যুদ্ধে তালেবান বাহিনী বেশিরভাগ গেরিলা কৌশলের উপর মনোনিবেশ করে। এতে তালেবান যোদ্ধাদের অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করার দাবি করেছে। বৃহস্পতিবার আফগান তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেন যে, দুই দেশের সীমান্তে পাকিস্তানি চেকপোস্টে হামলা চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, তাদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের একাধিক পোস্ট দখল করা হয়েছে এবং নিরাপত্তাকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে।
এর জবাবে পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারা এক বিবৃতিতে তালেবানের দাবি অস্বীকার করে বলেছেন, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে তালেবান সরকারের উসকানিহীন গুলিবর্ষণের যথাযথ ও কার্যকর জবাব দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দাবি করেন, পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা হামলায় আফগান তালেবানের ৩৬ জন সদস্য নিহত হয়েছে। তিনি সীমান্ত সংঘর্ষে দুই পাকিস্তানি সেনার মৃত্যুর বিষয়টিও নিশ্চিত করেন। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান এবং আফগান তালেবানের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে আফগানিস্তানে বিমান হামলায় সাতটি জঙ্গি আস্তানা লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করেছিল পাকিস্তান। সামরিক সূত্র জানায়, এসব অভিযানে ৮০ জনেরও বেশি জঙ্গি নিহত হয়েছে।
জবাবে আফগানিস্তানে তালেবানের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে পাকিস্তানি বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সতর্ক করেছে যে এসব হামলার 'উপযুক্ত সময়ে পূর্ণাঙ্গ জবাব দেওয়া হবে'। ২০২১ সালের অগাস্টে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে কাবুলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময় বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান এবং এর ফলে সীমান্ত সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
পাকিস্তান সরকার ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ করে আসছে যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন টিটিপিকে (তেহরিক-এ-তালেবান পাকিস্তান) সমর্থন দিচ্ছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। তবে আফগান তালেবান এ অভিযোগ অস্বীকার করে একে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার পরামর্শ দেয়। গত বছর দুই দেশের মধ্যে হওয়া সীমান্ত সংঘর্ষের পর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পরও দুই দেশের টানাপড়েন কমেনি। সাম্প্রতিক উত্তেজনা সে তিক্ততা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এখন দুই পক্ষের তীব্র সংঘর্ষের পর প্রশ্ন হচ্ছে সামনে কী হবে? আফগান তালেবানদের সামরিক সক্ষমতা কতটুকু এবং আগামী দিনে কী ঘটতে পারে? পাকিস্তানের সামরিক সূত্র দাবি করেছে, শনিবার রাতে পাকিস্তানের চালানো বিমান হামলায় ৮০ জঙ্গি নিহত হয়েছে, যদিও তালেবান কর্মকর্তারা এ দাবি অস্বীকার করেছে।
আফগান বিষয়ক বিশ্লেষক এবং সাংবাদিকদের পরিচালিত একটি প্ল্যাটফর্ম খোরাসান ডায়েরির সঙ্গে যুক্ত সিনিয়র সাংবাদিক ইফতিখার ফিরদৌস মনে করেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে প্রচলিত যুদ্ধ বলতে যা বোঝায় তার আশঙ্কা আপাতত নেই। বিবিসি উর্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তালেবানের পক্ষে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রচলিত যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ এর জন্য সামরিক সক্ষমতা, বিমান সক্ষমতা, ধারাবাহিক রসদ সরবরাহ এবং প্রশিক্ষিত সেনা প্রয়োজন। তিনি এ-ও উল্লেখ করেন, "নিকট ভবিষ্যতে তালেবান অবশ্যই জবাব দেবে, কারণ এটি তাদের সম্মানের বিষয়। তবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা খুব কম"।
