প্রতীকী ছবি ।
ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ মাসগুলোর একটি শাবান। রজব ও রমজানের মাঝামাঝি অবস্থান করা এই মাসকে বিশেষ মর্যাদার মাস বলে উল্লেখ করেছেন নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)। আলেমরা বলেছেন, শাবান হচ্ছে আত্মশুদ্ধি ও রমজানের প্রস্তুতির সেরা সময়। এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার এবং ইবাদতের প্রতি মনোযোগী হওয়ার প্রতি জোর দিয়েছেন তারা।
বুদ্ধিমান মুসলমানের জন্য বরকতময় শাবান মাসের সময়কে কাজে লাগিয়ে যতটা সম্ভব সওয়াব অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।
এই মাসের প্রথমার্ধে নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তবে রমজান খুব কাছাকাছি চলে এলে রোজা কমিয়ে দেওয়া উত্তম, যাতে শাবানের রোজা সরাসরি রমজানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে না যায়।
কোরআন তিলাওয়াতের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে এ মাসে। পূর্বসূরী নেককার মুসলমানদের অনেকেই শাবানকে ‘কোরআন তিলাওয়াতের মাস’ বলে আখ্যায়িত করতেন। পাশাপাশি নিয়মিত জিকির ও আল্লাহর স্মরণে অভ্যস্ত হওয়ার কথাও বলতেন।
রমজানের রোজা ও ইবাদত সঠিকভাবে পালনের জন্য প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল ও আদব-কায়দা এই মাসেই ঝালিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন আলেমরা।
শাবান মাসে একটি বিশেষ দোয়া রয়েছে। মহানবী (সা.) রমজান মাসের বরকত লাভের জন্য এই দোয়াটি পড়তেন। আমরাও শাবান মাসে দোয়াটি পড়তে পারি। দোয়াটি হলো ‘হে আল্লাহ, আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে শাবানের মতো বেশি রোজা রাখতেন না। আলেমদের মতে, এটি মূলত রমজানের জন্য মানসিক ও আত্মিক প্রস্তুতির অংশ।
শাবান মাসের সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ইমান, আমল ও চরিত্র শুদ্ধ করার চেষ্টা করা উচিত আমাদের সবার।
ইসলামে উপহার আদান-প্রদান অত্যন্ত সুন্দর একটি রীতি
ইসলামি সমাজব্যবস্থায় উপহার আদান-প্রদান অত্যন্ত সুন্দর একটি রীতি। এর ফলে পারস্পারিক সৌহার্দ্য যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি এটি ক্ষোভ-বিদ্বেষ দূর করে। খোদ রাসুল (সা.) বলেছেন- তোমরা একজন অন্যজনকে উপহার দাও। উপহার মনের ময়লা দূর করে। এক নারী প্রতিবেশী অপর নারী প্রতিবেশীকে যদি বকরির (ছাগল) পায়ের এক টুকরা ক্ষুরও উপহার দেয়, তবুও যেন তা অবহেলা না করে। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ২১৩০; সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৯৬)
তবে ইসলামে উপহার আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম ও ইনসাফের সুস্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে। সব ধরনের উপহার দেয়া-নেয়া যেমন ইসলামে জায়েজ নেই, তেমনি যেসব উপহারের নামে সুদ-ঘুষ বা কোনো অন্যায়ের লেনদেন হয়- সেসব ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
খোদ রাসুল (সা.)-ও হাদিয়া বা উপহার কবুল করতেন এবং অন্যদের উপহার দিতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়া (উপহার) কবুল করতেন এবং তার প্রতিদানও দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪১৪) নিচে ইসলামে নিষিদ্ধ এমন ৪ ধরনের উপহার সম্পর্কে আলোচনা তুলে ধরা হলো:
রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কোনো ক্ষেত্রে উপহার আদান-প্রদান নিষিদ্ধ
রাষ্ট্রীয় কোষাগার কিংবা সরকারি কোনো দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে উপহার আদান-প্রদান ইসলামে নিষিদ্ধ। এটি মূলত ঘুষের নামান্তর। হাদিসেও এ বিষয়ে কঠোর বার্তা এসেছে। রাসুল (সা) ঘুষ গ্রহণকারী ও ঘুষ প্রদানকারী উভয়কেই অভিসম্পাত করেছেন। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩৭)
আবু হুমায়দ সাঈদী (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে- একবার নবীজি (সা.) আযদ গোত্রের ইবনু উতবিয়া নামের একজনকে সাদকা সংগ্রহের কাজে নিয়োগ করেছিলেন। তিনি ফিরে এসে বললেন- এগুলো আপনাদের (অর্থাৎ, সাদকার মাল), আর এগুলো আমাকে হাদিয়া (উপহার) দেয়া হয়েছে। পরে নবীজি (সা.) এ কথা শুনে রাগান্বিত হয়ে বলেন- সে তার বাবার ঘরে কিংবা তার মায়ের ঘরে কেন বসে থাকল না? তখন সে দেখত, তাকে কেউ হাদিয়া দেয়া কি না?
পরে রাসুল (সা) বলেন- যার হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম, সাদকার মাল থেকে সামান্য পরিমাণও যে আত্মসাৎ করবে, সে তা কাঁধে করে কিয়ামতের দিন হাজির হবে। সেই মাল যদি উট হয়, তাহলে তা তার আওয়াজে, আর যদি গাভী হয়, তাহলে হাম্বা হাম্বা, আর বকরি হলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ রবে (আওয়াজ করতে থাকবে)। তারপর নবীজি (সা.) তার দু’হাত কিছুটা উত্তোলন করলেন যার ফলে তার উভয় বগলের শুভ্রতা প্রকাশ পেল। এরপর তিনি (নবীজি সা.) বারবার বললেন- হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি। হে আল্লাহ আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪২৫)
চাকরি কিংবা কোনো কাজের বিনিময় হিসেবে উপহার গ্রহণ নিষিদ্ধ
ইসলামে বরাবরই সৎ কাজে উৎসাহ দেয়া এবং অসৎ কাজে নিষেধের কথা এসেছে। এ ক্ষেত্রে কারও চাকরি, বিপদমুক্তি কিংবা কোনো বৈধ কাজে কারও জন্য সুপারিশ করা মহৎ কাজ। তবে এই উপকারের বিনিময় হিসেবে কোনো উপহার গ্রহণ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে ইসলামে কঠোর নিষেধ রয়েছে।
আবু উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- কোনো ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের জন্য কোনো বিষয়ে সুপারিশ করার কারণে যদি সে তাকে কিছু উপহার দেয় এবং সে (যে উপকার বা সুপারিশ করল) তা গ্রহণ করে, তাহলে সে সুদের একটি বড় দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৪১)
অর্থাৎ, ইসলামে কারও জন্য সুপারিশ করতে হলে নিঃস্বার্থভাবে সেটি করতে হবে। উপকারের পর উপহার নিলে ইসলামে সেটি সুদের মতোই পাপ হিসেবে গণ্য হবে। আর পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা এসেছে- আল্লাহ তায়ালা ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)
ঋণের সঙ্গে উপহার আদান-প্রদান নিষিদ্ধ
বিপদ-আপদে কাউকে ঋণ দেয়া উত্তম কাজ। তবে কাউকে ঋণ দিয়ে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো সুবিধা নেয়ার ক্ষেত্রেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কারণ, ইসলামে এটিও সুদের অন্তর্ভুক্ত।
আবু বুরদা (রহ.) বলেন- একবার আমি মদিনায় গেলাম। পরে আবদুল্লাহ ইবনু সালামের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি আমাদের এখানে আসবে না? তোমাকে আমি খেজুর ও ছাতু খেতে দেবো এবং একটি (মর্যাদাপূর্ণ) ঘরে থাকতে দেব। তারপর তিনি বললেন- তুমি এমন স্থানে (তৎকালীন ইরাক) বসবাস করো, যেখানে সুদের কারবার অত্যন্ত ব্যাপক। যখন কোনো মানুষের কাছে তোমার কোনো প্রাপ্য থাকে, আর সেই মানুষটি যদি তোমাকে কিছু ঘাস, খড় অথবা খড়ের ন্যায় নগণ্য বস্তুও হাদিয়া (উপহার) পেশ করে- তা গ্রহণ করো না, যেহেতু তা সুদের অন্তর্ভুক্ত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৫৪২)
ইয়াহইয়া ইবনে আবু ইসহাক আল-হানাঈ (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন- তোমাদের কেউ কোনো জিনিস করয (ধার বা ঋণ) দেয়ার পর করযদার (ঋণগ্রহীতা) তাকে কিছু উপঢৌকন (উপহার) দিলে বা তার সওয়ারীতে (বাহন) আরোহণ করাতে চাইলে, সে যেন তাতে আরোহণ না করে এবং উপঢৌকন গ্রহণ না করে। তবে তাদের মধ্যে আগে থেকেই এমন সৌজন্যমূলক বিনিময়ের প্রচলন থাকলে সে ক্ষেত্রে আপত্তি নেই। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ২৪৩২)
সন্তানদের বৈষম্য করে উপহার দেয়া নিষিদ্ধ
ইসলামে সন্তানদের বস্তুগত উপহারের পাশাপাশি ভালো আচরণ ও শিক্ষা দেওয়াকেও সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে দেখা হয়। খোদ রাসুল (সা.) বলেছেন- কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশি উত্তম কোনো জিনিস দিতে পারে না। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫২)
তবে বাবা-মায়ের জন্য সন্তানদের উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে সমতা ও ইনসাফ বজায় রাখাও জরুরি। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া এক সন্তানকে বেশি বা দামি উপহার দেয়া এবং অন্যদের বঞ্চিত করা ইসলামে ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
আমির (রহ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, তিনি নু’মান ইবনু বশীর (রা.) কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছেন যে- আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন (আমার মাতা) আমরা বিনত রাওয়াহা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সাক্ষী রাখা ছাড়া (এ দানে) সম্মত নই। পরে তিনি রাসুল (সা.) কাছে হাজির হয়ে আরজ করলেন- আমরা বিনতে রাওয়াহার গর্ভজাত আমার পুত্রকে কিছু দান করেছি। কিন্তু ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! সে আমাকে বলেছে- আপনাকে সাক্ষী রাখতে। এরপর তিনি (নবীজি সা.) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ ধরনের দান করেছ? জবাবে বশীর (রা) বললেন- না। পরে রাসুল (সা.) বললেন- তাহলে আল্লাহকে ভয় করো এবং আপন সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করো। এরপর বশীর (রা.) ফিরে এসে তার দান প্রত্যাহার করে নেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪১৬)
প্রতীকী ছবি
ইবাদত একজন মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নামাজ, রোজা, দান-সদকা কিংবা মানুষের উপকার করা—সবই নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত। তবে শুধু আমল করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই আমল আল্লাহ–তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমলের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর কাছে প্রতিদান লাভের ওপর। ইবাদত কবুলের গুরুত্বপূর্ণ ৪টি বিষয় জেনে নেওয়া যাক।
১. বিশুদ্ধ ইমান থাকা
নেক আমল কবুল হওয়ার অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো ইমান। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর নির্দেশনার প্রতি আনুগত্য এবং শিরক থেকে মুক্ত থাকা একজন মুমিনের জীবনের ভিত্তি। ইমান ছাড়া কোনো আমল পরকালে মুক্তি ও প্রতিদান লাভের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে না।
আল্লাহ–তায়ালা বলেন, ‘আর যে মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে, পুরুষ হোক কিংবা নারী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১২৪)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর কাছে সৎকর্মের প্রতিদান লাভের সঙ্গে ইমানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই একজন মুমিনের প্রথম দায়িত্ব হলো বিশুদ্ধ ইমান নিয়ে জীবনযাপন করা এবং শিরকসহ ইমানের পরিপন্থী সব বিষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
২. সুন্নত অনুযায়ী আমল করা
ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। তবে কোনো কাজকে ইবাদত হিসেবে পালন করতে হলে তা রাসুলের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ধর্মের নামে এমন কোনো ইবাদত বা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা গ্রহণযোগ্য নয়, যার ভিত্তি নেই।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এ বিষয়ে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৯৭)
৩. হালাল খাবার গ্রহণ করা
নেক আমল কবুলের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জন ও পবিত্র খাবার গ্রহণের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মানুষ নামাজ পড়ছেন, রোজা রাখছেন কিংবা দান-সদকা করছেন, কিন্তু তার উপার্জন ও ভোগের উৎস যদি হারাম হয়, তবে তা তার ইবাদত কবুলের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’
এরপর তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত ও ধুলামলিন অবস্থায় দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করে। অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং হারাম উপার্জন দিয়েই তার জীবন পরিচালিত।
এরপর নবীজি (সা.) বলেন, ‘তাহলে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, হালাল উপার্জন ও পবিত্র জীবনযাপন ইবাদত কবুলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হারাম উপার্জন মানুষের আত্মিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ইবাদত কবুলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
তাই নেক আমলের পাশাপাশি উপার্জন ও ভোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিধান মেনে চলা জরুরি।
৪. আমলে ‘ইখলাস’ থাকা
ইবাদতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ইখলাস। অর্থাৎ মানুষের প্রশংসা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদত করা।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের তো এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে তারা আল্লাহর ইবাদত করবে তারই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫)
কেউ যদি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য দান করেন, নিজেকে ধার্মিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ইবাদত করেন কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশ্যে নেক কাজ করেন, তবে তা ইখলাসের পরিপন্থী। ইসলামে এই লোকদেখানো মনোভাবকে ‘রিয়া’ বলা হয়, যা কঠোরভাবে নিন্দিত।
আল্লাহ–তায়ালা বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেই নামাজিদের জন্য, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন; যারা লোকদেখানোর জন্য তা করে। (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৬)
তাই আমল করার আগে নিজের নিয়ত যাচাই করা উচিত। নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন, আমি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজটি করছি, নাকি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য?
নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা এবং লোকদেখানো মনোভাব থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করাই ইখলাসের পথে চলার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
মো. রাশেদ খাঁন। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম এত সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও পূর্ণ নিরাপত্তায় দেশব্যাপী সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উদযাপন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাতে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। পোস্টে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম এত সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও পূর্ণ নিরাপত্তার সহিত দেশব্যাপী সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনেরা তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা উদযাপন করেছে।’
‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এভাবেই হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ নানা ধর্ম গোষ্ঠীর মানুষেরা নিরাপদে থাকবে, নিরাপদে ধর্ম পালন করবে, উৎসব করবে’ বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে সব ধর্মের মানুষ নিরাপদে থাকেন, এটা আবারও প্রমাণ হলো। প্রমাণিত হলো যে, ফ্যাসিবাদী জমানায় রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য ও আওয়ামী লীগের প্রভু রাষ্ট্রের আশীর্বাদ পেতেই মন্দিরে পরিকল্পিত হামলা হয়েছে।’
রাশেদ খাঁন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘ধন্যবাদ জানাই, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। তার সঠিক তত্ত্বাবধানে পুলিশ-প্রশাসন, এসআরবি, আনসার-ভিডিপিসহ সমস্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে ও রাত জেগে পাহারা বসিয়ে সমস্ত ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।’
ছবি : সংগৃহীত
মুহাম্মদ (সা.) নিজের প্রাত্যহিক আচরণে এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ ও বিজ্ঞানসম্মত জীবনপদ্ধতি বাস্তবায়ন করে গেছেন, যা মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গের সুস্থতা নিশ্চিত করে। তিনি স্বাস্থ্যকে ইমানের পর মানুষের সবচেয়ে বড় নেয়ামত হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সুস্বাস্থ্য (আফিয়াত) প্রার্থনা করো। কেননা, ইমানের পর সুস্বাস্থ্যের চেয়ে উত্তম কোনো বস্তু কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৫৮)
রাসুলের জীবন থেকে ছয়টি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস আলোচনা করা হলো:
১. খুব সকালে জেগে ওঠা
নবীজির জীবনের রুটিন ছিল রাতের প্রথম প্রহরে দ্রুত ঘুমাতে যাওয়া এবং শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদ ও ফজরের জন্য জেগে ওঠা। তিনি কখনো ইশার নামাজের পর অপ্রয়োজনীয় আলাপ–আলোচনা পছন্দ করতেন না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৮)
উম্মতের জন্য ভোরের কল্যাণ কামনা করে রাসুল (সা.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মতের সকালের প্রহরে (ভোরের সময়ে) বরকত দান করুন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৬)
আধুনিক ঘুম ও নিউরোবায়োলজি অনুযায়ী, মানবদেহে একটি নিজস্ব জৈবিক ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ রয়েছে। ভোরের নির্মল বাতাসে ওজোন ও বিশুদ্ধ অক্সিজেনের মাত্রা সর্বোচ্চ থাকে, যা ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে।
দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার ফলে দেহে কর্টিসল হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও মানসিক বিষণ্নতা তৈরি করে।
২. পেটের এক–তৃতীয়াংশ নীতি
অতিভোজন ও অপরিমিত খাদ্য গ্রহণই আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ জটিল রোগের মূল কারণ। মহানবী (সা.) খাদ্য গ্রহণের এমন এক বৈপ্লবিক ফর্মুলা দিয়েছিলেন, যা বর্তমান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির মূল স্তম্ভ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র মানুষ কখনো ভর্তি করেনি। মানুষের মেরুদণ্ড সোজা রাখার জন্য কয়েক লোকমা আহারই যথেষ্ট। যদি খেতেই হয়, তবে সে যেন পেটের এক–তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক–তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি এক–তৃতীয়াংশ শ্বাস–প্রশ্বাসের জন্য ফাঁকা রাখে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)
পেট পুরোপুরি ভর্তি না করে এক ভাগ খালি রাখলে খাদ্য পরিপাক দ্রুত ও সহজ হয়, অম্লতা (অ্যাসিডিটি) প্রতিরোধ হয় এবং পরিপাকতন্ত্রে অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। এ ছাড়া তিনি কখনো আহারে কোনো ত্রুটি ধরতেন না; পছন্দ হলে তৃপ্তি ভরে খেতেন, আর রুচি না হলে শান্তভাবে তা এড়িয়ে যেতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪০৯)
৩. ধীরে–সুস্থে ও বসে তিন শ্বাসে পানি পান
তৃষ্ণার্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ঢকঢক করে দ্রুত পানি পান করা আধুনিক গ্যাস্ট্রিক রিফ্লাক্স ও খাদ্যনালির বিভিন্ন সমস্যার কারণ। মহানবী (সা.) দাঁড়িয়ে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০২৪)
রাসুল (সা.) সর্বদা বসে, পাত্রের বাইরে নিশ্বাস ছেড়ে, ধীরে ধীরে তিন শ্বাসে পানি পান করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৩১)
দাঁড়িয়ে দ্রুত পানি পান করলে পানির তীব্র স্রোত খাদ্যনালি দিয়ে সরাসরি পাকস্থলীর দেয়ালে আঘাত হানে, যা সময়ের ব্যবধানে পরিপাকতন্ত্রের সংবেদনশীল আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বসে ধীরে ধীরে পানি পান করলে স্নায়ুতন্ত্র শিথিল থাকে এবং কিডনি রক্ত থেকে বিষাক্ত উপাদান ফিল্টার করার পর্যাপ্ত সময় পায়।
৪. দাঁতের যত্নে মিসওয়াক ব্যবহার
দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষায় মহানবী (সা.) ছিলেন সচেতন পথপ্রদর্শক। তিনি প্রতিটি অজুর সময়, নামাজে দাঁড়ানোর আগে, ঘুম থেকে ওঠার পর এবং ঘরে প্রবেশ করার মুহূর্তে নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহার করতেন।
তিনি বলেছেন, ‘মিসওয়াক হলো মুখ পরিষ্কারকারী এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যদি আমার উম্মতের ওপর কষ্টকর মনে না করতাম, তবে প্রতি ওয়াক্তের নামাজের আগেই তাদের মিসওয়াক করা বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৭)
প্রাকৃতিক জয়তুন বা পিলুগাছের ডালে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান, যা মাড়ির প্রদাহ ও দাঁতের ক্ষয়রোধে কৃত্রিম টুথব্রাশের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। মুখের ব্যাকটেরিয়া রক্তে ছড়িয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, যা নবীজি (সা.) শতাব্দী আগেই প্রতিরোধ করেছিলেন।
৫. দুপুরে সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম
দুপুরের খাবারের পর কিংবা জোহরের পর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সামান্য গা এলিয়ে দেওয়া ছিল নবীজি (সা.)–এর নিয়মিত অভ্যাস, যাকে আরবিতে বলা হয় ‘কায়লুলাহ’। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা কায়লুলাহ গ্রহণ করো। কেননা, শয়তান কখনো কায়লুলাহ করে না।’ (তাবারানি, হাদিস: ২৮৩৫)
দুপুরের ১৫ থেকে ২০ মিনিটের এই ‘পাওয়ার ন্যাপ’ মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সতর্কতা বাড়ায় এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমিয়ে আনে। এটি কোনো অলস ঘুম নয়; বরং স্নায়ুর অবসাদ দূর করে বিকেলের কাজের নব উদ্যম তৈরির বৈজ্ঞানিক উপায়।
৬. নিয়মিত দ্রুত হাঁটা
মহানবী (সা.) কখনোই অলস জীবনযাপন করতেন না। তিনি দ্রুত ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপে হাঁটতেন। সাহাবি আবু হোরাইরা (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর নবীজির চেয়ে দ্রুত কাউকে হাঁটতে দেখিনি। তিনি যখন হাঁটতেন, মনে হতো যেন মাটি তাঁর জন্য গুটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা তাঁর সঙ্গে চলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠতাম, অথচ তিনি স্বাভাবিক গতিতেই হাঁটতেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬৪৮)
সাহাবি আলী (রা.) বলেন, ‘তিনি যখন পথ চলতেন, তখন মনে হতো যেন কোনো উঁচু পাহাড় থেকে নিচের দিকে নেমে আসছেন।’ (শামায়িলে তিরমিজি, হাদিস: ১১৮)
আধুনিক সময়ে একে বলা হয় ‘ব্রিস্ক ওয়াকিং’ বা দ্রুত হাঁটা। দৈনিক ২০–৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার অভ্যাস কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, ফুসফুসের ধারণক্ষমতা বাড়ায় এবং মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে মেদ জমতে বাধা দেয়।
এ ছাড়া নবীজি (সা.) তিরন্দাজ, কুস্তি ও দৌড় প্রতিযোগিতার মতো শরীরচর্চাকে উৎসাহিত করেছেন।
ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মদিনায় ওমরাহ ও ভিজিট ভিসায় আসা আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের জন্য ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের এক নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন থেকে সংক্ষিপ্ত মেয়াদের ভিসাধারীরা মসজিদে নববিতে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের অধীনে পবিত্র কোরআন শিক্ষা এবং ঐতিহাসিক মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আরবি ভাষা শেখার সুযোগ পাবেন।
আগে স্বল্পমেয়াদে মদিনায় আসা দর্শনার্থীদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। সম্প্রতি সৌদি আরব সরকারের নেওয়া নতুন এই সিদ্ধান্ত ওমরাহ ও জিয়ারতের সফরের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
মসজিদে নববিতে বিনামূল্যে কোরআন শিক্ষা
মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে প্রতিদিন কোরআন পাঠদান কর্মসূচি পরিচালনা করছে দুই পবিত্র মসজিদের বিষয়াবলি সংক্রান্ত জেনারেল অথরিটি।
নতুন নিয়মানুযায়ী, ওমরাহ বা যেকোনো ধরনের ভিজিট ভিসা নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা কোনো ধরনের ফি বা খরচ ছাড়াই এসব ক্লাসে অংশ নিতে পারছেন।
শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে এসব শিক্ষাক্রমকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। একদম শিক্ষানবিশদের জন্য রয়েছে বর্ণমালা ও সহিহ-শুদ্ধ কোরআন পাঠ শেখার ব্যবস্থা। উন্নত স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য তাজবিদ, হিফজ এবং কোরআনের তাফসির শেখার বিশেষ সুযোগ রয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে নিবন্ধন করে দর্শনার্থীরা নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অধীনে সরাসরি ক্লাসে যুক্ত হতে পারছেন।
মসজিদে নববিতে বসে জ্ঞানচর্চার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, কেউ যদি ভালো কিছু শেখা বা শেখানোর উদ্দেশ্যে তাঁর মসজিদে আসে, সে মহান আল্লাহর পথে লড়াইকারী মুজাহিদের সমতুল্য মর্যাদা লাভ করবে। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২)
মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ সপ্তাহের আরবি কোর্স
মসজিদে নববির কোরআন ক্লাসের পাশাপাশি অনারব দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ঐতিহ্যবাহী মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। ভিজিট ভিসাধারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছয় সপ্তাহের ‘আরাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স’ চালু করা হয়েছে।
নির্ধারিত ফির বিনিময়ে পরিচালিত এই কোর্সে আধুনিক শিখনপদ্ধতির মাধ্যমে আরবি পড়া, লেখা ও দৈনন্দিন কথোপকথনের দক্ষতা অর্জন করা যাবে।
একাধিক মডিউলে সাজানো এই কোর্সে ধাপে ধাপে ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি মসজিদে নববির খুব কাছেই অবস্থিত হওয়ায় দর্শনার্থীদের জন্য যাতায়াতও বেশ সুবিধাজনক।
অংশগ্রহণ করবেন কীভাবে
মসজিদে নববির ফ্রি কোরআন ক্লাস এবং মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় সপ্তাহের আরবি কোর্স-এই দুটি সুযোগ মিলিয়ে দর্শনার্থীরা প্রায় দুই মাসের এক অনন্য শিক্ষাসফরের সুযোগ পাচ্ছেন।
দুই থেকে তিন মাসের ভিজিট ভিসায় আসা পুণ্যার্থীরা কেবল ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘুরে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এই সময়টুকু জ্ঞানার্জনে কাজে লাগাতে পারবেন। নিচের লিংকে ক্লিক করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করে নিতে পারবেন।
মসজিদে নববির কোরআন ক্লাস: https://reg.qm.edu.sa/Minton/Account/NewRegistration
মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স: https://ala.asaqefah.sa/
ওমরাহ ও মদিনা জিয়ারতে আসা হাজার হাজার আন্তর্জাতিক পুণ্যার্থী এই উদ্যোগের ফলে ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে মদিনায় প্রবেশ করলে খুব সহজেই এই ঐতিহাসিক শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া সম্ভব।
সূত্র: দি ইসলামিক ইনফরমেশন ডট কম
পরিস্থিতি সবসময় একরকম যায় না। কখনও এমন কিছুর মুখোমুখি হতে হয়, যার জন্য আমরা প্রস্তুত নই। তখন ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় হয় এবং মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার সঙ্গেই কেন এমন হয়?’
মুমিন হবে ইতিবাচক
মুমিনের জীবনদর্শন ভিন্ন রকম। সে জানে, মানুষ পরিকল্পনা করে, আর আল্লাহও পরিকল্পনা করেন। তবে আল্লাহর পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গ, দূরদর্শী ও কল্যাণময়। এই আস্থা যদি অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যায়, তাহলে আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয় না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আবার কোনো বিষয়কে পছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)
কীভাবে আস্থা অর্জন করব
আল্লাহর সিদ্ধান্তে আস্থা রাখা কঠিন কোনো বিষয় নয়। পাঁচটি উপায় অনুসরণ করলে খুব সহজেই তা অর্জন করা যায়।
১. মনে করুন, ‘আমি কিছুই জানি না’
মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ভবিষ্যত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়। আজকের ব্যর্থতাকে সে চূড়ান্ত ব্যর্থতা মনে করে বসে। অথচ সে জানে না, এই ব্যর্থতার ভেতরেই ভবিষ্যতের বড় কোনো কল্যাণ লুকিয়ে আছে। বিপদের সময় বারবার স্মরণ করুন, যে দরজাটি আজ বন্ধ হয়েছে, সেটিই হয়তো আপনার জন্য কল্যাণকর ছিল না। যে সুযোগটি হাতছাড়া হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারত।
কোরআনের এক আয়াত এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে, ‘আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)
২. দায়িত্ব পালন করুন
চেষ্টা করা আপনার দায়িত্ব, ফলাফল আল্লাহর হাতে। চাকরি চাইলে আবেদন করুন, প্রস্তুতি নিন, দক্ষতা বাড়ান। পরীক্ষায় ভালো করতে চাইলে পড়াশোনা করুন। ব্যবসা করতে চাইলে পরিকল্পনা করুন। সম্পর্ক ভালো রাখতে চাইলে আন্তরিক হোন। মোটকথা নিজের দায়িত্ব যথাযথ পালন করুন। চেষ্টা করার পর ফলাফল আশানুরূপ না হলেও মনে রাখুন, আপনার দায়িত্ব ছিল চেষ্টা করা, আপনি তা করেছেন। ফলাফল নির্ধারণ করা আপনার দায়িত্ব নয়।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তিকে তার উট ছেড়ে দিয়ে বলেছিল, ‘আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি।’ তখন নবীজি (সা.) তাকে বলেছিলেন, ‘আগে উটটি বেঁধে নাও, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
৩. ‘যদি’ বলা কমিয়ে দিন
অতীতের কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব বেশি অনুশোচনা করা থেকে বিরত থাকুন। এর ফলে অনেক সময় মানুষ আল্লাহর উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।
> ‘যদি সেদিন এটা করতাম’
> ‘যদি ওই চাকরিটা নিতাম’
> ‘যদি তখন তাকে বিশ্বাস না করতাম’
এভাবে বর্তমানকে অতীতের ‘যদি’র কাছে বন্দী করে ফেলাটা অনুচিত। ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু অনুশোচনায় আটকে গেলে চলবে না।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বলের তুলনায় আল্লাহর কাছে উত্তম ও অধিক প্রিয়। প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যাতে তোমার উপকার তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না। আর যখন কোনো বিপদ আপতিত তখন এভাবে বলো না, ‘যদি আমি এমন করতাম’ তাহলে এমন এমন হত।বরং এভাবে বলেবে, ‘আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে।’ কারণ ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের পথ খুলে দেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)
৪. আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা রাখুন
বিপদে পড়েলে অনেক সময় মনে হয়, ‘আল্লাহ হয়তো আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন।’
এই ধারণা মারাত্মক বিপজ্জনক। কারণ মুমিনের উচিত আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা। কেননা আল্লাহ-তাআলা কখনও বান্দাকে তার আপন অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন না।
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি সেরূপই, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাকে নিজে স্মরণ করি। আর যদি সে লোক-সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই, যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়; আমি তার দিকে দু হাত অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৫০৫)
তাই বিপদের সময় মনকে বলুন, আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে না। এই বিশ্বাস মনের অস্থিরতা কমিয়ে দেবে এবং আল্লাহ ওপর আস্থা রাখা সহজ হয়ে যাবে।
৫. আন্তরিক দোয়া চালু রাখুন
মুমিনের দোয়া তার শক্তিশালী হাতিয়ার। এর মাধ্যমে বান্দা নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে অসীম ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। দোয়ার পর কোনো কিছু না পাওয়া মানেই আল্লাহ তা কবুল করেননি—এমন নয়। কখনো তিনি চাওয়া জিনিসটি দেন, অথবা তার চেয়ে উত্তম কিছু দেন, আবার কোনো অদৃশ্য ক্ষতি থেকে আপনাকে রক্ষা করেন। এ জন্যই ভরসা রাখতে হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
আল্লাহর সিদ্ধান্তে ওপর আস্থা রাখা একজন মুমিনের জন্য পরম অনন্দের বিষয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর আস্থা রাখে, সে ব্যর্থ হলেও ভেঙে পড়ে না, অপেক্ষা করেও হতাশ হয় না, কোনো কিছু হারালেও আল্লাহর প্রতি অভিযোগ তুলে না।
কারণ সে জানে, আমার জন্য কোনটি কল্যাণকর আমার চেয়েও আল্লাহই ভালো জানেন। এই বিশ্বাসের নাম তাওয়াক্কুল। এখানেই লুকিয়ে আছে মুমিনের প্রশান্তির রহস্য।