুরোধ একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।


বাইডেনের এই অস্বীকৃতি ছিল তার আগের প্রশাসনের অবস্থান থেকে অনেকটাই ভিন্ন।


২০১৯ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ইমরান খানকে হোয়াইট হাউজে সংক্ষিপ্ত বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যদিও সেই বৈঠক চলে দেড় ঘণ্টার বেশি।


ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইমরান খানের মধ্যে তখন উষ্ণ সম্পর্ক ছিল। বেশ কিছু বিষয়ে মিলও ছিল তাদের মধ্যে।


দুজনই রাজনীতির বাইরের মানুষ হিসেবে আশি ও নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এছাড়া দুজনই প্রায় একই সময়ে রাজনীতিক পরিচয়ে হাজির হন।


২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্প ও ইমরান খান আবার দেখা করেন। পরের বছরের জানুয়ারিতে তাদের আরেক দফা সাক্ষাৎ হয় হোয়াইট হাউজে।


কিন্তু বাইডেন প্রশাসনের কাছে ইমরান খান ছিলেন ‘পাকিস্তানের ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মাত্র।


দুই দশক ধরে মার্কিন কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আসছিলেন, পাকিস্তান একদিকে তালেবানকে আশ্রয় দেয়, অন্যদিকে উপরে উপরে মিত্রতা দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার সামরিক সহায়তা নেয়।


২০১১ সালে পাকিস্তানের সামরিক একাডেমির শহর অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে। ওই ঘটনার পর পাকিস্তাননের সামরিক বাহিনী বেশ সমালোচনায় পড়ে যায়। কারণ সেই অভিযান চালানো হয় ইসলামাবাদকে না জানিয়েই।


২০২০ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহল বলতে থাকে, ওয়াশিংটনের আফগানিস্তান ছেড়ে দেওয়া এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা উচিত।


ড্রপ সাইট লিখেছে, একই সময়ে সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু ইমরান খানের সরকার সেটি প্রত্যাখ্যান করে।


নীতিগতভাবে ইমরান খানের সরকার ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ— উভয়ের সঙ্গেই একটা কূটনৈতিক সীমারেখা টেনেছিল। কিন্তু ইমরানের খানের এই নীতির কারণে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ভাবতে শুরু করেছিল, দেশটি হয়ত আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।


এমন মনোভাবের কারণেই ২০২১ সালের জুলাইয়ে ইমরানের অজান্তেই পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সিআইএর ইসলামাবাদ স্টেশনের সাবেক প্রধানকে ওয়াশিংটনে লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়।


পাকিস্তানের জেনারেলরা যে নির্বাচিত সরকারের বাইরে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করেছে, এ ঘটনা ছিল তার প্রাথমিক ইঙ্গিত।


‘সবই ক্ষমা করে দেওয়া হবে’


২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ও ইউক্রেইনের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। ওই সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে মোকাবেলা করাই ছিল তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।


মার্কিন কূটনীতিকরা বিভিন্ন দেশকে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন।


রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ ঘিরে বিশ্ব যখন বিভক্ত হতে শুরু করে, তখন পাকিস্তান অপ্রত্যাশিতভাবে নিজেকে এই বিভক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে আবিষ্কার করে।


ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি, যেদিন রুশ বাহিনী ইউক্রেইনে প্রবেশ করে, সেদিন প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত একটি বৈঠক করতে মস্কোতে অবস্থান করছিলেন ইমরান খান।


সেই বৈঠকের কয়েক দিন আগে বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে ফোন করে ইমরান খানকে রাশিয়া সফর বাতিল করার অনুরোধ জানান।


ফাঁস হওয়া সেই ফোনালাপ থেকে জানা যায়, সুলিভান সেদিন ইমরান খানের সফরের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন এবং ইউক্রেইন যুদ্ধে ইসলামাবাদকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইমরান খান সেই সতর্কতা তোয়াক্কা করেননি।


ওই বৈঠকের পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাশিয়ার নিন্দা জানিয়ে আনা একটি প্রস্তাবে পাকিস্তান ভোটদানে বিরত থাকে।


ড্রপ সাইট লিখেছে, সবকিছু মিলিয়ে ক্ষুব্ধ মার্কিন কূটনীতিকরা গোপনে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের এই বার্তা দেন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।


২০২২ সালের ৭ মার্চ ওয়াশিংটনে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর সঙ্গে দেখা করেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খান।


সেই কথোপকথন পরে ফাঁস হয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।


ফাঁস হওয়া সেই কথোপকথন অনুযায়ী, লু সেদিন রাষ্ট্রদূতকে বলেছিলেন, একটি অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে যদি ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে ইমরান খানের সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের ক্ষোভ প্রশমিত করা যাবে, অর্থাৎ ‘সব ক্ষমা করে দেওয়া হবে’ (এই বাক্যটি পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের মুখ থেকে এসেছিল)।


এরপর ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সমর্থনে একটি অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।


সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার ওয়াশিংটনকে এমন সব সুবিধা দিতে থাকে, যা ইমরান খান প্রত্যাখ্যান করেছিল।


কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তান ইউক্রেইনের জন্য কামানের গোলাসহ বিভিন্ন সামরিক রসদ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়।


ফাঁস হওয়া নথিপত্র থেকে জানা যায়, এসব অস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার এবং তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতায় পাঠানো হয়েছিল। পাকিস্তানের এসব রসদ ইউক্রেইনের অস্ত্রের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে।


২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী যখন ব্যাপকভাবে নির্বাচনে কারচুপি করে ইসলামাবাদে পছন্দের সরকার বসায়, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র, কেউই কোনো কথা বলেনি।


পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র


২০২২ সালের ৯ এপ্রিল, যেদিন ইমরান খানের সরকারের পতন ঘটে, সেদিনই একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায় পাকিস্তান। ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল 'শাহীন-৩’। এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।


পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ভারতকে মাথায় রেখে পরিচালিত হয়। কিন্তু সেদিন যে ক্ষেপণাস্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়, সেটি ইসরায়েলেও আঘাত হানতে সক্ষম।


ক্ষেপণাস্ত্রের এই পরীক্ষার সূত্র ধরে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে আবার সামনে আনা হয়।