আফগানিস্তানের ভেতরে টিটিপির নিরাপদ আশ্রয়স্থল নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ জাতিসংঘও চিহ্নিত করেছে, বলছেন ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক ড. খুররম ইকবাল। "একবার নয়, ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া জাতিসংঘের টানা তিনটি প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে টিটিপির আফগানিস্তানে নিরাপদ ঘাঁটি রয়েছে। সব শান্তিপূর্ণ উপায় ব্যবহার করার পর পাকিস্তান শক্তি প্রয়োগে বাধ্য হয়েছে," বলেন তিনি।
তিনিও মনে করেন গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে আফগান তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বা প্রচলিত যুদ্ধ চালাতে পারবে না। ড. ইকবাল বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী, প্রতি দশটি আফগান পরিবারের মধ্যে আটটি পরিবার জীবিকা নির্বাহের জন্য গৃহস্থালির জিনিসপত্র বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। যখন আফগান তালেবান অভ্যন্তরীণ সমস্যা সামাল দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা বাইরের দিকে মনোযোগ দেয়। পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা তাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য জোরদার করতে এবং সমস্যা থেকে মনোযোগ সরাতে সহায়তা করে। এ কারণেই তারা উত্তেজনা বজায় রাখতে চায়।
তবে এখানে আরেকটি বাস্তবসম্মত যুক্তির কথাও বলেন তিনি, ‘যদি তারা (আফগান তালেবান) টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে টিটিপির যোদ্ধারা আইএসের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে এবং অতীতে এমনটি ঘটেছেও। এ কারণেও তারা টিটিপির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে অনীহা দেখায়।’
বিশ্লেষক ইফতিখার ফেরদৌসের মতে, যদিও পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে পরিস্থিতি 'নতুন কিছু নয়', তবুও তালেবানের হাতে টিটিপির মতো সম্পদ রয়েছে এবং তারা পাকিস্তানের শহরাঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য সে সম্পদ (টিটিপি) পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করতে পারে। তালেবানের সক্ষমতা ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে ইফতিখার ফেরদৌসের সঙ্গে ড. খুররম ইকবালও একমত।
তিনি বলছেন, প্রচলিত যুদ্ধে যেহেতু পাকিস্তানের মোকাবিলা করা আফগান তালেবানের পক্ষে সম্ভব হবে না, তাই তারা অতীতের মতো অপ্রচলিত পদ্ধতি বেছে নেবে। পাকিস্তানের বড় শহরগুলোতে চরমপন্থি হামলার সংখ্যা বাড়তে পারে এবং দেশের শহরাঞ্চলে সহিংসতা বাড়তে পারে।
ড. খুররম ইকবালের মতে, আগামী দিনগুলোতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে সীমিত সংঘর্ষ হতে পারে, দেখানোর জন্য কিছু হামলা চালানো হতে পারে এবং আরও কঠোর বক্তব্য, দাবি ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখা যেতে পারে। অতীতেও উত্তেজনা বাড়লে একই ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে আফগান তালেবান তাদের স্থানীয় জনগণকে এই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে তারা প্রতিশোধ নিয়েছে। তারা সীমান্তে সীমিত পরিসরে কামান ব্যবহার করতে পারে।
আফগানিস্তানের সামরিক শক্তি কতটা?
তালেবান বাহিনীর হাতে থাকা অস্ত্র মূলত তিনটি উৎস থেকে এসেছে- সাবেক আফগান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র, দেশ ছেড়ে যাওয়া বিদেশি বাহিনীর রেখে যাওয়া সামরিক সরঞ্জাম এবং কালোবাজারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নতুন করে সংগ্রহ করা অস্ত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের সীমান্ত সংঘর্ষের ভিডিওতে দেখা যায়, তালেবান বাহিনী বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে হালকা অস্ত্র ব্যবহার করেছে, ভারী বা দূরপাল্লার অস্ত্র সেভাবে দেখা যায়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্গঠন বিষয়ক বিশেষ পরিদর্শক এবং দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে ২০ বছরের সময়কালে ১৬ লাখের বেশি হালকা ও ভারী অস্ত্র এবং বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম দেশটির সাবেক সরকারকে সরবরাহ করা হয়েছিল। এর প্রায় ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখের বেশি অস্ত্র তালেবানের হাতে চলে যায়। বর্তমানে তালেবান সরকারের বাহিনীর হাতে থাকা হালকা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে কালাশনিকভ, আমেরিকান এম-১৬, এম-৪, এম-২৯ হালকা মেশিনগান। এছাড়া পিকে এম-টু ও এম-২৪০ এর মতো ভারী মেশিনগান, গ্রেনেড লঞ্চার, রকেট লঞ্চার, আরপিজি-৭, এটিফোর এর মতো ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।
আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের (পেন্টাগন) প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক্তন আফগান সরকারের সেনাবাহিনীকে আমেরিকা যে ভারী সাঁজোয়া যান, বিমান এবং অন্যান্য ভারী সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল তাও তালেবানদের হাতে চলে গেছে। সেসব ভারী অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১২২ মিলিমিটার হাউইটজার আর্টিলারি কামান, যা ডি-৩০ নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, এ ধরনের ১০০ থেকে ১২০টি কামান এখনো আফগানিস্তানে রয়েছে। এছাড়া প্রায় ১৫৫ মিলিমিটার হাউইটজার মর্টার এবং জেডটি-২-২৩ এর মতো অনেক রাশিয়ান অস্ত্রও তালেবানের কাছে রয়েছে। ২০২৪ সালে তালেবান সরকার বাগরাম বিমান ঘাঁটিতে একটি সামরিক কুচকাওয়াজে তাদের ভারী অস্ত্র প্রদর্শন করেছিল। এর মধ্যে ছিল আর-১৭ স্কাড মিসাইল ও আলব্রুস আর-৩০০, যেগুলোর প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত পাড়ি দিতে সক্ষম।
লুনা মিসাইল যা ফ্রগ-৭ নামেও পরিচিত, গ্র্যাড রকেট লঞ্চার, মিলান অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল, এবং অর্গান মিসাইল ব্যবস্থাও রয়েছে। এর কিছু অস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৬ মাইল, আবার কিছু ৩৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। এই অস্ত্রগুলো অন্তত তিন দশক ধরে আফগানিস্তানে ব্যবহার করা হয়নি। কিছু প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এবং কিছু পাহাড়ি এলাকা যেমন পানজশিরে রয়েছে। তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা এসব অস্ত্রের কিছু পুনরায় সক্রিয় করেছে। তবে সেগুলোর প্রযুক্তিগত অবস্থা এবং বাস্তব যুদ্ধে কতটা ব্যবহারযোগ্য, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০২৪ সালে একটি সামরিক কুচকাওয়াজে তালেবান সরকার ভারী অস্ত্র প্রদর্শন করেছিল। এর মধ্যে ছিল আর-৭ স্কাড মিসাইল এবং এলব্রাস আর-৩০০, যা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে। তবে পাকিস্তানের একটি বড় সুবিধার জায়গা পাকিস্তানি বিমানবাহিনী ও আধুনিক যুদ্ধবিমান। তালেবান সরকারের কাছে এর সমতুল্য বিমানবাহিনী নেই।
তালেবান সরকার সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক হেলিকপ্টার মেরামত করে সচল করেছে এবং কয়েকজন পাইলটকে প্রশিক্ষণও দিয়েছে। আফগানিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বিসমিল্লাহ তাবান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের উপস্থিতির শেষ বছরগুলোতে আফগান বিমানবাহিনীকে পুরোপুরি সজ্জিত করেনি এবং বহু আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করে দিয়েছে। এই কারণেই তালেবানের কাছে আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপ করার মতো অস্ত্র নেই। তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তাদের কাছে প্রায় ৬০টি বিমান ও হেলিকপ্টার রয়েছে।
মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬১ হাজার হামভি, রেঞ্জার এবং শত শত সাঁজোয়া যান তালেবান দখল করেছে। তবে সাবেক আফগান সরকারের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, এসব সাঁজোয়া যান যুদ্ধের সময় রাবারের টায়ারের কারণে সমস্যায় পড়েছে।
'গেরিলা যুদ্ধের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা'
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নেটো এবং প্রাক্তন আফগান সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায় দুই দশক ধরে লড়াই করার পর, তালেবানরা গেরিলা যুদ্ধে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভিজ্ঞতা এখনো আজও তাদের সামরিক কৌশলের মেরুদণ্ড হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষের পর, আফগান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বিসমিল্লাহ তাবান বিবিসিকে বলেন, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ভিডিও এবং পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে যে তালেবানরা এখনো নিয়মিত সেনাবাহিনী হিসেবে নয়, বরং হালকা অস্ত্রে সজ্জিত হয়েও সশস্ত্র গেরিলা গোষ্ঠী হিসেবে লড়াই করছে।
অক্টোবর ২০২৫-এ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষের পর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বিসমিল্লাহ তাবান বিবিসিকে বলেন, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ভিডিও ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তালেবান এখনো নিয়মিত সেনাবাহিনীর মতো নয়, বরং হালকা অস্ত্রে সজ্জিত গেরিলা গোষ্ঠীর মতো লড়ছে। এই কৌশলে 'আকস্মিক' হামলার মাধ্যমে আক্রমণ চালানো হয়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন তালেবান কমান্ডার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন যে তালেবান বাহিনী, "বেশিরভাগই গেরিলা কৌশলের উপর জোর দিয়েছে, যেখানে আমাদের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। যদিও প্রয়োজনে মাঝে মাঝে নিয়মিত সামরিক ইউনিট ব্যবহার করা হত"।
তিনি বলছিলেন, "প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাদের এলাকা ও ফাঁড়ির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা জারি করা হয়, তবে স্থানীয় সীমান্ত কমান্ডারদের মাঠের বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়"। সাবেক আফগান সরকারের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "সীমান্ত এলাকায় ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও উপজাতীয় সামঞ্জস্য থাকলে তথ্য সংগ্রহ, গোপন রাখা এবং চলাচলে সহায়তা হয়। অনুপ্রবেশ অভিযানের জন্য এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ"। তিনি বলেন, এই 'সোশ্যাল কোর' বা সামজিক ভিত্তি তালেবানের সক্ষমতা বাড়ায়।
তালেবান বাহিনী ব্যাপকভাবে রাস্তার পাশে পুঁতে রাখা বোমার মতো রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্যও পরিচিত, যাকে 'ইয়েলো ব্যারেল' বলা হয়। এই বোমাগুলো তৈরি এবং ব্যবহার করা এত সস্তা যে জঙ্গিরা খুব কম সম্পদের মাধ্যমে তাদের বাড়িতে এগুলো তৈরি করতে পারে। এগুলো শত্রু বাহিনী এবং সরবরাহ লাইনের বিশাল ক্ষতি করতে পারে। এ ধরনের বিস্ফোরকের ব্যবহার স্পিন বোলদাক-চামান এলাকাতেও দেখা গেছে।
এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আমির রানা বলেন, তালেবান এখনো গেরিলা গোষ্ঠীকে পূর্ণাঙ্গ নিয়মিত সেনাবাহিনীতে রূপান্তর করতে পারেনি। তাই তারা আজও পুরোনো গেরিলা কৌশল ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের একটি নিয়মিত ও মানসম্মত সেনাবাহিনী রয়েছে, যা ভারতের মতো বড় শক্তির সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই বুধবার ইরাকে হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এতে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিয়ে গঠিত একটি আধাসামরিক জোটের ২০ সদস্য নিহত হয়েছেন।
ওয়াশিংটন ও রিয়াদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী আর সৌদির তেল স্থাপনায় হামলার জবাবে তারা ইরাকে ইরান সমর্থিত সন্ত্রাসীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। বিষয়টি আধাসামরিক ওই জোটের পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র আর ইরান দুই দেশই ইরাকের অন্যতম মিত্র। কিন্তু তাদের শত্রুতার কারণে বাগদাদ দীর্ঘদিন ধরে প্রক্সি যুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দেশটির সরকার ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতেও হিমশিম খাচ্ছে।
