আহসান এইচ মনসুর এবং মো. মোস্তাকুর রহমান
আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে মো. মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
একটি প্রজ্ঞাপনে গভর্নর পদে আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করার কথা জানিয়ে বলা হয়, জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
আরেকটি প্রজ্ঞাপনে নতুন গভর্নর নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ অনুযায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম–সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে তাঁর যোগদানের তারিখ থেকে ৪ (চার) বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ প্রদান করা হলো। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।
নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান একজন হিসাববিদ (এফসিএমএ)। তিনি পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। হেরা সোয়েটার্স নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত একটি পরিবেশবান্ধব কারখানা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হলো।
মোস্তাকুর রহমানের জন্ম ১৯৬৬ সালে ঢাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন। পরে তিনি আইসিএমএবি থেকে হিসাববিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি এফসিএমএ লাভ করেন।
মোস্তাকুর রহমান একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। তৈরি পোশাক ছাড়াও আবাসন খাতে তাঁর ব্যবসা রয়েছে। তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আর্থিক খাতে সুশাসন নিয়ে কাজ করছেন। বিশেষ করে করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা আছে তাঁর।
মোস্তাকুর রহমান তৈরি পোশাকের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব, অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব), ঢাকা চেম্বারের সদস্য। এসব সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতে তিনি কাজ করেছেন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডেও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। এরপর তৎকালীন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার ৯ দিনের মাথায় আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল করা হলো। তাঁর স্থলে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হলো।
আরও পরিবর্তন হবে: অর্থমন্ত্রী
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন নিয়ে দুপুরে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘নতুন সরকারের অনেক কর্মসূচি এবং অগ্রাধিকার আছে। তার অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে নয়, অনেক জায়গায় পরিবর্তন হচ্ছে, আরও হবে।’
সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে ৫০ শতাংশ কোটা কমালো সরকার
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাজারে সম্ভাব্য মূল্যচাপ নিয়ন্ত্রণে সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে অনুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ কমিয়েছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখা থেকে আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জারি করা প্রজ্ঞাপনে আগে অনুমোদিত ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ করা সুগন্ধি চাল রপ্তানির পরিমাণ অর্ধেকে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশোধিত বরাদ্দ অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং অনুমোদনের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে বৃহৎ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে মাঝারি ও ক্ষুদ্র পর্যায়ের রপ্তানিকারকরাও আগের অনুমোদিত পরিমাণের অর্ধেকের বেশি সুগন্ধি চাল রপ্তানি করতে পারবেন না।
রপ্তানিতে যুক্ত হচ্ছে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্ত
কোটা কমানোর পাশাপাশি রপ্তানি কার্যক্রমে নজরদারি, জবাবদিহি ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে ১০টি শর্ত আরোপ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. রপ্তানি নীতি ২০২৪-২৭-এর বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
২. সংশ্লিষ্ট অনুমোদন ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
৩. প্রতিটি চালান রপ্তানির আগে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যের মান ও সত্যতা যাচাই করবে।
৪. প্রতিটি কনসাইনমেন্ট জাহাজীকরণের পর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখায় জমা দিতে হবে।
৫. ভবিষ্যতে নতুন রপ্তানি অনুমোদনের আবেদন করলে আগের অনুমোদিত কোটার বিপরীতে প্রকৃত রপ্তানির পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও প্রমাণ দিতে হবে।
৬. কোনো অবস্থাতেই সংশোধিত অনুমোদিত পরিমাণের বেশি চাল রপ্তানি করা যাবে না।
৭. আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য সুরক্ষায় প্রতি কেজি সর্বনিম্ন FOB রপ্তানিমূল্য ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
৮. অনুমোদন সম্পূর্ণ অহস্তান্তরযোগ্য; সাব-কন্ট্রাক্ট বা অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রপ্তানি করা যাবে না।
৯. জনস্বার্থে সরকার যে কোনো সময় কারণ দর্শানো ছাড়াই অনুমোদন বাতিল করতে পারবে।
১০. রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসনের প্রমাণ হিসেবে PRC (Proceeds Realization Certificate) দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এর আগে, দুই দফায় ২৭৮ টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৪৫ হাজার ২৭০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ১২৯টি প্রতিষ্ঠান মোট ২৪১৯ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়।
সরকারের নীতিগত অবস্থান হলো, রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হলেও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বাজারের সরবরাহ ও মূল্যস্থিতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ বিষয়টি বিবেচনায় সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ কমানো এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে মূল্য, পরিমাণ, নথিপত্র ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় রপ্তানিকারকদের অনুমোদিত সীমার মধ্যে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে এবং ভবিষ্যৎ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আগের রপ্তানি-কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে হবে।
এর ফলে সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে একদিকে যেমন নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, অন্যদিকে রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও বাড়বে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
সরকারের এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করা নয়; বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার স্থিতিশীলতা বজায় রেখে নিয়ন্ত্রিত ও টেকসইভাবে সুগন্ধি চাল রপ্তানি পরিচালনা করা।
দেশের প্রথম আর্থিক সাক্ষরতা উদ্যোগ চালু করেছে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি।
শিশুদের কাছে অর্থ ব্যবস্থাপনার মৌলিক ধারণাগুলো সহজ ও আনন্দদায়কভাবে পৌঁছে দিতে পুতুলনাচ বা পাপেট শো ব্যবহার করে দেশের প্রথম আর্থিক সাক্ষরতা উদ্যোগ চালু করেছে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি। গল্প বলার ঢঙে, বিনোদনের মোড়কে এবং বয়স উপযোগী উপস্থাপনায় শিশুদের কাছে অর্থ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আজ রাজধানীর খিলক্ষেতে প্রাইম টাওয়ারের মেরিনা ইয়াসমিন চৌধুরী হল অব অ্যাসপিরেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্যোগের উদ্বোধন করা হয়। এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের ৬০তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে ইউনেসকো নির্ধারিত “মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা” প্রতিপাদ্যের আওতায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্টের পরিচালক মো. ইকবাল মহসীন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্যে মো. ইকবাল মহসীন বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কোনো চ্যারিটি নয়, বরং অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার একটি দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে পাপেট-শো এর মাধ্যমে আর্থিক সাক্ষরতার প্রচলন ঘটিয়ে প্রাইম ব্যাংক একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ নিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ করার সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তিনি প্রাইম ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং এমপাওয়ারিং ইয়ুথ উদ্যোগের প্রশংসা করেন, বিশেষ করে দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক শিক্ষা ও সম্পৃক্ততামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন।
চরিত্রনির্ভর ও সহজবোধ্য গল্পের মাধ্যমে এই পাপেট শোতে সঞ্চয়, দায়িত্বশীল ব্যয়, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিংয়ের মতো মৌলিক বিষয়ে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। উদ্দেশ্য হলো, আর্থিক সাক্ষরতাকে অতিরিক্ত কোনো পাঠ হিসেবে না দেখিয়ে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে তুলে ধরা।
এই উদ্যোগের আওতায় প্রতি মাসের দ্বিতীয় ও চতুর্থ শনিবার বিকেল ৫টায় প্রাইম ব্যাংকের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে পাপেট শোগুলো সম্প্রচারিত হবে। প্রতিটি পর্বে বয়স উপযোগী আর্থিক ধারণা সহজ, আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক উপায়ে উপস্থাপন করা হবে, যাতে শিশু ও অভিভাবক একসঙ্গে শিখতে পারেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন প্রাইম ব্যাংক পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. নাজিম এ. চৌধুরী। বক্তব্যে তিনি বলেন, অর্থবহ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য আর্থিক সাক্ষরতা একটি অপরিহার্য ভিত্তি। শুধু ব্যাংকিং সেবার প্রবেশাধিকার যথেষ্ট নয়; সচেতনভাবে ও দায়িত্বশীলভাবে সেসব সেবা ব্যবহারের জন্য মানুষের প্রয়োজন জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা।
তিনি আরও বলেন, শিশু ও তরুণদের কাছে আর্থিক সাক্ষরতাকে আরও সহজলভ্য করতে প্রাইম ব্যাংক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্টুডেন্ট ব্যাংকিং, ক্যাম্পাসভিত্তিক আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি এবং এই পাপেট শোর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সহজ ও বাস্তবসম্মতভাবে আর্থিক ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়, দায়িত্বশীল ব্যয় ও অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শিশুদের বোঝাতে পারলে একটি আর্থিকভাবে সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, আর্থিক শিক্ষা হওয়া উচিত সহজবোধ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন প্রাইম ব্যাংক পিএলসির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন অ্যান্ড স্কুল ব্যাংকিং এম এম মাহবুব হাসান। এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন এসইভিপি ও লায়াবিলিটি অ্যান্ড উইমেন ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান শায়লা আবেদীন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান নাবিলা খালিদ।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রাইম ব্যাংক পিএলসির এসইভিপি ও ডিস্ট্রিবিউশন বিভাগের প্রধান মামুর আহমেদ; বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক দেবাশীষ রায়, লাইট অব হোপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও সিইও ওয়ালিউল্লাহ ভূঁইয়া এবং টোগুমোগু প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল আরেফিন মোমেল। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রাইম ব্যাংক এবং অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর প্রতিশ্রুতির অংশ এই উদ্যোগ। প্রাইম ব্যাংক মনে করে, শুধু আর্থিক সেবার প্রবেশাধিকারই যথেষ্ট নয়; সেই সেবা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহারের জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা থাকলেই তা প্রকৃত অর্থে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
প্রাইম ব্যাংক বিশ্বাস করে, আর্থিক সাক্ষরতার সূচনা হওয়া উচিত শৈশব থেকেই। বিনোদনমূলক মাধ্যমে শিশুদের সঞ্চয়ের সুস্থ অভ্যাস, দায়িত্বশীল অর্থ ব্যয় এবং সচেতন আর্থিক সিদ্ধান্তের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা দিয়ে ব্যাংকটি এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়, যারা কেবল আর্থিকভাবে সচেতনই নয়, বরং ক্রমবর্ধমান জটিল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের জন্যও প্রস্তুত।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করতে চায় সরকার। এটা করা সম্ভব হলে বিশাল জনগোষ্ঠী এ খাতের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজ সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্যোগে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, নারীদের এ খাতে যুক্ত হওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে। সৃজনশীলতার পাশাপাশি দেশের খাবার, সংগীত, সংস্কৃতি, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কাজকে বৈশ্বিক বাজারে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ বলেন, বিশ্বের কোনো কোনো দেশের অর্থনীতিতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ১০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশ ১০ শতাংশে যেতে না পারলেও ২-৩ শতাংশে নিতে পারলে বিপুলসংখ্যক মানুষ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ এখানে বেশি।
দেশের গ্রাম-গঞ্জের গান, খাবার ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে পণ্য হিসেবে গড়ে তুলে বিশ্ববাজারে বিক্রির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের অনেক গান ও সৃজনশীল কাজ এতদিন মনিটাইজ করা সম্ভব হয়নি। এগুলোকে সঠিক সহায়তার মাধ্যমে বাজারযোগ্য পণ্যে পরিণত করতে হবে।
তিনি বলেন, একটা ছোটখাটো গান যখন হিট হয়, একজন সাধারণ মানুষের একটা গান যখন হিট হয়ে যায়, এটা কি শত শত কোটি টাকার প্রোডাক্ট হয়ে গেল না? আমাদের মধ্যে সেটা আছে, সৃজনশীলতা আমাদের দেশের মধ্যে আছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সারদের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইসিটি খাতে কাজ করা এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সৃজনশীলতাকে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে তুলতে হবে।
থাইল্যান্ডের ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ কর্মসূচির উদাহরণ দিয়ে আমির খসরু বলেন, তিনি থাইল্যান্ডে দেখেছেন গ্রামের মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে পণ্য তৈরি করছেন। কিন্তু পণ্যের মান ছিল বিশ্ববাজারে বিক্রির উপযোগী। এর পেছনে ছিল সরকারের সহায়তা, কাঁচামাল থেকে শুরু করে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিং পর্যন্ত।
তিনি বলেন, গ্রামের তৈরি পণ্যগুলো প্যাকেটজাত করে বিকেলে একটি ভ্যান এসে সংগ্রহ করে সরাসরি বিমানবন্দরে নিয়ে যেত। সেখান থেকে সেগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে যেত। বাংলাদেশেও এমন সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হলে গ্রামের সৃজনশীল মানুষকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব মানুষের জীবনযাত্রার মান শুধু পরিবর্তন হবে না, অর্থনীতিতেও বড় ধরনের অবদান রাখবে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে, রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তিনি কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্দেশে বলেন, শুধু ঋণ দিলেই হবে না, ঋণগ্রহীতাদের পণ্যকে আপগ্রেড করার জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করতে হবে।
অনুষ্ঠানে কর্মসংস্থান ব্যাংকের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে অনেক সৃজনশীলতা থাকলেও আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে তারা তা কাজে লাগাতে পারেন না। আবার অনেকেই ব্যাংকে যেতে ভয় পান কিংবা ব্যাংকিং সেবায় তাদের প্রবেশাধিকার নেই। এ কারণে ‘অ্যাক্সেস টু ফাইন্যান্স’ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ঋণের সঙ্গে খরচ বা সুদ যুক্ত থাকলে উদ্যোক্তার মধ্যে তা আয় করে পরিশোধ করার একটি দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। অন্যদিকে অনুদানের অর্থ অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। তাই ঋণ নিয়ে লাভজনক ব্যবসা করার সক্ষমতা তৈরি করা এবং উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে তাদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, কর্মসংস্থান ব্যাংক ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছে। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে আরও ৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে মোট ২২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং কুটিরশিল্পই বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। বড় শিল্প ও বড় প্রকল্পের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বহু পরিবার তিন-চার প্রজন্ম ধরে একই ধরনের কাজ করে আসছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে তারা সেই পর্যায় থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না।
সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য সরকারের নেওয়া সহায়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের শুধু ঋণ নয়, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ১০০ টাকার একটি পণ্যকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার পণ্যে উন্নীত করা সম্ভব হতে পারে। এসব পণ্য আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্যযোগ্য হয়ে উঠলে অ্যামাজন, আলিবাবাসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের বাজারে পৌঁছানো সম্ভব।
সংগীত, সংস্কৃতি, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও ওটিটি খাতের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব সৃজনশীল পণ্যের কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই। বিশ্বের মানুষ এখন বিভিন্ন দেশের গান, সংস্কৃতি ও বিনোদন উপভোগ করছে। তাই বাংলাদেশের প্রতিভাবান শিল্পী ও সৃজনশীল মানুষদেরও সহায়তার আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, এটা তো একটা জিডিপি, এটা অর্থনীতি। এটা কোনো চ্যারিটি না। চ্যারিটির মাধ্যমে কারও জীবনের উন্নয়ন হয় না। এটার একটা ইকোনমিক রিটার্ন পেতে হবে।
অর্থমন্ত্রী কর্মসংস্থান ব্যাংককে শুধু প্রচলিত খাতের উদ্যোক্তাদের নয়, সংগীত, সংস্কৃতি ও অন্যান্য সৃজনশীল খাতের সম্ভাবনাময় মানুষদেরও ঋণের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ফাইন্যান্সিং ইজ নট এনাফ। আপনি যে ফাইন্যান্সিংটা করছেন, যে মানুষটাকে করছেন, তার সঙ্গে আপনার একটা বন্ধন থাকতে হবে। তাকে সাপোর্ট দিতে হবে। হি ইজ আ পার্টনার, হি ইজ নট আ বোরোয়ার।
অনুষ্ঠানে কর্মসংস্থান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা এনপিএল কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকটির এনপিএল প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি এটি আরও কমিয়ে ১-২ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এতে ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিলের পাইলট প্রকল্পের জন্য ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রসঙ্গ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি কেবল একটি পাইলট প্রকল্প। প্রকল্পটি সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকের মুনাফা ও প্রফিট প্লাওব্যাকের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আরও উৎসাহিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা কর্মসংস্থান ব্যাংকের রয়েছে। জামানত ছাড়াই এসব জনগোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়ার সুযোগও রয়েছে বলে জানান তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণে সাধারণত ২৪ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নেওয়া হয়।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে এ উদ্যোগটি সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। এ জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হবে, যাতে তারা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে তিনটি জেলায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও এর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কর্মসংস্থান ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. এ এফ এম মতিউর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ২ শতাংশ সুদে তহবিল সরবরাহ করে, তাহলে কর্মসংস্থান ব্যাংক আরও কম সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে।
তিনি জানান, বর্তমানে কর্মসংস্থান ব্যাংক সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। ব্যাংকটি কম স্প্রেডে কার্যক্রম পরিচালনা করায় ঋণের সুদের হারও তুলনামূলকভাবে সীমিত রাখা হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
দুর্দশাগ্রস্থ পাঁচ ব্যাংক মিলে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আজ সোমবার থেকে অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু করেছে। ঘোষিত স্কিমের বাইরে আমানতকারীদের থেকে আবেদন নিয়ে টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। অর্থ ফেরত পেতে এখন পর্যন্ত বড় কোনো ঝামেলার খবর পাওয়া যায়নি। ঘোষিত স্কিমের বাইরে ১ সেপ্টেম্বর থেকে রোববার পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ হাজার গ্রাহক মোট ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করেন। অর্থ ফেরত দেওয়ার সুবিধার জন্য টাকা ছাপিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে রোববার পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
দীর্ঘ দিন ধরে আমানতকারীদের জমানো টাকা ফেরত দিতে না পারায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। ব্যাংকগুলো হলো— এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চার ব্যাংকের কতৃর্ত্ব ছিল চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদ ওরফে এস আলমের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী- ব্যাংকগুলোকে এর আগে বিভিন্ন সময়ে মোট ৪৭ হাজার ৮৪ কোটি টাকার বিশেষ ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সুদসহ যা এখন প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে নতুন করে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতিতে এর যে প্রভাব পড়বে তা মেনেই ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা আনতে এটা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়া বা তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে। এর বাইরে আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পুরো অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরতের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্কিম ঘোষণা করেছে। ওই স্কিমের বাইরে ব্যক্তি আমানতকারীদের থেকে আবেদন নিয়ে অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
২৫ আগস্ট সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরতে কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ থাকছে না এমন ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী আমানতের মূল অর্থ তুলতে পারবেন বলেও জানানো হয়। এরপর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক অর্থ ফেরতের বিশেষ উদ্যোগ নেয়। গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট শাখা বা উপশাখায় গিয়ে আবেদন করতে হয়েছে। আবেদন যাচাই করে পাওনা অর্থ পরিশোধ হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তি আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ও মেয়াদি আমানতের মূল টাকা উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। তবে এই সুবিধার আওতায় আমানতের বিপরীতে অর্জিত বা প্রাপ্য মুনাফা পাওয়া যাবে না। কোনো গ্রাহক মেয়াদি আমানতের মূল টাকা তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট আমানতের ক্ষেত্রে সেটিকে পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে। হিসাব চালু রাখলে চুক্তি অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে মুনাফা দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক
বিদেশ ভ্রমণে বাংলাদেশি নাগরিকদের বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা ১২ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৮ হাজার ডলার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রকৃত ভ্রমণসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা পূরণে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান ভ্রমণ-সুবিধা সংশোধন করে আজ রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে। এর আওতায় বাংলাদেশে বসবাসরত প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের বার্ষিক সীমা বাড়ানো হয়েছে।
সার্কুলার অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো কোনো প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিককে একটি পঞ্জিকাবর্ষে বিদেশ ভ্রমণের জন্য সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় করতে পারবে। এর আগে এ সীমা ছিল ১২ হাজার ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রকৃত ভ্রমণসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা পূরণ এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পরিবর্তিত প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন সীমা একটি পঞ্জিকাবর্ষের জন্য প্রযোজ্য হবে। তবে ১২ বছরের কম বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অনুমোদিত সীমার ৫০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুবিধা আগের মতোই বহাল থাকবে।
এদিকে, মার্কিন ডলারের নোট আকারে বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। প্রযোজ্য বার্ষিক ভ্রমণ কোটার মধ্যে প্রতি ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার নগদ ডলার নোট নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
ভ্রমণ কোটার সীমা বাড়ানোর ফলে পর্যটন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং অন্যান্য অনুমোদিত বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা পূরণে আরও বেশি নমনীয়তা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বার্ষিক ভ্রমণ কোটা আগে ১২ হাজার ডলার নির্ধারিত ছিল। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে তা ৬ হাজার ডলার বা ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যা বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য শিথিলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ২০ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ করা হয়েছে। তাঁরা মার্জনা চেয়ে আবেদন করলে তা মঞ্জুর করে দণ্ডাদেশ বাতিলের আদেশ দেন রাষ্ট্রপতি। ইতিমধ্যে শাস্তি মওকুফ করার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)।
গত বছর রাজস্ব খাতের সংস্কার আন্দোলনের ওই কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে তাঁদের বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলেন, যা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার লঙ্ঘন। কেউ কেউ আন্দোলনে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। কেউ নিজ নিজ দপ্তর বন্ধ রেখে আন্দোলনে অংশ নেন।
শাস্তি বাতিল হওয়া কর্মকর্তারা হলেন কমিশনার জাকির হোসেন (চলতি দায়িত্বে), অতিরিক্ত কর কমিশনার হাছান তারেক রিকাবদার, মির্জা আশিক রানা, চাঁদ সুলতানা চৌধুরানী, সুলতানা হাবীব, মুরাদ আহমেদ, সিফাত ই মরিয়ন, আ আ আমীমুল ইহসান, সাধন কুমার কুণ্ডু, যুগ্ম কর কমিশনার মোনালিসা শাহরীন, মামুন মিয়া, মাসুমা খাতুন, মোরশেদ উদ্দীন খান, সানোয়ারুল কবির, উপ কর কমিশনার জিল্লুর রহমান, ইমাম তৌহিদ হোসেন, সাইদুল ইসলাম, শাহাদাৎ জামিল, রাজস্ব কর্মকর্তা সবুজ মিয়া ও শফিউল বশর।
প্রজ্ঞাপন অনুসারে, শাস্তি মওকুফ করা এনবিআরের কর্মকর্তারা ২০২৫ সালের জুন মাসে রাজস্ব খাতের আন্দোলনের সময় তাঁদের বদলি করা হয়। পরে তাঁরা প্রকাশ্যে বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলেন। ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার ৩০এ বিধির লঙ্ঘন এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮–এর বিধি (খ) অনুসারে ‘অসদাচরণ’।
পরে বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়। যেমন সাময়িক বরখাস্ত, বেতন গ্রেড অবনমন ইত্যাদি।
আইআরডির প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তারা মার্জনা প্রার্থনা করে আপিল আবেদন করলে রাষ্ট্রপতি আপিল আবেদন মঞ্জুর করে দণ্ডাদেশ বাতিলের আদেশ প্রদান করেন।
২০২৫ সালের ১২ মে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারির পর এর বিরোধিতা করে প্রায় দেড় মাসজুড়ে আন্দোলন করেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ওই বছরের জুন মাসের শেষের দিকে দেশের শুল্ক-কর কার্যালয়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থবছরের শেষ সময়ে রাজস্ব আদায় হুমকির মুখে পড়ে। ওই সময়ে টানা কয়েক দিন রাজধানীর এনবিআরসহ দেশের সব শুল্ক-কর কার্যালয়ে কাজ বন্ধ থাকে। এনবিআর ইতিহাসে এমন কখনো হয়নি। সারা দেশে অবস্থান কর্মসূচির পাশাপাশি মিছিল-সমাবেশ চলে। তখন স্থবির হয়ে যায় পুরো রাজস্ব খাত।
একপর্যায়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় আন্দোলন স্থগিত করেছিলেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর এনবিআরে আন্দোলনের জেরে বরখাস্ত, বদলিসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।