যে সেনাপ্রধানের হাতে ইমরান খানের পতন ঘটে, সেই কামার জাভেদ বাজওয়ার ২০২২ সালের অক্টোবরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন সফর করেন। সফরটি হয় সেনাপ্রধান হিসেবে তার মেয়াদের শেষ মাসে।


সফরকালে বাজওয়া মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভানসহ বাইডেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।


সেসব বৈঠকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেন, পাকিস্তান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সীমা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, যা ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাবে না।


যুক্তরাষ্ট্রের আরো বেশি সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টায় বাজওয়া এই আশ্বাসও দেন, চীনের কাছ থেকে পাকিস্তান দূরে সরে আসতে চায়।


২০২২ সালের অক্টোবরে দেশে ফেরার পরেই জেনারেল বাজওয়া ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের’ (এসপিডি) প্রধানকে ফোন করেন। এসপিডি মূলত পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র তদারকি করে থাকে।


বাজওয়া ও এসপিডি প্রধানের কথোপকথনের বিবরণ সম্পর্কে জানা যায়, জেনারেল বাজওয়া সেদিন তাকে দেশের কিছু পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন প্রতিনিধিদের পরিদর্শন ও পরীক্ষা করার অনুমতি দেওয়ার নির্দেশ দেন।


পাকিস্তানে এসপিডি প্রধান সরাসরি জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ (জেসিএসসি) কমিটির কাছে জবাবদিহি করেন। এই কমিটি আবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কাজ করে, সেনাপ্রধানের অধীনে নয়।


এই যুক্তি দেখিয়ে এসপিডি প্রধান সেদিন সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করেন। অমান্য করার কারণে এটা স্পষ্ট হয় যে, সামরিক বাহিনীর প্রধান দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন না।


একই মাসের শেষ দিকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একটি বিবৃতি দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, "পাকিস্তান সম্ভবত বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক দেশ। কারণ এই দেশটির কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেও অভ্যন্তরীণভাবে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।"


হুট করে আসা এই বিবৃতি অনেক পর্যবেক্ষককে অবাক করেছিল। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য, এই বিবৃতির সঙ্গে পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার না দেওয়ার সম্পর্ক ছিল।


এই ঘটনার এক মাস পর বাজওয়া পদত্যাগ করেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে তার স্থলাভিষিক্ত হন জেনারেল আসিম মুনির, যিনি ২০২৫ সালে নিজেকে 'ফিল্ড মার্শাল' পদে উন্নীত করেন। নিজের জন্য 'চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস' নামে একটি নতুন পদও তৈরি করেন।


এছাড়া সংবিধানে সংশোধনী এনে জেসিএসসির ভূমিকা বিলুপ্ত করেন তিনি, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি আসিম মুনিরকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও দেয়।


আসিম মুনিরের দ্বিতীয় অধ্যায়


আসিম মুনির হলেন ট্রাম্পের ভাষায় ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’। মুনির নিজেও এই উপাধি বেশ উপভোগ করেন। তবে মুনির যে এমন পদে আসীন হবেন, তা কখনোই হিসাবে ছিল না।


২০১৯ সালের এপ্রিলে মুনির যখন দেশের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন, তখন তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তা এবং ইরানের রেভলুশনারি গার্ড কোরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তেহরান সফর করেছিলেন।


ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মতে, ইরান-পাকিস্তান সীমান্তের বেলুচ অঞ্চলে দীর্ঘদিনের বিদ্রোহ নিয়ে ইরানিদের সঙ্গে বিবাদে জড়ান আসিম মুনির।


কিন্তু বেলুচ অঞ্চলের বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তান ও ইরানের পারস্পরিক সহযোগিতা দুই দেশকে আরো কাছে টানতে পারত। কিন্তু সেটা হতো ইরানকে একঘরে করার মার্কিন পরিকল্পনার পরিপন্থি।


মার্কিন নির্দেশে হোক, কিংবা নিজের সহজাত প্রবৃত্তির কারণে হোক, আসিম মুনির সেই সম্ভাবনা নস্যাৎ করে মার্কিনিদের মস্ত বড় উপকার করেছিলেন।


আসিম মুনিরের এই আচরণ নিয়ে ইরানের কর্মকর্তারা ইমরান খানের কাছে নালিশ জানান। সেই নালিশের জেরেই ২০১৯ সালের জুনে ইমরান খান তাকে সরিয়ে দেন বলে ধারণা করা হয়।


আইএসআই প্রধান হিসেবে আসিম মুনিরই সবচেয়ে কম সময় দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া বাজওয়া তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে যাদের তালিকা করেছিলেন, সেখানে আসিম মুনিরের নামই ছিল না।


ইমরান খান পরে অভিযোগ করেন, চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর মুনির লন্ডনে যান এবং নওয়াজ শরিফের সঙ্গে দেখা করেন।


ইমরান খানের মতে, ওই বৈঠক ছিল সেই ষড়যন্ত্রের সূচনা, যাকে তিনি পরে ‘লন্ডন প্ল্যান’ বলে অভিহিত করেন।


বলা হয়, ওই পরিকল্পনাটি ছিল আসিম মুনির, নওয়াজ শরিফ এবং পাকিস্তানের উচ্চ আদালতের কিছু বিচারপতির মধ্যকার একটি সমঝোতা, যার অধীনে ইমরান খানের সরকার ও তার দলকে ধ্বংস করার বিনিময়ে আসিম মুনিরকে সেনাপ্রধানের পদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।


২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর আসিম মুনিরকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কয়েক মাসের মাথায় ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দুর্নীতি, আদালত অবমাননা ও জাতীয় নিরাপত্তার একগুচ্ছ মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়।


২০২৩ সালের অক্টোবরে নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানে ফিরে আসেন এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার দণ্ড বাতিল হয়ে যায়।


২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে তার ছোট ভাই শেহবাজ শরিফ আবারও প্রধানমন্ত্রী হন এবং আসিম মুনির হয়ে যান দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ইমরান খান এখনো কারাগারেই আছেন।


চীনকে ঠেকানো


গত দশকের প্রায় পুরোটা সময় পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সুসম্পর্ক ছিল। বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প হিসেবে ২০১৫ সালে চালু হয় ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’।


এই প্রকল্পের মাধ্যমে পাকিস্তানে শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ এসেছিল, যারা কিনা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে হিমশিম খাচ্ছিল।


ইসলামাবাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সম্পর্ককে কখনো কখনো ‘সবচেয়ে গভীর সমুদ্রের চেয়েও গভীর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।


আসিম মুনিরের অধীনে সেই সম্পর্ক প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।


চীনের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে যে ৯০টি প্রকল্প ছিল, তার মধ্যে মাত্র ৩৮টি সম্পন্ন হয়েছে। ২৩টি এখনো নির্মাণাধীন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাজই শুরু হয়নি।


কাজ শেষ হওয়া সর্বশেষ বড় প্রকল্প ছিল ‘গোয়াদার ইস্ট বে এক্সপ্রেসওয়ে’। এটি শেষ হয় ২০২২ সালে। এরপর থেকে পাইপলাইনে নতুন কোনো বড় প্রকল্প যুক্ত হয়নি।


নতুন অর্থায়নের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে চীন সফর করার পর প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ খালি হাতে বেইজিং ছাড়েন।


চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বকেয়া পরিশোধ না করায় পাকিস্তানের দেনা আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে, যা দুই দেশের দ্বন্দের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


পর্দার আড়ালের সম্পর্ক ছিল আরও শীতল। পাকিস্তান বেইজিংকে গোপনে আশ্বস্ত করেছিল যে, তারা চীনকে গোয়াদারের গভীর সমুদ্র বন্দরে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বানানোর অনুমতি দেবে। সেই ঘাঁটির বিনিময়ে বেইজিংয়ের কাছে একগুচ্ছ দাবি তুলে ধরে পাকিস্তান।


তারা চীনের কাছে দাবি করে, এই অনুমোদনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রতিশোধ হিসেবে কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেয়, তবে চীন যেন তার ক্ষতিপূরণ বা সুরক্ষা দেয়।


তারা ভারতের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতায় পাল্লা দিতে চীনের সহায়তাও চান। সবচেয়ে বড় দাবি ছিল, তারা বেইজিংয়ের কাছে পাকিস্তানের জন্য একটি সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক 'সেকেন্ড-স্ট্রাইক' সক্ষমতা অর্জনের দাবি তুলেছিল। তবে চীন তাতে রাজি হয়নি।


ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের বিষয়ে ২০২৫ সালের অগাস্টে এক সাক্ষাৎকারে আসিম মুনির বলেছিলেন, "আমরা এক বন্ধুকে অন্য বন্ধুর জন্য কোরবানি দেব না।"


তবে নিজেদের স্বার্থে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত ঠিক সেটাই করেছে।


জোটের জাল


২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে পাকিস্তান। তিন বছর আগে ইমরান খানের সরকার এই চুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।


অন্যদিকে পাকিস্তানের নতুন সামরিক নেতৃত্বাধীন সরকার নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে তৎপর হয়ে ওঠে।


ট্রাম্প পরিবার যখন ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবসায় নামে, ইসলামাবাদও তা অনুসরণ করে ‘পাকিস্তান ক্রিপ্টো কাউন্সিল’ গঠন করে।


এই কাউন্সিল গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্প পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্স’ এর শীর্ষ কর্তারা ইসলামাবাদে যান।


২০২৪ সালের ২৬ এপ্রিল পাকিস্তানে পা রাখা সেই প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ওয়ার্ল্ড লিবার্টির প্রধান নির্বাহী এবং স্টিভ উইটকফের ছেলে জ্যাচ উইটকফ এবং এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জাক ফোকম্যান ও চেজ হিরো।


সফরের শেষ দিকে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের উপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এই স্মারকের মাধ্যমে পাকিস্তান তার বার্ষিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের একটি অংশ ট্রাম্প পরিবারের মালিকানাধীন ফার্মের মাধ্যমে লেনদেন করার প্রতিশ্রুতি দেয়।


যখন চীনের ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মার্কিন নির্ভরতা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছিল, পাকিস্তান তখন মার্কিন অংশীদারদের সঙ্গে একটি ‘বিরল খনিজ’ চুক্তি ঘোষণা করে।


২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের সেই চুক্তিটি হয় সামরিক বাহিনী পরিচালিত ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন এবং মিসৌরি-ভিত্তিক ফার্ম ‘ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালস’-এর মধ্যে।


এই চুক্তির অধীনে, পাকিস্তানি অ্যান্টিমনি, তামা, টংস্টেন এবং বিরল খনিজ উপাদানের বিনিময়ে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসে।


এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন যখন গাজায় তার প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বাহিনীর জন্য একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সন্ধান করছিল, তখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী স্বেচ্ছায় সেখানে সেনা পাঠানোর প্রস্তাব দেয়।


ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পুরোটা সময় পাকিস্তান প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টায় তারা প্রতিশ্রুতি অনেক দিয়েছে, বাস্তবায়ন করেছে খুবই কম।


ইসলামাবাদ থেকে অনবরত প্রচার চালানো হলেও ইরান যুদ্ধের শান্তি আলোচনা অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে।


ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা থেকে বাদ দিতে ট্রাম্প প্রশাসনকে চাপ দেওয়া শুরু করেছে।


তবে ট্রাম্প এখনো পাকিস্তান নিয়ে বিরক্ত নন। সম্প্রতি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “তারা চমৎকার। আমি মনে করি পাকিস্তানিরা দারুণ কাজ করেছে। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল এবং প্রধানমন্ত্রী এক কথায় অসাধারণ।”



সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ৩:১৩ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান তিনটি সংবাদমাধ্যমকে হোয়াইট হাউস থেকে কার্যক্রম চালাতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প এ-সংক্রান্ত একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞায় পড়া তিনটি সংবাদমাধ্যম হলো-সিএনএন, পলিটিকো এবং এমএস নাও।


হোয়াইট হাউসের এ নিষেধাজ্ঞাকে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর ট্রাম্পের আঘাতের সর্বশেষ নজির বলে মনে করছেন অনেকেই।


এ তিনটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ভুয়া খবর প্রচারের অভিযোগ তুলেছেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে নিয়ে লেখা বা প্রতিবেদন করার সময় তাদের ক্রমাগত মিথ্যা ও মনগড়া লেখার সুযোগ থাকা উচিত নয়।’


ট্রাম্প আরও লেখেন, ‘ভুয়া খবর প্রচার করা অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের তালিকাও আসছে।’


ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ট্রাম্প জানান, নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নয়; বরং গত কয়েক বছরে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলোর কারণে তিনি তিনটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।


হোয়াইট হাউসকে ‘জনগণের বাড়ি’ বলেও উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘জনগণের বাড়িতে তাদের (ওই সংবাদমাধ্যমগুলোকে) ঢুকতে দিতে হবে-এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’


এ সময় ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ভুয়া খবর প্রচার করা অন্যান্য সংবাদমাধ্যম কোনগুলো। তখন ট্রাম্প ওয়াশিংটন পোস্ট আর নিউইয়র্ক টাইমসের নাম উল্লেখ করেন। ভবিষ্যতে এসব সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি। ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, সেটা প্রায় নিশ্চিত। 


কেননা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পদক্ষেপ মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ওই সংশোধনী নাগরিকদের মতপ্রকাশের এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের অধিকার নিশ্চিত করেছে।


কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির নাইট ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক জামেল জেফার এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অসাংবিধানিক। কেননা সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীন হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল একটি ‘পাবলিক ফোরাম’ হিসেবে বিবেচিত। তাই কোনো সাংবাদিকের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে সেখান থেকে বাদ দেওয়ার এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের নেই।


ট্রাম্পের এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও গতকাল বিকেলে ওই তিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের হোয়াইট হাউস থেকে দায়িত্ব পালন করে যেতে দেখা গেছে। এক বিবৃতিতে সিএনএন জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা সাংবাদিকদের পাশে রয়েছে তারা।


সংবাদমাধ্যটি বিবৃতিতে আরও জানায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, সরকারের কোনো ধরনের বাধা বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই সংবাদ সংগ্রহের অধিকার আমাদের আছে। এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন, তা কার্যকর করা হলে সেটি হবে এ মৌলিক ও সংবিধানে সুরক্ষিত অধিকারের ওপর বেআইনি আঘাত।’


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে পলিটিকো বলেছে, তারা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা চালিয়ে যাবে এবং সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর আওতাধীন অধিকার জোরালোভাবে রক্ষায় লড়াই করবে।


সংবাদমাধ্যমটি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন এবং ভবিষ্যতের যেকোনো প্রশাসনের বিষয়ে এখনকার মতো নিরপেক্ষভাবে সংবাদ প্রকাশ করে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর এমএস নাও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

সর্বশেষ সব খবর

জাতিসংঘের লোগো

  • প্রকাশ : শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১২:৪৭ পিএম

জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনকে সামনে রেখে নিউইয়র্কে জড়ো হচ্ছেন বিশ্বনেতারা। ইতিমধ্যে সংস্থাটির পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। নতুন নেতা বাছাইয়ে গতকাল শুক্রবার তৃতীয় দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটি করেছে নিরাপত্তা পরিষদ। 


তবে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা এ গোপন ভোটেও কোনো প্রার্থী স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে যেতে পারেননি। নিরাপত্তা পরিষদের এ ভোটাভুটির আনুষ্ঠানিক কোনো ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। বৈঠক শেষে পরিষদের বর্তমান সভাপতি ও জাতিসংঘে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জেরোম বোনাফন্ট শুধু জানান, তৃতীয় দফার খসড়া ভোটাভুটি সম্পন্ন হয়েছে।


বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে এখন আট প্রার্থী লড়ছেন। তবে প্রথম দুই দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটেও কোনো একক প্রার্থী স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে পারেননি।


নানা সংকটে থাকা জাতিসংঘে এবার একজন নারী মহাসচিব দেখতে চায় নিরাপত্তা পরিষদের কয়েকটি সদস্যদেশ। ইতিমধ্যে তারা নিজেদের এ পছন্দের কথা প্রকাশ করেছে।


দ্বিতীয় দফার গোপন ভোটে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রদ্রিগেজ-বার্কেট। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান। আর জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি ছিলেন তৃতীয় স্থানে।


মহাসচিব পদের অন্য প্রার্থীরা হলেন সেনেগালের ম্যাকি স্যাল, ইকুয়েডরের ইভন এ-বাকি ও মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা, চিলির মিশেল ব্যাসেলেট এবং উগান্ডার ওলারা ওতুন্নু।


নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী পাঁচ সদস্য হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়া। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে, ক্ষমতাধর এ পাঁচ দেশের সমঝোতায় শেষ মুহূর্তে হুট করে নতুন কোনো সমঝোতার প্রার্থীকে দৃশ্যপটে নিয়ে আসা হতে পারে।


বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কূটনীতিক বলেন, ‘যদি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এমন কিছু ঘটে, তবে সেটি বড় সংকট তৈরি করবে।’


মহাসচিব হতে হলে একজন প্রার্থীকে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে অন্তত ৯টি ভোট পেতে হয়। একই সঙ্গে স্থায়ী পাঁচ পরাশক্তির কারও ভেটো পাওয়া যাবে না। অথচ বর্তমানে এ পাঁচ পরাশক্তির মধ্যে গভীর বিভক্তি ও মতবিরোধ রয়েছে। কোনো প্রার্থী নিরাপত্তা পরিষদের এ বাধা পার হতে পারলে চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য তাঁর নাম পাঠানো হবে জাতিসংঘের সব সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত সাধারণ পরিষদে।


নির্দিষ্ট কোনো পছন্দের প্রার্থীর নাম উল্লেখ না করে বৃহস্পতিবার বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রার্থীদের অবশ্যই জাতিসংঘকে মূল লক্ষ্যে ফিরিয়ে নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।


ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘অযৌক্তিক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও তথাকথিত “ওক” (অতিসচেতন প্রগতিশীল) মতাদর্শ সংস্থাটির কার্যকারিতা নষ্ট করেছে। নতুন মহাসচিবকে অবশ্যই এসব বাদ দিয়ে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্বে জাতিসংঘকে ফিরিয়ে আনতে হবে।’


ভোটাভুটিতে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য গোপন ব্যালটে প্রার্থীদের মূল্যায়ন করে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যালটে তিনটি বিকল্প থাকে। এগুলো হলো ‘উৎসাহিত করা’, ‘নিরুৎসাহিত করা’ অথবা ‘মতামত নেই’।


কয়েক দফা অনানুষ্ঠানিক ভোটের পর স্থায়ী পাঁচ সদস্যকে ভিন্ন রঙের ব্যালট দেওয়া হবে। তবে ঠিক কত দফা পর তা দেওয়া হবে, তা নির্দিষ্ট নয়। ফলে বোঝা যাবে কোনো স্থায়ী সদস্য ভেটো দিয়েছে কি না। তবে কোন দেশ ভেটো দিয়েছে, তা জানা যাবে না।

বিষয় :

সর্বশেষ সব খবর

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১০:০৭ পিএম

একই দিনে একের পর এক ধাক্কা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে এরকম শুক্রবার আগে এসেছে কিনা সন্দেহ। আগেই ভেঙে খান খান হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। এবার পশ্চিমবঙ্গের দুই বিধানসভা উপ-নির্বাচনের আগে খোয়ালেন দলীয় নাম ও প্রতীক। 


অন্যদিকে, নমিনেশন জমা দেওয়ার সময় সীমা শেষ হওয়ার পর নন্দীগ্রামের মত হেভিওয়েট আসন থেকে নমিনেশন তুলে নিলেন মমতার প্রার্থী। আবার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তড়িঘড়ি করে কংগ্রেসকে সমর্থন জানালেন মমতা। এক ঘণ্টার মধ্যে খুনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হলো নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থীকে।


দলের নতুন নাম


মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের নতুন নাম হলো ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’। তাদের প্রতীক ‘ফুটবলার’। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের নাম হলো ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’। প্রতীক হলো ‘খাম’। পশ্চিমবঙ্গের দুই বিধানসভা আসনে উপনির্বাচনের আগে প্রতীক যুদ্ধে ইতি টেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের এমনই অন্তর্বর্তী নাম ও প্রতীক চূড়ান্ত করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।


আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের উপনির্বাচনে মমতা ও ঋতব্রত শিবিরের প্রার্থীদের এই প্রতীক এবং এই দলের নামেই নির্বাচনে লড়াই করতে হবে। আজ শুক্রবার দুপুরে বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।


বিধানসভা উপনির্বাচনের লড়াই করার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের বিবাদমান দুই গোষ্ঠীই নতুন দলের নাম ও প্রতীকের জন্য নিজেদের পছন্দের তালিকা নির্ধারিত সময় আজ শুক্রবার সকাল ১১টার মধ্যে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়। সূত্রের খবর, এর আগে গতকাল দিবাগত রাত ১২টার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী দলের নাম ও প্রতীকের জন্য তিনটি করে বিকল্প জমা দেয়। অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী আজ শুক্রবার সকালে তাদের পছন্দের তালিকা পাঠায়।


পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া তৃণমূল কংগ্রেসে দলের নাম ও নাম প্রতীকের দখল নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ভারতের নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তী নির্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে গড়া দল ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং দলের ‘জোড়াফুল’ প্রতীক আপাতত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে দুই গোষ্ঠীই ওই নাম বা প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। 


এদিকে, আগামী ৬ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের দুই বিধানসভার উপনির্বাচন। যেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক চেয়ে আবেদন করেছে দুই পক্ষের চারজন প্রার্থী। এমন অবস্থায় নির্বাচন কমিশনে দুই পক্ষের শুনানি চলমান অবস্থায় থাকায় সাক্ষ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারছিল না কমিশন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক স্থগিত করে। আজ শুক্রবার সকাল ১১টা ছিল নতুন নাম ও প্রতীক কমিশনে জমা করার জন্য শেষ সময়। 


নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনে কালীঘাটের পক্ষ থেকে যে তিনটি নাম পাঠানো হয়েছিল সেগুলো হলো- ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’, ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস মমতা’ ও ‘তৃণমূল মমতা কংগ্রেস’।


প্রতীক চাওয়া হয়েছিল খেলারত ফুটবল খেলোয়াড় (কমিশনের তালিকায় ৬৫ নম্বর), আর একটি ক্রিকেট ব্যাট (তালিকায় ৮ নম্বর)। 


অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের কাছে বিকল্প হিসেবে দলের তিনটি নাম ও প্রতীক পাঠিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির। তারা দলের নাম চেয়েছে ‘ন্যাশনালিস্ট তৃণমূল কংগ্রেস’, ‘ওয়েস্টবেঙ্গল তৃণমূল কংগ্রেস’ও ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’—এই তিন নামের কোনো একটি। পাশাপাশি আবেদন জানানো হয়েছিল খাম, টর্চ ও ব্ল্যাকবোর্ড প্রতীকের জন্য। দুই তরফেই নতুন নাম ও প্রতীকের আবেদনে সাড়া পাওয়ার পরও আজ শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে নাম ও প্রতীক চূড়ান্ত করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কমিশন। 


২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর দলীয় বিবাদের জেরে প্রথমবার দলীয় নাম ও প্রতীক ছাড়াই নির্বাচনী ময়দানে নামতে চলেছে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠী।


দলীয় প্রতীক খাম নিয়ে অভিযোগ


এদিকে ঋতব্রতপন্থি ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’কে নির্বাচন কমিশন প্রতীক চিহ্ন হিসেবে খাম অনুমোদন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছে আইএসএফ (ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট)। আইএসএফ’র প্রতীকও খাম, নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়েছেন আইএসএফ প্রার্থী। কী হবে আইএসএফ প্রার্থীর প্রতীক ভবিষ্যৎ?— এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। হাতছাড়া হতে পারে পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী ও বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর দল ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) অত্যন্ত পরিচিত প্রতীক ‘খাম’।


মনোনয়নপর্ব শেষ হওয়ার পর প্রার্থী প্রত্যাহার মমতার


দলের নাম প্রতীক খাওয়ানোর পর আবারও চূড়ান্ত ধাক্কা খেলেন মমতা। যে বিধানসভা উপনির্বাচনে লড়াই করার জন্য নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী নাম ও প্রতীক নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; সেই নির্বাচন থেকেই সরে দাঁড়ালেন মমতার প্রার্থী। 


পশ্চিমবঙ্গের হাইভোল্টেজ কেন্দ্র শুভেন্দুর ছেড়ে আসা নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের উপনির্বাচনের লড়াই থেকেই সরে দাঁড়ালেন মমতা সর্বভারতীয় তৃণুমল কংগ্রেসের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে। এমন সময় সঞ্চিতা প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেছেন; যখন মনোনয়নপর্ব শেষ হয়ে গেছে। 


গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করে ‘আশীর্বাদ’ চেয়েছিলেন তিনি। ময়দানের পূর্ত দপ্তরের ছাউনিতে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির ভোট পরিচালক শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেন সঞ্চিতা। সঙ্গে ছিলেন তার স্বামী সত্যজিৎ প্রধানও। এরপরেই তীব্র কল্পনা-জল্পনা শুরু হয়। 


যদিও সঞ্চিতা সে সময় বলেছিলেন, ‘শুভেন্দু নন্দীগ্রামের পুরোনো বিধায়ক এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তাই তার কাছে এসে দেখা করেছেন। কিন্তু আজ শুক্রবার বিকেলে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। ফলে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসে’র আর কোনো প্রার্থী থাকলো না।


নন্দীগ্রাম আসনে কালীঘাট শিবিরের প্রার্থী হিসেবে গত ১৩ সেপ্টেম্বর সঞ্চিতার নাম ঘোষণা হয়েছিল। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবিরও এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে মহম্মদ এতেশামুল হককে। ফলে একই দলের দুই গোষ্ঠীর দুই প্রার্থীকে ঘিরে নন্দীগ্রামের লড়াই এমনিতেই আলাদা মাত্রা পেয়েছিল। তবে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ শুক্রবার বিকেলে যেভাবে ভোটের লড়াই থেকে মমতার প্রার্থী নন্দীগ্রামের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ালেন; তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে ৷


প্রসঙ্গত, নন্দীগ্রামে বিজেপি ইতিমধ্যেই প্রার্থী করেছে হাসিরানি রথকে। তিনি প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মা। চন্দ্রনাথ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ফলে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে বিজেপির প্রচারে আবেগের একটি মাত্রাও যুক্ত হয়েছে। আপাতত ৬ অক্টোবরের ভোটকে সামনে রেখে প্রচার শুরু করেছে সব দল।


কংগ্রেসকে সমর্থনের বার্তা মমতার


মমতার নিজের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর কালীঘাটের বাড়িতে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘নন্দীগ্রামে আমরা লড়ব না, সিস্টার পার্টি কংগ্রেসকে সমর্থন করছি। তাতে ইন্ডিয়া জোটকে শক্তিশালী করা হবে।’ অর্থাৎ, আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করছে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’। রেজিনগর কেন্দ্রের উপনির্বাচনে কি লড়বেন মমতা? নাকি সেখানেও অন্য কাউকে সমর্থন দেবেন? তা নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানালেন পশ্চিমবঙ্গের এই নেত্রী।


কংগ্রেস প্রার্থীকে গ্রেপ্তার 


এদিকে মমতা কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন জানানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে। নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনে বিধানসভার কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন মিলন প্রধান। দাবি করেছিলেন, সম্প্রতি প্রচার কাজ শুরু করবেন। সূত্রের খবর, আজ দুপুর থেকে অনেকক্ষণ ধরেই তাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীকালে জেলা পুলিশ জানিয়েছে, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আগামীকাল শনিবার হলদিয়া মহকুমা আদালতে তোলা হবে। পুরোনো একটি খুনের মামলায় তার নামে ওয়ারেন্ট ছিল—এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে কলকাতা পুলিশ।


দিনভর ঘটনাপ্রবাহ প্রসঙ্গে যা বললেন মমতা, ঋতব্রত, শুভেন্দু ও অধীর


এদিকে দলের নাম এবং প্রতীক হারানোর পর সংবাদ সম্মেলন করে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের দিকে আঙুল তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার স্পষ্ট অভিযোগ, উপনির্বাচনের জন্য প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়ে দিয়েছিল, প্রত্যাহারের সময়সীমার একদিন আগে এইভাবে দলীয় নাম আর প্রতীক স্থগিত করে দেওয়া বেআইনি। মমতার সাফ কথা, ‘'আজ গণতন্ত্রের কালো অধ্যায়। অগণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যদিও এটা অন্তর্বর্তী নির্দেশ, তবুও আমরা মাথা নত করব না।’


মমতার প্রশ্ন— ‘২৮ বছরের দলের প্রতীক এভাবে কীভাবে ছিনিয়ে নেওয়া যেতে পারে? দলের অ্যাকাউন্টও ফ্রিজ করে দিয়েছে। এখানে অনেক বেনামি রাজনৈতিক দল আছে, তাদের প্রতীক তো নিচ্ছে না। তৃণমূল নেত্রী পরিষ্কার জানিয়েছেন, ‘প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আমরা একদম তৃণমূল থেকেই দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন করি। আমাদের সব সাংগঠনিক নির্বাচন আমরা করেছি। তার রেকর্ড আছে, কমিশনকেও সব রেকর্ড দেওয়া আছে। তাও এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এটা ঠিক নয়।’ কমিশনকে নিশানা করে তার বক্তব্য, মধ্যরাতে গণতন্ত্র হত্যা করা হয়েছে।


অন্যদিকে, বিধানসভায় সংবাদ সম্মেলন করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন আমাদের তৃতীয় বিকল্প নামটি দিয়েছে। প্রতীকে প্রথম চয়েস খাম চেয়েছিলাম। সেটা পেয়েছি। নির্বাচন কমিশনের যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। অন্যপক্ষ যে নাম পেয়েছে সেখানে ব্যক্তি গুরুত্ব পেয়েছে। আমরা জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা গণতন্ত্রকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছি। রাজনীতিতে মালিকানা হয় না। জোড়াফুল থেকে ফুটবল; এটা ওনারাই বলতে পারবে। যুবভারতীর সামনে থেকে গলাকাটা ফুটবলটা সরে গেছে বলে হয়তো ওনারা ফুটবল দিয়েছে।’