ইরাকে ইরান সমর্থিত আধাসামরিক জোটটি ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ বা পিএমএফ নামে পরিচিত। এক সময় সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে তাদের তেমন তৎপরতা নেই। পিএমএফ জানিয়েছে, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী অন্তত ২০ জন যোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩২ জন।
পিএমএফ আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি যৌথ আগ্রাসন চালিয়ে বাগদাদ, উত্তর ইরাকের নিনেভ এবং দক্ষিণের বসরাসহ ৭টি প্রদেশের ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। জোটের নেতারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে বলেন, নিনেভ এবং মধ্য ইরাকের দিয়ালা প্রদেশের হামলাগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে।
জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ইরাকে পিএমএফ গঠন করা হয় ২০১৪ সালে। পরে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর অংশ করা হয়। এর মধ্যে ইরান সমর্থিত কিছু ব্রিগেডও আছে। সেগুলো নিজেদের মতো করে কার্যক্রম চালায়।
গত সোমবার সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইরাক থেকে উড্ডয়ন করা বেশ কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিতের কথা জানিয়েছিল। এসব ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু ছিল পেট্রোলিয়াম স্থাপনা। তখন ইরাকি কোনো পক্ষ হামলার দায় স্বীকার করেনি।
জাপানে ভূমিকম্পে নিহত
জাপানের দক্ষিণাঞ্চলে ৭ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাস্থল কুমামোতো শহরের কাছে আংশিক ধসে পড়া একটি বিপণিবিতানে এখনও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভূমিকম্পের প্রায় এক ঘণ্টা পর কুমামোতো শহরের কাছে অবস্থিত একটি শপিং মলের একাংশ ধসে পড়ে।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, ভবনের ভেতরে সম্ভাব্য গ্যাস বিস্ফোরণের পর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে আটজনকে উদ্ধার করা হলেও তাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
বিপণিবিতান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আয়ন জানিয়েছে, প্রায় ২ হাজার ৭০০ কর্মীর খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তবে চারজন কর্মী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন, এখনও অনেক মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন। যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সরকার সব ধরনের সম্পদ কাজে লাগাচ্ছে।
ধসে পড়া ভবনে দমকল, পুলিশ ও প্রায় ১৭০ জন সেনাসদস্য উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে, নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ- এর একটি কারখানায় চিমনি ধসে সাতজন নিখোঁজ এবং চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে বহু আহত ব্যক্তির চিকিৎসা চলছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো কুমামোতো প্রিফেকচারে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্পের পর ভবন ধস ও আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারের জন্য ৩৮৬টি জরুরি কল পেয়েছে পুলিশ।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল কুমামোতো শহরের প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইয়াতসুশিরো শহরে বহু বাড়ির ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কয়েকটি ভবন ধসে পড়েছে এবং সড়কের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ও ধস দেখা দিয়েছে। একটি সেতুর অংশ কুমাগাওয়া নদীতে ভেঙে পড়েছে।
কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী এক সপ্তাহ ওই অঞ্চলে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প ও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।
আজ বুধবার তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছালে ৩৬ হাজারের বেশি বাড়ি বিদ্যুৎহীন অবস্থায় ছিল। ফলে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি নিয়েও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উকি শহরের একটি হাসপাতালের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আরেকটি হাসপাতাল ৮৬ জন আহতকে চিকিৎসা দেওয়ার পর অতিরিক্ত চাপের কারণে নতুন জরুরি রোগী ভর্তি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এ ছাড়া দ্রুতগতির ট্রেনে থাকা কয়েকজন যাত্রী আহত হয়েছেন। কম্পন অনুভূত হওয়ার পর ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, প্রায় ২০০টি দোকানবিশিষ্ট আয়ন মলের একপাশ সম্পূর্ণ ধসে পড়ে ভেতরের ইস্পাত কাঠামো উন্মুক্ত হয়ে গেছে এবং পার্কিং এলাকায় ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে পড়েছে।
ভূমিকম্পের প্রভাবে রেনেসাস ইলেকট্রনিক্স, সনি, টোকিও ইলেকট্রন ও হোন্ডা তাদের স্থানীয় কারখানার কার্যক্রম স্থগিত করেছে। টয়োটা মোটর জানিয়েছে, সরবরাহকারীদের পরিস্থিতি বিবেচনায় শুক্রবার পর্যন্ত কুমামোতো প্রিফেকচারের বাইরের তিনটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকবে।
উল্লেখ্য, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত জাপানে বিশ্বের ৬ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ২০ শতাংশ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। ১০ বছর আগে কুমামোতোতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২৭৫ জন নিহত এবং ২ হাজার ৭৩৯ জন আহত হয়েছিলেন। এবারের ভূমিকম্পেও ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গ, কয়েকটি উপাসনালয় এবং সপ্তদশ শতাব্দীর একটি চা-পানের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিনগত রাতে এই হামলা চালানো হয়ে বলে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আকস্মিক হামলার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা ফের চরম আকার ধারণ করলো।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছিল ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র সময় বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে এক আকস্মিক হামলার উদ্দেশ্যে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তবে সেসব ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
সেন্টকম আরও জানায়, মার্কিন বাহিনী বর্তমানে ‘সম্পূর্ণ সতর্ক ও উচ্চ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে।’
এর আগে টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ইরানের ওপর নৈশ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে গালফ বা পারস্য উপসাগরে ওয়াশিংটনের মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করে ইরান। তবে গত সপ্তাহে উভয় পক্ষই সাময়িকভাবে গোলাগুলি বা আক্রমণ বন্ধ রেখেছিল।
চরম সামরিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ লড়াই
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ প্রবাহিত হওয়া অতি সংকীর্ণ ও কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালী’-তে ইরান কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর পর এই সংঘাতের সূচনা হয়। গত জুন উভয় পক্ষের মধ্যে এক অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই কার্যত এই প্রণালির ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক লড়াই শুরু হয়ে যায়।
ইরানের দাবি হলো, এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী সব জাহাজকে তাদের উপকূলের কাছাকাছি নির্ধারিত রুট ব্যবহার করতে হবে ও তেহরান এর জন্য শুল্ক বা ফি আদায় করার অধিকার রাখে। অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ অপারেশনের অধীনে ওমানের উপকূল ঘেঁষে দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ দিয়ে যখন একের পর এক জাহাজ নিরাপদে অতিক্রম করছিল, ঠিক তখনই কয়েকটি জাহাজে হামলা চালায় ইরান।
ঘটনা নতুন মোড় নেয় যখন বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরের দিকে মার্কিন ও সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো যৌথভাবে ইরাকে অবস্থানরত ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র মিলিশিয়াদের ওপর দফায় দফায় বিমান হামলা চালায়। সম্প্রতি সৌদি আরবের কয়েকটি তেল স্থাপনায় হওয়া ড্রোন হামলার পেছনে এই ইরাকি মিলিশিয়াদের দায়ী করেই যৌথ এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে এই অভিযুক্ত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর কথিত ড্রোন হামলার ঘটনাটি গভীরভাবে তদন্ত করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, তার দেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যাতে ‘ইরাকি ভূখণ্ডকে কোনো বন্ধুপ্রতীম বা ভাতৃপ্রতিম দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণের রুট বা লঞ্চিং প্যাড হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া না হয়।’
তবে ইরাকের সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো সৌদি তেলের স্থাপনায় ড্রোন হামলার সব দায় সরাসরি অস্বীকার করেছে। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমন্বিত মোর্চা ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ সৌদির এই অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সোমবার (২৭ জুলাই) সংঘটিত এই হামলাগুলো মূলত ইয়েমেনের হুথিরাই চালিয়েছে; যারা নিজেরাই সৌদি তেলের স্থাপনায় হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
ছবিঃ সংগৃহীত
মুম্বাইয়ের পুলিশ ভ্যান আটকে প্রতিবাদের মুখ হয়ে ওঠা মডেল রিয়া আহির এবার অনলাইনে তীব্র আক্রমণ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। এই ঘটনার পর তিনি সাইবার পুলিশের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন।
গত ২২ জুলাই মুম্বাইয়ের দাদারের শিবাজি পার্কের কাছে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভরত মানুষদের আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় একটি পুলিশ ভ্যান আটকে দিয়েছিলেন রিয়া আহির।
ছাই রঙের হুডি পরে ভ্যানের বনেটে হাত রেখে তার সাহসিকতার সেই দৃশ্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। পরবর্তীতে এনডিটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, পুলিশ অন্যায় করছে বুঝতে পেরেই তিনি সহজাত প্রবৃত্তি থেকে ওই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
তবে এই সাহসী ঘটনার পর থেকেই অনলাইনে তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমআইডিসি পুলিশ স্টেশনে দায়ের করা অভিযোগে তিনি জানান যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়মিত হত্যার হুমকি এবং তার অনলাইন কন্টেন্টে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হচ্ছে।
রিয়ার দাবি, তার বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত ঘৃণা প্রচার চালানো হচ্ছে, যার মধ্যে মানহানি, ভীতি প্রদর্শন, নারীর প্রতি অবমাননাকর অপব্যবহার, টার্গেটেড হয়রানি এবং ডিপফেক ভিডিও ছড়ানোর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই সাইবার হয়রানির কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে তিনি আইনি সহায়তার পথ বেছে নেন এবং মানহানিকর কন্টেন্টের স্ক্রিনশট, বিভিন্ন ইউআরএল ও প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র পুলিশের কাছে জমা দেন। তার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং এর সঙ্গে জড়িত অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
সম্প্রতি এনডিটিভির একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে রিয়া আহির জানান, ওই মুহূর্তে তার প্রতিক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল এবং বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে এত বড় একটি অসাধারণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে, তা এখনও তিনি পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না।
সূত্র: এনডিটিভি।
মা-বাবার মাঝে অভিজিৎ দিপকে
ভারতের সাম্প্রতিক যুব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি পেয়েছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। আন্দোলন থামতেই এই তরুণের জন্য একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব আসছে তার বাবা-মায়ের কাছে। অভিজিতের মা অনিতা দিপকের ইচ্ছা, আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারির মধ্যেই ছেলেকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাবেন। তবে বিয়ের সুনির্দিষ্ট তারিখ বা মাসের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার তিনি ছেড়ে দিয়েছেন ৩০ বছর বয়সী এই সমাজকর্মীর ওপরই।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অনিতা দিপকে জানান, এনইটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সিজেপির প্রতিবাদের আগে থেকেই অভিজিতের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করেছিল। আর সেই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
তিনি স্মরণ করেন, বোস্টনে থাকার সময় অভিজিতের সঙ্গে ফোনে এ বিষয়ে তার কথা হয়েছিল। তিনি যোগ করেন, ‘সে এ নিয়ে বেশি কিছু বলেনি; শুধু একটু হেসেছিল। অভিভাবক হিসেবে আমরা তাকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছি। তবে সে আর কয়েকদিনের মধ্যে বাড়ি ফিরলে আমরা বিষয়টি আবার তুলব এবং তাকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দেব।’
সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলন সমাপ্ত হলে অভিজিতের দ্রুত বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি ভ্রমণ পিছিয়ে দেন। তার মা বলেন, ‘আমরা এখন জানতে পেরেছি তার ফিরতে আরও চার থেকে পাঁচদিন লাগবে।’
