বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ফ্লাইট ডেক থেকে উড্ডয়ন করছে একটি এফ/এ-১৮ই সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান। ৩১ জুলাই ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর দায়িত্ব পালন শেষে কবে নাগাদ ফেরা যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠানো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিক ও সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। একই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীরা। সম্প্রতি এ উদ্বেগের কথা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত টাউন হল সভায় নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে তাঁরা এ ক্ষোভ উগরে দেন। সভায় উপস্থিত দুই নাবিকের স্ত্রী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সান ডিয়েগোর ওই সভায় আনুমানিক ২০০ জন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অংশ নেওয়া এক নাবিকের স্ত্রীর ভাষ্য, সভার দিনই তিনি তাঁর স্বামীর কাছ থেকে একটি বার্তা পান।
অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি কর্মকর্তাদের জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে লিখেছেন যে ‘তিনি আশা করেন আগামীকাল যেন তাঁর আর ঘুম না ভাঙে।’
ওই নারী আরও জানান, সভায় উপস্থিত নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সুনির্দিষ্ট বা আবেগঘন বক্তব্যের কোনো সরাসরি জবাব দেননি। তবে জাহাজে থাকা নাবিকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক) এবং চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন তাঁরা।
একই সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুদ্ধজাহাজটিতে আরও বেশি মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ পাঠানোর কাজ চলছে বলে জানান নৌবাহিনীর সেই কর্মকর্তারা।
টানা ২৫০ দিন সমুদ্রে: চরম ক্লান্তি ও হতাশায় মার্কিন নাবিকেরা
গত সপ্তাহের সভায় যে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে, তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় নাবিক ও তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর কাছে ব্যক্ত করা মতামতের হুবহু মিল রয়েছে।
বর্তমানে কর্মরত নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রু সদস্যদের ডজনখানেক মন্তব্য ও পোস্ট থেকে এ সংকটের গভীরতা স্পষ্ট। তাঁদের বিবরণ অনুযায়ী, চরম ক্লান্তি ও মনোবল ভেঙে পড়ায় নাবিকেরা প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন। এর মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তার মতো গুরুতর বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি অন্তত একজন ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অস্বাভাবিক ও অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এ যুদ্ধজাহাজের নাবিকেরা। মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের অধীন ৪০ দিন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নিতে হয়েছে তাঁদের। সব মিলিয়ে সমুদ্রে টানা ২৫০ দিন পার করার এক নজিরবিহীন ধকল সামলাচ্ছেন তাঁরা।
গত নভেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে এ বিমানবাহী রণতরি সান ডিয়েগো ত্যাগ করেছিল। তবে পরে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে কোনো ধরনের বন্দরবিরতি বা যাত্রাবিরতি ছাড়াই সমুদ্রে রেকর্ডসংখ্যক দিন পার করে আট মাসের বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে যুদ্ধজাহাজটি।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান সফল করতেই ক্রুদের এ দীর্ঘ সময় পার করতে হয়েছে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত মে মাসে এ মিশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়ানো হয়েছে। তবে কবে নাগাদ তাঁরা ফিরতে পারবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করেনি মার্কিন প্রশাসন।
সভায় মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে নৌবাহিনী ঠিক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি। তবে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রণতরিটিতে পরামর্শক, চ্যাপলিন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অন্যান্য জরুরি সহায়তাসহ মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বা ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
খাদ্য-পানির সংকট, বাড়ি ফিরতে চান ৫ হাজার সেনা
মার্কিন নৌবাহিনী গত সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘নাবিকদের মানসিক সুস্থতা পর্যবেক্ষণ ও বজায় রাখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়ত মূল্যায়ন বা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যাচ্ছে।’