পুরো ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমার আর এই নিয়ে বলার কিছু নেই। এটা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত। নির্বাচন কমিশন নিয়ম মেনে সব পক্ষের কথা শুনে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উনি নিজের দলকে এক রাখতে পারেননি, দুই, তিন, চার ভাগ হয়েছে দল। এর দায়-দায়িত্ব ওনার। এর সঙ্গে আমাদের বিজেপির সরাসরি রোল নেই। তবে আমি একটা কথা বলি, নির্বাচনের গণনার দিন হলদিয়ায় বলেছিলাম। আর যেই থাকুক, এনারা থাকবেন না। তার কারণ, অতি দর্পে হত লঙ্কা। দম্ভ যার হবে সেই দম্ভে সে চূর্ণ হবে। কারণ, হিন্দু ধর্মকে গন্ধা ধর্ম বলা। মহা কুম্ভকে মৃত্যু কুম্ভ বলা হয়। রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার দিনে রাম মন্দির মানি না বলে মিছিল করা। ভগবান পুরুষোত্তম মহারাজ রামচন্দ্রের অভিশাপে সব ধ্বংস হয়ে গেছে।’


মিলন প্রধানের গ্রেপ্তার নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার করার অর্থ, কংগ্রেস প্রার্থীকে ভয় পাচ্ছে বিজেপি। গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে বিজেপি প্রমাণ করে দিল, তারা নৈতিকভাবে পরাজিত।’

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ৮:৪৩ পিএম

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের কোহাটে মসজিদের কাছে বোমা হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫০ জনের বেশি। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের সময় পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে এ হামলা হয়। খবর আলজাজিরার।


কোহাটের জেলা সদর হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার পর হাসপাতালে ১৬টি মরদেহ এবং ৫০ জনের বেশি আহত ব্যক্তিকে নেওয়া হয়েছে। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।


খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশপ্রধান জুলফিকার হামিদ জানান, বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ি পুরোনো পুলিশ লাইনসের ফটকে ধাক্কা দেওয়ার পর বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে গোলাগুলিও শুরু হয়।


পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের বন্দুকযুদ্ধের সময় স্পেশাল ব্রাঞ্চ ভবনের কাছেও আরেকটি আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটে বলে জানান তিনি।


আইজি হামিদ বলেন, পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এখন পর্যন্ত তিন হামলাকারী নিহত হয়েছেন। তবে হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বীকার করেনি।


পুলিশপ্রধান বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশ ‘লোহার দেয়ালের মতো’ দাঁড়িয়ে আছে। এ ধরনের হামলা পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভেঙে দিতে পারবে না।


তিনি আরও বলেন, নিহতদের রক্ত বৃথা যাবে না। হামলাকারী ও তাদের সহযোগীদের এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।


এদিকে বিস্ফোরণে মসজিদের বাইরের অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি দেয়ালও ধসে পড়েছে। ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চলছে। হামলার পর কোহাট-হাঙ্গু সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।


আহতদের চিকিৎসায় কোহাটের জেলা সদর হাসপাতালে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে অন্তত ২৫ জন আহতকে চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছে।


কেন্দ্রীয় পুলিশ কার্যালয় জানিয়েছে, কোহাটের আঞ্চলিক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে ঘটনার প্রতিবেদন চেয়েছেন আইজি হামিদ। বিস্ফোরণের ধরন ও হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।


জুমার নামাজের সময় পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে এ হামলার ঘটনায় কোহাটজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।


সূত্র : আলজাজিরা ও জিউ নিউজ

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ৩:৪২ পিএম

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের লাগাম টানতে তেহরানের কাছে সহায়তা চেয়েছে চীন। সৌদি আরব গত এক সপ্তাহে ইরান–সমর্থিত এই গোষ্ঠীর সামরিক অগ্রযাত্রার পর বেইজিংয়ের কাছে সাহায্য চেয়েছিল। এরপরই চীন একান্তে তেহরানের কাছে এ অনুরোধ জানায়। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি ইরানি সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।


সূত্রগুলো জানায়, লোহিত সাগর উপকূল ও বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে হুতিরা দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। এতে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সহায়তার জন্য চীনের দ্বারস্থ হয় রিয়াদ।


চীন প্রকাশ্যে সংযম, সংলাপ ও নৌপথে নিরাপদ চলাচল ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে। তবে তেহরানকে একান্তে দেওয়া বার্তায় এর চেয়ে আরও বেশি কিছু বলা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।


বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বেইজিং চায় না জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ুক। এ কারণে হুতিদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে তেহরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে চীন।


আলোচনার বিষয়ে অবহিত সূত্রগুলো পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছে। তবে বার্তাটি ঠিক কীভাবে তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছিল, সে বিষয়ে তারা কোনো তথ্য দেয়নি। গত বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির চীন সফরের সময় বার্তাটি দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।


সূত্রগুলো জানিয়েছে, চীনের এই বার্তার জবাবে তেহরান বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ না হলে এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরবে না।


তিনটি ইরানি সূত্র জানায়, চীনা কর্মকর্তারা তেহরানকে সরাসরি কোনো হুমকি দেননি। হুতিদের ওপর প্রভাব খাটাতে ব্যর্থ হলে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ দেওয়া হবে, এমন কোনো ইঙ্গিতও বেইজিং দেয়নি।


এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, চীন চায় না আঞ্চলিক উত্তেজনা ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে আরও ছড়িয়ে পড়ুক। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বেড়ে গেলে তাতে কোনো পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা হবে না।


মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান জানাতে হবে। মানুষের জীবন–জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, এমন পদক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে আলোচনা–সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিয়েছে দেশটি।


এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পায়নি রয়টার্স।


বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি


এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতাও চীন।


পণ্যবাজারের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। এর পরিমাণ ছিল দিনে গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।


এ বিষয়ে অঞ্চলটিতে দায়িত্বরত এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, হুতিদের লাগাম টানতে ইরানের ওপর চাপ দিতে পারে, বিশ্বে এমন দেশের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে এই হাতে গোনা দেশগুলোর মধ্যে চীন অন্যতম।


সৌদি আরবের সুন্নি প্রভাবের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনে হুতি গোষ্ঠীটির উত্থান ঘটে। ইরানি সূত্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর মতে, হুতিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থ দিয়ে থাকে ইরান। হুতিরা বর্তমানে তেহরানের পশ্চিমা ও ইসরায়েলবিরোধী ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ।


ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে হুতিদের যেকোনো হুমকি সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে তা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়বে।


হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরের জাহাজ বা বন্দরে হুতিদের অব্যাহত হামলা মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান তেল রপ্তানি পথকে একই সময়ে ব্যাহত করতে পারে। এতে জ্বালানিসংকট আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিস্তৃত সংঘাতে নতুন একটি ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।


একটি সূত্র বলেছে, ইরান ও তার মিত্ররা এখন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের দুই প্রান্তেই চাপ সৃষ্টি করছে। আর চীন দুটি নৌপথের ওপরই নির্ভরশীল।


ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, বেইজিং হয়তো ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের চাপের বিরোধিতা করবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের স্বার্থ ইরানের বাইরেও বিস্তৃত। চীনের তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে এ অঞ্চল থেকে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার।


ভাতানকা বলেন, ‘ইরান হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু একপর্যায়ে এ সক্ষমতা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা ইরান যে শক্তির ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করছে, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’


চীনের দোটানা


তিনটি ইরানি সূত্র জানিয়েছে, বেইজিংয়ের উদ্বেগের বিষয়ে তেহরান কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।


সূত্রগুলো বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে থাকা ইরানের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।


যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। দেশটির তেলশিল্প টিকিয়ে রাখতে, অর্থনৈতিক চাপ কমাতে যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা থাকা হাতে গোনা কয়েকটি দেশের একটি চীন।


বেইজিং তার কূটনৈতিক প্রভাবও দেখিয়েছে। বহু বছরের বৈরিতার পর ২০২৩ সালে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতা করেছিল চীন।


তবে সে প্রভাবেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০২১ সালে চীন ও ইরান ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তি সই করে। এরপর তেলবহির্ভূত খাতে চীনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় ইরানের ভেতরে সমালোচনা হয়েছে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির তুলনায় ইরানে এ বাণিজ্য–বিনিয়োগের পরিমাণ কম।


চীন এমন একটি পক্ষ, যাকে তেহরান উপেক্ষা করতে পারে না। তবে দুটি ইরানি সূত্র বলেছে, তেহরানের কাছে বেইজিংয়ের স্বার্থ অনেকগুলো বিবেচনার মধ্যে একটি মাত্র। ইরানের সিদ্ধান্ত কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নেওয়া হয়।


পশ্চিমা সেই কূটনীতিক বলেন, তেহরান ও বেইজিংয়ের একে অপরকে প্রয়োজন। চীন এমন একটি পক্ষ, যাকে তেহরান উপেক্ষা করতে পারে না। আর বেইজিং চায়, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হোক, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল নিরাপদ থাকুক।


বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন তার দাবির সঙ্গে বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের ওপর নিজের প্রভাব খাটাতে চীন সত্যিই প্রস্তুত, এর প্রমাণ পাওয়া গেলে বেইজিংয়ের দৃঢ় অবস্থানের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলবে।

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ২:৩২ পিএম

দিল্লিতে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর ছুরিকাঘাতে হত্যা করে মরদেহ খোলা মাঠে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চারজনের বিরুদ্ধে। অভিযুক্তদের মধ্যে তিনজনই অপ্রাপ্তবয়স্ক। কয়েক দিন পর পচে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারের সময় তার শরীরের কিছু অংশ কুকুরে খেয়ে ফেলেছিল। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও রাতভর অভিযানের পর চার সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ।


ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, দিল্লিতে ১৭ বছর বয়সী ওই চারজনে ধর্ষণ করে। পরে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। পরে মরদেহ একটি খোলা মাঠে ফেলে দেওয়া হয়। সেখানে মরদেহের কিছু অংশ কুকুরে খেয়েও ফেলে। পুলিশ জানিয়েছে, ধর্ষণ ও হত্যার কয়েক দিন পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর পচে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারের পর ভয়াবহ এই ঘটনা সামনে আসে।


পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহ এতটাই পচে গিয়েছিল যে, প্রথমে সেটি নারী নাকি পুরুষের, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই কিশোরী ও অভিযুক্তরা পরস্পরের পরিচিত ছিল। ঘটনার সময় সে তাদের সঙ্গে একটি টেম্পোতে করে যাচ্ছিল। অভিযোগ, টেম্পোর ভেতর তারা একসঙ্গে মদ পান করে। এরপর কিশোরীকে যৌন নির্যাতন করা হয় এবং ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়।


পুলিশ জানায়, ১৩ সেপ্টেম্বর মধ্য দিল্লির কুশাক রোডে জয়পাল রানার মাঠের কাছে কিশোরীর পচে যাওয়া মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহের কিছু অংশও কুকুরে খেয়ে ফেলেছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার একটি হাত মরদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়।


কিশোরীর পরিবার তার নিখোঁজ হওয়ার কোনো অভিযোগ করেনি। পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের সদস্যরা তাদের বলেন, ওই কিশোরী প্রায়ই বাড়ি থেকে বের হয়ে কয়েক দিন পর আবার ফিরে আসত।


এ ঘটনায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং শিশু নির্যাতন আইন পকসোর প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি এবং শুরুতে অভিযুক্তদের পরিচয়ও জানা ছিল না। এ কারণে পুলিশ দল ওই এলাকা ও আশপাশের রুটের ৫০ টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে।


ফুটেজ বিশ্লেষণের সময় ঘটনার সম্ভাব্য সময়ের কাছাকাছি একটি টেম্পোকে ঘটনাস্থলের আশপাশ দিয়ে যেতে দেখা যায়। অন্ধকারের কারণে টেম্পোটির নম্বর স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। এরপর তদন্তকারীরা একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ অনুসরণ করে টেম্পোটির চলাচলের গতিপথ শনাক্ত করার চেষ্টা করেন।


গত ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে রাতভর অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন টেম্পোটির সন্ধান পাওয়া যায়। এর চালককে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর তদন্তে ওই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে চারজনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ক।


পুলিশ জানিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক অভিযুক্তের নাম শিবম ওরফে সুদামা ওরফে চুচু। সে খাড্ডা কলোনির বাসিন্দা। তিন অপ্রাপ্তবয়স্কের বয়স ১৬ ও ১৭ বছর। অভিযোগ অনুযায়ী, অপরাধে ব্যবহৃত দুটি ছুরি, অভিযুক্তদের পরা পোশাক এবং টেম্পোটি উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পুরো ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে, আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণ করতে এবং ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ যাচাই করতে তদন্ত চলছে।

সর্বশেষ সব খবর