ছবি : সংগৃহীত
দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৯ নেতার ফাঁসির রায় প্রত্যাখ্যান করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে আইসিটি ট্রাইব্যুনাল বাতিল, দলীয় কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ ৯ দফা দাবি তুলে ধরেছে দলটি। গত শুক্রবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এসব দাবি জানানো হয়। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর এটিই ছিল আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথম বৈঠক। এ বৈঠকটি ভারতের নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার আবাসস্থলে হওয়ার কথা থাকলেও পরে ভার্চুয়ালি হয়েছে।
দলটির ভেরিফায়েড অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে গতকাল শনিবার প্রচারিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে দেশে বিদ্যমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উত্তরণ, তেল-গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। সভার প্রস্তাবে দ্রব্যমূল্য কমানো, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সরবরাহ নিশ্চিত, বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, রাজবন্দিদের মুক্তি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাসহ গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দাবি করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বিদ্যমান অবস্থা থেকে দেশকে রক্ষা করতে দেশে ফেরার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
দলের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের সঞ্চালনায় বৈঠকে বক্তব্য দেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, সুজিত রায় নন্দী, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আরাফাত, উপাধ্যক্ষ রেমন্ড আরেং প্রমুখ।
গাজী মো. নজরুল ইসলাম
অবশেষে মুখ খুলেছেন নারীসহ ভাইরাল হওয়া সেই জামায়াতে ইসলামীর সদস্য ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মো. নজরুল ইসলাম। দল থেকে বহিষ্কারের প্রায় দুই মাস পরও নিজেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সদস্য ও সংসদ সদস্য হিসেবে দাবি করেছেন তিনি। তার এই দাবির সঙ্গে একমত নয় জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা বলছেন, বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল আর জামায়াতের সদস্য নন।
গণমাধ্যমকে গাজী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে তার দাবি, দলের সদস্যপদ এখনো বহাল রয়েছে। তার ভাষ্য, ‘আল্লাহর রহমতে সদস্যপদ এখনো আছে’ এবং খাতা-কলমে তিনি জামায়াতের সদস্য হিসেবেই রয়েছেন। দল তার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য দিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান তিনি।
তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. ইজ্জতুল্লাহ বলেন, গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
একই কথা জানিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কারের পর স্পিকার, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গত ২২ জুলাই নৈতিক স্খলনের অভিযোগে গাজী মো. নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী।
এরপর তার সংসদ সদস্যপদ নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেয় দলটি।
এমপি পদ থাকবে কি না, সিদ্ধান্ত কার?
দলীয় সদস্যপদ হারানোর পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ কীভাবে বহাল থাকবে, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়। তিনি দলীয় এমপি হিসেবে থাকবেন, নাকি স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন—এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
জামায়াতের পক্ষ থেকে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো জানা যায়নি। ফলে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ নিয়ে আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ লোগো
জুলাই সনদে সই করা রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে আজ রোববার মতবিনিময় করবে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। এতে অংশ নিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও দলটি বৈঠকে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে জুলাই সনদ ও গণভোটের সিদ্ধান্তের আলোকে সংবিধান সংস্কার করা উচিত। দলটির মতে, গণভোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
এ কারণে আজকের মতবিনিময় সভায় অংশ নেবে না বলে জানিয়েছে দলটি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সহকারী মহাসচিব ও বিভাগীয় প্রধান শেখ ফজলুল করীম রোববার এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হওয়া উচিত। এ বিষয়ে দলের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গত ছয় মাসের ‘সাফল্য’ তুলে ধরে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া ওই পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ চারটি বিষয় মন্ত্রীর ‘উল্লেখযোগ্য সাফল্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি মন্ত্রীর ছেলে ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে কয়েকটি অভিযোগ ও মন্তব্য করেছেন।
পোস্টে হাসনাত লিখেছেন, গত ছয় মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য— ১. ছেলের বিসিবির ডিরেক্টর হওয়া। ২. প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কমিশনের জাপানি কোম্পানির লোকাল এজেন্ট হিসেবে কাজ পাওয়া এবং সচিবদের সঙ্গে মিটিং করার সুযোগ তৈরি করা। ৩. বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ম্যানেজমেন্টের লোকাল এজেন্ট হিসেবে কাজ পাওয়ার চেষ্টায় এগিয়ে থাকা। ৪. ছেলের শিক্ষক থেকে ব্যবসায়ী হয়ে ওঠা।
পোস্টের শেষে তিনি আরও লেখেন, ‘সব মিলিয়ে, গত ছয় মাসে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার কতটা উন্নতি হয়েছে জানি না, তবে উনার পকেটের উন্নতির গতিটা বেশ লক্ষণীয়।‘
হাসনাতের এমন পোস্টে ইতোমধ্যে সাড়ে ছয় হাজারের মতো শেয়ার ও সাড়ে ৫ হাজারের মতো কমেন্ট পড়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এখনও কিছু বলেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে মন্ত্রী বলেছেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে জনগণের অধিকার হরণ এবং গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে। যারা অতীতে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে, তাদের স্থান হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। তারেক রহমানকে নির্ধারণ করতে হবে, তিনি কীভাবে ক্ষমতা থেকে চলে যাবেন।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ঢাকা টু রংপুরমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে নাহিদ ইসলাম এ কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘তিনি (তারেক রহমান) কি হেলিকপ্টারে করে দেশ থেকে পালিয়ে যাবেন, নাকি সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করবেন, সে সিদ্ধান্ত তাঁকে নিতে হবে। এরশাদও সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন। তারেক রহমানকে তাঁর যাওয়ার রাস্তা নিজেকে বাছাই করে নিতে হবে।’
সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে সরকার গুম আইন, মানবাধিকার আইন পাস করেছে। র্যাবের নাম বদলে এসআরবি করেছে। সরকারের কাজ মানবাধিকারের সুরক্ষা দেওয়া, কিন্তু তারা মানবাধিকার হরণ করার সব ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে।
শেখ হাসিনার সরকার যেসব আইন ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের অধিকার হরণ করেছে, বর্তমান সরকারও একই আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করা শুরু করেছে বলেও অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
লংমার্চের পক্ষে গণজোয়ার শুরু হয়েছে উল্লেখ করে এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, গণজোয়ার প্রতিরোধ করতে গতকাল রাত থেকে লংমার্চের পথে থাকা ১১দলীয় ঐক্যের ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে এই কাজে যোগ দিয়েছে সিটি করপোরেশন। ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে লংমার্চের গণজোয়ার বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বিরোধী দলের লংমার্চে দফা বাড়ছে। তবে সব দফা গিয়ে ঠেকবে এক দফায়। এ জন্য প্রস্তুতি নিতে ১১-দলীয় ঐক্যের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে সমাপনী বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম ও দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম।
আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) প্রমুখ।
জামায়াত আমির শফিকুর রহমান
১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চের আট দফা যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে বলে সরকারকে হুঁশিয়ার করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, বিরোধী দলের ৮ দফা ৯ দফা, ১০ দফায় পরিণত হতে পারে। আবার জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় এটি এক দফায় পরিণত হতে পারে।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে রংপুরমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন।
সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের আট দফা এক দফায় পরিণত হলে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে। সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আগে সরকার যেন সাম্প্রতিক অতীত থেকে শিক্ষা নেয়। সেই শিক্ষা নিয়ে সরকার যেন জনগণের দাবি মেনে নেয়। দাবি মানতে ব্যর্থ হলে কোনো চোখরাঙানিতে কাজ হবে না। বিরোধী দল কোনো কিছুতেই পরোয়া করবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ সফল হওয়ায় অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে। এর কিছু লক্ষণ দুই দিন ধরে রাজধানীতে দেখা যাচ্ছে। তারা যেন হতাশ হয়ে মাথা গরম না করে জনতার দাবি মেনে নেয়।
বিরোধী দল দলীয় কোনো দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামেনি উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা ১৮ কোটি মানুষের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি। আজকে ১৮ কোটি মানুষ ১১ দলের সঙ্গে আছে। সেই দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব ইনশা আল্লাহ।’
সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চে দেশব্যাপী জোয়ার তৈরি হয়েছে। তাই সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন কথা বলছেন। বিরোধী দলের লংমার্চ শান্তিপূর্ণ হবে বলে জানান তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী দলের লংমার্চ শান্তিপূর্ণ হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন ও লড়াই চলবে।
জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম এবং দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম।
আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) প্রমুখ।
চট্টগ্রামের ছয় দাবি, রংপুরে আরও দুই
৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চে ছয় দফা দাবি সামনে রেখেছিল ১১ দল। দাবিগুলো ছিল গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি তেল-গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ।
রংপুরের কর্মসূচিতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি। অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতির বিষয়গুলোর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের একটি আঞ্চলিক ইস্যুকেও সামনে এনেছে জোট। জোটের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের মানুষের দাবিকে বিবেচনায় নিয়েই তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে কর্মসূচির অংশ করা হয়েছে।
সামনে আরও দুই লংমার্চ
১১-দলীয় ঐক্যের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ হবে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম, রংপুর, খুলনা ও সিলেট-দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের দিকে ধারাবাহিক লংমার্চের কর্মসূচি নিয়েছে ১১-দলীয় ঐক্য।
১১-দলীয় ঐক্যের সূত্রগুলো বলছে, লংমার্চ ও সমাবেশ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক দাবিগুলোকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি জুলাই সনদ মেনে সংবিধান সংস্কারে সরকারকে চাপে রাখার বিষয়টিও আছে।
লংমার্চ কর্মসূচি শেষ করে ঢাকায় সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে ১১-দলীয় ঐক্য। তবে জোটের সূত্র বলছে, ঘোষিত চারটি লংমার্চ কর্মসূচি শেষে আরও কিছু বিভাগীয় শহরে লংমার্চ হতে পারে।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন, “জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন সংশোধনের সময় জামায়াতে ইসলামী তাদের নাম মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করেছিল। সংসদে আইনটি পাসের সময় জামায়াতে ইসলামী কোনো ‘না’ ভোট দেয়নি। এর অর্থ, ‘না’ ভোট না দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী দল তার ১৯৭১ সালের ভূমিকা পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে।”
আজ শুক্রবার রাজধানীর লেকশোর গ্রান্ডে জামায়াতের সাবেক নেতা ও সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: এর ইতিহাস ও রাজনীতি’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ, গবেষক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ ও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা বইটি প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।
জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে ১৯৭১ সালের অপরাধের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর লেখা প্রকাশিত বইয়ে এ সংক্রান্ত তথ্য উঠে এসেছে।
বিষয়টি আলোচনায় টেনে এনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ব্যারিস্টার রাজ্জাক যে রাজনৈতিক দর্শন এবং নীতি অনুসরণ করেন তার আলোকে ২০১৬ সালে একটি বিবৃতি (স্টেটমেন্ট) খসড়া করেছিলেন। যেখানে তিনি একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকাকে জাতির সামনে আনার চেষ্টা করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘সেই স্টেটমেন্টটা যদি ২০১৬ সালে স্বাক্ষর করা হতো, তাহলে জামায়াতের অনেক প্রশ্নের সমাধান হতো।’
আসাদুজ্জামান আরও বলেন, ‘প্রকাশিত এই বইটিতে জামায়াতের অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়েছে। আজকে জামায়াতের যারা প্রথম সারির আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট বা আমাদের এই অঙ্গনে পরিচিত জামায়াতের নেতারা আছেন আমার প্রত্যাশা ছিল আজকের আলোচনায় তারা থাকবেন। তারা কেউ উপস্থিত হতে পারেননি। এটা তাদের দীনতা, এটা তাদের ব্যর্থতা, এটা তাদের সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা। তারা উপস্থিত হয়ে বইয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারতেন, কারণ এটাই গণতন্ত্র। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সব কথার সঙ্গে একমত হবেন এটা যেমন সত্যি না, আবার তাঁর সমালোচনা গ্রহণ করতে পারবেন না- এটাও সঠিক না। এই বইয়ের মধ্যে বিএনপি সম্পর্কে সমালোচনা করা হয়েছে, ভালো, আমরা এটা গ্রহণ করি। আমরা যদি এটা ধারণ করতে না পারি, সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো না।’
তিনি বলেন, ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২ এ মুক্তিযোদ্ধাদের একটা সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেই সংজ্ঞার মধ্যে ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের বিরোধিতা করেছিল, সেই কথাটি নিবন্ধিত করা আছে। এটাতে ২০২৫ সালের সংশোধনীতে কিছু সংশোধনী আনা হলো। আমরা ২০২৬ সালে এটা সংসদ অধিবেশনে কার্যকর করতে গেলে বিশেষ কমিটিতে এই বিষয়টা আনা হয়। তখন দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জামায়াতের নামটা এখান থেকে বাদ দেওয়া যাবে কিনা।’
আইনমন্ত্রী বলেন, “সেখানে সংশোধনীতে বলা হলো যে, ‘মুক্তিযোদ্ধা কারা?’ সংজ্ঞায় বলা আছে, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, রাজাকার, আল বদর, জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামী পার্টির বিরোধিতা করেছেন, সংগ্রাম করেছেন দেশ স্বাধীনের জন্য- তারা হলেন মুক্তিযোদ্ধা। জামায়াতের দাবি ছিল, জামায়াতের নামটা ওখান থেকে বাদ দিয়ে দেওয়ার জন্য। আমরা বললাম, ঐতিহাসিক সত্যটাকে আমরা তো অস্বীকার করতে পারি না। আলোচনার এক পর্যায়ে এসে ওখানে শুধু লেখা হলো ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’, ‘তৎকালীন মুসলিম লীগ’, ‘তৎকালীন নেজামে ইসলাম’। পরে পার্লামেন্টে এই আইনটা উপস্থাপন করা হলো। আপনারা জানেন যে, পার্লামেন্টে আইন পাস করতে গেলে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোট দেওয়ার বিধান রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর কোনো সদস্য এতে ‘না’ ভোট দেননি। এটা রেকর্ডেড।”
অনুষ্ঠানে প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা বইটিকে ‘জ্ঞানকোষ’ বলে অভিহিত করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এই বইটি আমার কাছে সাহিত্য বা গবেষণাধর্মী মনে হয়নি। এটা জীবন্ত এক মানুষের এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো মনে হয়েছে। ব্যারিস্টার রাজ্জাক একটা সমাজকে তাঁর জীবন দিয়ে যেভাবে দেখেছেন, তাঁর জীবন দর্শন যেমন ছিল এই বইটা তাঁর একটা প্রতিচ্ছবি।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের চিন্তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু একটা মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জায়গা থেকে আমার ধারণা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা বইটি একজন আইনবিদের জন্য লিখিত গদ্য।’
তিনি বলেন, ‘ইসলামিক শাসন কায়েম করে চাপিয়ে দেব, সেটা একটা ভ্রান্তনীতি। বরং সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের আলোকে একটি রাষ্ট্র গঠিত হোক, রাষ্ট্র পরিচালিত হোক- সেটাই হবে প্রকৃত ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের সঠিক পথ।’
প্রসঙ্গত, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: এর ইতিহাস ও রাজনীতি’ বইয়ে এ বিষয়টিসহ নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।