এদিকে প্রতিশোধ বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় এ প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া নাবিকদের স্ত্রী, পরিবারের অন্য সদস্য ও কর্তব্যরত নাবিকদের নাম-পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল। ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’সেই অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখিয়েছে।
পরিবারের সদস্য ও নাবিকদের অভিযোগ, আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে থাকা প্রায় ৫ হাজার সেনাসদস্য চরম খাদ্য ও পানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিঠি বা ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং একটানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যেখানে বিশ্রামের সুযোগ মেলাই ভার।
সাধারণত সাগরে থাকাকালীন নাবিকদের একঘেয়েমি ও ক্লান্তি দূর করতে নিয়মিত বিরতিতে বন্দরে যাত্রাবিরতি বা ‘পোর্ট কল’ দেওয়া হয়। তবে মোতায়েনের দীর্ঘ সময়ে আব্রাহাম লিংকনের ক্রুরা এমন কোনো স্বাভাবিক সুযোগ পাননি বললেই চলে।
মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, রসদ সংগ্রহ, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্রুদের বিশ্রামের জন্য সাধারণত প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরপর বিমানবাহী রণতরিগুলো কোনো না কোনো বন্দরে নোঙর করতে হয়।
যুদ্ধজাহাজটিতে থাকা এক নাবিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুরো মোতায়েনজুড়ে আমরা কোনো বিরতি ছাড়াই জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করে গেছি।’ অথচ মোতায়েনের শুরুতে বিভিন্ন বন্দরে যাওয়া এবং বিশ্রামের আশায় সবার মনোবল বেশ চাঙা ছিল বলে তাঁর মন্তব্য।
বর্তমানে ক্রুদের মনোবল এতটাই ভেঙে পড়েছে যে তাঁরা সামনে কোনো বন্দরে বিশ্রামের সুযোগও চান না; বরং যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরার স্বার্থে যেকোনো বিরতি ত্যাগ করতে তাঁরা রাজি। সেই নাবিকের আকুতি, ‘এই মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।’
জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা: নাবিকের করুণ আকুতি
নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করা সামরিক জীবনেরই অংশ। তবে সেটি তাঁরা মেনে নিলেও অনেকেরই অভিযোগ, শারীরিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা না করেই এ যুদ্ধজাহাজের ক্রুদের অস্বাভাবিক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে টানা যুদ্ধাভিযান চালাতে বাধ্য করা হচ্ছে।
গত জুলাই মাসে এক চিন্তিত অভিভাবক ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-কে দেওয়া এক চিঠিতে লেখেন, ‘আমার ছেলে বর্তমানে ওই যুদ্ধজাহাজে আছে। সে এবং তার সহকর্মীরা একটু স্বস্তি পেতে প্রতিনিয়ত জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছে, এটি শোনা একজন বাবার জন্য অত্যন্ত কষ্টের।’
নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এই অভিভাবক আরও বলেন, ‘আমরা রাতে ঘরের নরম বিছানায় আরামে ঘুমাই, অথচ আমাদের প্রিয়জনেরা ওখানে যুদ্ধ করছে। তারা আসলে কিসের জন্য জীবন বাজি রাখছে, সেটিও তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’
জাহাজে থাকা একাধিক নাবিক জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে এক ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। এক নাবিকের ভাষ্য, ‘আমাদের এখানে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে দায়িত্বরত প্রহরীদের এক নাবিককে সাগরে লাফ দেওয়া থেকে আটকাতে হয়েছিল।’ ঘটনাটি পুরো জাহাজের লাউডস্পিকারে ঘোষণার মাধ্যমে সব ক্রুকে জানানো হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি।
তবে এই সুনির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সাধারণ প্রশ্নের উত্তরে বাহিনী জানিয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষ সব সময়ই পরিবারগুলোর কথা শুনতে, সেনাসদস্যদের পাশে দাঁড়াতে এবং আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের লক্ষ্য নিরাপদে ও সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সম্পদ বা সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
নাবিক, তাঁদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন, এর আগে আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে খাবার রেশন করে দেওয়া, তীব্র পানির সংকট এবং টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কাপড় লন্ড্রি করতে না পারার মতো বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তবে এখন সেসব সমস্যার বড় অংশই সমাধান হয়েছে এবং চিঠি বা ডাক যোগাযোগের ব্যবস্থাও ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে বলে তাঁদের মত।
মানসিক ভাঙন ও তীব্র হতাশা, তা-ও মিলছে না ফেরার তারিখ
