ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিন।
বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আর মাত্র একদিন পরই সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। সারা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি এবং স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের সাফল্যের পর আজ আবার গণতান্ত্রিক উত্তরণের যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি।
আপামর জনগণের-বিশেষ করে জুলাইয়ের যোদ্ধাদের-আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন, এই গণভোট-কোনোটিই সম্ভব হতো না। সমগ্র জাতি তাই তাদের কাছে চিরঋণী।
তিনি বলেন, আগামী পরশুদিন দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে নতুন সরকার গঠনের নির্বাচন করব এবং পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করব।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। এখন আমাদের সবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সার্বিক প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে। মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো সংযম দেখিয়েছে, প্রার্থীরা দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন এবং সাধারণ মানুষ সচেতন থেকেছেন। এই পরিবেশ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি-এটি সম্মিলিত দায়িত্ববোধের ফল।
ড. ইউনূস বলেন, তবে এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মাঝেও আমাদের হৃদয়ে গভীর বেদনার ছায়া রয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এবং প্রচার-প্রচারণাকালে সংঘটিত কয়েকটি সহিংস ঘটনায় আমরা কিছু মূল্যবান প্রাণ হারিয়েছি। এই সহিংসতা আমাদের জাতীয় বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া-কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা এ যাবৎকালের যেকোনো নির্বাচনের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। আগের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে এর চেয়ে বেশি প্রার্থী প্রায় কখনোই দেখা যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।’
‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না-একইসঙ্গে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব-এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, আজ আমি বিশেষভাবে কথা বলতে চাই আমাদের তরুণ ভোটার ও নারী ভোটারদের সঙ্গে। আপনারাই সেই প্রজন্ম, যারা গত ১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে পারেননি। আপনারা বড় হয়েছেন এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে ভোটের মুখোশ ছিল-কিন্তু ভোট ছিল না; ব্যালট ছিল-কিন্তু ভোটার ছিল না। এই দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা ও অবদমনের সবচেয়ে বড় মূল্য জাতিকে প্রতিদিন দিতে হয়েছে।
‘তবু আপনারা আশা ছাড়েননি। অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। আন্দোলনে, প্রতিবাদে, চিন্তায় ও স্বপ্নে আপনারা একটি নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা লালন করেছেন। আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর সেই দিনটি এসেছে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের নারীরা-মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সবকটি গণআন্দোলন, পরিবার থেকে রাষ্ট্র-সবখানেই শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। নারীরাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা। নারীরাই এ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শক্ত ভিত। ক্ষুদ্র ঋণ, কুটির শিল্প, নারী উদ্যোক্তা এই শব্দগুলোর পেছনে আছে পরিবর্তনের গল্প, পরিবার ও সমাজে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প।
ড. ইউনূস বলেন, আমাদের তরুণরা-যাদের স্বপ্ন, মেধা ও শক্তিই আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি-এই ভোট আপনাদের প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ। তাই আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ নয়, দাবি জানাচ্ছিভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে-এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনোদিন হারাতে দেবে না।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। এবার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও ব্যাপকভাবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা দ্রুত ও কঠোরভাবে প্রতিহত করা যায়।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো সারাদেশে ব্যাপক পরিসরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা শরীরে ক্যামেরা ব্যবহার করছেন। নিরাপত্তা ও নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য-ভোটাররা যেন নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে ও সম্মানের সঙ্গে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী আমাদের ভাই-বোনেরা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশগ্রহণ করতে পারছেন-এটি আমাদের গণতন্ত্রের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। আমাদের এই নতুন অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশে প্রচলনের জন্য ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমাদের অভিজ্ঞতার প্রতিটি ধাপ তারা পর্যবেক্ষণ করছে।
‘একইসঙ্গে দেশে অবস্থানরত সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আইনি হেফাজতে বা কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে-রাষ্ট্র কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে চায়।’
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ দিন, যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার করা কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়। কেউ যেন সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনভাবে গুজব না ছড়ায়। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এ ধরনের আচরণ সহ্য করবে না।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়-একটি ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। বরং দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে। যারা জনগণের মতামত উপেক্ষা করে শক্তি ও অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে, তারা সবাই শেষ পর্যন্ত জনগণের আদালতে কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়েছে।
ড. ইউনূস বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা লক্ষ্য করছি-একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে নাগরিকদের মনে সন্দেহ, ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই-নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করা, জনগণের আস্থাকে দুর্বল করা।
তিনি বলেন, আমি আপনাদের অনুরোধ করছি-সতর্ক থাকুন, দায়িত্বশীল থাকুন। যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করবেন না। গুজবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা ও সত্য। নির্বাচন নিয়ে যারা বিগত মাসগুলিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল, তারা সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আপনারা সকল প্রকার অপপ্রচার থেকে নিজেদের মুক্ত রাখুন। তথ্য যাচাইয়ের জন্য সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখুন। নির্বাচনবন্ধু হটলাইন- ৩৩৩ এতে ফোন করে সঠিক খবর জেনে নিন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এখন নতুন করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নাকি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ কোনো দলের একক ইশতেহার নয়। দীর্ঘ নয় মাস ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদ প্রস্তুত করেছে। এই আলোচনায় অনেক প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষে দীর্ঘ মতবিনিময় শেষে রাজনৈতিক দলগুলো এতে স্বাক্ষর করেছে। এই সনদ জাতির ভবিষ্যৎ পথচলার এক ঐতিহাসিক দলিল, গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
‘এই সনদের মাধ্যমে আমরা সংস্কারসমূহ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছি। তবে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সমাজে সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ-এসবের সফল বাস্তবায়ন এককভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মতামত। কারণ একটি জাতীয় রূপান্তর কখনোই একক সিদ্ধান্তে বা একক শাসনের মাধ্যমে টেকসই হয় না। জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। পরিবর্তনের চূড়ান্ত বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকেই। তাই দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে জনগণকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়াই হলো গণতান্ত্রিক পথের মূল ভিত্তি।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই লক্ষ্যেই আমরা গণভোটের আয়োজন করেছি-যাতে দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কার-দিশা নির্ধারণে জনগণ সরাসরি নিজেদের মতপ্রকাশ করতে পারেন। এই গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখানে আপনার প্রতিটি ভোট আগামী দিনের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করবে। এর প্রভাব থাকবে বহু প্রজন্মজুড়ে।
তিনি আরও বলেন, এই ভোটের মাধ্যমেই আপনারা জানি জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কার কাঠামোকে এগিয়ে নিতে চান কি না। আপনাদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র কোন পথে অগ্রসর হবে, শাসনব্যবস্থা কোন কাঠামোয় গড়ে উঠবে এবং একটি নতুন বাংলাদেশ কীভাবে তার গণতান্ত্রিক ও মানবিক রূপ লাভ করবে।
‘এই গণভোটে আপনার একটি ভোট শুধু একটি কাগজে দেওয়া সিল নয়-এটি আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ, আপনার পরিবারের নিরাপত্তা এবং দেশের আগামী দিনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। আজ আপনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার প্রভাব পড়বে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে। এটি এমন একটি মুহূর্ত, যেখানে নাগরিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব ও অধিকার এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।
গণভোটে সবাইকে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নিশ্চিত করুন।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, নির্বাচন হয়ে গেলে নির্বাচিত সরকার দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তার সঙ্গে শেষ হবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এবং গৌরবের সঙ্গে নবনির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে, তাদের সাফল্য কামনা করে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ কাজে ফিরে যাবো। আমরা এই শুভ মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে দুই দেশের মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক, দুটি অনুদান চুক্তি এবং একটি অভিপ্রায়পত্র সই হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) এসব চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার এবং পারস্পরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়।
এদিকে বেসরকারি খাতে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ ছাড়া উপকূল নিরাপত্তায় বাংলাদেশকে ১৩.৪৪ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিতে চুক্তি সই করেছে জাপান সরকার।
বুধবার রাতে জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
তিনি জানান, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতে সহায়তা করবে জাপান। এ ছাড়া কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতে সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়েও আলাদা একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, সরকারি পর্যায়ের চুক্তি ও সমঝোতার পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে বর্তমান সরকার কাজ করছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে দেশটিতে চার দিনের সফরে আছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার সফরসঙ্গী হিসেবে আছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল।
দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভিত্তিতে নতুন সহযোগিতা কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুই দেশের অংশীদারত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়াই এই সফরের লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন উপলক্ষে আবাসস্থল পরিবর্তনের কারণে ভোটার স্থানান্তরের আবেদন জমা দেওয়ার সময় বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর (রোববার) পর্যন্ত এ আবেদন দাখিল ও গ্রহণ করা হবে।বুধবার (২৮ অক্টোবর) নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
এতে বলা হয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন উপলক্ষ্যে আবাসস্থল পরিবর্তনের কারণে ভোটার স্থানান্তরের আবেদন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ আগে ৩১ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ৩০ ও ৩১ অক্টোবর যথাক্রমে শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় পরবর্তী কর্মদিবস ১ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদনের সময় বাড়ানো হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনতেই হবে এবং এর কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে এ কথা জানান তিনি।সংবিধানের বিভিন্ন ধারা সংশোধন ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এই বৈঠকে। একইসঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিত করে তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও মতামতও সরাসরি শোনা হয়।
সভা শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বৈঠকের বিস্তারিত সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করলেও কী প্রক্রিয়ায় এই সরকার গঠন করা হবে, এর ক্ষমতা ও কার্যপরিধি কী হবে এবং নির্বাচনকালীন এই সরকারের মেয়াদ কত দিনের হবে— সেসব বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কী প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে, এর সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা ও কার্যপরিধি কেমন হবে এবং সংসদ ভেঙে দেওয়ার কত দিনের মধ্যে এই সরকার গঠন করতে হবে— এসব বিষয় গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সার্চ বডি গঠন কিংবা নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে যাতে পরবর্তীতে কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের সুযোগ না থাকে, সে বিষয়ে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করতে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, সমস্ত প্রস্তাব ও পর্যালোচনা শেষে যখন জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করা হবে, তখন সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে আরও নতুন পরামর্শ ও প্রস্তাব যুক্ত হতে পারে।
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’-এর বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, সনদে উল্লেখিত বিভিন্ন প্রস্তাবের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বৈঠকে র্যাঙ্কড চয়েস ভোটের প্রস্তাব নিয়ে কথা হলেও এ বিষয়ে কমিটির পক্ষ থেকে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত দেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্যদের বক্তব্য ছিল, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি সার্বিকভাবে সংসদে আলোচনার মাধ্যমেই চূড়ান্ত হওয়া উচিত। এর বাইরেও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জাতীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য যেকোনো নতুন ভালো প্রস্তাব আসলে তা সহানুভূতির সাথে পরীক্ষা করে দেখা হবে।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের কাছ থেকে প্রচুর প্রস্তাব পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকদের কাছ থেকে পাওয়া গঠনমূলক প্রস্তাবগুলো একত্র করে কমিটির পরবর্তী বৈঠকগুলোতে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হবে। তবে সব প্রস্তাব পর্যালোচনার প্রক্রিয়ায় থাকায় এখনো কোনো শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
বৈঠকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, হুমাম কাদের চৌধুরী, আনিছুর রহমান ও মোছা. তাহসিনা রুশদী উপস্থিত থেকে তাদের জীবনের ট্র্যাজিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা বিগত সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নির্যাতন, দীর্ঘদিনের আইনি সুরক্ষা না পাওয়া এবং ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার মর্মস্পর্শী বর্ণনা দেন। ভবিষ্যতে যাতে স্বাধীন বাংলাদেশে এ ধরনের মানবতাবিরোধী ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর কখনোই না ঘটে, সে জন্য সংবিধানে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ও শক্তিশালী পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
সংসদের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত এই যৌথ পর্যালোচনা বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
ছবি: সংগৃহীত
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় সম্পর্কে মতামত ও সুপারিশমালা প্রণয়নে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো জাতীয় গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থার বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সঞ্চালন-২ এর প্রধান প্রকৌশলী (অতিঃ দায়িত্ব) সৈয়দ এবাদুল্লাহ হায়দার আলীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এ কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এর আগে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিটে একযোগে রাজধানী ঢাকার পূর্বাঞ্চলের বড় একটি এলাকা এবং চট্টগ্রামের কিছু অংশে হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা পর যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে সচল হয় জাতীয় গ্রিড। এখন পর্যায়ক্রমে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করা হচ্ছে।
বিকেলে জাতীয় গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির পাঠানো বার্তায় বলা হয়, দুপুর আড়াইটায় জাতীয় গ্রিডের রিস্টোরেশন কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুতের সব গ্রিড লাইন ও গ্রিড উপকেন্দ্রগুলো চালু রয়েছে।
পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করা হচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষিপ্ত লোডশেডিংও কমে আসবে।
অনাকাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জনসাধারণের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ।