যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
চিরকাল স্থায়ী হবে, এমন কোনো ভাবনা নিয়ে কেউ কখনোই যুদ্ধ শুরু করেন না। অথচ ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বারবার এমন সব সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, যা বছরের পর বছর ধরে চলতেই থাকে। অন্তত পরবর্তী কোনো প্রেসিডেন্ট বা তারও পরেরজন এসে যখন দেখেন যে এ যুদ্ধের খরচ ও রাজনৈতিক খেসারত দেওয়ার কোনো মানে নেই; তখন তিনি নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা ও সেনা প্রত্যাহার করে বাড়িতে ফিরে যান।
ইরান ইস্যুতে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও হয়তো একই ফাঁদে পড়তে যাচ্ছেন। তিনি যখন নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন, তখন যুদ্ধ শুরু করা নয়, বরং যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের কথা বাদই থাক, যেকোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বা ‘অনন্ত যুদ্ধে’ কখনো না জড়ানোর কথা বলেছিলেন তিনি। অথচ সমালোচকেরা বলছেন, ইরানের ক্ষেত্রে তিনি ঠিক সেই চিরস্থায়ী যুদ্ধের ঝুঁকিই তৈরি করছেন।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে যে ইরান যুদ্ধ প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে শুরু করেছিল, তা কখনো আলোচনা আবার কখনো হামলার মধ্য দিয়ে মোড় পরিবর্তন করেছে। ইরান সরকারের পতন ঘটানো কিংবা দেশটির পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করার যে লক্ষ্য ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, তা অর্জনে তাঁরা এ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন। উল্টো এ যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে অবরুদ্ধ করে এক নতুন ও অত্যন্ত জটিল সংকটের জন্ম দিয়েছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, অন্তত সাময়িকভাবে হলেও, একজন হতাশ ট্রাম্প নিজেকে আবারও যুদ্ধের ময়দানে আবিষ্কার করছেন।
ইতিমধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে এবং হরমুজ প্রণালিও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এক মাসও পার হওয়ার আগেই ভেস্তে গেছে ট্রাম্পের সেই সমঝোতা স্মারক, যা নিয়ে তিনি দাবি করেছিলেন যে এটি তাঁদের সব লক্ষ্য পূরণ করেছে। যদিও সমঝোতা স্মারকটি নিয়ে নানা মহলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ছিল।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, উভয় পক্ষই এ সমঝোতা স্মারককে শান্তির সেতু হিসেবে দেখেনি; বরং তারা এটিকে ভিন্ন উপায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছে।
আলী ভায়েজ সতর্ক করে বলেন, একটি টেকসই সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো কৌশল না থাকলে, এ পরিস্থিতি আরেকটি ‘অনন্ত যুদ্ধের’ ক্ষেত্র তৈরি করার ঝুঁকি বাড়াবে।
‘অনন্ত যুদ্ধের’ ইতিহাস ও সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা
‘অনন্ত যুদ্ধ’ বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ধারণা মূলত শুরু হয়েছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা এবং এর জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ’ শুরুর ঘোষণার মধ্য দিয়ে।
ওই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযানে জড়িয়ে ফেলে এবং দেশ দুটিতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়। শত্রুভাবাপন্ন সরকারগুলোর পতন ঘটানোর মাধ্যমে শুরু হওয়া এসব সংঘাত পরবর্তী সময়ে স্থানীয় বিদ্রোহীদের দমনের লড়াইয়ে রূপ নেয়। অবশেষে বিপুল অর্থ খরচ ও বহু প্রাণের বিনিময়ে যুদ্ধগুলো হয় কোনো অমীমাংসিত অবস্থায়, না হয় (মার্কিন বাহিনীর) পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিদ্যা বিষয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক লরেন্স ডি ফ্রিডম্যান গত বছর ‘দ্য এজ অব ফরএভার ওয়ার্স’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। তিনি বলেন, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকা দেশগুলোর প্রভাবশালী নেতারা প্রায়ই একটি ভুল ধারণার ফাঁদে পড়েন, যাকে ‘স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের বিভ্রম’ বলা যেতে পারে। এ নেতারা মনে করেন, যুদ্ধে তাঁরা খুব দ্রুত জয়লাভ করতে পারবেন এবং এর কোনো বিরূপ পরিণতি তাঁদের ভোগ করতে হবে না।
অধ্যাপক ফ্রিডম্যানের মতে, ইরানে ট্রাম্প এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন—উভয়ের ক্ষেত্রে একই বিষয় দেখা যাচ্ছে। তাঁরা সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং এমন সব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন যা অর্জন করা যদি আদৌ সম্ভবও হয়, তবে তা শুধু দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের মাধ্যমেই সম্ভব। যুদ্ধক্ষেত্রের শ্রেষ্ঠত্বকে যদি একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার সঠিক কৌশল না থাকে, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনী দিয়েও লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয় না। ট্রাম্পের সামনে এখন বাড়তি চ্যালেঞ্জ হলো, তিনি মার্কিন জনগণের কাছে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য স্থলসেনা ইরানের মাটিতে না পাঠিয়ে, শুধু বিমান ও নৌবাহিনীর শক্তি ব্যবহার করে এ যুদ্ধে জিততে চাইছেন।
১৯৯১ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং এটি লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছিল। কারণ, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল সীমিত—শুধু কুয়েত থেকে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে বিতাড়িত করা। কিন্তু তাঁর ছেলে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় এ শিক্ষা ভুলে যান, যার চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে ওই অঞ্চলে উল্টো ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও, জুনিয়র বুশ তালেবানদের ক্ষমতাচ্যুত করার পর তিনি ও তাঁর উত্তরসূরিরা আফগান সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। অবশেষে ওয়াশিংটন যখন এ দীর্ঘ চেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন সেখানে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।
তবে ইরানে ট্রাম্পের যুদ্ধযাত্রার পেছনে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি যুক্তিও রয়েছে, যা নিজে বহুবার উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ১৯৭৯ সালে ইরানে শাহের পতন এবং পরে ৬০ জনের বেশি মার্কিনকে জিম্মি করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যে দ্বন্দ্বের শুরু হয়েছিল, তা ৪৭ বছর ধরে চলছে। ট্রাম্প মূলত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এ দীর্ঘদিনের পুরোনো সংঘাতেরই একটি চূড়ান্ত অবসান ঘটাতে চান।
সংঘাতের ধারাবাহিক চক্র ও ইরানের ভিন্ন প্রেক্ষাপট
জনস হপকিনস স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক ভালি নাসর মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এ ‘অনন্ত যুদ্ধ’ প্রকৃতপক্ষে একটি দীর্ঘ সংঘাতের ধারাবাহিক চক্র। এ দ্বন্দ্ব কখনো চরম উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে, আবার কখনো চুক্তির মধ্য দিয়ে শান্ত হয়েছে। যেমন ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি, যা ২০১৮ সালে ট্রাম্প নিজেই বাতিল করেছিলেন।
অন্যদিকে, কার্নেগি অ্যান্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ইসরায়েলের উসকানিতে ট্রাম্প আসলে দেশটির সমান্তরাল আরেকটি ‘অনন্ত যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছেন। এটি হলো, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ; যা বর্তমানে লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনে ইরানের প্রক্সি বা ছায়া গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে চলছে।
ট্রাম্পের সামনে এখনো সুযোগ রয়েছে এ অপ্রিয় যুদ্ধকে নিজ সমর্থকদের কাছে একধরনের বিজয় হিসেবে তুলে ধরে সেনা প্রত্যাহার করার। কিন্তু সবাইকে অবাক করে তিনি যেন এ যুদ্ধেই নিজের শক্তি আরও বাড়িয়ে চলেছেন, যদিও কূটনৈতিক সমাধানের কোনো স্পষ্ট পথ তাঁর সামনে নেই। ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর আর ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার। দুপক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে মিত্রদের সহযোগিতা নিয়েও হয়তো এখানে অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে জড়িয়ে থাকতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে।
তবে আফগানিস্তান বা ইরাকের দ্বিতীয় যুদ্ধের তুলনায় ইরানের এ যুদ্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগের দুটি যুদ্ধেই হাজার হাজার মার্কিন স্থলসেনা দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে অবস্থান করেছিলেন। তখন তাঁদের লড়াই করতে হয়েছিল মূলত মার্কিন–সমর্থিত নতুন সরকারের বিরোধী বিভিন্ন মিলিশিয়া ও ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, ইরানের মতো কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়।