গত জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির কারণে যুদ্ধজাহাজটিতে নতুন করে রসদ সরবরাহের সুযোগ হয়। ফলে দীর্ঘ কয়েক মাস পর ক্রুরা তাজা ফলমূল ও শাকসবজি পান বলে জানান এক নাবিক। তবে সে সময় অনেক নাবিককে জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁদের বন্দর এলাকার একটি সুরক্ষিত সীমানার মধ্যেই আটকে রাখা হয়েছিল।
এর আগে গত ডিসেম্বরেও ‘আব্রাহাম লিংকন’ গুয়াম দ্বীপে একটি সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেছিল। কিন্তু জাহাজে থাকা অনেক নাবিকই সেই সময় তীরে নামার সুযোগ পাননি বলে জানান তাঁদের স্ত্রীরা।
সেনাসদস্যদের জন্য নিয়মিত বন্দরবিরতির অভাব, ডাক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতি নিয়ে এক নাবিকের স্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিজের মানুষের (নাবিক) এই অবস্থা দেখাটা দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে।’ অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি চোখের সামনে আমার স্বামীকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখছি। মনে হচ্ছে, তারা যেন সব আশাই হারিয়ে ফেলছে।’
নৌবাহিনী অবশ্য তাদের জবাবে উল্লেখ করেছে যে লিংকন যুদ্ধজাহাজটি বর্তমানে অত্যন্ত বৈরী ও যুদ্ধসংক্ষুব্ধ এক পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী রসদ সরবরাহ কেন্দ্রগুলো সামরিক সংঘাতের কারণে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন বাহিনী রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে মিশনের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর তালিকায় প্রথমে খাবার, তারপর স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ও সবশেষে চিঠি বা ডাকের স্থান।
নৌবাহিনীর দাবি, যুদ্ধজাহাজ থেকে আসা সাম্প্রতিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করছে যে সেখানে পরিষ্কার পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও প্রতিবেলার খাবারে দুটি আমিষের ব্যবস্থা রয়েছে। রসদ সরবরাহের এ প্রবাহ দিন দিন আরও উন্নত হচ্ছে।
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত দুটি সভার (একটি সশরীর ও অন্যটি অনলাইনে) একটিতে নেভাল এয়ারফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল ডগলাস ভেরিসিমো, নেভাল সারফেস ফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জোসেফ কাহিলসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত নৌ সেক্রেটারি হাং কাও সশরীর উপস্থিত থাকলেও ভিডিও কলে যুক্ত ছিলেন না।
সভায় অংশ নেওয়া এক নারী কাও, ভেরিসিমো ও কাহিলকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা আমাদের এবং নেতৃত্বের মধ্যকার বিশ্বাসের জায়গাটি সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।’
সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘ইউএসএনআই নিউজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১৬২ দিনের একটি মোতায়েন শেষে ঘরে ফেরার এক বছরের কম সময়ের মধ্যে সান ডিয়েগোর নিজস্ব বন্দর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল লিংকন। কিন্তু এর পরপরই রণতরিটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং গত জানুয়ারি মাসে সেটি সেখানে পৌঁছায়। সেই থেকে আজ অবধি যুদ্ধজাহাজটি আরব সাগরেই অবস্থান করছে।
সামরিক নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা আব্রাহাম লিংকন কবে দেশে ফিরবে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে জানান নাবিকদের স্ত্রীরা।
বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, লিংকন যুদ্ধজাহাজের নাবিক এবং তাঁদের পরিবারের বর্ণনা করা এ পরিস্থিতিগুলো সমুদ্রে থাকা সেনাসদস্যদের জন্য তীব্র মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ।
একাডেমিক জার্নাল ‘মিলিটারি মেডিসিন’-এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মোতায়েনকালে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নিতে না পারা এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগই নাবিকদের সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার এবং উভচর যুদ্ধজাহাজে কর্মরত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত এ সমীক্ষায় আরও উঠে আসে যে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে জটিলতা এবং মানসিক চাপ কমানোর সুযোগের অভাবও তাঁদের বড় উদ্বেগের কারণ।
নৌবাহিনীতে দীর্ঘ ২০ বছর দায়িত্ব পালন করা ও চারবার মোতায়েন হওয়া অবসরপ্রাপ্ত চিফ পেটি অফিসার থমাস নাটজম্যান জানান, একটি মোতায়েন কবে শেষ হবে, তা না জানাটা নাবিকদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নাটজম্যান বলেন, ‘সেখানে কোনো সোম, মঙ্গল বা বুধবার নেই; প্রতিটি দিনই যেন একটি দিন। আপনি আপনার সাধ্যমতো ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেন।’
