ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুটা নাটকীয়ভাবে এর মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। ট্রাম্প তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরান সরকার বর্তমানে অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত। ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের অনুরোধে আমরা হামলা স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের নেতৃত্ব, বিশেষ করে আসিম মুনিরের প্রতি এটা ট্রাম্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক স্বীকৃতি। ৮ এপ্রিল ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পেছনে আসিম মুনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এই অচলাবস্থা নিরসনের পথ তৈরি করেন।
ইসলামাবাদে ১১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রায় ২১ ঘণ্টার বৈঠক করেন। কিন্তু কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। এরপর দ্বিতীয় দফার বৈঠকের জন্য জোর তৎপরতা শুরু করে পাকিস্তান। তারই অংশ হিসেবে সরাসরি তেহরান সফরে যান আসিম মুনির। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর কোনো আঞ্চলিক সামরিক নেতার এটাই ছিল প্রথম ইরান সফর।
এক বছরে বদলে যাওয়া দৃশ্যপট
আসিম মুনিরকে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক শান্তির দূত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে বিশ্বমঞ্চে তাঁর অভাবনীয় উত্থান জানতে হলে যেতে হবে এক বছর পেছনে। তখনকার কিছু ঘটনা তাঁর আজকের ভাবমূর্তির ভিত্তি তৈরি করে।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর এক সশস্ত্র হামলা হয়। এর জেরে দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়ায়। তা আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
চার দিনের সেই সংঘর্ষে আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার ও পাকিস্তানের সামগ্রিক সামরিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তিনি চার তারকা জেনারেল থেকে ফিল্ড মার্শাল এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের প্রথম চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
সবকিছু পাল্টে দেওয়া এক যুদ্ধ
পেহেলগাম হামলার প্রতিক্রিয়ায় ভারত ২০২৫ সালের ৭ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নাম দিয়ে পাকিস্তানে হামলা করে বসে। সীমান্ত এলাকার পাশাপাশি পাকিস্তানের গভীরে হামলা চালানো হয়। পাকিস্তানও পাল্টা জবাব দেয় এবং একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে। ১০ মে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগপর্যন্ত দুই দেশ পাল্টাপাল্টি ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও কামানের গোলা নিক্ষেপ করে। ট্রাম্প বারবার এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব দাবি করে আসছেন। পাকিস্তান তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান খান, ইউএসআইপির সাবেক প্রধান
পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা ২০ মে সর্বসম্মতিক্রমে আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করে। আইয়ুব খানের পর তিনি পাকিস্তানের ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি এই পদমর্যাদা পেলেন। ফিল্ড মার্শাল হওয়ার পর আইয়ুব খান সেনাপ্রধানের পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আসিম মুনির সেনাপ্রধানের পদটিও নিজের হাতে রাখেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিসের (ইউএসআইপি) সাবেক প্রধান ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান খানের মতে, ভারতের সঙ্গে এই সীমিত সংঘাত আসিম মুনিরকে বিশ্বদরবারে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ট্রাম্পের মতো নেতারা ‘শক্তির ভাষা’ পছন্দ করেন। মুনির সেই শক্তিরই প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন সমীকরণ
ট্রাম্প ২০২৫ সালের ১৮ জুন হোয়াইট হাউসে আসিম মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করেন। কোনো বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া কোনো পাকিস্তানি সামরিক প্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটিই ছিল প্রথম একান্ত বৈঠক। বৈঠক শেষে মুনিরকে ‘একজন মহান যোদ্ধা’ এবং ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
আসলে আরও আগে ট্রাম্প ও মুনিরের এই সুসম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে সমন্বয় করে ‘অ্যাবে গেট’ বোমা হামলায় জড়িত একজন সন্দেহভাজনকে ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দেয় ইসলামাবাদ। এটা ট্রাম্পকে মুগ্ধ করেছে।
প্রসঙ্গত প্রায় ২০ বছর অবস্থান শেষে ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট আফগানিস্তান ত্যাগের সময় কাবুলে মার্কিন সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা হয়েছিল। এটা অ্যাবে গেট বোমা হামলা নামে পরিচিত।
এ ছাড়া বিরল খনিজ পদার্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি সহযোগিতার প্রস্তাবের মাধ্যমে ইসলামাবাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়। পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, তারা এমন একটি ‘সুইং স্টেট’, যারা ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসার ক্ষমতা রাখে।
ক্ষমতার সাংবিধানিক ভিত্তি
পাকিস্তানের পার্লামেন্টে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ২৭তম সংবিধান সংশোধনী পাস হয়। এটা আসিম মুনিরের ক্ষমতাকে আইনগতভাবে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস বা সিডিএফ পদটি তৈরি করা হয়।
সিডিএফের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও কৌশলগত পরিকল্পনা বিভাগকে একটি একক ও একীভূত কমান্ডের অধীনে আনা হয়। আসিম মুনির বর্তমানে পাঁচ বছরের জন্য সিডিএফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা অন্তত ২০৩০ সাল পর্যন্ত তাঁর ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে।
সংশোধনী অনুযায়ী, ফিল্ড মার্শাল পদমর্যাদা যে কর্মকর্তা পাবেন, তা তিনি আজীবন ব্যবহার করতে পারবেন। তা ছাড়া পাঁচ তারকা পদধারী কোনো কর্মকর্তাকে বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে আজীবনের জন্য দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
বিরোধীদের প্রবল প্রতিবাদ সত্ত্বেও মাত্র ১৬ মিনিটে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে বিলটি পাস হয়।
ইসলামাবাদভিত্তিক সনোবর ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কামার চিমা বলেন, এটি কেবল ক্ষমতা কুক্ষিগত করা নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামরিক শক্তিকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসার প্রয়াস।
তবে অনেক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মনে করেন, এই অতি-কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা দীর্ঘ মেয়াদে পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ইরান মধ্যস্থতা
কাতারের রাজধানী দোহার একটি ভবনে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর হামলা চালায় ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। এর আট দিন পর পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এখানেও মুখ্য ভূমিকা রাখেন আসিম মুনির। এই চুক্তির আওতায় এক দেশের ওপর হামলা হলে অন্য দেশ তা নিজের ওপর হামলা বলে ধরে নিয়ে ব্যবস্থা নেবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন শুরু করলে পাকিস্তান এক কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়ে। কারণ, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান।
কামার চিমা, নির্বাহী পরিচালক, সনোবর ইনস্টিটিউট, ইসলামাবাদ
একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে নবজাতক প্রতিরক্ষা চুক্তি, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা পাকিস্তানের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু এই যুদ্ধ একই সঙ্গে আসিম মুনিরের কপাল খুলে দেয়। যুদ্ধের একপর্যায়ে আসিম মুনির সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তেহরানের কাছে ওয়াশিংটনের প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন।
মূলত আসিম মুনিরের মধ্যস্থতার কারণে ৮ এপ্রিলের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
পাকিস্তানের গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, একটি দুর্বল বা অস্থিতিশীল ইরান পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে ভারতের প্রভাব বাড়িয়ে দেবে। এই আশঙ্কা থেকে মুনির ইরানকে রক্ষার কূটনৈতিক লড়াইয়ে নামেন।
অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আসিম মুনিরের ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী’ ভাবমূর্তি থাকলেও পাকিস্তানের ভেতরে তা ঠিক উল্টো। ২০২৫ সালে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সশস্ত্র সহিংসতা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখনো কারাবন্দী। তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। দেশটির নাগরিক অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসিম মুনিরের এই বাহ্যিক বৈধতা ও আন্তর্জাতিক স্তরে ট্রাম্পের মতো নেতাদের সমর্থন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতাকে আরও জোরদার করেছে। বর্তমানে পাকিস্তানে আসিম মুনিরের মেয়াদ বা ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো আইনি বা রাজনৈতিক শক্তি অবশিষ্ট নেই বললেই চলে।
আসিম মুনিরের উত্থান কেবল এক সামরিক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। বরং এটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় পাকিস্তানের নতুন অবস্থানের প্রতিফলন।
একদিকে ভারতের সঙ্গে সীমিত যুদ্ধ। অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা, এই দুই মেরুর রাজনীতি আসিম মুনিরকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে তিনি ট্রাম্পের কাছে ‘পছন্দের ফিল্ড মার্শালে’ পরিণত হয়েছেন।
তবে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা আর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে আসিম মুনিরের এই ক্ষমতা কত দিন টেকসই হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আপাতত আসিম মুনির এমন একজন নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যাঁর সিদ্ধান্ত কেবল ইসলামাবাদ নয়, বরং ওয়াশিংটন থেকে তেহরান পর্যন্ত ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির
গত আগস্টের শেষের দিকে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট একটি নতুন আইন পাস করেছে। তড়িঘড়ি করে পাসকৃত এই আইনের মাধ্যমে দেশটির সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পদের ক্ষমতা আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। গত বছরের নভেম্বরে সংবিধানের ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, এই আইনের মাধ্যমে তা আরও এক ধাপ এগোল।
গত ২০ আগস্ট দেশটির জাতীয় পরিষদ ‘ডিফেন্স ফোর্সেস অব পাকিস্তান অ্যাক্ট, ২০২৪’ এবং ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি অ্যাক্ট, ২০১০’-এর একটি সংশোধনী অনুমোদন করে। এই দুটি আইন যৌথভাবে ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ (সিডিএফ) পদের আইনি কাঠামো নিশ্চিত করেছে। গত বছরের ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে এই পদ তৈরি করা হয়।
বিল দুটি জাতীয় পরিষদের মূল কার্যসূচিতে ছিল না। তবু সেদিন সকালে মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেয়ার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা পাস হয়ে যায়। গত বছরের নভেম্বরে ২৭তম সংবিধান সংশোধনীও একইভাবে সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়ায় পাস করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের চার দিনের সংঘাতের ঠিক এক বছর পর এই আইনি পরিবর্তনগুলো আনা হলো। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৬ সালে তিন বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) মধ্যে সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে ‘চেয়ারম্যান অব দ্য জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি’ (সিজেসিএসসি) পদ তৈরির পর এটিই পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর উচ্চতর কমান্ড কাঠামোর সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন।
পুরোনো সিজেসিএসসি পদটি এখন বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে ‘ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স’ (ডিএফএইচকিউ), যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সিডিএফ। বর্তমানে এই পদে রয়েছেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, একই সঙ্গে সেনাপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
এই পরিবর্তনের পেছনে মূল যুক্তি কী এবং নতুন সদর দপ্তরে নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এ বিষয়ে সামরিক বাহিনীর তথ্য শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনসের (আইএসপিআর) কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠালেও কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা কোনও জবাব পায়নি।
পাকিস্তানের সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এই কাঠামোতে দেশটির সেনাবাহিনী এবং সেনাপ্রধান ও সিডিএফ আসিম মুনিরের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানের গুরুত্ব অনেকাংশে কমে গেছে। এ ছাড়া সামরিক বাহিনী সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সিভিল প্রশাসনের ভূমিকাও বহুলাংশে খর্ব হবে।
বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাওয়ালপিন্ডিভিত্তিক একজন অবসরপ্রাপ্ত থ্রি-স্টার জেনারেল এই ব্যবস্থাকে একটি বিধিবদ্ধ ‘চেইন অব কমান্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এখন থেকে চেইন অব কমান্ড হবে—প্রধানমন্ত্রী, তারপর সিডিএফ ও তার নতুন সদরদপ্তর, এরপর সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রধানগণ এবং সবশেষে মাঠপর্যায়ের ফরমেশনগুলো।
তবে অন্যান্য কর্মকর্তাদের মতে, আদেশ প্রয়োগের ক্ষমতা না থাকলে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বিশেষ অর্থ থাকে না। অবসরপ্রাপ্ত থ্রি-স্টার জেনারেল ও সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব নাঈম খালিদ লোধি বলেন, ‘কমান্ডার যদি পুরস্কার বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে না পারেন, তবে সেই কমান্ড কার্যকর হয় না। ডিফেন্স ফোর্সেসের কমান্ডার এখন একজন প্রকৃত কমান্ডার এবং এই আইনের মাধ্যমে তা যথাযথভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে রূপ পেয়েছে।’
লোধি আল জাজিরাকে জানান, আগের ব্যবস্থায় ‘নৌ বা বিমানবাহিনীর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আইনি সুযোগ প্রধান কর্মকর্তার ছিল না। তিনি কেবল সেনাবাহিনীর ভেতরে ব্যবস্থা নিতে পারতেন, কিন্তু এখন এটি সর্বাত্মক রূপ নিয়েছে।’
সিডিএফ ও তার দপ্তরকে দেয়া নতুন এই ক্ষমতা তিন বাহিনীর মধ্যকার ভারসাম্য নষ্ট করছে কি না—তা নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
নতুন আইনের অধীনে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের’ (এনএসসি) প্রধান পদের কর্মকর্তাকে অবশ্যই সেনাবাহিনী থেকে আসতে হবে। সিডিএফ-এর সুপারিশেই নিযুক্ত হবেন তিনি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে জেনারেল সৈয়দ আমের রেজাকে প্রথম সিএনএসসি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। পূর্বে চিফ অব জেনারেল স্টাফ হিসেবে দায়িত্বরত এই কর্মকর্তাকে লেফট্যানেন্ট জেনারেল থেকে পদোন্নতি দিয়ে এ পদে বসানো হয়। নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা আর এই পদে বসতে পারবেন না।
সামরিক বাহিনীর সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই পরিবর্তন নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলতে পারে। ইসলামাবাদভিত্তিক এই কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেন, ‘যেহেতু তিন বাহিনীর সব জ্যেষ্ঠ পদের পদোন্নতি ও নিয়োগ এখন সিডিএফ অনুমোদন করবেন, তাই এটি কালক্রমে অন্য দুটি বাহিনীর স্বতন্ত্র সত্তাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।’ অন্য বাহিনীর কারও মাধ্যমে নিজস্ব পদোন্নতি নির্ধারিত হলে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অবসরপ্রাপ্ত ভাইস অ্যাডমিরাল আহমেদ সাঈদের মতে, এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি নৌবাহিনীর জন্য।
এই আইনি পরিবর্তনের ফলে সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পাচ্ছে কি না—তা নিয়েই সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমান আইনজীবী কর্নেল ইনাম রহিম বলেন, নতুন আইনটি নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তা সামরিক বাহিনীর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি জানান, আগে কোনও কর্মকর্তাকে বরখাস্ত বা অবসর দিতে হলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার কাছে সামারি পাঠাতে হতো। এখন সেই ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে সিডিএফ-এর একক এখতিয়ারে।
রহিম আল জাজিরাকে বলেন, ‘তাকে আর কোথাও কোনো ফাইল পাঠাতে হবে না। তিনি কেবল একটি চিঠি ইস্যু করবেন, আর সেই কর্মকর্তা বরখাস্ত বা অবসরে চলে যাবেন।’
ইসলামাবাদভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক যুক্তি দেন, নতুন এই আইনটি সংবিধানের ২৪৩ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও কমান্ড থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে’—যা গত বছরের সংবিধান সংশোধনীতেও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘সিডিএফ-কে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর অপারেশনাল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে রাজনৈতিক সরকার মূলত ২৪৩ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করছে।’
আসিম মুনির সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করার চেষ্টায় লেগেছিলেন। এই আইনের মাধ্যমে তার সেই মিশন পূর্ণতা পেল বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। পাকিস্তানে এখন প্রধানমন্ত্রীর পরেই সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয় তাকে।
এমনকি ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যখন দৌড়ঝাঁপ করছিলেন–তখন তার পাশে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার নন, বরং বেশিরভাগ সময়ই সেখানে দেখা গেছে আসিম মুনিরকে। কূটনৈতিক সার্কেলে তার এমন উপস্থিতি প্রমাণ করে, সিডিএফ-এর হাত আসলে কতদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে।
আর তিন বাহিনীর ওপর এক অর্থে তার সর্বময় ক্ষমতা পেয়ে যাওয়ার পর নৌ ও বিমানবাহিনীতে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে বলেও ধারণা বিশ্লেষকদের। সামরিক ক্ষমতাকে এভাবে কেন্দ্রীভূত করা হলে ভবিষ্যতে তা তিন বাহিনীর স্বতন্ত্র সক্ষমতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতি সিডিএফ নির্ভরতা বাহিনীগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বশূন্য করতে পারে, যা হবে ধ্বংসেরই নামান্তর।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত ও বড় আকারে কমে যাবে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ৩ ডলারে নেমে আসবে। শেষ পর্যন্ত তা ২ ডলারের নিচেও নামতে পারে। এক গ্যালনে প্রায় ৩ দশমিক ৮ লিটার।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তেলের দাম দ্রুত কমবে।’ একই সঙ্গে তিনি পুনরায় সতর্ক করে বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না।
তবে ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩৪ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ দশমিক ৩৪ ডলারে উঠেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ১৫ ডলার বা ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। এতে প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৬৩ ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ড বা সম্পদে নতুন করে হামলা চালালে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
এ পরিস্থিতিতে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় তেলের দামে ঝুঁকিমূল্য যুক্ত হয়েছে। সর্বশেষ লেনদেনে ব্রেন্ট তেলের দাম ২৪ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্বের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে এই নৌপথে তেল পরিবহন ব্যাহত হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম আরও বড় ব্যবধানে এগিয়েছে। ভলিউম ও পোশাকের ইউনিটপ্রতি মূল্য দুই দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে ভিয়েতনাম। কয়েক বছর ধরেই ক্রমে এ ব্যবধানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি এখন বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ। তৈরি পোশাক দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশই আসে এ পণ্য থেকে।
চলতি পঞ্জিকা বছরের প্রথম সাত মাস, অর্থাৎ গত জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে সাড়ে ৬ শতাংশ। ভিয়েতনামের কমেছে মাত্র ১ শতাংশ। বাংলাদেশের রপ্তানি কমে ৪৬৬ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৪৯৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ, সাত মাসের ব্যবধানে প্রধান বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৩২ কোটি ডলার।
অন্যদিকে জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি কম হয়েছে মাত্র ১১ কোটি ডলার। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৯৩৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে দেশটি। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৯৪৬ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
অটেক্সার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে চীনের অবস্থান তৃতীয় প্রধান রপ্তানিকারক দেশের। গত আলোচ্য সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশটির পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪৫৬ কোটি ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৬৯২ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। আলোচ্য সময়ে দেশটির রপ্তানি বেড়েছে ৩ শতাংশের মতো। রপ্তানি হয়েছে ২৭৪ কোটি ডলারের পোশাক, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে কম্বোডিয়া। রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ২৬২ কোটি ডলারের পোশাক, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৩৭ কোটি ডলার।
বছরের প্রথম সাত মাসে সারাবিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ৯ শতাংশের মতো। মোট চার হাজার ১৮৩ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে দেশটি। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল চার হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। অটেক্সার তথ্য উপাত্ত বলছে, সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকের দর ইউনিটপ্রতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের পোশাকের দর কমেছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ভিয়েতনামের পোশাকের কমেছে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। চীনা পোশাকের কমেছে ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। কেবল মেক্সিকো ও হন্ডুরাসের পোশাকের ইউনিটপ্রতি দর বেড়েছে ১৪ ও ৬ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে ভারতের অবস্থান ষষ্ঠ। সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশটির পোশাক রপ্তানি কমেছে ২৬ শতাংশের মতো। রপ্তানি হয়েছে ২৪৫ কোটি ডলারের পোশাক। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৩০ কোটি ডলার।
শেখ হাসিনা ও শেখ সেলিম
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।
তার মতে, শেখ সেলিম এখন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য। তাই শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিমই দলীয় সভাপতির দায়িত্ব পালনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
ছোট বোন শেখ রেহানা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন বলেও জানিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
দ্য ওয়ালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে নিজের দেশে ফেরা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, বাংলাদেশের পরিস্থিতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।
এ সময় দেশে ফেরার আগ্রহ রয়েছে বলে জানান ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তবে দেশে ফিরলে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে তার। শেখ হাসিনার দাবি, দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেও তাকে হত্যা করা হতে পারে।
তার দেশে ফেরার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, প্রত্যেকেরই জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। তাই তিনি দেশে ফেরার নির্দেশনা দিয়ে কাউকে বিপদে ফেলতে চান না।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গে নয়াদিল্লির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা।
তার মতে, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আঞ্চলিক বোঝাপড়া গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের জন্য জরুরি। কোনো সামরিক জোটের পরিবর্তে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ভিডিওবার্তায় কথা বলছেন মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রথম সচিব (প্রেস) মো. তরিকুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বৈধ কাজের ভিসাহীন কর্মীদের দ্রুত দেশে ফিরে যেতে আহ্বান জানিয়েছে কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশন। অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দেশটিতে ইমিগ্রেশন বিভাগের অভিযানের মধ্যেই হাইকমিশন বলেছে, সরকারি সুযোগ কাজে লাগিয়ে গ্রেপ্তার এড়িয়ে বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফিরে যেতে হবে। স্থানীয় সময় রোববার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের ফেসবুক পেইজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে অনিয়মিত বা বৈধ নথিপত্রহীন বাংলাদেশিদের নিজ দেশে ফেরার এ আহ্বান জানানো হয়।
ভিডিও বার্তায় কথা বলেন বাংলাদেশ হাইকমিশন মালয়েশিয়ার প্রথম সচিব (প্রেস) মো. তরিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আপনারা হয়তো জানেন, অনিয়মিত বা ডকুমেন্টবিহীন বিদেশি অভিবাসীদের জন্য বর্তমানে মালয়েশিয়ার সরকারের মাইগ্রেশন বিভাগের একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু রয়েছে, যার নাম- মাইগ্র্যান্ট REPATRIATION PROGRAMME 2 তথা BRM 2.0।
এই কর্মসূচির আওতায় মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বা ডকুমেন্টহীন বিদেশি নাগরিক বা কর্মীরা আইনসম্মতভাবে ও নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যারা এই কর্মসূচির আওতায় দেশে ফিরতে চান তাদের সহজ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রথমত বৈধ ও মেয়াদযুক্ত বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকতে হবে। যাদের বৈধ পাসপোর্ট নেই বা পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে তারা বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে একটি ট্রাভেল পারমিট বা টিপি নেবেন।
এরপর দেশে ফেরার জন্য বৈধ ও নিশ্চিত বিমান টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। মালয়েশিয়ার সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, টিকিটের যাত্রার তারিখ ইমিগ্রেশনে অ্যাপয়েন্টমেন্টের কমপক্ষে পাঁচ দিন পর এবং ১৪ দিনের মধ্যে হতে হবে।
আবেদনকারীকে নির্ধারিত ইমিগ্রেশন অফিসে নিজে উপস্থিত হয়ে আবেদন করতে হবে। কোনো প্রতিনিধি বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আবেদন করা যাবে না।
আবেদনের সময় সঙ্গে রাখতে হবে মূল পাসপোর্ট অথবা ট্রাভেল পারমিট, পাসপোর্টের বায়োডাটা পৃষ্ঠার কপি, সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন পাসের কপি, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুরোনো ও নতুন উভয় পাসপোর্ট, বাংলাদেশে ফেরার বৈধ ও নিশ্চিত বিমান টিকিট।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত ফি ও প্রযোজ্য জরিমানা ইমিগ্রেশন বিভাগের অনুমোদিত পেমেন্ট পদ্ধতিতে পরিশোধ করতে হবে। আবেদন করার আগে সর্বশেষ ফি ও শর্তাবলি ইমিগ্রেশন বিভাগের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নিতে হবে।
তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘মনে রাখবেন, BRM 2.0-এর আবেদন করতে কোনো দালাল, প্রতিনিধি বা তৃতীয় পক্ষকে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলে টাকা চাইলে সতর্ক থাকুন। নিজের আবেদন নিজেই করুন এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করুন।’
প্রেস সচিব আরও বলেন, ভাই ও বোনেরা, আপনারা যদি এই কর্মসূচির আওতায় আইনসম্মতভাবে ও নিরাপদে দেশে ফিরতে চান, তাহলে শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন অফিস ও বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সর্বশেষ তথ্য জেনে নিন।
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের রাজধানী দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় শিক্ষার্থীদের একটি হোস্টেল ভবন ধসে পড়ে অন্তত পাঁচ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছেন আরও ১৫ থেকে ২০ জন। রোববার দুপুর দেড়টার দিকে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের কাছে অবস্থিত ছয়তলা ওই ভবনটি ধসে পড়ে। বেসমেন্ট ও ওপরের দিকে পাঁচতলা বিশিষ্ট ভবনটি মূলত শিক্ষার্থীদের পেয়িং গেস্ট (পিজি) হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (এইমস)-এ নিয়ে আসার পর চারজনকে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং গুরুতর আহত অপর এক শিক্ষার্থী পরে মারা যান।
চিকিৎসার জন্য আরও তিন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একজনের হাত ও পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে, আর অন্যজন সামান্য আঘাত পেয়েছেন যাকে পর্যবেক্ষণের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া আনুমানিক ১৫-২০ জনের সন্ধানে কর্তৃপক্ষের একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত উদ্ধার অভিযান রাত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বেসমেন্ট এবং ওপরের দিকে পাঁচটি তলা বিশিষ্ট ওই ভবনটি পেয়িং গেস্ট (পিজি) থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। দুপুর দেড়টার দিকে ভবনটি ধসে পড়ার সময় বেসমেন্টে মেরামতের কাজ চলছিল।
এনডিআরএফ-এর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জীবিতদের সন্ধানে ৭০ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সের (এনডিআরএফ) দুটি দল এবং একটি ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হয়েছে। আটকে পড়া ব্যক্তিদের শ্বাস নিতে সাহায্য করার জন্য ধ্বংসস্তূপের নিচে অক্সিজেন সিলিন্ডারও নামানো হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হোস্টেলে থাকা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই কেরালা, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা এবং তারা কাছের কলেজগুলোতে পড়াশোনা করতেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে কাজ করছে এবং ভবন ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদান করছে।