ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৩:৩৬ পিএম

রাজধানীর হাজারীবাগের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী মা ও তার সাত মাস বয়সী শিশুকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনায় আপাতত শিশুটিকে মায়ের জিম্মায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড।


মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শুনানি শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মো. সায়েম খান।


তিনি বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সাত মাস বয়সী শিশুটি আপাতত তার মায়ের সঙ্গেই থাকবে। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শুনানির সময় কিশোরী মাকে ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আইন মেনে চলতে উভয় পক্ষকেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


লিগ্যাল এইড সূত্র জানায়, শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব নিয়ে বাবার করা আবেদন বর্তমানে সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত লিগ্যাল এইড নয়, বরং পারিবারিক আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই হবে।


সম্প্রতি হাজারীবাগের এই ১৩ বছর বয়সী কিশোরী ও তার সাত মাসের শিশুকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, টিকটকের মাধ্যমে পরিচয়ের পর কিশোরীকে ফুসলিয়ে নিয়ে নোটারির মাধ্যমে বিয়ে করা হয়। পরবর্তীতে তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন এবং একপর্যায়ে তার সন্তানকে তার কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়।


পরে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইডের সহায়তায় শিশুটিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। শিশুর নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে লিগ্যাল এইডের উদ্যোগে এ শুনানির আয়োজন করা হয়। তবে শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব নির্ধারণের বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।


যেভাবে আলোচনায় আসে ঘটনাটি


ঘটনাটি প্রথম আলোচনায় আসে গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই)। সেদিন ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের নির্দেশে সাত মাস বয়সী শিশুটিকে তার কিশোরী মায়ের জিম্মায় দেওয়া হয়। শুনানির সময় লিগ্যাল এইড অফিসে শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসে থাকা ১৩ বছর বয়সী মায়ের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।


ভাইরাল সেই ১৩ বছরের মা, সামনে এল পুরো ঘটনা 



পরিচয় থেকে সংসার


কিশোরীর পরিবারের দাবি, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় টিকটকের মাধ্যমে শাকিল মিয়া (২২) নামের এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় ওই কিশোরীর। পরে তাকে বিভিন্ন সময় বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।


কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, কোনো বৈধ কাবিন ছাড়া নোটারির মাধ্যমে বিয়ের ভুয়া কাগজ তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে সন্তান জন্মের কয়েক মাস পর শিশুটিকে রেখে কিশোরীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। নিজের সন্তানকে ফিরে পেতে চলতি বছরের ২০ মে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে আবেদন করে ওই কিশোরী।


আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১৬ জুলাই উভয় পক্ষকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযুক্ত পক্ষ উপস্থিত না হওয়ায় চকবাজার থানাকে শিশুটিকে উদ্ধারের নির্দেশ দেন আদালত। পরে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে।


গত ২৮ জুলাই ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে মানবিক দিক বিবেচনায় লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খান শিশুটিকে আপাতত তার কিশোরী মায়ের জিম্মায় রাখার নির্দেশ দেন। শুনানির সময় কোলে সন্তান নিয়ে বসে থাকা ১৩ বছর বয়সী ওই কিশোরী মায়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।


বর্তমানে সাত মাস বয়সী শিশুটি লিগ্যাল এইডের নির্দেশে তার ১৩ বছর বয়সী মায়ের কাছে রয়েছে। তবে শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব, কথিত বিয়ের বৈধতা এবং কিশোরীর পরিবারের আনা অভিযোগ–এসব বিষয়ে পৃথক আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ফলে পুরো ঘটনার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখন আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।


কিশোরীর বাবা জুয়েল খান বলেন, ওই ছেলে প্রথমবার মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছি। পরে মেয়েকে ফিরিয়ে আনলেও আবারও তাকে নিয়ে যায় সে।


‘আমাকে ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল’


ওই কিশোরী বলেন, ‘আমার বয়স তখন মাত্র ১১ বছর। দুই মাসের পরিচয়ের পর শাকিল আমাকে নানা কথা বলে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। সে বলেছিল, দুই পরিবারের কেউ আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবে না, তাই তার সঙ্গে চলে যেতে। এরপর কেরানীগঞ্জে নিয়ে গিয়ে কাজির মাধ্যমে ঘরোয়াভাবে বিয়ে হয়। পরে আদালতে গিয়ে জানতে পারি, নোটারির মাধ্যমে করা ওই কাগজের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তখনই বুঝতে পারি, আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।’


এই কিশোরী বলেন, ‘শাকিল ও তার পরিবারের লোকজন আমার মা-বাবাকে বিভিন্ন সময় প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। আমার বাবা গাড়ি চালাতেন। তাকেও রাস্তায় পেলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো।’


কিশোরীর অভিযোগ, ‘শাকিলের বাসায় যাওয়ার পর কোনো ভরণপোষণ দেওয়া হতো না। একটি ছোট ঘরে কয়েকটি পরিবার একসঙ্গে থাকত। সেখানে আমার ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। এমনকি একাধিকবার আমাকে হত্যাচেষ্টাও করা হয়েছে। বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।’


ওই কিশোরী আরও বলে, ‘আমার সন্তান জন্মের কয়েক মাস পর সন্তান রেখে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আমি আমার সন্তান ফিরে পাই। আদালতে যখন আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল শিশুটি আমার কি না, তখন আমি বলেছি, হ্যাঁ, এটা আমার। এরপর জানতে চাওয়া হয়েছিল, সন্তানকে ফিরে পেয়ে আমি খুশি কি না। আমি বলেছি, আমি অনেক খুশি।’


ওই কিশোরী বলেন, ‘আমি চাই আমার সন্তান আমার কাছেই থাকুক। আর আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার সুষ্ঠু বিচার হোক। যারা আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং নির্যাতন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’


নির্যাতন, হুমকি ও বিচার চাওয়ার কথা বললেন কিশোরীর বাবা


কিশোরীর বাবা বলেন, ‘আমার মেয়ে তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। শাকিলের সঙ্গে ফোনে পরিচয়ের বিষয়টি জানার পর আমি তাদের বলেছিলাম আমার মেয়ে নাবালিকা। কোনোভাবেই বিয়ে দেব না। সে অন্তত এসএসসি পরীক্ষা শেষ করুক, এরপর বসে কথা বলা যাবে। তারা তখন বিষয়টি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কিছুদিন পর আমার অজান্তে মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে যায়।’


তিনি বলেন, মেয়েকে না পেয়ে থানায় জিডি করি। কয়েক দিন পর মেয়েকে ফিরে পেলেও আবার শুটিং স্পট দেখানোর কথা বলে নিয়ে গিয়ে নোটারির মাধ্যমে কথিত বিয়ে করানো হয়। এসব বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি।


তার ভাষ্য, মেয়ের গর্ভধারণের বিষয়টি আমরা পরে জানতে পারি। এরপর চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। সন্তান জন্মের কয়েক মাস পর আমার মেয়ের কাছ থেকে শিশুটিকেও আলাদা করে দেওয়া হয়। মেয়েকে মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছে, ঠিকমতো খেতে দেওয়া হয়নি।


তিনি বলেন, আমার নাবালিকা মেয়ের সঙ্গে যা হয়েছে তার সুষ্ঠু বিচার চাই। যারা তার জীবন নষ্ট করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। একই সঙ্গে আমার নাতির ভবিষ্যৎ ও ভরণপোষণের বিষয়েও আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি।


স্বামী শাকিলের দাবি


ওই কিশোরীর স্বামী শাকিল মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, বিয়ের সময় মেয়েটির বয়স ২০ বছর উল্লেখ ছিল এবং তিনি স্বেচ্ছায় এসেছিলেন। তিন মাস আগে সে (তার স্ত্রী) বাবার অসুস্থতার কথা বলে সন্তান তার কাছেই রেখে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় সন্তানের কোনো খোঁজ নেয়নি।


শাকিল মিয়া জানান, মেয়েটির বাবা যে জন্মসনদ তাকে দেখিয়েছিলেন সেখানে বয়স ২০ বছর উল্লেখ ছিল। কিন্তু মামলা হওয়ার পর আদালতে গিয়ে তিনি আরেকটি কাগজে মেয়েটির বয়স ১৩ বছর দেখতে পান।


ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শাকিল বলেন, ‘ওই কিশোরী তখন জানিয়েছিল তার বাবা তার জোর করে অন্যত্র বিয়ে ঠিক করেছে। তখন অনুরোধ করেছিল যদি তাকে নিয়ে না যাই তাহলে সে আত্মহত্যা করবে।


অভিভাবকত্ব নিয়ে আদালতে মামলা


শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব চেয়ে ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেন শাকিল মিয়া। অন্যদিকে কিশোরীর পরিবার বলছে, শিশুটিকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করতেই এ মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে শিশুটি মায়ের জিম্মায় থাকলেও চূড়ান্তভাবে কার হেফাজতে থাকবে, সে বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে উভয় পক্ষ।


ধর্ষণের অভিযোগে নতুন আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি


কিশোরীর পরিবার পুরো ঘটনাকে ধর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি– নাবালিকা এই মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য করা হয়েছে।


কিশোরীর আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র জানিয়েছেন, নাবালিকার সঙ্গে সংঘটিত ঘটনাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় বিচারযোগ্য। তিনি অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন।


বিয়ের বয়স নিয়ে কী বলছে আইন

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নারীদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। নির্ধারিত বয়সের আগে সম্পন্ন হওয়া বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয় এবং তা আইনসম্মত নয়। আইন অনুযায়ী, উভয় পক্ষের স্বাধীন ও স্বেচ্ছায় সম্মতি ছাড়া কোনো বিয়ে বৈধ হতে পারে না। জোরপূর্বক আদায় করা সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন বিয়েও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।


ঢাকা মহানগর আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নারীদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। এর কম বয়সে সম্পন্ন হওয়া বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয় এবং এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।


তিনি বলেন, শুধু বয়সের শর্ত পূরণ হলেই বিয়ে বৈধ হয় না; উভয় পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাধীন সম্মতিও আইনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। জোরপূর্বক, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বা প্রতারণার মাধ্যমে আদায় করা সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন কোনো বিয়ে আইনি সুরক্ষা পায় না। যদি কোনো নাবালিকাকে প্রলোভন দেখিয়ে, অপহরণ করে বা জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, দণ্ডবিধি বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।


তিনি আরও বলেন, এমন ঘটনায় ভুক্তভোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ, নিরাপত্তা ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।


নোটারির মাধ্যমে বিয়ে কি বৈধ?


আইনজীবীদের মতে, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা কোনো অ্যাফিডেভিট মুসলিম বিয়ের বৈধ বিকল্প নয়। মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে কাবিন সম্পন্ন হলেই কেবল সেই বিয়ে আইনগত স্বীকৃতি পায়।


কোর্টের আইনজীবীদের ভাষ্য, নোটারির মাধ্যমে করা তথাকথিত বিয়ের ভিত্তিতে স্বামী-স্ত্রীর কোনো আইনি অধিকার–যেমন দেনমোহর, খোরপোশ বা উত্তরাধিকার দাবি করা যায় না। বয়স গোপন করে এ ধরনের অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের চেষ্টা করলে সেটিও দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে।


বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব  বলেন, দেশের প্রচলিত আইনে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা কোনো অ্যাফিডেভিট বা ঘোষণাপত্র মুসলিম বিবাহের আইনগত বিকল্প নয়। মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজির মাধ্যমে কাবিন নিবন্ধন সম্পন্ন হলেই কেবল সেই বিয়ে আইনগত স্বীকৃতি পায়।


তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বয়স গোপন করে বা ভুল তথ্য দিয়ে নোটারির মাধ্যমে তথাকথিত বিয়ের দলিল তৈরি করা হয়। কিন্তু এ ধরনের দলিল কোনোভাবেই বৈধ বিয়ের প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না এবং এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। ফলে দেনমোহর, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার বা বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধে এমন অ্যাফিডেভিটের ভিত্তিতে দাবি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হতে পারে।


তিনি আরও বলেন, যদি কোনো নাবালিকার বয়স গোপন করে নোটারির মাধ্যমে বিয়ের চেষ্টা করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনসহ অন্যান্য প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই বিয়ে অবশ্যই আইনসম্মত প্রক্রিয়ায়, নিবন্ধিত কাজির মাধ্যমে এবং প্রকৃত বয়স ও পরিচয় যাচাই করে সম্পন্ন করা উচিত।


১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে আইনের অবস্থান


২০২৬ সালে সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বলা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।


আইনজীবীদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে এবং আপসের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত।


বিষয়টি সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, ২০২৬ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আনা সংশোধনের ফলে ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর ক্ষেত্রে আইনের সুরক্ষা আরও জোরদার হয়েছে।


তিনি বলেন, সংশোধিত আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে এ ধরনের মামলায় ভুক্তভোগীর সম্মতির প্রশ্নটি আইনি দায় নির্ধারণে প্রাধান্য পায় না; মূল বিষয় হলো ভুক্তভোগীর বয়স এবং ঘটনার প্রমাণ।


এখন কী হবে


বর্তমানে সাত মাস বয়সী শিশুটি লিগ্যাল এইডের নির্দেশে তার ১৩ বছর বয়সী মায়ের কাছে রয়েছে। তবে শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব, কথিত বিয়ের বৈধতা এবং কিশোরীর পরিবারের আনা অভিযোগ–এসব বিষয়ে পৃথক আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ফলে পুরো ঘটনার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখন আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।


আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুবের মতে, বর্তমানে শিশুটিকে মায়ের জিম্মায় দেওয়া হলেও এটি চূড়ান্ত অভিভাবকত্বের সিদ্ধান্ত নয়।


তিনি বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে দেওয়া এমন ব্যবস্থা সাধারণত তাৎক্ষণিক সুরক্ষা ও শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হয়। অন্যদিকে শিশুর অভিভাবকত্ব, কথিত বিয়ের বৈধতা, নাবালিকার বয়স এবং সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি অভিযোগ–এসব বিষয় পৃথক আইনি কাঠামোর আওতায় বিচার হবে। যদি আদালতে প্রমাণিত হয় যে কিশোরী নাবালিকা ছিল এবং বয়স গোপন করে বা বেআইনি উপায়ে বিয়ের চেষ্টা করা হয়েছে, তাহলে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে পারিবারিক আদালত শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে স্থায়ী হেফাজত বা অভিভাবকত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।


তিনি আরও বলেন, একটি মামলার ফলাফল অন্য মামলার ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয় না। তাই ফৌজদারি অভিযোগ, বিয়ের বৈধতা এবং শিশুর হেফাজত–প্রতিটি বিষয় আদালত আলাদাভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করবেন।




ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : রবিবার ০১ নভেম্বর, ২০২৬, সময় : ৬:৪১ পিএম

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তরুণীকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে নিখোঁজ হওয়ার দিন ওই তরুণীকে (১৯) তাহসিফ সাউরির সঙ্গে রাজধানীর একটি এলাকায় দেখা গিয়েছিল।


আজ রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেনের আদালত তাঁর রিমান্ড মঞ্জুর করেন।


মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নৌ–পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তরুণীকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। পরে তাঁকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।


রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, সিসিটিভি ফুটেজে গত ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় তাহসিফ সাউরির সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা যায়। এরপর তাঁরা আরও কয়েক জায়গায় যান। তাঁদের মধ্যে মুঠোফোনে কথা হয়।


জিজ্ঞাসাবাদে তাহসিফের ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্য যাচাইয়ের জন্য ওই তরুণীকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে বলে পুলিশ জানায়।


গতকাল শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে কাফরুল এলাকা থেকে তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।


গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তাহসিফ। পরদিন বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে রাজধানীর উত্তরখান থানায় গত শুক্রবার রাতে হত্যা মামলা করেন তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।


হাইকোর্ট

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৬:২৯ পিএম

হাইকোর্ট বিভাগের ১২টি ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চে আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ২ হাজার ৩৫৪টি পুরাতন ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মাধ্যমে মাত্র ১৪ কার্যদিবসে মোট ৬২ হাজার ৮০২টি পুরাতন ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তি করা হলো। 


সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। 


এতে বলা হয়, সম্প্রতি পুরাতন মামলা নিষ্পত্তির বিশেষ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত পুরাতন ক্রিমিনাল মিস মামলা এবং পুরাতন রিট মামলা মিলিয়ে মোট ৬৯ হাজার ৭০৯টি পুরাতন মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে।


সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, প্রধান বিচারপতির নির্দেশনা অনুসারে হাইকোর্ট বিভাগের ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চ এবং রিট মোশন বেঞ্চে দীর্ঘদিনের পুরাতন মামলা নিষ্পত্তির কার্যক্রম চলছে। বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, মামলা জট হ্রাস এবং বিচার ব্যবস্থার গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত এ বিশেষ উদ্যোগের আওতায় ধারাবাহিকভাবে বিপুল সংখ্যক পুরাতন মামলা নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। 


বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ৭ মে হাইকোর্ট বিভাগের ক্রিমিনাল মোশন এবং রিট মোশন বেঞ্চে বিচারপতিরা দীর্ঘদিনের পুরাতন মামলা নিষ্পত্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে পুরাতন ক্রিমিনাল মিস ও পুরাতন রিট মামলা নিষ্পত্তির বিশেষ এ কার্যক্রম শুরু করেন। পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

মাহবুব-উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল


মাহবুব-উল আলম হানিফ

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১:০৮ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।


এ মামলার অন্য তিন আসামি—কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। একইসঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে আসামিদের সবাই পলাতক রয়েছেন।


এর আগে, গত ৭ অক্টোবর দুই পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। 


গত বছরের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলায় ৪ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য, ষড়যন্ত্র এবং কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।


  • প্রকাশ : বুধবার ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:২২ পিএম

চিত্রনায়ক মান্নার ব্যবহৃত গাড়িতে আগুন লাগার ঘটনায় করা মামলায় তার পরিবারের ম্যানেজার মো. মামুন মণ্ডলকে জামিন দিয়েছেন আদালত। 


বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ এক হাজার টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন।


আসামিপক্ষের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মামুন দীর্ঘদিন ধরে মান্নার পরিবারের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন। এটি নিছক দুর্ঘটনা। আদালতে জামিন আবেদন করা হলে বিচারক তা মঞ্জুর করেন।


গত ২৬ অক্টোবর মামুন মণ্ডল (২৯) ও গাড়ির টেকনিশিয়ান মো. সোহেল পাটওয়ারীকে (৩৭) গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন তাদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার এসআই মো. ইয়াউর রহমান। আসামিপক্ষের জামিন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। বুধবার শুনানি শেষে মামুনের জামিন মঞ্জুর করা হয়।   


মামলার অভিযোগে বলা হয়, রাজধানীর ভাটারা এলাকার একটি ভবনের নিচে গাড়ি পার্কিংয়ের গ্যারেজ রয়েছে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে ছিল চিত্রনায়ক মান্নার স্ত্রী সেলির নামে নিবন্ধিত ঢাকা মেট্রো-গ-১৫-০৭৭৫ নম্বরের একটি প্রাইভেট কার। গাড়িটির নিচে তেলের চিহ্ন দেখতে পেয়ে সেটি সরিয়ে নিতে মালিককে অনুরোধ করেন ভবন কর্তৃপক্ষ।  


পরে গাড়িটি গ্যারেজ থেকে বের করে ওয়ার্কশপে নিয়ে যাওয়ার জন্য ম্যানেজার মামুনকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে গত ২৬ অক্টোবর গ্যারেজেই মামুন ও টেকনিশিয়ান সোহেল গাড়িটির মেরামতের কাজ শুরু করেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে গাড়িটিতে আগুন লাগে। এতে গাড়িটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। আগুনে পাশের আরেকটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


এ ছাড়া গ্যারেজ, বিদ্যুতের তার, সিসিটিভি ক্যামেরা, গেটের শাটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পুড়ে যায়। ভবনের বিভিন্ন স্থানের কাচও ভেঙে যায়। সব মিলিয়ে প্রায় ৯০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।


এ ঘটনায় ভবনের ম্যানেজার মো. গাজি মানিক মিয়া ভাটারা থানায় অভিযোগ করেন। পরে পুলিশ অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে তদন্ত শুরু করে।


চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১০:৪৮ পিএম

আবাসিক এলাকায় প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্নার স্মৃতিবিজড়িত একটি গাড়ি মেরামতের সময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৯০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগের মামলায় দুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।


মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালত এ আদেশ দেন।


কারাগারে পাঠানো দুই আসামি হলেন- মান্নার পরিবারের ম্যানেজার মো. মামুন মণ্ডল (২৯) ও গাড়ির টেকনিশিয়ান মো. সোহেল পাটওয়ারী (৩৭)। এদিন আসামিদের আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ভাটারা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ইয়াউর রহমান। এরপর তাদের কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘গাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। সেটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়ার সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আগুন লাগে। আসামিদের একজন গাড়ির মালিকের পরিবারের ম্যানেজার, অন্যজন টেকনিশিয়ান। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়েছেন, এমন অভিযোগ সঠিক নয়। আসামিদের জামিন আবেদনের শুনানির জন্য কাল বুধবার (২৮ অক্টোবর) দিন ধার্য করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। আসামির আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম এসব তথ্য জানিয়েছেন।’


আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ইয়াউর রহমান বলেন, চিত্রনায়ক মান্নার ব্যবহৃত গাড়িটি তার স্ত্রী শেলী মান্নার তত্ত্বাবধানে ছিল।


মামলার অভিযোগে বলা হয়, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাড়ির নিচে গাড়ি পার্কিংয়ের গ্যারেজ রয়েছে। ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া সেলির (চিত্রনায়ক মান্নার স্ত্রী) ঢাকা মেট্রো-গ-১৫-০৭৭৫ নম্বরের একটি প্রাইভেটকার দীর্ঘদিন ধরে গ্যারেজে পড়ে ছিল। গাড়িটির নিচে তেলের চিহ্ন দেখতে পেয়ে সেটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য বাড়ির কর্তৃপক্ষ গাড়ির মালিককে অনুরোধ করে।


এরপর গাড়িটি গ্যারেজ থেকে বের করে ওয়ার্কশপে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারের ম্যানেজার মামুনকে নির্দেশ দেন মালিক। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ অক্টোবর মামুন ও সোহেল গাড়িটি মেরামত করতে গ্যারেজে আসেন। বাড়ির ম্যানেজার তাদের গ্যারেজের বাইরে গিয়ে কাজ করার কথা বললেও তারা ভেতরেই মেরামতকাজ শুরু করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।


এদিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে গাড়িটিতে আগুন লাগে। এতে গাড়িটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। আগুনে পাশের আরেকটি প্রাইভেটকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া গ্যারেজ, বিদ্যুতের তার, সিসিটিভি ক্যামেরা, গেটের শাটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পুড়ে যায়। ভবনের বিভিন্ন স্থানের কাচও ভেঙে যায়। সব মিলিয়ে প্রায় ৯০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।


এ ঘটনায় বাড়ির ম্যানেজার মো. গাজী মানিক মিয়া ভাটারা থানায় অভিযোগ করেন। পরে পুলিশ অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে মামুন ও সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।


গ্রেপ্তার সাত আসামি। ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : সোমবার ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১:৪৮ এএম

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার সাত আসামির দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

রোববার (২৫ অক্টোবর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

আসামিরা হলেন- মো. মফিজুল ইসলাম (২৭), মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন (৩২), আসাদুল ইসলাম (৩১), এস এম এমদাদুল রহমান (৩৫), মো. জাহাঙ্গীর আলম (৩৮) ও নূর মোহাম্মদ (৩০)। তাঁদের মধ্যে নূর মোহাম্মদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অফিস সহায়ক, আর মো. জাহাঙ্গীর (৩৮) ও এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫) কম্পিউটার অপারেটর, আসাদুল ইসলাম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক, রুবেল পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর এবং মফিজুল ও হাসিনুর প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রের সদস্য।

শুনানির সময় ৭ আসামিকে আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মোহাইমিনুল ইসলাম। রিমান্ড আবেদনে তিনি বলেন, আসামিরা বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও চেকের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন সরবরাহ এবং প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করিয়ে দেওয়ার চুক্তি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবেদনে আরও বলা হয়, এই চক্রের সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের আরও অনেকে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আসামিরা বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন। এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। তারা একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তাদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর অ্যাডমিট কার্ড (প্রবেশপত্র), ব্যাংকের চেক, প্রশ্ন লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদের রিমান্ড প্রয়োজন।

এ সময় আসামি এস এম এমদাদুল রহমানের পক্ষে শুনানি করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম। আদালতকে তিনি বলেন, এই আসামি এজাহারভুক্ত না। তার কাছ থেকে কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তিনি নির্দোষ। তাকে হয়রানি করার জন্য এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামিপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, তার মক্কেলের দায় কী? কী আলামত পাওয়া গেছে তার কাছে কিছুই মামলায় উল্লেখ নেই। রিমান্ড আবেদনেও তার ব্যাপারে বিশেষ কিছু লেখা হয়নি।

একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে এই আইনজীবী বলেন, শুধু রিমান্ড আবেদন করলেই রিমান্ড হয়ে যায় না। আদালত এগুলো বুঝে ভালোমতো। মনে করেছে রিমান্ড আবেদন করলেই হয়ে যায়। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা বিচারকের দিকে দুইবার তাকান ইতস্ততভাবে।

তখন বিচারক এই আইনজীবীকে বলেন, ‘আপনি মেরিটে কথা বলেন। আপনি শুনানির প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলবেন। অন্য প্রসঙ্গে কথা বলবেন না।’ তখন আসামিপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, ‘জি, মাননীয় আদালত আমি মেরিটেই কথা বলছি।’ এ সময় বিচারক তদন্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করেন যে এই আসামির কাছ থেকে কোনো আলামত পাওয়া গেছে কি না। তখন তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘জি, বেশ কিছু আলামত পাওয়া গেছে। তিনি এই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ একজন।’

এরপর আসামি আসাদুল ইসলামের পক্ষে জামিনের আবেদন করেন তার আইনজীবী আলমগীর হোসেন। আদালতকে তিনি বলেন, আসাদুল একেবারেই নির্দোষ। এ ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার সম্পর্কে রিমান্ড আবেদনেও কিছু নেই। এ সময় বিচারক তদন্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তাঁর বিষয়ে কিছু পাওয়া গেছে কি না। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, জি, পাওয়া গেছে।

তখন আদালতে দাখিল করা নথি দেখে বিচারক আসাদুলের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার কাছে ও ফোনে অনেকগুলো স্ট্যাম্প, চেক পাওয়া গেছে। চেকের ৪৫টি পাতা পাওয়া গেছে। এগুলো আপনার কাছে কেন, আপনি এগুলো দিয়ে কী করেন?’

উত্তরে আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি চাকরি করি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে।’ বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, ‘তাহলে এতগুলো চেক, স্ট্যাম্প কেন আপনার কাছে?’ উত্তরে এই আসামি বলেন, ‘আমার একটা ছোট ব্যবসা আছে।’ বিচারক বলেন, ‘সরকারি চাকরি করে কি আপনি ব্যবসা করতে পারেন, আইনে আছে?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রীর নামে ব্যবসা।’ বিচারক বলেন, ‘আপনি কি সেটা করতে পারেন, আপনার কাছে এতগুলো ডকুমেন্টস, প্রবেশপত্র কেন, কী করতেন এগুলো দিয়ে?’ উত্তরে আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার শালা-সম্বন্ধীয় পরীক্ষার্থী ছিল।’ বিচারক বলেন, ‘কিন্তু আপনার ফোনে কেন? আর এতগুলো! কী করতেন এগুলো?’

এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্যের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাওসার আহম্মেদ বলেন, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম করে আসছেন। যার প্রমাণ প্রাথমিকভাবে তদন্ত কর্মকর্তা পেয়েছেন। তারা আরও ১১টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরিকল্পনা করেছিল। এ পর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, তারা সাতজন প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে কানেক্টেড (যুক্ত)। তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে প্রত্যেক আসামির দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করে আদেশ দেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার কিছু সময় আগে ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ও উত্তর ছড়িয়ে পড়ে। ওই প্রশ্নপত্রের সঙ্গে আসল প্রশ্নের মিল পাওয়া যাওয়ায় কিছুক্ষণ আগে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরে প্রশ্নপত্র ফাঁসে যুক্ত থাকার অভিযোগে এই সাতজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাদের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ১০ লাখ টাকায় প্রশ্ন ও উত্তর পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন এই চক্রের সদস্যরা। তাদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, চাকরিপ্রার্থীদের ১০টি সনদ, ৪০ জনের ব্যাংক চেকের পাতা ও ব্যাংকের চেক বই জব্দ করা হয়।