সংকটের জায়গাটি উল্লেখ করে নাটজম্যান বলেন, ‘সমস্যা হলো, আপনি যখন অনেক লম্বা সময় সমুদ্রে থাকবেন, তখন মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা একটা সময় এসে থমকে যাবে আর ঠিক সেখান থেকেই মানসিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করবে।’
চীনের তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তিব্বত অঞ্চলে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।
চায়না আর্থকোয়েক নেটওয়ার্কস সেন্টার (সিইএনসি) বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে এ ভূমিকম্প হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
সিইএনসির তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল তিব্বতের উত্তরাঞ্চলের নাগচু এলাকার একটি উচ্চ পার্বত্য কাউন্টিতে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থলের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে ভূমির গড় উচ্চতা প্রায় ৪ হাজার ৮৬৪ মিটার।
চীনে ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে জানিয়েছে সিইএনসি। স্থানীয় এলাকায় কম্পনটি স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে। এর আগে ২০১০ সালে প্রতিবেশী ছিংহাই প্রদেশের ইউশু এলাকায় ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। ওই ঘটনায় অন্তত ২ হাজার ৬৯৮ জন নিহত হন এবং প্রায় ৩০০ জন নিখোঁজ ছিলেন।
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের রাজধানী তেহরানের উত্তরে তাজরিশ স্কয়ারে মঙ্গলবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে ব্যতিক্রমী এক শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। ব্যস্ত সড়কের পাশে স্থাপন করা ওই শিল্পকর্মে ট্রাম্পের আদলে এক অভিনেতাকে কারাগারের পেছনে দেখা যায়। বিলবোর্ডের মতো দেখতে শিল্পকর্মটিতে একটি কৃত্রিম কারাগার তৈরি করা হয়েছে। ট্রাম্পের ভূমিকায় অভিনয় করা ওই ব্যক্তি কারাগারের চারপাশে হাঁটেন এবং মাঝেমধ্যে ভেতরে বসেন।
শিল্পকর্মটিতে লেখা রয়েছে, ‘এই দৃশ্য না দেখা একটি অপরাধ।’ এর পাশে থাকা অন্যান্য বার্তায় দক্ষিণ ইরানের সিরকি এলাকায় সেপ্টেম্বরের শুরুতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, ওই হামলায় দুই নারী ও দুই শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ৬০ জনেরও বেশি মানুষ।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তেহরানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কারাগারে বন্দি অবস্থায় দেখিয়ে প্রতীকীভাবে তার প্রতি প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ
আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) প্রকাশিত ‘আইনের শাসন সূচক ২০২৬’-এ ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম।
উন্নতি সত্ত্বেও দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে দেশটি। সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ০ দশমিক ৩৯, যেখানে বৈশ্বিক গড় ০ দশমিক ৫৫। তবে এ বছর আইনের শাসন সূচকে বিশ্বের ১৫তম শীর্ষ অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অগ্রগতির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে দেশটি।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ অঞ্চলে শীর্ষে রয়েছে নেপাল।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে শুধু পাকিস্তান ও আফগানিস্তান।
আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশও সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ঘানা ৬২তম, কেনিয়া ১০০তম, লাইবেরিয়া ১০৩তম, সিয়েরা লিওন ১১০তম, নাইজেরিয়া ১২০তম এবং জিম্বাবুয়ে ১২২তম স্থানে রয়েছে।
বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। সূচকের শীর্ষ পাঁচে রয়েছে যথাক্রমে ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও লুক্সেমবার্গ।
সূচকে আটটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে দেশগুলোর আইনের শাসন মূল্যায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো- সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, বিধি-বিধানের প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার।
আটটি মানদণ্ডের মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং বিধি-বিধানের প্রয়োগ। বাকি পাঁচটি মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে।
মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল। এ খাতে ০ দশমিক ৩১ স্কোর নিয়ে ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে ১৩৩তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর সবচেয়ে ভালো অবস্থান মুক্ত সরকার মানদণ্ডে। এ খাতে ০ দশমিক ৪২ স্কোর নিয়ে ১২৮তম স্থানে রয়েছে দেশটি।
মোহাম্মদ সাদিক
