ছবি : সংগৃহীত
সারাদিন কাজ আর কাজের চিন্তায় আমরা সব শক্তি শেষ করে ফেলি। দিনশেষে যখন ইবাদত করার সময় আসে, তখন শরীর আর সায় দিতে চায় না। মনে হয়, ইবাদতও বুঝি সারাদিনের কাজের তালিকার আরও একটা দায়িত্ব।
তাই আমরা চেষ্টা করি যত দ্রুত সম্ভব নামাজটা পড়ে শেষ করে দায়মুক্ত হতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নামাজ আর ইবাদত কি সত্যিই আমাদের জন্য কোনো বোঝা? নাকি আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে শান্তির সবচেয়ে বড় জায়গা এটিই হতে পারত?
আসুন, নতুন করে ৫টি উপায় চর্চা করি, যা ইবাদতের স্বাদ ফিরিয়ে দেবে।
১. ভাবনাটা একটু বদলে নেওয়া দরকার
কেন আমাদের কাছে ইবাদত অনেক সময় কঠিন মনে হয়? কাজের ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়ার জন্য আমরা যতখানি মনোযোগ দিই, ইবাদতের বেলায় অতখানি দিতে পারি না। কেন এমন হয়? কারণ সংসারের কাজের ফল আমরা সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পাই, আর ইবাদতের সুফল বা মানসিক শান্তিটা আমরা চট করে চোখে দেখতে পাই না।
তাই প্রথমেই আমাদের চিন্তাভাবনাটা একটু বদলে ফেলতে হবে। নামাজ কেন পড়ি? কেবল হুকুম মানার জন্য নয়, বরং আমাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যই মহান আল্লাহ এটি দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, নামাজ মানুষকে অন্যায় ও খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, দিন ও রাতের নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করো, নিশ্চয়ই ভালো কাজ খারাপ কাজকে দূর করে দেয়। (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৪)
দিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আসলে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা কেন এই পৃথিবীতে এসেছি। মহান আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর আনুগত্য ও ইবাদতের জন্য। (সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)
এই সহজ কথাটা মনে লালন করতে পারলে নামাজকে আর কোনো কঠিন দায়িত্ব মনে হবে না। সারাদিনের বিশৃঙ্খলা ও মানসিক চাপের মধ্যে নামাজ আমাদের মনকে এনে দেবে অদ্ভুত এক শান্তি ও স্থৈর্য। তখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোকেই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা বলে মনে করবে।
২. মনকে এক জায়গায় আনা
আমাদের জীবনটা এখন এমন হয়ে গেছে যে, আমাদের মন কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকে না। মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, নানা চিন্তা—সব মিলিয়ে মন অলস বসে থাকার সুযোগ পায় না।
এমনকি যখন আমরা নামাজে দাঁড়াই, তখনও মাথার ভেতরে সংসারের নানা চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। ফলে রুকু-সেজদা তো আমরা করি ঠিকই, কিন্তু অন্তরে আল্লাহর সঙ্গে সেই গভীর যোগাযোগটা তৈরি হয় না।
এই যান্ত্রিকতা দূর করার সহজ উপায় হলো সেজদা। সেজদাই হলো মানুষের জন্য তার স্রষ্টার সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার সময়। রাসুল (সা.) বলেছেন, বান্দা সেজদার অবস্থাতেই তার রবের সবচেয়ে কাছে পৌঁছায়, তাই তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া কোরো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)
তাই নামাজে সেজদার সময় তাড়াহুড়ো না করে কিছুটা বেশি সময় থাকুন। নিজের মনের সব কথা ও অনুভূতি নীরব ভাষায় আল্লাহর কাছে খুলে বলুন। সেজদার এই কয়েকটা মুহূর্তই আপনার নামাজকে একটি নিয়মমাফিক অভ্যাসের বদলে হৃদয়ের সুগভীর ভালোবাসায় বদলে দেবে।
৩. সংসারের দায়িত্বও তো ইবাদত
ইবাদতকে গুরুত্ব দেওয়ার মানে কিন্তু এই নয় যে আপনি সংসারের কাজ বা অন্যান্য দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। ইসলাম আমাদের কাজ ফেলে ঘরকুনো হয়ে বসে থাকতে বলে না। পরিবার, সন্তান, মা-বাবা কিংবা সহকর্মীদের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা পালন করা অত্যন্ত জরুরি।
সত্যি বলতে কি, সঠিক নিয়তে পরিবারের যত্ন নেওয়া বা নিজের দায়িত্ব পালন করাও এক ধরনের ইবাদত। মহানবী (সা.) বলেছেন, একজন মুমিন যা ভালো কাজ করে এবং পরিবারের জন্য যে খরচ করে, সেটাও তার জন্য সদকা বা ইবাদত হিসেবে লেখা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫)
কাজের পাশাপাশি যদি অন্তরে এই চিন্তা থাকে যে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাজগুলো করছি, তবে আপনার পুরো দিনটাই ইবাদতে পরিণত হবে। প্রতিদিন সকালে কাজের শুরুতেই মনে মনে আল্লাহকে স্মরণের নিয়ত করে নিন।
কাজের চাপে মন যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন আবার নতুন করে আল্লাহর নাম স্মরণ করুন। ইবাদত জীবন থেকে আলাদা কিছু নয়, বরং সুন্দর জীবনযাপনেরই পথ।
৪. নিজের সাধ্য জানা ও মধ্যপন্থা
আত্মিক উন্নতির পথে আরেকটি বড় বাধা হলো নিজের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করতে যাওয়া। ধর্মের ক্ষেত্রে সবার ক্ষমতা সমান নয়। ইসলাম মানুষের ওপর অসাধ্য কিছু চাপিয়ে দেয় না। যেমন, কারও যদি নফল রোজা রাখা সহজ মনে হয়, তবে তিনি রোজা রাখতে পারেন।
কিন্তু যদি রোজা রাখলে শরীর বেশি খারাপ হয়ে যায় বা দৈনন্দিন কাজে বড় ব্যাঘাত ঘটে, তবে নিজেকে জোর না করে অন্য কোনো আমল বেছে নেওয়া উচিত।
আপনি সাধ্যমতো দান-সদকা করতে পারেন, রাতে একটু তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন কিংবা আল্লাহর রাসুলের ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে পারেন।
মহানবী (সা.) ইবাদতের ব্যাপারে সবসময় সহজ পথ ও মধ্যপন্থা বেছে নিতে বলেছেন। তিনি আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি ধর্মের ব্যাপারে অতিরিক্ত কঠোরতা করে, ধর্ম তার ওপর বিজয়ী হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯)
তাই নিজের শরীর ও মনকে জানুন। আপনার জন্য যে আমলটি সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়, সেটির মাধ্যমেই আল্লাহর প্রিয় হওয়ার চেষ্টা করুন।
৫. কারো তুলনা নয়, নিজের উন্নয়ন
ইবাদতকে দীর্ঘস্থায়ী ও আনন্দময় রাখার শেষ উপায় হলো, নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা না করা। কে কত বেশি নামাজ পড়ছে বা কে কতটা ইবাদত করছে, তা দেখে নিজের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করা ঠিক নয়। প্রত্যেকের পরিস্থিতি ও শক্তি আলাদা।
অন্যের দেখাদেখি হঠাৎ এমন কোনো কঠিন কাজ শুরু করা উচিত নয়, যা পরে ধরে রাখা যায় না। বরং নিজের আগের অবস্থার সঙ্গে আজকের অবস্থার তুলনা করুন।
যেমন—আপনি যদি এখন প্রতিদিন কোরআনের একটি পৃষ্ঠা পড়েন, তবে আস্তে আস্তে তা বাড়িয়ে দুটি পৃষ্ঠা করার চেষ্টা করুন। সেই নিয়মটি নিজের অভ্যাসে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত সেটুকুই ধরে রাখুন।
ইসলামে খুব বেশি আমল একবারে করার চেয়ে নিয়মিত ছোট ছোট আমল করাকে বেশি পছন্দ করা হয়েছে। নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি উত্তরে বললেন, যে আমল নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)
সাধ্যের বেশি করতে গেলে একসময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সব আমল একবারে ছেড়ে দেয়। তাই নিজেকে সময় দিন এবং অল্প হলেও নিয়মিত ইবাদত চালিয়ে যান।
পরিশেষে বলা যায়, ইবাদত কোনো যান্ত্রিক শারীরিক অভ্যাস নয়, এটি হলো স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার এক মধুর আত্মিক সম্পর্ক। ক্লান্তি আর ব্যস্ততায় ভরা জীবনে ইবাদতকে যদি একটু বিরতি ও শান্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে তা আমাদের মন ও জীবনের গতি পুরোটাই বদলে দেবে।
ছবি : সংগৃহীত
বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখা এবং প্রশ্ন করার বিষয়ে ইসলামে কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। হাদিসে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া নারীকে দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে রয়েছে কিছু শর্ত ও সীমারেখা।
মোহাম্মদপুর জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার মুফতি ও মুহাদ্দিস শফিকুল ইসলাম হাটহাজারী এ সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। নিচে তার প্রশ্নে উত্তর তুলে ধরা হলো-
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল যে, আমি জনৈকা আনসারী নারীকে বিয়ে করার ইচ্ছা করেছি (আপনার কী অভিমত?)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘(বিয়ের পূর্বে) তাকে দেখে নাও। কেননা, আনসারী নারীদের চক্ষুতে কিছু দোষ থাকে।’ (মুসলিম: ১৪২৪, নাসায়ী: ৩২৪৬, আহমাদ: ৭৮৪২, সহীহাহ্: ৯৫)
অন্য হাদিসে এসেছে, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন সম্ভব হলে তার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য যেন দেখে নেয়, যা তাকে বিয়েতে আগ্রহী করে তোলে।’
বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমি এক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা অন্তরে গোপন রেখেছিলাম। এরপর আমি গোপনে তার মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখি, যা আমাকে তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী করে তুলল। এরপর আমি তাকে বিয়ে করি।’ (আবু দাউদ: ২০৮২)
তবে পাত্রী দেখার সময় শুধুমাত্র পাত্র ব্যতীত অন্য কোনো নন-মাহরাম, যেমন ছেলের বাবা, ভাই, দুলাভাই, বন্ধু প্রমুখ, মেয়েকে দেখতে পারবে না। এটা হারাম।
আর পাত্র যখন পাত্রীকে দেখবে, তখন এক্ষেত্রে শুধু পাত্রীর চেহারা, হাতের কব্জি ও পায়ের পাতা দেখা যাবে। এছাড়া অন্য কোনো অঙ্গ দেখতে পারবে না। এমনকি মাথার চুলও দেখা যাবে না।
এ বিষয়ে ইবন আবেদীন রহ. বলেন, ‘পাত্রীর চেহারা, দুই হাতের কব্জি ও দুই পা (পাতা) দেখা জায়েয। এর বেশি দেখা যাবে না।’ (হাশিয়া ইবন আবেদীন: ৫/৩২৫)
পাত্র-পাত্রীর দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপচারিতায় যেসব শর্ত
পাত্র-পাত্রীর পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপচারিতার কয়েকটি মূলনীতি রয়েছে।
১. খালওয়াত (একা থাকা, গোপন কক্ষে অবস্থান করা বা আত্মগোপন) হতে পারবে না।
২. মুবাহ (ইসলামে যেসব বিষয়ে আদেশ, নিষেধ কিছুই করা হয়নি বা যেসব বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে) বিষয় ব্যতীত অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাবে না।
৩. ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকতে হবে। যদি কামভাব জাগ্রত হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে যায়, অথবা কোনো একজন উপভোগ করতে শুরু করে নেয়, তাহলে তখন সেটা হারাম হয়ে যাবে।
৪. নারী নরম ভাষায় কথা বলতে পারবে না।
৫. নারী পূর্ণ হিজাব তথা কবজা পর্যন্ত হাত, টাখনু পর্যন্ত পা এবং মুখ ব্যতীত সমস্ত শরীর ঢেকে রাখবে।
৬. প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথাবার্তা বলা যাবে না।
যখন এসব শর্ত পাওয়া যাবে, তখনই মূলত পাত্র-পাত্রী পরস্পর আলোচনা ও দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবে। সুতরাং, পাত্রী দেখার সময় পাত্রের অতিরিক্ত প্রশ্ন না করা উচিত। এতে পাত্রী বিব্রত অবস্থায় পড়তে পারেন। যতটুকু জানার প্রয়োজন থাকবে, পাত্রের মাহরাম মহিলারা তা জেনে নেবেন।
ছবি : সংগৃহীত
পবিত্রতা অর্জন মুমিনের জীবনের এক অনুপম সৌন্দর্য। আত্মাকে স্নিগ্ধ রাখা এবং প্রভুর দরবারে সিজদানত হওয়ার প্রাথমিক চাবিকাঠি হলো অজু। কেবল নামাজ বা কুরআন তিলাওয়াতই নয়, সার্বক্ষণিক অজু অবস্থায় থাকার আত্মিক ও মানসিক ফজিলত অপরিসীম। এটি মনকে সতেজ ও প্রফুল্ল রাখে। পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবেসে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তওবাকারী এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২২২)
গালি দিলে কি অজু ভেঙে যায়? ফিকহি বিধান
দৈনন্দিন জীবনে রাগ কিংবা অসাবধানতাবশত অজুর পর মুখ থেকে অশালীন বাক্য বা গালি বের হয়ে গেলে অনেকের মনেই এই সংশয় জাগে যে অজু ভেঙে গেল কি না।
ফিকহি বিধান অনুযায়ী, অজু করার পর কাউকে গালি দিলে সরাসরি অজু ভেঙে যায় না। অজু ভেঙে যাওয়ার নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক কারণ রয়েছে। যেহেতু গালি দেওয়া বা অশালীন কথা বলা অজু ভঙ্গের কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই অজুর পর গালি দিলে অজু নষ্ট হবে না। তবে গালি দেওয়ার কারণে অজুর আধ্যাত্মিক নুর ও পবিত্রতার মাহাত্ম্য বা বরকত কমে যায়। এ জন্য বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ হলো— এমন পরিস্থিতি ঘটলে নতুন করে আবার অজু করে নেওয়া উত্তম।
ইসলামে গালি দেওয়া ও কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহতা
অজু না ভাঙলেও কাউকে গালি দেওয়া ইসলামে একটি অত্যন্ত গর্হিত ও কবিরা গুনাহের কাজ। কোনো যৌক্তিক বা অযৌক্তিক কারণেই ইসলামে অন্যকে গালি দেওয়ার বিন্দুমাত্র অনুমতি নেই। এমনকি ঠাট্টা-মশকরা কিংবা হাসি-কৌতুকের ছলেও কাউকে গালি দেওয়া বা গালিগালাজ করা কঠোরভাবে নিন্দনীয়।
কাউকে গালি দেওয়া বা মুখে কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন—
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
‘যারা বিনা অপরাধে ইমানদার পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫৮)
অজু শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতার মাধ্যম নয়, এটি মুমিনের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনেরও একটি বড় উপায়। তাই বাহ্যিক পবিত্রতা রক্ষার পাশাপাশি মুখের ভাষাকেও সংযত রাখতে হবে। সব ধরনের অশ্লীলতা ও গালিগালাজ থেকে দূরে থেকে নিজেদের জীবনকে ইবাদত ও সুন্দরের আলোয় আলোকিত করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামের দৃষ্টিতে জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। হাদিসে এ দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দিনে বিশেষ কিছু আমল রয়েছে, যেগুলো পালনের মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করতে পারেন। কোরআনে ‘জুমা’ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরাও রয়েছে।
জুমার দিনের মর্যাদা ও আমল সম্পর্কে একাধিক হাদিসে বিস্তারিত নির্দেশনা এসেছে।
১. জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা
আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, পৃথিবীতে অবতরণ করানো হয়েছে এবং তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন-যদি সে হারাম কিছু প্রার্থনা না করে। আর এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।(ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৮৯৫)
২. জুমার নামাজ আদায়
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো জুমার নামাজ আদায় করা। এ দিনের জন্য গোসল করে, পরিচ্ছন্ন হয়ে, সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যাওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, ভালোভাবে পবিত্র হয়, সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যায়, দুজন মুসল্লির মাঝখানে গিয়ে তাদের আলাদা না করে, নির্ধারিত নামাজ আদায় করে এবং ইমাম খুতবা শুরু করলে নীরব থাকে-তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত সময়ের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)
৩. জুমার দিন গোসল করা
জুমার দিন গোসল করা এবং পরিচ্ছন্ন হয়ে মসজিদে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল।
আউস ইবনে আউস সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালোভাবে গোসল করে, দ্রুত মসজিদে যায়, ইমামের কাছাকাছি বসে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে-তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব রয়েছে।
(আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫)
৪. আগে আগে মসজিদে যাওয়া
জুমার দিন যত আগে মসজিদে যাওয়া যায়, তত বেশি ফজিলতের কথা হাদিসে এসেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রথমে মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট কোরবানি করল; এরপর যে যায়, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল; এরপর যে যায়, সে যেন একটি ছাগল কোরবানি করল। এরপর যারা আসে, তাদের জন্যও পর্যায়ক্রমে সওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম খুতবার জন্য বের হলে ফেরেশতারা খুতবা শুনতে উপস্থিত হন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৪১)
৫. দোয়া কবুলের বিশেষ সময়
জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার কথা হাদিসে এসেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কোনো কল্যাণের জন্য দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। হাদিসে এ সময়টি আসরের পর অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে।
(আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮)
তাই জুমার দিনে বিশেষ করে আসরের পর বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
৬. সুরা কাহাফ পাঠ
জুমার দিনের অন্যতম আমল হলো সুরা কাহাফ পাঠ করা। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় আলোয় আলোকিত থাকবে।
(আল-মুস্তাদরাক: ২/৩৯৯)
৭. বেশি বেশি দরুদ পড়া
জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
আউস ইবনে আবি আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। ... অতএব, তোমরা এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কারণ জুমার দিনে তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’
(আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)
৮. গুনাহ থেকে বিরত থাকা
জুমার দিনের মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি সব ধরনের গুনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখা জরুরি। হাদিসে জুমার নামাজ ও অন্যান্য আমলের মাধ্যমে এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ হওয়ার কথা এসেছে-তবে কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার শর্তও উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই জুমার দিনকে শুধু নামাজের দিন হিসেবে নয়, বরং তওবা, ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বিশেষ সুযোগ হিসেবে নেওয়া উচিত।
প্রতীকী ছবি
ইবাদতের প্রথম পুরস্কার হলো আত্মার প্রশান্তি। আমলের মাধ্যমে ইবাদতকারীর মন উত্ফুল্ল হয়। ইবাদতের স্বাদ বলে একটি কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু বহু মুসলমান এমন আছে, যারা বছরের পর বছর ইবাদত করে, আমলময় জীবন যাপন করে, কিন্তু কোনো শান্তি, কোনো তৃপ্তি অনুভূত হয় না।
এখানে ইবাদতে তৃপ্তি আসার উপায় নিয়ে আলোচনা করা হলো—
১. ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করা : ভালো কাজে প্রতিযোগিতা ইবাদতে প্রশান্তি আনে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা প্রতিযোগিতা করো তোমাদের রবের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততার মতো। (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২১) তাই কোনো সৎকর্মের সুযোগ এলে দ্রুত তা সম্পাদন করা সত্যিকার মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
২. ইবাদতে কষ্ট স্বীকার করা : কষ্টের সঙ্গে পূর্ণভাবে অজু করা, এশা ও ফজরের জামাতে যোগদান করা, শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া, কষ্টের সময় ও সচ্ছলতার সময় আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে হাদিসে সর্বোত্তম আমল বলা হয়েছে। আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেন, ‘অতঃপর নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।
অতএব যখন অবসর পাও একান্তে ইবাদত করো এবং তোমার রবের দিকে মনোনিবেশ করো। (সুরা : ইনশিরাহ, আয়াত : ৫-৮)
৩. বেশি বেশি নফল ইবাদত করা : নফল ইবাদত তৃপ্তিদায়ক আমলের ক্ষেত্রে সহায়ক। আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেন, ‘আর রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ো। এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত। নিঃসন্দেহে তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত স্থানে উঠাবেন।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯)
৪. কোরআন অনুধাবন করা : যেকোনো অবস্থায় কোরআন হলো মুমিনের জন্য শিফা বা আরোগ্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তবে কি তারা কোরআন অনুধাবন করে না? নাকি তাদের হৃদয়গুলো তালাবদ্ধ?’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ২৪)
৫. পাপের কাছেও না যাওয়া : বারবার পাপ কাজ করার দ্বারা অন্তরে মরিচা পড়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘...প্রকাশ্য বা গোপন কোনো অশ্লীলতার নিকটবর্তী হবে না। ন্যায্য কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন। এসব বিষয় তিনি তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, যাতে তোমরা অনুধাবন করো।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)
৬. অনর্থক কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকা : সফল মুমিনদের গুণাবলি ব্যাখ্যায় আল্লাহ বলেন, ‘যারা অনর্থক ক্রিয়াকলাপ থেকে নির্লিপ্ত।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৩)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তির ইসলামী সৌন্দর্য হলো, অনর্থক কর্মকাণ্ড পরিহার করা।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯৬৭)
৭. ইবাদতে অহংকার না করা : আগে-পিছে সব গুনাহ মাফ থাকা সত্ত্বে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাহাজ্জুদে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ইবাদত করতেন। এতে তাঁর দুই পা ফুলে যেত। এ প্রসঙ্গে স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ (বুখারি, হাদিস : ৪৮৯৭)
৮. সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা : আল্লাহর স্মরণে অন্তর প্রশান্ত হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘...জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)
এ জন্য বিভিন্ন সময়ে কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। যেমন—খানাপিনা, ওঠা-বসা, নিদ্রাকালে ও জাগরণে দৈনন্দিন পঠিতব্য দোয়াগুলো বুঝেশুনে পাঠ করা উচিত। মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ছবি : সংগৃহীত
জুমার দিন ইসলামি সংস্কৃতিতে ‘সাপ্তাহিক ঈদের দিন’। জুমার দিন শুধু সাধারণ সাপ্তাহিক ছুটির দিন নয়, বরং এটি আত্মিক জাগরণ, পাপমুক্তি এবং মহান আল্লাহর খাস রহমত অর্জনের এক মহিমান্বিত সুযোগ।
এক ব্যক্তি জানতে চান, কেউ যদি ইমামের খুতবা চলাকালীন সময় সুন্নতের নিয়ত করেন, তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?
উত্তরে ঢাকার মারকাযুশ শরীয়াহ আলইসলামিয়ার হাদীস ও ফিকহ বিভাগের শিক্ষক মুফতী নাঈম সিদ্দীকী বিন আব্দুস সাত্তার বলেন, ইমামের খুতবা চলাকালীন সময় নামাজের নিয়ত করা নিষেধ।
عن ابن عمر قال : سمعت النبي صلى الله عليه و سلم يقول إذا دخل أحدكم المسجد والإمام يخطب على المنبر فلا صلاة ولا كلام حتى يفرغ الإمام
অনুবাদ-আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ বলেন-আমি রাসূল (স.) -কে বলতে শুনেছি যে, যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করে আর ইমাম খুতবা দিচ্ছে মিম্বরের উপর, তাহলে ইমাম ফারিগ হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো নামায নেই, কোনো কথাও নেই। (মাযমাউজ জাওয়ায়েদ, ২/১৮৪, হাদীস নং-২০১৪) ইবনে হিব্বান (রহ.) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
عن ثعلبة بن أبى مالك القرظي : أن جلوس الإمام على المنبر يقطع الصلاة وكلامه يقطع الكلام (شرح معانى الآثار، كتاب الصلاة، باب الرجل يدخل المسجد يوم الجمعة والإمام يخطب هل ينبغي له أن يركع أم لا، رقم الحديث-2014)
অনুবাদ-হযরত সা’লাবা বিন আবি মালিক আল কুরাজী (রা.) বলেন- ‘নিশ্চয় ইমামের মিম্বরে বসা নামায বন্ধ করে দেয়, আর তার কথা বলা কথাকে বন্ধ করে দেয়’। (তাহাবী শরীফ, ১/৩৭০, হাদীস নং-২০১৪) এই হাদীসটি সহীহ।
أن أبا هريرة أخبره أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال إذا قلت لصاحبك يوم الجمعة أنصت والإمام يخطب فقد لغوت (صحيح البخارى-كتاب الجمعة، باب الإنصات يوم الجمعة والإمام يخطب، رقم الحديث-892
অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন- রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- ‘যখন তুমি তোমার পাশের জনকে জুমআর দিন বল-চুপ থাক, এমতাবস্থায় যে, ইমাম সাহেব খুতবা দিচ্ছে, তাহলে তুমি অযথা কাজ করলে।’ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৮৯২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০০৫)
ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, ইসলামের প্রথম যুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তরুণ সাহাবিরাই পালন করেছেন। আলী ইবনে আবি তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, ওসামা ইবনে জায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতো তরুণেরা নবীজির হাতে গড়ে উঠেছিলেন। তাঁদের কেউ ছিলেন আলেম, কেউ প্রচারক, কেউ প্রশাসক, কেউ সেনাপতি। তাঁদের যোগ্যতা এক ছিল না। দায়িত্বও এক ছিল না। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যে রাসুল (সা.) এমন কিছু দেখেছিলেন, যা অন্যরা হয়তো তখনো দেখতে পায়নি।
তরুণদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাই মহানবীর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী। তিনি উপদেশ দিয়েছেন, আবার দায়িত্বও দিয়েছেন। ভুল শুধরে দিয়েছেন, আবার আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছেন। ইমান তৈরি করেছেন, আবার সেই ইমানের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগও দিয়েছেন।
১. ভালোবাসার মাধ্যমে তরুণের হৃদয় জয় করা
কোনো মানুষকে সংশোধন করতে হলে আগে তার হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়। রাসুল (সা.) তরুণদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, যাতে তারা নির্ভয়ে তাঁর কাছে নিজেদের কথা বলতে পারত। এর একটি অসাধারণ উদাহরণ সেই যুবক, যে নবীজির কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিল।
সাহাবিরা তার কথায় ক্ষুব্ধ হলেন। কিন্তু নবীজি (সা.) তাকে ধমক দিলেন না। বললেন, ‘তাকে আমার কাছে আসতে দাও।’ এরপর তাকে কাছে বসিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এমনটা পছন্দ করবে?’
যুবক বলল, ‘না, আল্লাহর কসম।’ তিনি বললেন, ‘মানুষও তাদের মায়ের জন্য তা পছন্দ করে না।’ এরপর কন্যা, বোন, ফুফু ও খালার কথা উল্লেখ করলেন। প্রতিবার যুবক একই উত্তর দিল। শেষে রাসুল (সা.) তার জন্য দোয়া করলেন।
বর্ণনাকারী আবু উমামাহ (রা.) বলেন, এরপর ওই যুবকের কাছে ব্যভিচারের চেয়ে অধিক ঘৃণিত আর কিছু ছিল না। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২১১)
২. প্রতিভা খুঁজে বের করে তাকে বিকশিত করা
প্রত্যেক মানুষ একই ধরনের যোগ্যতা নিয়ে জন্মায় না। কেউ জ্ঞান অর্জনে এগিয়ে, কেউ নেতৃত্বে, কেউ ভাষা ও লেখায়, কেউ দাওয়াতের কাজে। রাসুল (সা.) তরুণদের সবাইকে একই ছাঁচে গড়ে তোলেননি। তিনি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র যোগ্যতা চিনেছেন এবং সেই অনুযায়ী তাদের তৈরি করেছেন।
জায়েদ ইবনে সাবিত ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী তরুণ। রাসুল (সা.) তাঁর শেখার ক্ষমতা লক্ষ করেছিলেন। তাই তাঁকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। জায়েদ (রা.) বলেন, তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ভাষা শিখে ফেলেন। এরপর ইহুদিদের চিঠি নবীজির কাছে পড়ে শোনাতেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে তাদের চিঠি লিখতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১৫)
পরবর্তী সময়ে তিনি ওহি লেখকদের অন্যতম হন। কোরআন সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। ফরায়েজ শাস্ত্রেও তিনি বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মধ্যেও তিনি জ্ঞানের বিশেষ যোগ্যতা দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তাঁকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাঁকে কোরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৩)
পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও মুফাসসির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
৩. আত্মবিশ্বাস তৈরি করা
তরুণ বয়সে আত্মবিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণ যদি মনে করে, ‘আমি পারি না’, তাহলে তার অনেক যোগ্যতাই অপ্রকাশিত থেকে যায়। রাসুল (সা.) তাই প্রয়োজনমতো তরুণদের ভালো গুণের প্রশংসা করতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ কতই না উত্তম মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত!’ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘এর পর থেকে তিনি খুব কমই রাতের নামাজ ছেড়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১২২)
এখানে নবীজি (সা.) সরাসরি ‘তুমি তাহাজ্জুদ পোড়ো না’ বলে ভর্ৎসনা করেননি। আগে তার ভালো দিকটি উল্লেখ করেছেন। তারপর উন্নতির একটি পথ দেখিয়েছেন। এ ধরনের প্রশংসা মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগায়। আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
৪. তরুণদের হাতে বাস্তব দায়িত্ব তুলে দেওয়া
রাসুল (সা.) তরুণদের শুধু ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে প্রস্তুত করেননি; যোগ্যতা দেখলে তাদের বর্তমানেই দায়িত্ব দিয়েছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)।
নবীজি তাঁকে একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই বাহিনীতে বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক বড় সাহাবিও ছিলেন। ওসামা তখন তরুণ। কিছু মানুষ তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করলে নবীজি বললেন, ‘তোমরা যদি ওসামার নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করো, এর আগে তাঁর পিতার নেতৃত্ব নিয়েও আপত্তি করেছিলে। আল্লাহর শপথ, সে নেতৃত্বের উপযুক্ত ছিল। আর তার পরে ওসামাও আমার কাছে প্রিয় এবং নেতৃত্বের উপযুক্ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৩০)
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। রাসুল (সা.) নেতৃত্ব শেখানোর জন্য ওসামাকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করাননি। তাঁর যোগ্যতার ওপর আস্থা রেখে বাস্তব দায়িত্ব দিয়েছেন। কেননা দায়িত্ব পালন করতে করতেই দায়িত্বশীলতা তৈরি হয়।
৫. পাঠশালা থেকে পাঠিয়ে দিতেন জীবনের মাঠে
শিক্ষা যদি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ না পায়, তাহলে তার প্রভাব সীমিত হয়ে যায়। রাসুল (সা.) তরুণদের জ্ঞান দিয়েছেন এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগও দিয়েছেন।
মুসআব ইবনে ওমাইর (রা.) ছিলেন তরুণ। হিজরতের আগে নবীজি তাঁকে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
মদিনায় গিয়ে তিনি মানুষের কাছে ইসলাম তুলে ধরেন। তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে সাদ ইবনে মুয়াজ ও উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের মাধ্যমে আরও বহু মানুষ ইসলামের দিকে আসে।
৬. ইমান ও চিন্তার ভিত শক্ত করা
তরুণকে দায়িত্ব দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার আগে তার চিন্তার ভিত শক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) তাই তরুণদের সঙ্গে এমন কথাও বলতেন, যা তাদের পুরো জীবনদর্শন গড়ে দিত।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন তখন কিশোর। এক সফরে তিনি নবীজির বাহনের পেছনে বসে ছিলেন। সেই সময় নবীজি (সা.) তাঁকে বললেন, ‘হে বৎস, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাব।’
এরপর বললেন, ‘আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। কিছু চাইলে আল্লাহর কাছে চাইবে। সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখবে, সমগ্র মানুষ তোমার উপকার করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে কিছু করতে পারবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬)
পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমে পরিণত হন।
৭. শুধু শিষ্য নয় শিক্ষক বানাতেন
নবীজির কাছে কয়েকজন তরুণ প্রায় ২০ দিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের পরিবারের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। এটা বুঝতে পেরে তিনি তাঁদের বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। কিন্তু তাঁদের যাওয়ার সময় বললেন, ‘তোমরা তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও, তাদের শিক্ষা দাও এবং তাদের সৎকাজের নির্দেশ দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭২৪৬)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাঁরা নবীজির কাছে এসেছিলেন শিখতে। আর ফিরে গেলেন শিক্ষক হয়ে। এটাই নবীজির দীক্ষার বড় বৈশিষ্ট্য যে মানুষকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা নয়; তাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে সে নিজেই অন্যদের পথ দেখাতে পারে।