তা ছাড়া ভিয়েতনাম, ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতি ইরানে নয়। ইরান হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় অর্থনৈতিক আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। এ ক্ষমতা তেহরানকে একটি শক্তিশালী সুবিধা এনে দিয়েছে এবং এ কারণেই তারা এ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি হবে না।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক পরিচালক সুজান ম্যালোনি বলেন, যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। ইরাকের মতোই, যুক্তরাষ্ট্রের ভুল ধারণা ও হিসাব-নিকাশ এ অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। তিনি আরও মনে করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো বাধা ছাড়া জাহাজ চলাচলের দিন হয়তো এখন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।
সুজান ম্যালোনি মনে করেন, এর ফলে একটি ‘নতুন স্বাভাবিক’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে ইরান যেহেতু যখন খুশি তখন যেকোনো জাহাজে আঘাত করার সক্ষমতা রাখে, তাই এ নতুন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে হবে।
আফগান যুদ্ধ নিয়ে কাজ করা অধ্যাপক ভালি নাসর বলেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বাজি বা স্বার্থ তেহরানের চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেক কম। এ কারণেই একপর্যায়ে মার্কিনদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের গতি ধীর হতে শুরু করে, যেখানে অন্য পক্ষ (ইরান) আগের মতোই তীব্রতা বজায় রাখতে প্রস্তুত থাকে।
ভালি নাসর মনে করেন, ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র যখনই সেনা প্রত্যাহার করতে শুরু করেছিল, তখনই যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে যেতে শুরু করেছিল।
তবে ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত অবসান ঘটানো এখনো অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, উভয় পক্ষ ইতিমধ্যে এটি প্রমাণ করেছে যে তারা একটি ন্যূনতম রূপরেখা চুক্তিতেও টিকে থাকতে পারছে না, যে চুক্তিতে সব মূল বা মৌলিক বিষয় ভবিষ্যতের জন্য তোলা রাখা হয়েছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, তারা যদি এতটুকুও করতে না পারে, তবে তা সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন সংঘাত ও একটি চিরস্থায়ী বা ‘অনন্ত যুদ্ধের’ মাঝখানের শেষ দেয়ালও ভেঙে দিতে পারে।
হরমুজে ৭ জাহাজে মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি ইরানের। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে সাতটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এই জলপথে জাহাজ চলাচলে সহায়তা অব্যাহত রাখলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার রাতভর হামলার শিকার হওয়া সাতটি জাহাজের মধ্যে চারটি থেকে তেল স্থানান্তরের কাজ চলছিল। হামলার পর জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। অন্য তিনটি জাহাজ মাইনে আঘাত হানার পর চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে বলে দাবি করেছে ইরান। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হামলায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর কোন দেশের পতাকা ছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি। তাদের বক্তব্য, ওয়াশিংটন যদি প্রণালির অন্যান্য অংশ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে সহায়তা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংঘাত এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।’ এটিকে তারা গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই জলপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
কিম জং উন। ছবি: সংগৃহীত
সীমান্তের নতুন সেতু অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন চীনের দানদং শহরে অত্যন্ত গোপনে এক ঝটিকা সফর সম্পন্ন করেছেন। দীর্ঘ ১২ বছর আগে নির্মিত ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় এই প্রতীকী সফর অনুষ্ঠিত হলো। শনিবারের (২৪ অক্টোবর) এই একদিনের ঝটিকা সফর শেষে তিনি ইতোমধ্যেই স্বদেশে ফিরে গেছেন।
সফরকালে কিম জং উনের সঙ্গী ছিলেন চীনের চতুর্থ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ওয়াং হুনিং। তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের পক্ষ থেকে উত্তর কোরীয় নেতার কাছে আন্তরিক শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। দুই নেতা একসঙ্গে স্থানীয় একটি অটোমোবাইল কারখানা পরিদর্শন করেন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। এসময় কিম জানান, চীনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব রক্ষা এবং ব্যবহারিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রস্তুত রয়েছে পিয়ংইয়ং।
বিশেষ এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যা ১৯৫০-১৯৫৩ সালের কোরিয় যুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণের বর্ষপূর্তির ঠিক আগের দিন। সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দানদং-এর কোরিয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে যান কিম ও ওয়াং। সেখানে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করে প্রাণ উৎসর্গকারী চীনা সৈন্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কিম জং উন। সফর শেষে নতুন সেতুর গোড়ায় এসে কিমকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান ওয়াং হুনিং।
বিশ্লেষকদের মতে, ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নতুন চার লেনের সেতু চালুর মাধ্যমে চীন ও উত্তর কোরিয়ার বাণিজ্যের বড় বাধা দূর হলো। তবে কেবল অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থেকে নিজের অবস্থান শক্ত করার কৌশল হিসেবেই কিম জং উনের এই হঠাৎ ও রহস্যময় চীন সফরকে দেখছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র:আল-জাজিরা
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আবারও বড় ধরনের হামলা বা কড়া অবরোধের চিন্তাভাবনা করছেন। তবে এতে একটুও দমে না গিয়ে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পারস্য উপসাগরে তারা কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ঘেঁষতে দেবে না।
ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলি আবদুল্লাহি কড়া ভাষায় ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পারস্য উপসাগরে আবার মার্কিন সৈন্য পাঠানোর স্বপ্ন ট্রাম্পকে কবরে নিয়ে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে তারা নাকি ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করেছে, অথচ নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের সীমানার কাছে পাঠাতে তারা ভয় পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যেকোনো হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে তেহরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
চীনে কিম জং উনের ২৪ ঘন্টার ‘রহস্যজনক’ সফর
এই সংঘাতের আতঙ্কে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু-হু করে বেড়ে প্রতি ব্যারেলে ১১৭ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’-তে একের পর এক তেলবাহী জাহাজে হামলা চলছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের সঙ্গে সৌদি আরবের লড়াইও নতুন করে বেড়ে চলেছে।
সংঘাত থামাতে ইস্তাম্বুলে তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইউরোপীয় দেশগুলো বৈঠক করলেও সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান উপস্থিত ছিল না। তুরস্ক সতর্ক করেছে, ইরানে নতুন হামলা পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। তবে ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন হামলা ও অত্যাচার না থামলে তারা কোনো আলোচনায় বসবে না এবং হরমুজ প্রণালিও মুক্ত করবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা
মেগান মার্কেল ও তার বাবা থমাস মার্কেল। ছবি: সংগৃহীত
ব্রিটিশ রাজপরিবারের বধূ ও প্রিন্স হ্যারির স্ত্রী মেগান মার্কেলের বাবা থমাস মার্কেলের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়নের আপত্তিকর ছবি জমানোর এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চরম ক্ষোভ ও গভীর মানসিক কষ্ট প্রকাশ করেছেন ডাচ অব সাসেক্স মেগান। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এমন বিভৎস খবর শুনে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ও বিপর্যস্ত। ঘটনার শিকার হওয়া নিরীহ শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের ‘দ্য সান’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, মেগানের সৎ ভাই থমাস মার্কেল জুনিয়র ফিলিপাইনে তাদের বাবার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে এই আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও উদ্ধার করেন। তার দাবি, বাবার ড্রয়ার ও কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে শত শত শিশু নির্যাতনের ছবি ছিল। এরপরই তিনি ফিলিপাইন