আফগানিস্তানে বড় পরিবার এবং সন্তানের সংখ্যা অনেক এমন দম্পতির দেখা পাওয়া সাধারণ ঘটনা। তবে উরুজগান প্রদেশের মোহাম্মদ সাদিকের পরিবার সম্ভবত দেশটির অন্যতম বড় একটি পরিবার। মোহাম্মদ সাদিকের চার স্ত্রীর ঘরে ৫৮টি সন্তান রয়েছে এবং তার সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের জন্ম হয়েছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। এত বড় পরিবার চালানো তার জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, তার সমস্ত প্রচেষ্টা প্রতিদিন সন্তানদের খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবারের ছোট সন্তানরাও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
এই পরিবারের চার নারীও বছরের পর বছর গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব বহন করে আসছেন। মোহাম্মদ সাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের সময় তার চার স্ত্রীর বয়সই খুব অল্প ছিল, ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে ছিলেন তারা।
মোহাম্মদ সাদিক হাসতে হাসতে বলেন, কখনও কখনও তিনি তার সব সন্তানের নামও মনে রাখতে পারেন না। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি সন্তানদের গুনে দেখেন, সবাই বাড়িতে আছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য।
উৎসবের' আবহ
মোহাম্মদ সাদিকের মতে, ছোট সন্তানরা যখন তাকে ঘিরে জড়ো হয়, তখন তাদের বাড়ি কোলাহল, হাসি আর ব্যস্ততায় ভরে ওঠে, যেন সেখানে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। তবে এই পরিবারের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে গুরুতর আর্থিক সংকট। দারিদ্র্য কখনও কখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে কিছু সন্তানকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়।
পরিবারটিতে দিনে মাত্র দুইবার রান্না হয়, সকালে এবং সন্ধ্যায়। পরিবারের দুই জন নারী রান্নার দায়িত্ব পালন করেন।
৫৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তিনি বলেন, আরও সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল "নবীর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানো"।
তার এক মেয়ের বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মজার ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, "যে মৌলভি সাহেব বিয়ে পড়িয়েছিলেন, তিনি আমাকে আমার মেয়ের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে ভুলবশত আমার অন্য এক মেয়ের নাম বলে ফেলি। তখন মৌলভি সাহেব হেসে বললেন, আপনি বাড়ি গিয়ে আবার দেখে আসুন, ভুল নাম বলেছেন কি না।"
'নামটাও মনে থাকে না'
তিনি ব্যাখ্যা করেন, এত বেশি সন্তান থাকার কারণে সবার নাম মনে রাখা তার জন্য প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি অধিকাংশকেই "বাবা" বা "আমার সন্তান" বলে ডাকেন।
মোহাম্মদ সাদিক একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন, "এক রাতে আমরা সবাই খাবারের টেবিলের চারপাশে বসেছিলাম। আমি সন্তানদের গোনা শুরু করি এবং দেখি একজন নেই। আমি এটাও জানতাম না যে অনুপস্থিত সন্তানটি ছেলে না মেয়ে। পরে আমি তাদের মায়েদের জিজ্ঞেস করি। তখন একজন জানান, তিনি তার সন্তানকে তার নানির বাড়িতে পাঠিয়েছেন এবং সে রাতটা সেখানে কাটাবে।"
মোহাম্মদ সাদিকের প্রথম বিয়ে হয়েছিল যখন তার বয়স ছিল ২০ বছর। তরুণীদের বিয়ে করার কারণ সম্পর্কে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি বিয়ের জন্য তাকে কয়েক বছর ধরে কনের পরিবারকে দেওয়া অর্থ জমাতে হয়েছে।
এত বড় পরিবার ও সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার স্ত্রীরা খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন। শৈশব ও কৈশোরেই তারা বিয়ে, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান পালনের বিশাল দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা তাদের জীবনের স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে। মোহাম্মদ সাদিক এবং তার স্ত্রীরা জীবনে আরেকটি বড় ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে তারা ১৪ সন্তান হারিয়েছেন, যা যেকোনো বাবা-মায়ের জন্য গভীর বেদনার বিষয়।
স্বাস্থ্য সংকট ও আর্থিক অনটন
বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে বিয়ে এবং গর্ভধারণ মা ও অনাগত শিশু উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। বারবার গর্ভধারণ নারীদের জন্য আরও স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ হতে পারে।
আফগানিস্তান এমন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে, যেখানে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় নারীদের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে এখনো বেশি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকাগুলোতে, যেখানে মানসম্মত চিকিৎসাসেবার সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে, দারিদ্র্যও এই পরিবারের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে একসঙ্গে খাবার খান এবং গ্রীষ্মকালে উঠানে খান, কিন্তু মৌলিক সুবিধাগুলোরও তাদের সীমিত প্রাপ্যতা রয়েছে।
যে জায়গায় তারা গোসল করেন, সেটিই কাপড় এবং বাসন ধোয়ার জন্যও ব্যবহৃত হয়। একই স্থান শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
পরিবারের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে শুধু মোহাম্মদ সাদিক নন, তার অনেক সন্তানও কাজ করে। কেউ কেউ কাগজ, প্লাস্টিক এবং অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সংগ্রহ করে, যা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় অথবা বিক্রি করে পরিবারের খরচে অবদান রাখা হয়।
সব কষ্ট সত্ত্বেও এই পরিবার প্রতিদিনের চাহিদা মেটানোর জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি দিনই নতুন একটি চ্যালেঞ্জ, খাবার, আশ্রয় এবং সন্তানদের প্রয়োজন মেটানোর চ্যালেঞ্জ।
শীতের রাতে কখনও কখনও ছয় বা সাতজন মানুষ একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমান। সাধারণ গদি ছাড়া এই পরিবারের কোনো বিশেষ শোয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, মজবুত দরজাও নেই। প্রবেশমুখে শুধু পাতলা পর্দা ঝোলানো রয়েছে। জ্বালানির জন্য পরিবারটি মূলত কাগজ এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পোড়ায়।
মোহাম্মদ সাদিকের দুই ইচ্ছে
শীতের রাতে কখনও কখনও ছয় বা সাতজন মানুষ একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমান। সাধারণ গদি ছাড়া এই পরিবারের কোনো বিশেষ শোয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, মজবুত দরজাও নেই। প্রবেশমুখে শুধু পাতলা পর্দা ঝোলানো রয়েছে।
জ্বালানির জন্য পরিবারটি মূলত কাগজ এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পোড়ায়।
এসব কষ্টের মধ্যেও নিজে পড়াশোনা করতে না পারা মোহাম্মদ সাদিক বলেন, তিনি তার সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তবে সীমিত আয়ের কারণে তাদের শিক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মোহাম্মদ সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তিনি বলেন, প্রতি একটি গাড়ি বিক্রির জন্য তিনি মাত্র এক হাজার আফগানি কমিশন পান।
কিন্তু এত বড় পরিবারের চাহিদা তাদের সম্মিলিত আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। তাই মোহাম্মদ সাদিক সরকার, সহায়তা সংস্থা এবং আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান, যাতে তিনি তার সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন।
নিজের ইচ্ছের কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদ সাদিক বলেন, তার জীবনে মাত্র দুটি বড় ইচ্ছে রয়েছে।
"আমার প্রথম ইচ্ছা, আমার সন্তানরা শিক্ষা লাভ করুক, ধর্ম এবং পৃথিবী সম্পর্কে জানুক। দ্বিতীয়ত, তাদের যেন কখনও ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না হয় এবং তাদের পেট যেন ভরা থাকে।"
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোতে হুতিদের আক্রমণে অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার।
এর জেরে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, চলমান উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ায় নিকট ভবিষ্যতেও তেলের দাম চড়া থাকতে পারে।ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৩৫ ডলার বা ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ১১২ দশমিক ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ১৮ মের পর এটিই ব্রেন্ট ক্রুডের সর্বোচ্চ দাম।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৬৮ ডলার বা ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৮৩ ডলারে পৌঁছেছে।
পিভিএম অয়েলের বিশ্লেষক তামাস ভার্গা বলেন, ‘ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টাগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে... হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরব ও তার তেল অবকাঠামোতে হুতিদের হামলা নতুন করে চিন্তার কারণ হয়েছে। এসবের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সংঘাতের পূর্ববর্তী মাত্রার চেয়েও বেশি তেল রপ্তানির খবর পুরোপুরি ম্লান হয়ে গেছে।’তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এসব সংঘাত হ্রাসের কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে নিকট ভবিষ্যতে তেলের দাম চড়া থাকবে।’
এদিকে, মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকরা এক নোটে অনুমান করেছেন, গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে সৌদি আরবে নিজেদের কূটনৈতিক উপস্থিতি নিয়েও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন মিশনগুলোর কিছু কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মার্কিন মিশন থেকে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন।
এরই মধ্যে বুধবার সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী। হামলার মধ্যে দাম্মামের একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে আঘাতের ঘটনায় অন্তত দুজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সৌদি আরবের একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিকেও বুধবার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। তবে এসব বিস্ফোরণের প্রকৃতি ও উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। নতুন এক বার্তায় সংস্থাটি বলেছে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনও বাণিজ্যিক জাহাজ মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে আবারও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং তেল অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে তেলের দামে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
সূত্র: রয়টার্স, দ্য স্টার
দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তজুড়ে আবারও বিশালাকার লাউডস্পিকার চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখলে দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং জানান, অক্টোবরের শেষ নাগাদ পুরো সীমান্তজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়াবিরোধী লাউডস্পিকার সক্রিয় করা হবে। এর আগে বুধবার রাতে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের সেনা দুর্গ ও প্রতিরোধব্যবস্থা পরিদর্শন করেন তিনি। খবর জাপান টাইমসের।
কিম ইয়ো জংয়ের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত সামরিক ইউনিটগুলো সীমান্তে নতুন অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সীমান্ত এলাকায় উসকানিমূলক বার্তা প্রচার এবং একাধিক স্থানে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সতর্কতামূলক গুলিতে উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড বা কোনো সেনাসদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে দক্ষিণ কোরীয় বাহিনীকে ‘বিনা দ্বিধায় ও নির্মমভাবে নির্মূল’ করা হবে।তবে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের পদক্ষেপকে ‘আইনসম্মত ও আত্মরক্ষামূলক’ বলে দাবি করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা ও একীভূতকরণ মন্ত্রণালয় উত্তর কোরিয়াকে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ কমান্ডের সহায়তায় অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোনে (ডিএমজেড) নিয়ন্ত্রণ জোরদারে সিউলের নেওয়া পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে বলেই কিম ইয়ো জং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। উত্তর কোরিয়া হুমকি বাস্তবায়ন করলে দক্ষিণ কোরিয়াও ‘সমানুপাতিক ও উপযুক্ত জবাব’ দেবে বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
কিম ইয়ো জংয়ের এই হুঁশিয়ারিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের দুই দেশের বৈরিতা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বছরের জুনে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধ যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হওয়ার পর থেকেই ডিএমজেড দুই দেশকে পৃথক করে রেখেছে। ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশই সীমান্তে প্রচারণার জন্য শক্তিশালী লাউডস্পিকার ব্যবহার করে আসছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মাইকে জনপ্রিয় কে-পপ গান ও জাতীয় সংবাদ প্রচার করা হতো, যা উত্তর কোরিয়ার অসন্তোষের কারণ ছিল।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর লি জে-মিয়ং আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে গত বছর সীমান্তে লাউডস্পিকারে প্রচার বন্ধ করেন এবং স্পিকারগুলো সরিয়ে ফেলেন। এর জবাবে উত্তর কোরিয়াও প্রচার বন্ধ রেখেছিল। তবে পিয়ংইয়ং আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ২০২৪ সাল থেকেই সীমান্তে স্থায়ী দেয়াল নির্মাণ, মাইন স্থাপন ও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই সেনা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় সিউল উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করলেও পিয়ংইয়ং তা অস্বীকার করে ঘটনাটিকে ‘বানানো গল্প’ বলে দাবি করেছে।
সিউলের কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিম উল-চুলের মতে, কিম ইয়ো জংয়ের হুমকির অর্থ এই নয় যে লাউডস্পিকারগুলো অবিলম্বে চালু হবে। তবে এই হুমকি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের প্রশাসনের সামনে বড় রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বিধা তৈরি করেছে।
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান