ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৪:৪৪ পিএম

সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মদিনায় ওমরাহ ও ভিজিট ভিসায় আসা আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের জন্য ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের এক নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন থেকে সংক্ষিপ্ত মেয়াদের ভিসাধারীরা মসজিদে নববিতে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের অধীনে পবিত্র কোরআন শিক্ষা এবং ঐতিহাসিক মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আরবি ভাষা শেখার সুযোগ পাবেন।


আগে স্বল্পমেয়াদে মদিনায় আসা দর্শনার্থীদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। সম্প্রতি সৌদি আরব সরকারের নেওয়া নতুন এই সিদ্ধান্ত ওমরাহ ও জিয়ারতের সফরের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।


মসজিদে নববিতে বিনামূল্যে কোরআন শিক্ষা


মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে প্রতিদিন কোরআন পাঠদান কর্মসূচি পরিচালনা করছে দুই পবিত্র মসজিদের বিষয়াবলি সংক্রান্ত জেনারেল অথরিটি। 


নতুন নিয়মানুযায়ী, ওমরাহ বা যেকোনো ধরনের ভিজিট ভিসা নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা কোনো ধরনের ফি বা খরচ ছাড়াই এসব ক্লাসে অংশ নিতে পারছেন।


শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে এসব শিক্ষাক্রমকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। একদম শিক্ষানবিশদের জন্য রয়েছে বর্ণমালা ও সহিহ-শুদ্ধ কোরআন পাঠ শেখার ব্যবস্থা। উন্নত স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য তাজবিদ, হিফজ এবং কোরআনের তাফসির শেখার বিশেষ সুযোগ রয়েছে।


একটি নির্দিষ্ট অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে নিবন্ধন করে দর্শনার্থীরা নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অধীনে সরাসরি ক্লাসে যুক্ত হতে পারছেন।


মসজিদে নববিতে বসে জ্ঞানচর্চার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, কেউ যদি ভালো কিছু শেখা বা শেখানোর উদ্দেশ্যে তাঁর মসজিদে আসে, সে মহান আল্লাহর পথে লড়াইকারী মুজাহিদের সমতুল্য মর্যাদা লাভ করবে। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২)


মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ সপ্তাহের আরবি কোর্স


মসজিদে নববির কোরআন ক্লাসের পাশাপাশি অনারব দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ঐতিহ্যবাহী মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। ভিজিট ভিসাধারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছয় সপ্তাহের ‘আরাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স’ চালু করা হয়েছে।


নির্ধারিত ফির বিনিময়ে পরিচালিত এই কোর্সে আধুনিক শিখনপদ্ধতির মাধ্যমে আরবি পড়া, লেখা ও দৈনন্দিন কথোপকথনের দক্ষতা অর্জন করা যাবে।


একাধিক মডিউলে সাজানো এই কোর্সে ধাপে ধাপে ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি মসজিদে নববির খুব কাছেই অবস্থিত হওয়ায় দর্শনার্থীদের জন্য যাতায়াতও বেশ সুবিধাজনক।


অংশগ্রহণ করবেন কীভাবে


মসজিদে নববির ফ্রি কোরআন ক্লাস এবং মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় সপ্তাহের আরবি কোর্স-এই দুটি সুযোগ মিলিয়ে দর্শনার্থীরা প্রায় দুই মাসের এক অনন্য শিক্ষাসফরের সুযোগ পাচ্ছেন।


দুই থেকে তিন মাসের ভিজিট ভিসায় আসা পুণ্যার্থীরা কেবল ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘুরে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এই সময়টুকু জ্ঞানার্জনে কাজে লাগাতে পারবেন। নিচের লিংকে ক্লিক করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করে নিতে পারবেন।


মসজিদে নববির কোরআন ক্লাস: https://reg.qm.edu.sa/Minton/Account/NewRegistration 


মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স: https://ala.asaqefah.sa/ 


ওমরাহ ও মদিনা জিয়ারতে আসা হাজার হাজার আন্তর্জাতিক পুণ্যার্থী এই উদ্যোগের ফলে ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে মদিনায় প্রবেশ করলে খুব সহজেই এই ঐতিহাসিক শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া সম্ভব।


সূত্র: দি ইসলামিক ইনফরমেশন ডট কম




  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১১:২৫ এএম

পরিস্থিতি সবসময় একরকম যায় না। কখনও এমন কিছুর মুখোমুখি হতে হয়, যার জন্য আমরা প্রস্তুত নই। তখন ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় হয় এবং মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার সঙ্গেই কেন এমন হয়?’


মুমিন হবে ইতিবাচক


মুমিনের জীবনদর্শন ভিন্ন রকম। সে জানে, মানুষ পরিকল্পনা করে, আর আল্লাহও পরিকল্পনা করেন। তবে আল্লাহর পরিকল্পনা  পূর্ণাঙ্গ, দূরদর্শী ও কল্যাণময়। এই আস্থা যদি অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যায়, তাহলে আর  ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয় না।


পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আবার কোনো বিষয়কে পছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)


কীভাবে আস্থা অর্জন করব


আল্লাহর সিদ্ধান্তে আস্থা রাখা কঠিন কোনো বিষয় নয়। পাঁচটি উপায় অনুসরণ করলে খুব সহজেই তা অর্জন করা যায়। 


১. মনে করুন, ‘আমি কিছুই জানি না’


মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ভবিষ্যত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়। আজকের ব্যর্থতাকে সে চূড়ান্ত ব্যর্থতা মনে করে বসে। অথচ সে জানে না, এই ব্যর্থতার ভেতরেই ভবিষ্যতের বড় কোনো কল্যাণ লুকিয়ে আছে। বিপদের সময় বারবার স্মরণ করুন, যে দরজাটি আজ বন্ধ হয়েছে, সেটিই হয়তো আপনার জন্য কল্যাণকর ছিল না। যে সুযোগটি হাতছাড়া হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারত।


কোরআনের এক আয়াত এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে, ‘আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)


২. দায়িত্ব পালন করুন


চেষ্টা করা আপনার দায়িত্ব, ফলাফল আল্লাহর হাতে। চাকরি চাইলে আবেদন করুন, প্রস্তুতি নিন, দক্ষতা বাড়ান। পরীক্ষায় ভালো করতে চাইলে পড়াশোনা করুন। ব্যবসা করতে চাইলে পরিকল্পনা করুন। সম্পর্ক ভালো রাখতে চাইলে আন্তরিক হোন। মোটকথা নিজের দায়িত্ব যথাযথ পালন করুন। চেষ্টা করার পর ফলাফল আশানুরূপ না হলেও মনে রাখুন, আপনার দায়িত্ব ছিল চেষ্টা করা, আপনি তা করেছেন। ফলাফল নির্ধারণ করা আপনার দায়িত্ব নয়।


হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তিকে তার উট ছেড়ে দিয়ে বলেছিল, ‘আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি।’ তখন নবীজি (সা.) তাকে বলেছিলেন, ‘আগে উটটি বেঁধে নাও, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)


৩. ‘যদি’ বলা কমিয়ে দিন


অতীতের কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব বেশি অনুশোচনা করা থেকে বিরত থাকুন। এর ফলে অনেক সময় মানুষ আল্লাহর উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।


> ‘যদি সেদিন এটা করতাম’


> ‘যদি ওই চাকরিটা নিতাম’


> ‘যদি তখন তাকে বিশ্বাস না করতাম’


এভাবে বর্তমানকে অতীতের ‘যদি’র কাছে বন্দী করে ফেলাটা অনুচিত। ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু অনুশোচনায় আটকে গেলে চলবে না। 


রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বলের তুলনায় আল্লাহর কাছে উত্তম ও অধিক প্রিয়। প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যাতে তোমার উপকার তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না। আর যখন কোনো বিপদ আপতিত তখন এভাবে বলো না, ‘যদি আমি এমন করতাম’ তাহলে এমন এমন হত।বরং এভাবে বলেবে, ‘আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে।’ কারণ ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের পথ খুলে দেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)


৪. আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা রাখুন


বিপদে পড়েলে অনেক সময় মনে হয়, ‘আল্লাহ হয়তো আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন।’


এই ধারণা মারাত্মক বিপজ্জনক। কারণ মুমিনের উচিত আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা। কেননা আল্লাহ-তাআলা কখনও বান্দাকে তার আপন অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন না। 


হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি সেরূপই, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাকে নিজে স্মরণ করি। আর যদি সে লোক-সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই, যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়; আমি তার দিকে দু হাত অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৫০৫)


তাই বিপদের সময় মনকে বলুন, আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে না। এই বিশ্বাস মনের অস্থিরতা কমিয়ে দেবে এবং আল্লাহ ওপর আস্থা রাখা সহজ হয়ে যাবে। 


৫. আন্তরিক দোয়া চালু রাখুন 


মুমিনের দোয়া তার শক্তিশালী হাতিয়ার। এর মাধ্যমে বান্দা নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে অসীম ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। দোয়ার পর  কোনো কিছু না পাওয়া মানেই আল্লাহ তা কবুল করেননি—এমন নয়। কখনো তিনি চাওয়া জিনিসটি দেন, অথবা তার চেয়ে উত্তম কিছু দেন, আবার কোনো অদৃশ্য ক্ষতি থেকে আপনাকে রক্ষা করেন। এ জন্যই ভরসা রাখতে হয়।


পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)


আল্লাহর সিদ্ধান্তে ওপর আস্থা রাখা একজন মুমিনের জন্য পরম অনন্দের বিষয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর আস্থা রাখে, সে ব্যর্থ হলেও ভেঙে পড়ে না, অপেক্ষা করেও হতাশ হয় না, কোনো কিছু হারালেও আল্লাহর প্রতি অভিযোগ তুলে না। 


কারণ সে জানে, আমার জন্য কোনটি কল্যাণকর আমার চেয়েও আল্লাহই ভালো জানেন। এই বিশ্বাসের নাম তাওয়াক্কুল। এখানেই লুকিয়ে আছে মুমিনের প্রশান্তির রহস্য।


  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১০:৪৯ এএম
  • আপডেট : শুক্রবার ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ২:০১ পিএম


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১০:৪৯ এএম

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর)। আজ দুর্গাষষ্ঠী। মহাষষ্ঠীর অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। আগামী বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমী পর্যন্ত ছয় দিন মুখর থাকবে পূজামণ্ডপগুলো।


প্রচলিত নিয়মে দুর্গাপূজা মূলত মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে উদযাপিত হয়। তবে এ বছর মহাসপ্তমীর তিথি দুদিন পড়ায় শারদীয় দুর্গাপূজা এক দিন বেড়ে চলবে ছয় দিন ধরে। এ হিসাবে আগামী শনিবার মহাসপ্তমী, রোববার মহাসপ্তমী (অধিক পূজা), সোমবার মহাষ্টমী ও কুমারী পূজা এবং মঙ্গলবার মহানবমী শেষে বুধবার বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ছয় দিনের শারদীয় দুর্গোৎসব।


এবার দেবী দুর্গা আসছেন ঘোটকে (ঘোড়ায়)। বিদায় নেবেন নৌকায়। হিন্দু শাস্ত্রমতে, শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী বাপের বাড়ি বেড়াতে মর্ত্যলোকে আজ আসছেন। অসুর শক্তির কাছে পরাভূত দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হয়েছিলেন। এই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে একত্র হন দেবতারা। অসুর শক্তির বিনাশে অনুভূত হলো এক মহাশক্তির আবির্ভাব। দেবতাদের তেজরশ্মি থেকে আবির্ভূত হলেন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা।


বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে রেকর্ড সংখ্যক দুর্গাপূজা। এবার সারাদেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা গত বছরের চেয়ে ৪৯৬টি বেশি। তবে ঢাকা মহানগরীতে রাস্তার ওপর পূজা আয়োজনের অনুমতি না পাওয়ায় মণ্ডপের সংখ্যা ৩টি কমে দাঁড়িয়েছে ২৫৮টিতে। 



প্রতীকী ছবি

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:২৫ এএম

ফরজ নামাজের পর মহান আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ নামাজ তাহাজ্জুদ। নবীজি (সা.) বলেন, “ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদ।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)


সাধারণত এশার ফরজ নামাজ আদায়ের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে কিছুটা ঘুমিয়ে নিয়ে এই নামাজ আদায় করতে হয়। বিশ্বাস করা হয়, এ সময়ে বান্দার যেকোনো কল্যাণকর আবেদন ও তওবা সরাসরি কবুল করা হয়।


কিন্তু আধুনিক যুগের ব্যস্ত জীবনযাত্রা, রাত জাগার অপসংস্কৃতি এবং অলসতার কারণে শেষ রাতে ঘুম থেকে ওঠা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কীভাবে প্রাত্যহিক জীবনের অংশ বানিয়ে নিয়মিত ও সহজে তাহাজ্জুদের জন্য জাগা যায়, তারই সহজ ও কার্যকরী ৬ উপায় তুলে ধরা হলো।


১. খাঁটি সংকল্প


তাহাজ্জুদ পড়ার ইচ্ছা শুধু কোনো দুনিয়াবি চাওয়া-পাওয়া পূরণের জন্য হওয়া উচিত নয়; বরং অন্তরের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সুদৃঢ় নৈকট্য লাভ।


জীবনের যেকোনো কঠিন মোড়ে আল্লাহর হেদায়েত চাওয়ার নিয়ত থাকলে অলসতা দূর হয়ে যায়। অন্তরে যদি খাঁটি সংকল্প থাকে, তবে বিশ্বজাহানের মালিকই বান্দার জন্য ঘুম ভাঙা সহজ করে দেন।


২. ঘুমানোর পূর্বে প্রার্থনা করা


রাতে ঘুমোতে যাওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে মহান আল্লাহর কাছে ব্যাকুল হয়ে দোয়া করা উচিত, ‘হে আল্লাহ! আমাকে শেষ রাতে আপনার দরবারে সেজদানত হওয়ার জন্য জাগিয়ে দিন’।


বান্দা যখন নিভৃতে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার আকুতি জানিয়ে দোয়া করে, তখন পরম করুণাময় সেই শুভ ইচ্ছা কখনো ফিরিয়ে দেন না। দোয়ার মাধ্যমে ঘুমের ওপর আত্মিক প্রভাব তৈরি হয়।


৩. ‘আর্লি বার্ড’ হওয়া


তাহাজ্জুদের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া। রাত জেগে অনর্থক সময় নষ্ট না করে এশার পর জলদি ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।


প্রতিটি মানুষের ঘুমের নির্দিষ্ট শারীরিক চাহিদা থাকে; কারো ৬ ঘণ্টা আবার কারো ৮ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। নিজের শারীরিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ঘুমানোর সময়সূচি নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে সকালে প্রফুল্ল মনে জাগা যায়।


অনেকে তাহাজ্জুদ পড়ে কিছু সময় ঘুমিয়ে পুনরায় ফজরে ওঠেন, আবার অনেকে একবারে জেগে তাহাজ্জুদ আদায় শেষে জিকির করে ফজরের নামাজ পড়েন—উভয় পদ্ধতিই সুবিধাজনকভাবে অনুসরণ করা যেতে পারে।


৪. অ্যালার্ম সেট করা


ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য অ্যালার্ম দিয়ে রাখা একটি চমৎকার কৌশল। প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে জেগে উঠলে শরীর ও মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই বায়োলজিক্যাল রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।


প্রথম কিছুদিন কিছুটা কষ্ট হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ম ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ভেঙে যাওয়া স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়।


৫. ওজু করে পবিত্র অবস্থায় ঘুমানো


রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অজু করে পবিত্রতা অর্জন করা সুন্নাহসম্মত একটি আমল। শরীর যখন পবিত্র থাকে এবং অন্তরে আল্লাহকে পাওয়ার বাসনা থাকে, তখন মহান আল্লাহ রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায়ের ইচ্ছা পূরণ করা অনেক সহজ করে দেন। ওজু অবস্থায় ঘুমালে বান্দার জন্য ফেরেশতারাও দোয়ায় রত থাকেন।


৬. ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হওয়া


যেকোনো নতুন অভ্যাসের ক্ষেত্রে শুরুতেই অতিরিক্ত কঠোর হওয়া ঠিক নয়। প্রথম প্রথম নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অল্প কয়েক রাকাত দিয়ে শুরু করতে হবে। হঠাৎ একসঙ্গে এত বেশি সময় বা রাকাত আদায় করা অনুচিত, যার ফলে পরবর্তীতে ফজরের নামাজই হাতছাড়া হয়ে যায় কিংবা কাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়।


মহানবী (সা.) বলেছেন, “রাতের বেলা নামাজ আদায় করো যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তবেই তোমরা পরম শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৮৫)


তবে যেকোনো ভালো আমল অল্প হলেও নিয়মিত বজায় রাখাই হলো নববি কৌশল।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:৩৭ এএম

ইসলামে নেতৃত্ব একটি পবিত্র আমানত এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। রাসুল (সা.) ছিলেন সামগ্রিক আধ্যাত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের অধিকারী। জীবনের সব ক্ষেত্রে তিনি আদর্শ।


তিনি প্রত্যেক মুসলিমকে নেতৃত্বের দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত করে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৩৮)


নবীজির জীবনে নেতৃত্বের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য ছিল। সেখান থেকে অন্যতম ও মৌলিক কয়েকটি গুণাবলি এখানে তুলে ধরা হলো।


১. সততা ও বিশ্বস্ততা


নবীজির সততা ও বিশ্বস্ততা ছিল সর্বজনস্বীকৃত। তাঁর পরম শত্রুও তাঁকে মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি এবং আল-আমিন (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। ব্যবসায়িক লেনদেন থেকে শুরু করে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত তিনি সততা ও বিশ্বস্ততার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।


এ বিষয়ে সতর্ক করে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যার বিশ্বস্ততা নেই, তার ইমান নেই; আর যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তার ধার্মিকতা নেই।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৩৮৩)


২. দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি


আবু জর (রা.) বলেন, আমি বললাম, ‘আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আমাকে কোনো (রাষ্ট্রীয়) পদে নিযুক্ত করবেন না?’


তখন তিনি তাঁর হাত দিয়ে আমার কাঁধে চাপ দিলেন এবং বললেন, ‘আবু জর, তুমি তো একজন দুর্বল মানুষ (নেতৃত্বের ভার বহন করার ক্ষেত্রে) আর দায়িত্ব হলো একটি আমানত। আর কেয়ামতের দিন এটি হবে শুধুই লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ। তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে ন্যায়ের সঙ্গে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং অর্পিত সব হক ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৫)


৩. স্পষ্টভাষী


রাসুল (সা.) সাবলীল ও স্পষ্টভাবে কথা বলতেন ও যোগাযোগ করতেন, যাতে শ্রোতারা সহজে তাঁর উদ্দেশ্য ও বক্তব্য বুঝতে পারে। এ সম্পর্কে আনাস (রা.) বলেন, ‘নবীজি যখন কোনো কথা বলতেন, তখন তিনি তা (প্রয়োজনবোধে) তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন, যাতে তাঁর কথাটি সঠিকভাবে বোঝা যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫)


৪. বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ


রাসুল (সা.) ছিলেন অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার অধিকারী। হিজরতের আগে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে কোরাইশদের মধ্যকার বিরোধ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মেটানো এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সন্ধি তাঁর অনন্য প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করে।


এ জন্যই তিনি বলেছেন, ‘প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য ও বিচক্ষণতা হলো মুমিনের হারানো ধন। যেখানেই সে তা পাবে, সেটির সবচেয়ে বেশি হকদার হবে সে-ই।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৬৮৭)


৫. ন্যায়বিচার নিশ্চিতকারী


ইনসাফ ছিল রাসুলের নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তিনি সামাজিক অবস্থান, বংশীয় মর্যাদা বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে কখনো কোনো বৈষম্য করেননি। আইনের দৃষ্টিতে ধনী-দরিদ্র, মুসলিম-অমুসলিম সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে আপন পরিবারের ওপরও আইন প্রয়োগের দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছিলেন।


নিজেই বলেছেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল শুধু এই কারণে যে যখন তাদের মধ্যে কোনো সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ চুরি করত, তখন তারা তার ওপর দণ্ডবিধি কার্যকর করত; আর যখন কোনো প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যদি (নবী-কন্যা) ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৮৭)


৬. দয়ালু ও সহানুভূতিশীল


সহানুভূতি ও দয়া ছিল নবীজির নেতৃত্বের প্রধানতম ভূষণ। তিনি সাহাবিদের ক্ষুদ্রতম দুঃখ বা কষ্টও অনুভব করতেন এবং তাঁদের জন্য চিন্তিত থাকতেন।


কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের নিকট একজন রাসুল এসেছেন, তোমাদের যা কিছু কষ্ট দেয়, তা তার নিকট খুবই কষ্টদায়ক। সে তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি করুণাসিক্ত, বড়ই দয়ালু।’ (সুরা তওবা, আয়াত: ১২৮)


৭. পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া


পেশাদার জীবনে একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে কাজ করা রাসুলের নেতৃত্বের মৌলিক নীতি। তিনি সাহাবিদের সঙ্গে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত পরামর্শের (শুরা) মাধ্যমে গ্রহণ করতেন।


আবু হোরাইরা (রা.) বলেন, ‘আমি নবীজির চেয়ে অন্য কাউকে তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে বেশি পরামর্শ করতে দেখিনি। নবীজির এই আদর্শের পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ বলেছেন, ‘এবং তাদের (মুমিনদের) কাজসমূহ সম্পন্ন হয় নিজেদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৩৮)।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৭১৪)


৮. যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন


পেশাগত ক্ষেত্রে যেকোনো কাজের সফলতা নির্ভর করে সঠিক ব্যক্তিকে উপযোগী দায়িত্ব দেওয়ার ওপর। মহানবী (সা.) যোগ্যতা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতেন। অযোগ্য লোকের হাতে দায়িত্ব অর্পণ সমাজ বা জাতির ধ্বংস ডেকে আনে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।


এক বেদুইন নবীজিকে প্রশ্ন করল, ‘কেয়ামত কবে হবে?’ তিনি বললেন, ‘যখন আমানত (সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা) হারিয়ে যাবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা কোরো।’ বেদুইন লোকটি পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কীভাবে আমানত হারিয়ে যাবে?’


নবীজি উত্তর দিলেন, ‘যখন কোনো দায়িত্বশীল পদ বা ক্ষমতা অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে অর্পণ করা হবে, তখন তুমি কেয়ামতের প্রতীক্ষা কোরো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯)


৯. সেবামূলক নেতৃত্ব


নবীজির দৃষ্টিতে নেতৃত্ব হলো মানুষের সেবা করার সুবর্ণ সুযোগ। একজন নেতা নিজেকে প্রভু ভাববেন না, বরং অধীনস্থদের কল্যাণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সেবক মনে করবেন।


তিনি বলেছেন, ‘সফর অবস্থায় দলের নেতাই হলেন মূলত তাঁদের সেবক। সুতরাং যে ব্যক্তি সেবা করার মাধ্যমে অগ্রগামী হয়, অন্য কোনো আমল দিয়ে তাকে ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়—একমাত্র শহীদ হওয়া ছাড়া।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস: ৮০৫০)


১০. দলগত কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ


তিনি সাহাবিদের শুধু আদেশ করতেন না, বরং নিজে দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে কাজ করে জীবন্ত আদর্শ স্থাপন করতেন। মসজিদে নববি নির্মাণ বা খন্দকের যুদ্ধের পরিখা খননে তিনি সাহাবিদের সঙ্গে সমানভাবে মাটি কেটেছেন এবং পাথর বহন করেছেন।


বারা (রা.) বলেন, ‘খন্দকের যুদ্ধের দিন আমি নবীজিকে মাটি বহন করতে দেখেছি। মাটি বহন করতে করতে তাঁর পেট ধুলাবালিতে সম্পূর্ণ ঢেকে গিয়েছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১০৪)


১১. মার্জিত পদ্ধতিতে ভুল সংশোধন


কারও ভুলত্রুটি জনসমক্ষে বা সরাসরি নাম উল্লেখ করে লজ্জিত না করে মার্জিত ও পরোক্ষভাবে সংশোধন করার এক অনন্য শিক্ষা মহানবী (সা.) দিয়েছেন। তিনি ভুলকারীর নাম প্রকাশ না করে সবার উদ্দেশে নসিহতের মাধ্যমে বা ব্যক্তিগতভাবে বুঝিয়ে দিতেন।


আয়েশা (রা.) বলেন, একবার নবীজি নিজে কোনো কাজ করলেন এবং অন্যদের সেটা করার অনুমতি দিলেন। তা সত্ত্বেও একদল লোক তা থেকে বিরত রইল। এ সংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছলে তিনি ভাষণ দিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসার পর বললেন, ‘কিছু লোকের কী হয়েছে, তারা এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে চায়, যা আমি নিজে করছি। শপথ কোদার, আমি আল্লাহ সম্পর্কে তাদের থেকে বেশি জানি এবং আমি তাদের চেয়ে অনেক অধিক তাঁকে ভয় করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১০১)


১২. অধীনস্থদের প্রতি সহানুভূতি


অধীনস্থদের সঙ্গে অত্যন্ত মানবিক আচরণ করা এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজের বোঝা না চাপানো নববি আদর্শের অংশ। অধীনস্থদের ভাইয়ের মর্যাদা দিয়ে তাদের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে ও কষ্টের খেয়াল রাখতে হবে।


আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি ১০ বছর নবীজির খেদমত করেছি। কিন্তু তিনি কখনো আমার প্রতি “উফ” শব্দটিও করেননি। এ কথা জিজ্ঞাসা করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৩৮)


রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মনে রেখো, তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের আশ্রয়ে রেখেছেন। সুতরাং এমন কোনো ভাইয়ের অভিভাবকত্ব বা পরিচালনার ভার যদি কারও ওপর অর্পিত থাকে, তবে সে যেন তাকে তাই খাওয়ায় যা সে নিজে আহার করে, আর তাকে তেমনই পোশাক পরতে দেয় যেমনটা সে নিজে পরিধান করে। তোমরা তাদের ওপর তাদের সাধ্যাতীত কোনো কষ্টের কাজ চাপিয়ে দিও না। যদি কখনো কঠিন কাজের দায়িত্ব দাও, তবে নিজেরা হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের সহযোগিতা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০)


শেষকথা


নবীজির নেতৃত্বের এসব মৌলিক গুণ যেকোনো যুগের নেতৃত্ব, শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার জন্য এক কালজয়ী রূপরেখা। সততা, ইনসাফ, কল্যাণকামিতা ও সেবাবোধের সমন্বয়ে গঠিত তাঁর এই আদর্শ অনুসরণ করলেই সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৩:০২ পিএম

জীবন মানেই চড়াই-উতরাই। কখনো সাফল্য আমাদের আনন্দিত করে, আবার কখনো ব্যর্থতা বা বিপদ আমাদের চারপাশ অন্ধকার করে দেয়। এই কঠিন সময়ে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন পবিত্র কোরআনের বাণী হতে পারে পরম নির্ভরতা ও মানসিক শক্তির উৎস।


বিপদের দিনে মনকে শক্ত রাখতে সহায়ক এমন ১০টি আয়াতের কথা বলা হলো:


১. সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা তিনি দেন না


আপনার ওপর যে পরীক্ষা এসেছে, তা সইবার ক্ষমতা আপনার আছে বলেই আল্লাহ তা নির্ধারণ করেছেন।


উচ্চারণ: লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উস'আহা।


অর্থ: আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। (সুরা বাকারা আয়াত: ২৮৬)


২. কষ্টের পরেই আসে স্বস্তি


বিপদ স্থায়ী নয়; স্রষ্টা দুবার অভয় দিয়ে বলেছেন যে, অন্ধকারের পরেই আলোর দেখা মিলবে।


উচ্চারণ: ফা ইন্না মা'আল উসরি ইউসরা, ইন্না মা'আল উসরি ইউসরা।


অর্থ: নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে। (সুরা শারহ, আয়াত: ৫-৬)


৩. মুমিনের নেই পরাজয়


সাময়িক ব্যর্থতায় হীনম্মন্য হওয়া সাজে না; বিশ্বাসে অটল থাকাই বিজয়ের প্রথম শর্ত।


উচ্চারণ: ওয়ালা তাহিনু ওয়ালা তাহযানু ওয়া আনতুমুল আ'লাউনা ইন কুনতুম মুমিনীন।


অর্থ: তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখ করো না। তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মুমিন হও। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৯)


৪. ধৈর্য ও নামাজই পরম শক্তি


যখন নিজের সামর্থ্য ফুরিয়ে আসে, তখন ধৈর্য এবং নামাজের মাধ্যমেই অসীম শক্তির উৎস খুঁজে পাওয়া যায়।


উচ্চারণ: ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আমানুস তা'ঈনু বিসসাবরি ওয়াসসালাহ, ইন্নাল্লাহা মা'আস সাবিরীন।


অর্থ: হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। (সুরা বাকারা আয়াত: ১৫৩)


৫. আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন


একাকীত্ব বা অসহায় বোধ করার প্রয়োজন নেই; বিপদের চরম মুহূর্তেও মহান প্রতিপালক আপনার পাশেই আছেন।


উচ্চারণ: লা তাহযান ইন্নাল্লাহা মা'আনা।


অর্থ: দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৪০)


৬. নিরাশ হওয়া বারণ


ভুল বা পাপে জীবন জর্জরিত হলেও স্রষ্টার দয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ঠিক নয়। তাঁর রহমতের দুয়ার সব সময় খোলা।


উচ্চারণ: কুল ইয়া ইবাদিয়াল্লাযিনা আসরাফু আলা আনফুসিহিম লা তাকনাতু মির রাহমাতিল্লাহ।


অর্থ: বলো, হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ! আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)


৭. প্রভু আপনাকে ত্যাগ করেননি


প্রার্থনা কবুল হতে দেরি হওয়া মানে এই নয় যে আল্লাহ আপনাকে ভুলে গেছেন। তিনি ধৈর্যশীলদের জন্য সেরা পুরস্কার জমা রাখেন।


উচ্চারণ: মা ওয়াদ্দা'আকা রাব্বুকা ওয়া মা কলা।


অর্থ: তোমার প্রতিপালক তোমাকে ত্যাগ করেননি এবং বিরূপও হননি। (সুরা দুহা, আয়াত: ৩)


৮. আল্লাহর সাহায্যই যখন মূল ভরসা


জাগতিক সব শক্তি এক হলেও আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো বিজয় সম্ভব নয়, আবার তিনি পাশে থাকলে কোনো পরাজয় নেই।


উচ্চারণ: ইন ইয়ানসুরকুমুল্লাহু ফালা গালিবা লাকুম।


অর্থ: যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে কেউ তোমাদের পরাজিত করতে পারবে না। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬০)


৯. তাকওয়ায় মেলে সংকট মুক্তি


সততার পথে অবিচল থাকলে এমন সব অচেনা পথ দিয়ে সমাধানের পথ খোলে, যা ভাবনার অতীত।


উচ্চারণ: ওয়া মান ইয়াত্তাকিল্লাহা ইয়াজ'আল লাহু মাখরাজা।


অর্থ: যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সংকট থেকে উত্তরণের) পথ খুলে দেন। (সুরা তালাক, আয়াত: ২)


১০. যা নির্ধারিত, তা-ই হবে


ভবিষ্যৎ নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা উচিত। কারণ তিনিই আমাদের পরম অভিভাবক।


উচ্চারণ: কুল লাই ইউসিবানা ইল্লা মা কাতাবাল্লাহু লানা হুওয়া মাওলানা।


অর্থ: বলো, আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া আমাদের কিছুই ঘটবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৫১)


সংকটকালে এই আয়াতগুলো আমাদের মনে আত্মবিশ্বাস ও প্রশান্তি ফিরিয়ে আনে। জীবনের প্রতিকূলতায় ভেঙে না পড়ে ধৈর্যের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়াই প্রকৃত মানুষের পরিচয়। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ০৯ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১:৩৪ পিএম

মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করাই একজন মুমিনের পুরো জীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। মানুষ আল্লাহকে যত বেশি স্মরণ করে, তাঁর আনুগত্যে নিজেকে সঁপে দেয় এবং তাঁর প্রিয় কাজগুলোয় আত্মনিয়োগ করে, আধ্যাত্মিক জগতের সিঁড়ি বেয়ে সে ততই রবের নিকটবর্তী হতে থাকে। তবে ইসলামি জীবনবিধানে সব আমলের গুরুত্ব ও মর্যাদা এক স্তরের নয়। শরিয়তে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট আমল ও কর্মপন্থা রয়েছে, যা বান্দাকে অতি দ্রুত আল্লাহর রহমত ও ভালোবাসার পরম সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়।


আল্লাহর নৈকট্যের প্রকৃত অর্থ কী


আমলের পর্যালোচনায় যাওয়ার আগে ‘আল্লাহর নৈকট্য’ (কুরবে ইলাহি)-র তাৎপর্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহর নৈকট্য কোনো স্থানিক বা ভৌগোলিক নৈকট্য নয়। কারণ, মহান আল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট স্থান, দিক বা সীমানার মুখাপেক্ষী নন। তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে।


ইসলামি আকিদার দৃষ্টিতে বান্দার আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার অর্থ হলো—বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি, রহমত, ভালোবাসা ও বিশেষ অনুগ্রহের প্রকাশ ঘটা এবং বান্দার মর্যাদা আল্লাহর দরবারে সুউচ্চ হওয়া।


১. ফরজ বিধানের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন


আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার পথের প্রথম এবং অলঙ্ঘনীয় ধাপ হলো তাঁর নির্ধারিত ফরজ বিধানগুলো যথাযথভাবে আদায় করা।


‘হাদিসে কুদসি’তে মহান আল্লাহ–তাআলা নৈকট্য লাভের এই প্রাথমিক ভিত্তি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘আমার বান্দা আমার নৈকট্য লাভের জন্য যা কিছু করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো তা, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)


দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, সামর্থ্যবানদের জন্য জাকাত ও হজ এবং শরিয়তের যাবতীয় হারাম বিষয় থেকে বেঁচে থাকা—এগুলো হলো ইমানের মেরুদণ্ড।


কোনো ব্যক্তি যদি ফরজ আমলগুলোয় অবহেলা করে শুধু নফল বা অন্যান্য বাহ্যিক আমলে মগ্ন থাকে, তবে তা দিয়ে কখনোই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়। ফরজ হলো ভবনের মূল ভিত্তির মতো; ভিত্তি মজবুত না হলে ওপরের কোনো কাঠামোরই স্থায়িত্ব থাকে না।


২. নফল আমলের নিয়মিত চর্চা


ফরজ বিধানগুলো সতর্কতার সঙ্গে পালন করার পর বান্দাকে আল্লাহর একান্ত প্রিয় বানায় ঐচ্ছিক বা নফল ইবাদত। উপরিউক্ত হাদিসে কুদসিতেই মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘এবং আমার বান্দা ক্রমাগত নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে—যতক্ষণ না আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)


তাহাজ্জুদ নামাজ, চাশত-ইশরাকের নামাজ, নফল রোজা, দান-সদকা ও পবিত্র কোরআন পাঠ বান্দার অন্তরে আল্লাহর প্রতি বিশেষ ভালোবাসা তৈরি করে।


বিশেষ করে নামাজের মধ্যে সেজদা হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে কার্যকর ও চূড়ান্ত মুহূর্ত। রাসুল (সা.) করেছেন, ‘বান্দা সিজদাহরত অবস্থাতেই তার মহান প্রতিপালকের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়; সুতরাং তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)


৩. ইখলাস বা খাঁটি নিয়ত


আমল কম হোক বা বেশি, আল্লাহর কাছে তা কবুল হওয়ার একমাত্র শর্ত হলো ‘ইখলাস’ বা খাঁটি নিয়ত। মানুষের চোখে অত্যন্ত চমৎকার ও বড় আমলও যদি লোকদেখানো (রিয়া), প্রশংসা কুড়ানো বা পার্থিব স্বার্থের উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে আল্লাহর দরবারে তার কোনো মূল্য থাকে না; বরং তা শিরকে আসগার বা গোপন পাপে পরিণত হয়।


আল্লাহর কাছে যাওয়ার পথ কেবল শারীরিক কসরত নয়, এটি অন্তরের পরিচ্ছন্নতার সফর। প্রতিটি আমলের শুরুতে ও শেষে হৃদয়কে এই বিশ্বাসে স্থির রাখতে হবে যে, আমার এই কাজ কেবল আমার রবের সন্তুষ্টির জন্যই নিবেদিত।


৪. সার্বক্ষণিক সংযোগ: আল্লাহর জিকির ও ধ্যান


বান্দা ও স্রষ্টার মধ্যকার অদৃশ্য সেতুবন্ধন হলো আল্লাহর জিকির। আল্লাহ–তাআলা কোরআনে এক পরম প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘোষণা করেছেন, ‘অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব; আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)


জিকির মানুষের অন্তরকে জীবন্ত ও সতেজ রাখে। প্রাত্যহিক শত ব্যস্ততার মধ্যও যার জিহ্বা আল্লাহর তাসবিহ, তাহমিদ ও ইস্তিগফারে সিক্ত থাকে এবং যার অন্তরে সর্বদা আল্লাহর নজরদারির অনুভূতি জাগ্রত থাকে, সে কখনো আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।


৫. উত্তম চরিত্র ও সৃষ্টির সেবা


ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর নৈকট্য কেবল জায়নামাজ কিংবা মসজিদের চার দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। মানুষের সঙ্গে নম্র আচরণ, সত্যভাষণ, পিতা-মাতার নিঃস্বার্থ সেবা, আত্মীয়দের খোঁজখবর রাখা, আমানত রক্ষা এবং সততার সঙ্গে হালাল উপার্জন করাও মহান রবের নৈকট্য পাওয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।


মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি ইবাদত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৫৭৮৭; সহিহুল জামে, হাদিস: ১৭৬)


একজন মুমিন যখন নিজের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করে, তখন তার জীবনের প্রতিটি কর্মই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একেকটি সোপানে পরিণত হয়।


আল্লাহর নৈকট্যের পরম পুরস্কার


বান্দা যখন ফরজ ও নফলের সমন্বয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, তখন মহান আল্লাহ তাকে এমন এক মর্যাদায় ভূষিত করেন, যার কোনো তুলনা নেই। হাদিসে কুদসির শেষাংশে আল্লাহ–তাআলা সেই পরম পুরস্কারের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘অতঃপর আমি যখন তাকে ভালোবেসে ফেলি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে; আমি তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে; আমি তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে এবং আমি তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে হাঁটে। সে যদি আমার কাছে কোনো কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি; আর সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)


এই হাদিসের ব্যাখ্যায় হাদিসবেত্তারা বলেছেন, এর অর্থ হলো, আল্লাহ–তাআলা তখন বান্দার যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে পাপের পথ থেকে রক্ষা করেন এবং তাকে সর্বদা নিজের পছন্দের পথে চলার বিশেষ তাওফিক ও হেফাজত দান করেন। তার দৃষ্টি কেবল হালাল ও কল্যাণময় বিষয় দেখে, তার শ্রবণ কেবল ভালো কথা শোনে এবং তার হাত-পা কেবল পুণ্যের কাজেই অগ্রসর হয়।


শেষ কথা


আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ কোনো জটিল রহস্যময় বিষয় নয়; এটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ এক জীবনাদর্শ। এর সূচনা হয় যাবতীয় ফরজ ও ওয়াজিবের যথাযথ আদায়ের মাধ্যমে, এর প্রবৃদ্ধি ঘটে নিয়মিত নফল ইবাদত ও জিকিরের সুবাসে, আর এর পূর্ণতা পায় উত্তম চরিত্র ও নিঃস্বার্থ সৃষ্টির সেবায়।


ইখলাসপূর্ণ অন্তরে এই পথ অনুসরণ করলেই বান্দা ইহকালে অর্জন করতে পারে রবের বিশেষ অভিভাবকত্ব এবং পরকালে লাভ করতে পারে তাঁর চিরস্থায়ী দিদার ও অনাবিল বেহেশত।