পুলিশ, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থায় গিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেন। ফিলিপাইন প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই বর্তমানে যৌথভাবে এই ঘটনার তদন্ত করছে। তবে মেগানের বাবা থমাস মার্কেল সিনিয়র তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বর্তমানে ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন ৮২ বছর বয়সি থমাস জানান, তার ছেলে সম্পূর্ণ মিথ্যা গল্প ফেঁদেছে। মেগানের বোন সামান্থা মার্কলও বাবার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, এই কম্পিউটারগুলো দুই বছর ধরে অন্য মানুষদের হাতে ছিল এবং তার ভাই বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। এই ঘটনার পর মেগান মার্কেল তার বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্বের আসল কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, আজ থেকে আট বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালেই পুলিশের পক্ষ থেকে তার বাবার বিরুদ্ধে কিছু আপত্তিকর অভিযোগের বিষয়ে তাকে জানানো হয়েছিল।
মেগান বলেন, এতদিন সংবাদমাধ্যমে নানা কথা ছড়ানো হলেও, মূলত সন্তানদের সুরক্ষার কথা ভেবেই তিনি বাবাকে নিজের পরিবার থেকে দূরে রেখেছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার অন্তত মানুষ বুঝতে পারবে যে কেন তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তিনি আশা করেন ভুক্তভোগী শিশুরা যেন দ্রুত ন্যায়বিচার পায়।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য সামনে এক বড় ধরণের ‘চমক’ অপেক্ষা করছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলার ঘটনার পর সেখানে বড় ধরণের সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি এই মন্তব্য করেন।
ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানান, ফিলিস্তিনকে কোনোভাবেই স্বাধীন রাষ্ট্র হতে না দেওয়া তাদের নির্বাচনের মূল লক্ষ্য। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের সোজা উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, হঠাৎ এবং আচমকা পদক্ষেপ নেওয়াই তার বেশি পছন্দ। নেতানিয়াহু আরও জানান, ফিলিস্তিন থেকে আসা যেকোনো সংকট মোকাবিলায় কিছু গোপন কৌশল ব্যবহার করা হবে, যা এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের জন্য খুব শীঘ্রই এক বড় ধাক্কা আসতে চলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের দাবি তুলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়াই তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় আরও কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের চুক্তি বাড়াবেন। অন্তত দুটিরও বেশি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেই দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো শর্ত দেবে না, কারণ তারা ভালো করেই জানে যে ইসরাইল তা কখনোই মেনে নেবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা
সুলতান আল-কাহতানি। ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের দাম্মামে কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের এক হামলার সময় অন্য যাত্রীদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে সুলতান আল-কাহতানি নামের এক বিমানবন্দর কর্মী বীরের মতো প্রাণ হারিয়েছেন।
গত ২১ অক্টোবর বিমানবন্দরে হামলার পরপরই প্রস্থান গেটের কাছে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই আগুন যাতে রানওয়েতে থাকা অন্য কোনো বিমানে ছড়িয়ে না পড়ে এবং যাত্রীদের কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য সুলতান ও তার সহকর্মীরা দ্রুত আগুন নেভানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে তারা আগুন নেভাতে প্রাণপণে চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুন নেভাতে গিয়ে তিনি এতটাই অতিরিক্ত ধোঁয়া গ্রহণ করেন যে, তার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা ও তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
পরবর্তীতে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে আর বাঁচাতে পারেননি। নিহত সুলতানের ছয়টি সন্তান রয়েছে। তার বাবা ছেলের এই আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, দেশ ও মানুষের সেবা করতে গিয়েই তার ছেলে শহীদ হয়েছে। চরম বিপদের মুখে নিজের জীবনের পরোয়া না করে অন্যদের প্রাণ বাঁচাতে সুলতানের এই অসাধারণ সাহসিকতা এখন পুরো দেশজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।