হুমকির মুখে আত্মগোপনে যায় পরিবার
অভিজিৎ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই চরম হুমকির মুখে পড়ে তার পরিবার। নিরাপত্তার খাতিরে তাদের প্রায় দুই সপ্তাহ আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল।
অনিতা দিপকে বলেন, দল গঠনের পর বোস্টনেই অভিজিৎকে হুমকি দেওয়া শুরু হয়। ফোন করে হুমকিদাতারা বলত, যেহেতু সে বস্টনে রয়েছে, তাই ভারতে তার বাবা-মাকে টার্গেট করা হবে।
এই খবর পেয়েই অভিজিৎ তাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার তাগিদ দেন। এরপর তারা কংকনে আত্মীয়দের বাড়িতে চলে যান এবং সেখানে ১৫ দিন কাটিয়ে আসেন। বর্তমানে পরিবারটি ছত্রপতি সম্ভাজি নগরের ওয়লুজ এলাকায় বসবাস করছে।
পরিবারকে না জানিয়েই রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ
অভিজিৎ যে এমন রাজনৈতিক দল গঠন করবেন, সে পরিকল্পনা তিনি পরিবারকে ঘুণাক্ষরেও জানাননি। সংবাদমাধ্যমে তার সাক্ষাৎকার দেখেই তারা বিষয়টি জানতে পারেন।
তার মা বলেন, ছেলে বাড়িতে খুব একটা কথা বলত না। খাবার বা মৌলিক প্রয়োজন ছাড়া সে দীর্ঘ কোনো আলোচনা করত না। স্কুলের বিতর্কে অংশ নেওয়ারও কোনো রেকর্ড ছিল না তার।
ছোটবেলায় বেশ শান্ত প্রকৃতির এই ছেলেটি কীভাবে জাতীয় টিভিতে তিন ভাষায় কথা বলল, তা দেখে আজও অবাক হন তার মা। মহামারির সময়ে অভিজিতের গৃহহীন আদিবাসী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর মানবিক রূপও তিনি তুলে ধরেন।
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যর্থতা ও আক্রমণের ভয়
দশম শ্রেণীতে ৯৬ শতাংশ নম্বর পাওয়া মেধাবী অভিজিৎকে তার বাবা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ায় এই পেশায় ঠেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বাদশ শ্রেণীতে ৬৫ শতাংশ পাওয়ার পর পুনের সিংহগড় ইনস্টিটিউটে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি তিনি। মা স্বীকার করেন, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে জোর করাটা তাদের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
সাম্প্রতিক আন্দোলনে ছেলের ওপর হামলা এবং মুখে কালি ছেটানোর ঘটনায় পরিবারটি দারুণ ভীতি ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে গেছে। মা জানান, এসব খবর শুনে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন এবং ছেলের বড় কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না তা নিয়ে ভেবেছিলেন।
তবে অভিজিৎ তাকে ফোন করে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তিনি এখন আর শুধু পরিবারের নন, দেশের সাধারণ মানুষের সম্পদে পরিণত হয়েছেন।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
ছবি : সংগৃহীত
পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর (এজেকে) আইনসভার নির্বাচনের প্রথম ধাপে বড় ব্যবধানে এগিয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ (নওয়াজ) বা পিএমএল-এন।
অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে দেখা গেছে, ১৩টি আসনের মধ্যে দলটি ৯টিতে জয় পেয়েছে। বাকি চারটি আসন জিতেছে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)।
গতকাল সোমবার মিরপুর, কোটলি ও ভিম্বর জেলার ১৩টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল পাঁচটায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর গণনা শুরু হয়।
অনানুষ্ঠানিক ও প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, পিএমএল-এন মিরপুরের দুটি, ভিম্বরের তিনটি এবং কোটলির চারটি আসনে জয় পেয়েছে। অন্যদিকে পিপিপি মিরপুরের দুটি ও কোটলির দুটি আসনে বিজয়ী হয়েছে।
পিএমএল-এনের রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ ফলাফলে সন্তোষ প্রকাশ করে বিজয়ী প্রার্থীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছিল। তবে নির্বাচন চলাকালে দুটি সহিংস ঘটনার কথা জানান সানাউল্লাহ। তাঁর ভাষ্য, একটি ঘটনায় পারিবারিক বিরোধের জেরে গুলির ঘটনা ঘটে। অন্যটি ঘটে নাকিয়াল এলাকায়, যেখানে একজন নিহত হন। এ ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রানা সানাউল্লাহ আরও অভিযোগ করেন, ভিম্বরের এক আসনে এক প্রার্থী নিজেই একটি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট বাক্স সরিয়ে ফেলেন। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সামগ্রিকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে।