ইরানে যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে মোদী সরকারকে

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১০ এপ্রিল, ২০২৬, সময় : ২:২১ এএম

স্পষ্টত একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছিলো বিশ্ব। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ থামাতে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে পাকিস্তান। উভয়পক্ষকে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে মধ্যস্ততা করেছে পাকিস্তান। দেশটির এই প্রচেষ্টা প্রশংসিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী। 


বিশ্লেষক অশোক সোয়াইন ‘পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট’ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি এই যুদ্ধবিরতিকে ইরানের বিজয় এবং পাকিস্তানের জন্য সম্মানের বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাকিস্তানের সফল আলোচনা প্রমাণ করে যে, তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আস্থাভাজন নয়, তাদের প্রতি চীনেরও আস্থা রয়েছে। বিশ্বমঞ্চে মোদী পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু উল্টে তিনি ভারতকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। এই প্রসঙ্গে অতীতেও পাকিস্তানের ভূমিকার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন তিনি। 


তার কথায়, স্নায়ু যুদ্ধের সময় পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শান্তির পথ প্রশস্ত করেছিল এবং এখন স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী যুগে পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের কাজ করছে। জয়শঙ্কর যাই বলুন না কেন, এমন রেকর্ড কারো নেই। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, উপসাগরীয় দেশ এবং ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষক অভিনব সিং। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন, বর্তমানে পাকিস্তানই একমাত্র রাষ্ট্র যার তিন পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তি উপসাগরীয় দেশসমূহ ও ইরান এই সবার সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। সেই তুলনায় মোদীর কাছে রয়েছে নেতানিয়াহুর কাছ থেকে পাওয়া পদক ও আলিঙ্গন এবং তাকে অধীন একজন হিসেবে মনে করেন ট্রাম্প।



এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে ভারত। তবে এই যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তান যে ভূমিকা পালন করেছে সে সম্পর্কে কোনো উল্লেখ করেনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারতের তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে পাকিস্তানের নামও নেই। বিশ্বের বিভিন্ন নেতারা যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতার করার জন্য পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টার প্রশংসা করলেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টাকে শুধু উপেক্ষাই করেনি, ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়েও নীরব থেকেছে।



ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমরা যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। আমরা আশা করি এটা পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে। যেমনটা আমরা আগেও বলেছি, যুদ্ধবিরতি, সংলাপ এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপ এই যুদ্ধ অবসানের জন্য অপরিহার্য। 



এই যুদ্ধের যে ধ্বংসাত্মক রূপ দেখা গেছে, সে বিষয়েও ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে, এটা বিশ্বব্যাপী তেল ও জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছে। আমরা আশা করি বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজগুলো এবার স্বাধীনভাবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসতে পারবে।



এর আগে পাকিস্তান যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মাঝে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, সেই সময় থেকেই দেশের ভেতরে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এটাকে ভারতের জন্য এক জাতীয় ‘কূটনৈতিক আঘাত’ বলে আখ্যাও দিয়েছিল। অন্যদিকে, বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছিলেন ভারত ‘ব্রোকার নেশন’ (দালালি করে এমন দেশ বোঝাতে) বা মিডলম্যান হতে চায় না।



ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকার কথা উল্লেখ না থাকলেও ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের অনেকেই এই বিষয়ে পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের কূটনীতির সমালোচনা করছেন।



কংগ্রেস নেতা রশিদ আলভি বলেছেন, পাকিস্তান যে ভূমিকা পালন করেছে, তা আসলে ভারতের করা উচিত ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদী যখন ইসরায়েলকে ‘পিতৃভূমি’ বলে অভিহিত করেন, তখন তিনি যুদ্ধবিরতির কথা কীভাবে বলবেন?



যুদ্ধবিরতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা মেনন রাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটা দীর্ঘ পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, (এক্ষেত্রে) পাকিস্তানের ভূমিকা আর্কিটেক্ট হিসেবে নয়, বরং মাধ্যম ও অনুঘটক হিসেবে উন্মোচিত হয়েছে। তারা এমন এক পথ তৈরি করে দিয়েছে যার মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে, ডেডলাইন (সময়সীমা) শিথিল করা হয়েছে এবং একটা সংকীর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটা ঠিক চিরাচরিত অর্থে মধ্যস্থতা নয়, কিন্তু একে রসিকতা করে উড়িয়েও দেওয়া যায় না।



নিরুপমা মেনন রাও লিখেছেন, আমরা এখন যা দেখছি সেটা সংঘাতের সমাধান নয়, বরং অবস্থানের পুনর্বিন্যাস। যুদ্ধ শেষ হয়নি। সেটা একটা ভিন্ন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে মাত্র, যেখানে এখন বলপ্রয়োগ এবং আলোচনা একসঙ্গে চলছে। এই প্রসঙ্গে ভারতের ভূমিকা নিয়েও মত প্রকাশ করেছেন তিনি। ওই পোস্টে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘এর অন্তর্নিহিত অর্থ স্পষ্ট’। একে শুধু উত্তেজনা প্রশমন হিসেবে দেখলে হবে না। বিষয়টাকে চাপের পরিস্থিতিতে থাকা একটা ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে ফলাফল এখনো পরিবর্তনশীল।



পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, ভারতের নিজের অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার। ‘ভারতের উচিত সুস্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান জানানো। উত্তেজনা প্রশমনকে সমর্থন করা, সমুদ্রপথে নেভিগেশনকে রক্ষা করা এবং এই সংঘাতের কোনো একটা পক্ষের বয়ানের সঙ্গে একাত্ম হওয়া থেকে বিরত থাকা দরকার। এটা নীরব থাকার মুহূর্ত নয়। এটা পরিমিত কণ্ঠস্বর ব্যবহারের মুহূর্ত।’ লিখেছেন তিনি।


গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স সাংবাদিক অঞ্জনা শঙ্করও পাকিস্তানের ভূমিকার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, আমি বুঝতে পারছি না কেন কিছু মানুষ মধ্যস্থতা করার জন্য পাকিস্তানের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিতে চান না। যুদ্ধ চরম অবস্থায় থাকাকালীনও পাকিস্তান কূটনৈতিক পথ বন্ধ হতে দেয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ইসলামাবাদ আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মধ্যস্থতা করতে সফল হয়। এই যুদ্ধ যেভাবে বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছিল সেদিক থেকে এটা একটা বড় সাফল্য।



অমিত ভেরে নামে এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী লেখেন, আপনারা বুঝতে পারছেন যে, ভারতের এলপিজি ও পেট্রোল সমস্যার সমাধান আমাদের নেতা (মোদী) করেননি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এর সমাধান করেছেন? এটা অবিশ্বাস্য শোনালেও বিষয়টা চমকে দেওয়ার মতো। শাহবাজ শরিফ যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছেন।



বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও পরিশোধিত পণ্যের উপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় সাত বছরের মধ্যে প্রথমবার ইরানের তেল ভারতে আসছে। চলতি সপ্তাহেই এসে পৌঁছাবে তেলের সেই ট্যাংক। ক্যাপ্টেন নরেশ সিং নামে একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী লিখেছেন, মোদীজির ব্যর্থ কূটনীতির ফলস্বরূপ পাকিস্তান বিশ্বগুরু হয়ে উঠেছে।


সাংবাদিক অঙ্কুর ভারদ্বাজের মতে, তুচ্ছ চিন্তাভাবনা ও তিক্ততা দেখানোর বদলে আমাদের স্বীকার করা উচিত যে, এই যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তান যে ভূমিকা পালন করেছে এবং কূটনীতিতে আমরা কোথায় ভুল করেছি আর কেন ভুল করেছি তা নিয়ে গভীরভাবে আত্মসমীক্ষা করা এবং ভাবা উচিত। সূত্র- বিবিসি



সর্বশেষ সব খবর

মেগান মার্কেল ও তার বাবা থমাস মার্কেল। ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:৩৬ পিএম

ব্রিটিশ রাজপরিবারের বধূ ও প্রিন্স হ্যারির স্ত্রী মেগান মার্কেলের বাবা থমাস মার্কেলের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়নের আপত্তিকর ছবি জমানোর এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চরম ক্ষোভ ও গভীর মানসিক কষ্ট প্রকাশ করেছেন ডাচ অব সাসেক্স মেগান। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এমন বিভৎস খবর শুনে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ও বিপর্যস্ত। ঘটনার শিকার হওয়া নিরীহ শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।


যুক্তরাজ্যের ‘দ্য সান’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, মেগানের সৎ ভাই থমাস মার্কেল জুনিয়র ফিলিপাইনে তাদের বাবার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে এই আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও উদ্ধার করেন। তার দাবি, বাবার ড্রয়ার ও কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে শত শত শিশু নির্যাতনের ছবি ছিল। এরপরই তিনি ফিলিপাইন পুলিশ, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থায় গিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেন। ফিলিপাইন প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই বর্তমানে যৌথভাবে এই ঘটনার তদন্ত করছে। তবে মেগানের বাবা থমাস মার্কেল সিনিয়র তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।


বর্তমানে ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন ৮২ বছর বয়সি থমাস জানান, তার ছেলে সম্পূর্ণ মিথ্যা গল্প ফেঁদেছে। মেগানের বোন সামান্থা মার্কলও বাবার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, এই কম্পিউটারগুলো দুই বছর ধরে অন্য মানুষদের হাতে ছিল এবং তার ভাই বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। এই ঘটনার পর মেগান মার্কেল তার বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্বের আসল কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, আজ থেকে আট বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালেই পুলিশের পক্ষ থেকে তার বাবার বিরুদ্ধে কিছু আপত্তিকর অভিযোগের বিষয়ে তাকে জানানো হয়েছিল।


মেগান বলেন, এতদিন সংবাদমাধ্যমে নানা কথা ছড়ানো হলেও, মূলত সন্তানদের সুরক্ষার কথা ভেবেই তিনি বাবাকে নিজের পরিবার থেকে দূরে রেখেছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার অন্তত মানুষ বুঝতে পারবে যে কেন তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তিনি আশা করেন ভুক্তভোগী শিশুরা যেন দ্রুত ন্যায়বিচার পায়।


সর্বশেষ সব খবর

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:০৩ পিএম

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য সামনে এক বড় ধরণের ‘চমক’ অপেক্ষা করছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলার ঘটনার পর সেখানে বড় ধরণের সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি এই মন্তব্য করেন।


ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানান, ফিলিস্তিনকে কোনোভাবেই স্বাধীন রাষ্ট্র হতে না দেওয়া তাদের নির্বাচনের মূল লক্ষ্য। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের সোজা উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, হঠাৎ এবং আচমকা পদক্ষেপ নেওয়াই তার বেশি পছন্দ। নেতানিয়াহু আরও জানান, ফিলিস্তিন থেকে আসা যেকোনো সংকট মোকাবিলায় কিছু গোপন কৌশল ব্যবহার করা হবে, যা এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের জন্য খুব শীঘ্রই এক বড় ধাক্কা আসতে চলেছে।



মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের দাবি তুলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়াই তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় আরও কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের চুক্তি বাড়াবেন। অন্তত দুটিরও বেশি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেই দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো শর্ত দেবে না, কারণ তারা ভালো করেই জানে যে ইসরাইল তা কখনোই মেনে নেবে না।


সূত্র: আল-জাজিরা

সর্বশেষ সব খবর

সুলতান আল-কাহতানি। ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৮:৫৫ পিএম

সৌদি আরবের দাম্মামে কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের এক হামলার সময় অন্য যাত্রীদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে সুলতান আল-কাহতানি নামের এক বিমানবন্দর কর্মী বীরের মতো প্রাণ হারিয়েছেন।


গত ২১ অক্টোবর বিমানবন্দরে হামলার পরপরই প্রস্থান গেটের কাছে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই আগুন যাতে রানওয়েতে থাকা অন্য কোনো বিমানে ছড়িয়ে না পড়ে এবং যাত্রীদের কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য সুলতান ও তার সহকর্মীরা দ্রুত আগুন নেভানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে তারা আগুন নেভাতে প্রাণপণে চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুন নেভাতে গিয়ে তিনি এতটাই অতিরিক্ত ধোঁয়া গ্রহণ করেন যে, তার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা ও তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।


 পরবর্তীতে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে আর বাঁচাতে পারেননি। নিহত সুলতানের ছয়টি সন্তান রয়েছে। তার বাবা ছেলের এই আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, দেশ ও মানুষের সেবা করতে গিয়েই তার ছেলে শহীদ হয়েছে। চরম বিপদের মুখে নিজের জীবনের পরোয়া না করে অন্যদের প্রাণ বাঁচাতে সুলতানের এই অসাধারণ সাহসিকতা এখন পুরো দেশজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৩:১৭ পিএম

ভারতের অরুণাচল প্রদেশে সীমান্তের একাধিক স্থানে ভারত ও চীনা সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুর।


গত জুলাইয়ের পর থেকে সীমান্তে উত্তেজনা কতটা বিস্তৃত হয়েছে, এ বিষয়ে এটিই ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। এছাড়া প্রদেশটির কয়েক কিলোমিটার ভেতরে চীনা সেনারা অবস্থান করছে বলেও জানা গেছে।


গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজস্থানের আলওয়ারে আইটিবিপির সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজে বাহিনীর বার্ষিক সম্মাননা অনুষ্ঠান ‘হিমবীর সম্মান সমারোহে’ বক্তব্য দেয়ার সময় উভয় দেশের সেনাদের মধ্যে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিষয়ে কথা বলেন কাপুর। 


দ্য হিন্দু তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘গত কয়েক দিনে অরুণাচলের একাধিক স্থানে মুখোমুখি অবস্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তা এখনো চলছে।’


বাহিনীর নবগঠিত ‘শৌর্য কমান্ডো’ ইউনিটের ভূমিকার প্রশংসা করে কাপুর জানান, এ পরিস্থিতিতে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। ২০০৪ সালে চীনের সঙ্গে সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব পাওয়ার আগে আইটিবিপি একটি পার্বত্য গেরিলা বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।


কাপুর বলেন, ‘বাহিনীকে তার মূল দায়িত্ব থেকে সরে আসার প্রয়োজন নেই, বরং সেনাবাহিনী থেকে পৃথক একটি বিশেষায়িত উচ্চ পার্বত্য যুদ্ধবাহিনী গড়ে তোলা হচ্ছে। শিগগিরই শৌর্য কমান্ডোদের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে। উচ্চ পার্বত্য এলাকায় মোতায়েনই আমাদের শক্তি।’


মাজা এলাকায় তাঁবু স্থাপন চীনা সেনাদের


সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দু জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের টাকসিংয়ের কাছে আসাফিলা এলাকায় জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা চলছে। আপার সুবানসিরি জেলার টাকসিং সার্কেলের মাজা কোম্পানি অপারেটিং বেসের কাছে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সদস্যরা উঁচু এলাকায় তাঁবু স্থাপন করেছেন। ভারত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) যেখানে রয়েছে বলে মনে করে, সেখান থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাঁবুগুলো স্থাপন করা হয়েছে।


একটি সূত্র সংবাদমাধ্যমটিকে জানায়, জুলাইয়ে নিয়মিত টহলের সময় মাজা এলাকায় ভারতীয় ও চীনা সেনারা মুখোমুখি হন। সংক্ষিপ্ত উত্তেজনার পর দুই পক্ষ ফিরে গেলেও কয়েক দিন পর আরও বেশি সদস্য নিয়ে ফিরে আসে চীনা সেনারা। 


এরপর ভারতের ধারণা অনুযায়ী, এলএসি থেকে ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করে তারা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর থেকে ওই এলাকায় নিজেদের সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে ভারতও।


আধুনিক অস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ


কাপুর জানান, আইটিবিপির অস্ত্রশস্ত্র প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। এখন সেগুলো আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। অস্ত্র ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের বড় বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে চীনের মোকাবিলা করা যথেষ্ট নাও হতে পারে। এ জন্য ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।


কাপুর উল্লেখ করেন, ড্রোনের মাধ্যমে ছোট একটি দেশও বড় দেশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। রাশিয়ার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধ এবং ড্রোনের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ইরানের উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি।


তিনি বলেন, ‘আমাদের ড্রোন ও ড্রোনবিরোধী ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। ৪০০ কোটি রুপির আধুনিকায়ন তহবিলের ৭০ শতাংশ আমরা ড্রোনের পেছনে ব্যয় করেছি। সীমান্ত পাহারার প্রতিটি ব্যাটালিয়নে একটি করে ড্রোন প্লাটুন রয়েছে। ড্রোন চালক তৈরির প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে এবং নিজস্ব উদ্যোগে ড্রোন তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৩ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৪ হাজার কোটি রুপির আরেকটি আধুনিকায়ন প্রকল্প থেকে ড্রোনের জন্য ১ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’


আলোচনার পরও কমেনি উত্তেজনা


কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হলেও সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। জুলাইয়ের পর সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে তিনটি আলোচনাও হয়েছে। গত ৬ আগস্ট ভারত-চীন সীমান্তবিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয়ের জন্য গঠিত ওয়ার্কিং মেকানিজমের ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।


২৬ আগস্ট বেইজিংয়ে সীমান্ত প্রশ্নে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম আলোচনায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর অরুণাচল প্রদেশের ওয়াচা-দামাই সীমান্ত বৈঠককেন্দ্রে পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরে প্রথমবারের মতো ‘কর্পস কমান্ডার’ পর্যায়ের বৈঠক করেন ভারত ও চীনের সেনাবাহিনী।


মোদি সরকারের সমালোচনায় কংগ্রেস


আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের পর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ। সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রশাসনের ‘গভীর ও অস্বস্তিকর নীরবতা’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রমেশ লেখেন, ‘তথাকথিত ‘বিশ্বগুরু’ যখন চীনের কাছে একের পর এক ছাড় দিয়ে চলেছেন, তখন আইটিবিপির মহাপরিচালক অরুণাচল প্রদেশে পিএলএ’র সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের ঘটনায় বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন- যা যথার্থই প্রশংসনীয়। অথচ, এই পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক গভীর নীরবতা পালন করা হচ্ছে।’


তিনি আরও যোগ করেন, ‘গত মাসে ‘তাকসিং’ এলাকায় মুখোমুখি সংঘাতের পর অরুণাচল প্রদেশের ওয়াচা ও দামাইতে কর্পস কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, লাদাখের মতোই এখানেও ভারতীয় বাহিনীর টহল দেয়ার জায়গাগুলো হাতছাড়া হয়ে গেছে। চীন ক্রমাগত অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তন করে চলেছে এবং সেখানে ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বাঁধ নির্মাণ করছে, যা আমাদের পরিবেশগত ও পানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।’

সর্বশেষ সব খবর

নিজেই পা কেটে ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন ইউক্রেনে

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ২:৪৪ পিএম

বোমায় বিধ্বস্ত একটি স্কুলের ধ্বংসস্তূপের নিচে ছোট্ট এক গর্তে আটকে ছিলেন ইউক্রেনীয় সেনা কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। বেঁচে থাকার তাগিদে একপর্যায়ে তাকে নিতে হয় ভয়াবহ এক সিদ্ধান্ত-নিজের অবশিষ্ট পা-টিও কেটে ফেলতে হবে।


৪৯ বছর বয়সী এই পদাতিক সেনা গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ ড্রোন হামলায় বাঁ পা হারান। একই হামলায় তার ডান পা-ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে হামাগুড়ি দিয়ে চলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন তিনি। 


প্রায় তিন মাস পর, পচে যাওয়া ও হাড় বেরিয়ে আসা ডান পা-টি নিজের ছুরি দিয়ে কেটে ফেলতে বাধ্য হন ভ্লাসেনকো। এরপর রক্তপাত বন্ধ করতে ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধেন।


সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার পরও শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফেরেন তিনি। গত ৪ অক্টোবর এক নজিরবিহীন অভিযানে বিশাল একটি ড্রোনের সঙ্গে ঝুলিয়ে তাকে উদ্ধার করে ইউক্রেনীয় বাহিনী। আট মাসের মতো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরেন তিনি। এর আগে ইউক্রেনের ড্রোন-অধ্যুষিত যুদ্ধক্ষেত্রে টানা ৪৯১ দিন কাটাতে হয়েছিল তাকে।


ছয় পাখার একটি ভারী ড্রোনের সঙ্গে নিরাপত্তা বেল্টে ঝুলিয়ে তাকে প্রায় ৭০ মিটার উঁচুতে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায় ড্রোনটি। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আকাশপথে ড্রোন ব্যবহার করে কোনো সেনাকে উদ্ধারের এটিই প্রথম জানা ঘটনা।


রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের ধরন পাল্টে দিয়েছে। বিশেষ করে সম্মুখসারির কিছু এলাকা এখন ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরী হিসেবে পরিচিত। সেখানে সারাক্ষণ নজরদারি ও হামলায় নিয়োজিত থাকে ড্রোন। ফলে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।


খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়টার্সকে ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি নিজেকে কবর দিয়েই ফেলেছিলাম।’ ব্যান্ডেজে মোড়ানো দুই পায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম, বেঁচে ফেরার আর কোনো আশা নেই।’


ভ্লাসেনকোর দুর্দশা ও উদ্ধার অভিযানের বিষয়টি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে। উদ্ধারকারী ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজেও অভিযানের দৃশ্য দেখা গেছে। 


তবে রয়টার্স জানিয়েছে, তার বর্ণনার প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার দিনগুলো


ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের হয়ে খারকিভ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত বছরের মে মাসে তাকে সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে বাস্কি নামের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে অবস্থান করতেন তিনি।


দুজন একটি ছোট মাটির গর্তে গাদাগাদি করে থাকতেন। ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত তাদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে ওপর থেকে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল। তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত কঠিন। গত বছরের শরৎকালে তাদের বদলি করতে নতুন দুই সেনাকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নিহত হন। তাদের মরদেহ উদ্ধারে পাঠানো আরও দুই সেনাও প্রাণ হারান।


বিবাহিত ভ্লাসেনকো বলেন, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে যাচ্ছে। তার ভাষায়, ‘বুঝতে পেরেছিলাম, এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’


একটানা প্রায় ১০ মাস একই জায়গায় থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ভ্লাসেনকো ও বাস্কিকে অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। তাদের গর্তে পানি ঢুকে পড়ায় তারা একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন।


কিন্তু সেখানেও বিপদ এড়ানো যায়নি। সহযোদ্ধাদের ফেলে যাওয়া শুকনা কাপড় ও খাবারের প্যাকেট আনতে বাইরে বের হলে একটি রুশ নজরদারি ড্রোন তাদের শনাক্ত করে। এরপর আরেকটি ড্রোন তাদের ওপর বোমা ফেলে।


সেই হামলায় বাস্কি নিহত হন। দিনটি ছিল তার ৫০তম জন্মদিন। বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ডান পায়েও গুরুতর আঘাত পান তিনি। নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে কোনোমতে একটি ছোট গর্তে আশ্রয় নেন। গর্তটি ছিল স্কুল ভবন গরম রাখার কাজে ব্যবহৃত একটি পুরোনো ধাতব বয়লারের নিচে।


‘আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না’


গর্তের মধ্যে আটকে থাকা অবস্থায় ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের ক্ষত ধীরে ধীরে পচে যেতে থাকে। ডান পায়ের অবস্থাও ছিল ভয়াবহ। নিচের অংশে এতটাই আঘাত লেগেছিল যে হাড় বেরিয়ে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে থাকা ছুরি দিয়ে ডান পা-টিও কেটে ফেলেন তিনি। এরপর ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেন।


ঘটনাটি স্মরণ করতে গিয়ে ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমাকে পা-টা কাটতেই হতো। কারণ, এটা আমার পেছন পেছন ঝুলছিল।’


তিনি আরও বলেন, ‘পা-টা এতটাই ঝুলছিল যে হাড় আরও বেশি করে বাইরে বেরিয়ে আসছিল।’ এরপর আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘ফলে আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না।’


উদ্ধার অভিযানে নতুন ধরনের ভারী ড্রোন


ভ্লাসেনকো যখন বেঁচে ফেরার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তখন তার কমান্ডাররা তাকে উদ্ধারের উপায় খুঁজছিলেন। এ কাজে ৯২তম অ্যাসল্ট ব্রিগেডসহ ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিভিন্ন দল যুক্ত হয়।


উদ্ধার পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ‘অ্যালেক্স’ ছদ্মনামের এক কর্মকর্তা জানান, ড্রোনের হুমকির কারণে পিকআপ ট্রাক বা সাঁজোয়া যান দিয়ে আহত সেনাদের উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। 


বিকল্প হিসেবে চালকবিহীন স্থলযান পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছানোর পথে এমন দুটি যানই রুশ ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে তাঁকে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল।


এমন পরিস্থিতিতে কর্মকর্তারা গুরজুফ ডিফেন্স নামের একটি স্থানীয় কোম্পানির তৈরি ভারী ড্রোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। ছয়টি খাড়া পাখা ও কালো কাঠামোর এই ড্রোনটি দেখতে বিশাল পোকার মতো। এটি সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে ৯০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে।


কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, দীর্ঘদিন যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকার পর ভ্লাসেনকোর ওজন প্রায় ৭০ কেজি। ফলে তাঁকে ড্রোনে ঝুলিয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।


তবে ঝুঁকি ছিল বড়। ইউক্রেনের ভারী ড্রোনগুলো প্রায়ই রাশিয়ার ছোট ড্রোনের হামলার শিকার হয়। এসব ড্রোনে থাকা ক্যামেরার মাধ্যমে চালকেরা দূর থেকে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।


অবশেষে মৃত্যুপুরী থেকে উদ্ধার


অক্টোবরের শুরুতে ভ্লাসেনকো নিয়মিত সরবরাহের একটি প্যাকেটে অপ্রত্যাশিত কিছু জিনিস পান। সেখানে ছিল একটি নিরাপত্তা বেল্ট এবং উদ্ধার অভিযানের নির্দেশনাসংবলিত ভিডিও রাখা একটি ফোন। 


ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতে পারলেও ভ্লাসেনকো জানতেন, বেঁচে ফেরার জন্য এটাই তার সবচেয়ে বড় সুযোগ।


৪ অক্টোবর ছয় পাখার ভারী ড্রোনটি তার কাছে পৌঁছায়। ড্রোনের সঙ্গে ঝুলে থাকা একটি ধাতব সংযোগের হুকে নিজেকে আটকে নেন তিনি। এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার ওপরে তুলে নেয়। অভিযানের সময় তিনটি ছোট ড্রোন ভারী ড্রোনটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়, যাতে রুশ ড্রোনগুলো সহজে হামলা চালাতে না পারে। শত্রুপক্ষের ড্রোনের অবস্থানে হামলা চালাতে ইউক্রেনের চারটি ছোট ড্রোন, গোলন্দাজ বাহিনী এবং বড় ডানাযুক্ত ড্রোনও অংশ নেয়। এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অভিযান চালানো হয়।


টানটান উত্তেজনার মধ্যে প্রায় ১৫ মিনিটের উড্ডয়ন শেষে উদ্ধারকারী ড্রোনটি গন্তব্যে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী উদ্ধারস্থলের সঠিক অবস্থান প্রকাশ করেনি।


দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরলেও যাত্রাপথে ভয় একেবারে কাটেনি ভ্লাসেনকোর। তবে তার ভয় ছিল ড্রোন থেকে পড়ে যাওয়া নিয়ে নয়, বরং পানিতে পড়ে যাওয়া নিয়ে।


তিনি বলেন, ‘আমি নিচে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম না। ধরুন, বনের মধ্যে কোথাও পড়ে গেলে আমার ভয় লাগত না।’ এরপর নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে আমি পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ, আমি সাঁতার জানি না।’


যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা, সহযোদ্ধাকে হারানো, নিজের দুই পা হারিয়েও বেঁচে থাকার লড়াই-সবকিছুর পর শেষ পর্যন্ত ড্রোনের সাহায্যে মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে আসেন ভ্লাসেনকো। 

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ২:১২ পিএম

ভালোবাসার সাধারণ এক আলিঙ্গন যে শেষ পর্যন্ত হাড় ভাঙার কারণ হতে পারে, তা হয়তো কল্পনাও করেননি চীনের এক দম্পতি। স্বামীর মৃদু জড়িয়ে ধরাতেই ভেঙে গেছে স্ত্রীর পাঁচটি পাঁজর, ফাটল ধরেছে আরও একটিতে। 


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তোলা এ ঘটনার পর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় জানা গেছে, ওই নারী তীব্র ‘অস্টিওপোরোসিস’ বা হাড়ক্ষয় রোগে ভুগছিলেন।


চীনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘জিংসি লাইভ’-এর বরাতে জানা যায়, শীত লাগছে জানানোয় স্ত্রীকে উষ্ণতা দিতে জড়িয়ে ধরেছিলেন ওয়াং পদবির ওই ব্যক্তি। 


তবে আলিঙ্গনের মুহূর্তেই হাড় ভেঙে যাওয়ার শব্দ শুনতে পান তিনি। ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়ে স্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে মাটিতে বসে পড়েন।


স্বামীর দাবি, তিনি কোনো অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেননি; স্বাভাবিকভাবেই স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। বিষয়টি যে এতটাই গুরুতর রূপ নিতে পারে, তা আঁচ করতে পারেননি ওই দম্পতি। ফলে সারা রাত অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে পরদিন সকালে তারা হাসপাতালে যান। সেখানে বুকের সিটি স্ক্যান করার পর চিকিৎসকেরা দেখতে পান, তার পাঁচটি পাঁজর ভেঙে গেছে এবং ষষ্ঠ পাঁজরে চিড় (হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার) ধরেছে।


চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াং জানান, তার স্ত্রীর হাড় অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ার মূল কারণ অস্টিওপোরোসিস। 


তিনি জানান, ৪৫ থেকে ৫০ কেজি ওজনের তার স্ত্রী মাত্রাতিরিক্ত ডায়েট করতেন এবং প্রায়ই রাতের খাবার বাদ দিতেন। এ ছাড়া তিনি সূর্যালোকের সংস্পর্শেও আসতেন না বললেই চলে। বাসা থেকে মাত্র দুই-তিন মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত পারিবারিক দোকানেই তার বেশির ভাগ সময় কাটত।


উহান এশিয়া হার্ট জেনারেল হাসপাতালের অস্থিশল্য বিশেষজ্ঞ (অর্থোপেডিক ফিজিশিয়ান) ইয়ান ইয়ানসিয়াং বলেন, সাধারণত তরুণ বয়সে শুধু আলিঙ্গনের চাপে পাঁজর ভেঙে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ব্যক্তির অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার সঙ্গে হাড়ের এই অস্বাভাবিক দুর্বলতার গভীর যোগসূত্র রয়েছে।


তিনি আরও জানান, পাঁজরের এই ধরনের ভাঙনে ফুসফুস বা ফুসফুসের পর্দায় কোনো জটিলতা তৈরি না হলে সচরাচর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে না। সে কারণে চিকিৎসকেরা ওই নারীকে কোনো অস্ত্রোপচার না দিয়ে ওষুধ, বিশেষ প্যাচ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের মাধ্যমে নিরাময়ের পরামর্শ দিয়েছেন।

সর্বশেষ সব খবর