ছবি : সংগৃহীত
ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিতে ইসরায়েলের আরও একটি গোপন সামরিক ঘাঁটি থাকার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ৩ মার্চ এক মেষপালক আওয়াদ আল-শাম্মারি দুর্ঘটনাক্রমে একটি ঘাঁটির কাছে গেলে ইসরায়েলি হেলিকপ্টার থেকে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
গোপন ঘাঁটিগুলো ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য ব্যবহৃত হতো। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে জানলেও ইরাককে জানায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। আরও গোপন ঘাঁটি থাকতে পারে বলে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
দিনটি ছিল ৩ মার্চ, স্থানীয় সময় বেলা প্রায় ২টা। একটি পিকআপ ট্রাক ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমি দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যাচ্ছে। মরুভূমিতে বসবাস করা স্থানীয় বেদুইন বসতির কাছে সেটি পরিচিত এক দৃশ্য। পিকআপটি স্থানীয় এক মেষপালকের। তিনি বাজার করতে কাছের শহর আল-নুখাইবে যাচ্ছিলেন।
তবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই পিকআপটি ফিরে আসে, যা একেবারেই অস্বাভাবিক ছিল। ফিরে আসার সময় সেটিতে আগুন জ্বলছিল এবং গুলিতে সেটি ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল।
তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, একটি হেলিকপ্টার ট্রাকটিকে (পিকআপ) ধাওয়া করছিল এবং বারবার গুলি চালাচ্ছিল, একপর্যায়ে সেটি মরুভূমিতে বালুর মধ্যে থেমে যায়। সেটিতে তখনো আগুন জ্বলছিল।
ইরাকের মরুভূমিতে প্রাণঘাতী এই হামলা নিয়ে আগে কখনো কোথাও খবর প্রকাশ পায়নি। ট্রাকটি ২৯ বছর বয়সী আওয়াদ আল-শাম্মারির। শাম্মারির চাচাতো ভাই আমির আল-শাম্মারি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, তাঁর ভাই আওয়াদ ট্রাকটি নিয়ে বাজার করতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু পথ চলতে গিয়ে তিনি অজান্তে ইরাকের মরুভূমিতে গোপনে স্থাপন করা একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির মুখোমুখি পড়ে যান।
অত্যন্ত গোপনীয় এবং দারুণভাবে সুরক্ষিত ওই সামরিক আস্তানার কাছাকাছি চলে যাওয়ার কারণেই আওয়াদকে প্রাণ দিতে হয়েছে বলে বিশ্বাস তাঁর পরিবারের।
আওয়াদ আল-শাম্মির কারণেই শেষ পর্যন্ত থলের বিড়াল বের হয়ে আসে। জানা যায়, এক বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েল তাদের শত্রুদেশ ইরাকের ভেতরে দুটি গোপন সামরিক স্থাপনা থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে। দুর্ভাগ্যজনক সেই যাত্রা শুরুর পর থেকে ভয়াবহ পরিণতির আগে কোনো একসময় আওয়াদ ইরাকের আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি যা দেখেছিলেন, তা জানাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ওই মেষপালক বলেছিলেন, সেখানে একটি উড়োজাহাজ ওঠা-নামার পথ এবং সেটি ঘিরে সেনা, হেলিকপ্টার ও তাঁবুর সমাবেশ রয়েছে।
জ্যেষ্ঠ ইরাকি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, বাগদাদের আঞ্চলিক মিত্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সহায়তার জন্য ইসরায়েল সেখানে একটি ঘাঁটি পরিচালনা করছিল।
এর আগে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ইরাকের ভেতরে ইসরায়েলের একটি সামরিক ফাঁড়ি থাকার খবর প্রকাশ করে। ইরাকি কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমিতে আওয়াদের আবিষ্কার করা সামরিক স্থাপনাটি ইসরায়েলের দ্বিতীয় আরেকটি ঘাঁটি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, আওয়াদ আল-শাম্মারি যে ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলেন, সেটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধেরও আগে তৈরি। ২০২৫ সালের জুনে তেহরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে ঘাঁটিটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
আঞ্চলিক কর্মকর্তারা আরও বলেন, দেশের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চল বেছে নিয়ে ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই ইসরায়েল অস্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু করে, যাতে ভবিষ্যৎ সংঘাতের সময় অভিযান চালানোর জন্য সেগুলো ব্যবহার করা যায়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের এই ফাঁড়ি ও ঘাঁটি এবং আওয়াদ আল-শাম্মারির হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য করা একাধিক অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়াদ হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছেন।
ইসরায়েলি ঘাঁটিগুলো নিয়ে যেসব কর্মকর্তা কথা বলেছেন, তাঁদের অধিকাংশই এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল নিরাপত্তা বিষয় হওয়ায় নিজেদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে তাঁরা যে তথ্য দিয়েছেন, তা ইঙ্গিত করে যে অন্তত একটি ঘাঁটি, যেটিতে আওয়াদ হঠাৎ করে পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেটির বিষয়ে ২০২৫ সালের জুন মাস থেকেই অথবা তারও আগে থেকে ওয়াশিংটনের কাছে তথ্য ছিল।
এর অর্থ দাঁড়ায়, বাগদাদের অন্য প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এ বিষয়ে ইরাককে কোনো তথ্য দেয়নি। তাদের শত্রু বাহিনী যে গোপনে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করেছে, এটা ওয়াশিংটন বাগদাদকে জানতে দেয়নি।
ইরাকের পার্লামেন্ট সদস্য ওয়াদ আল-কাদু বলেন, ‘এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব, দেশটির সরকার ও তার বাহিনীগুলোর পাশাপাশি ইরাকি জনগণের মর্যাদার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা প্রদর্শন করার শামিল।’
আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, ইরাকের নিরাপত্তাব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ইসরায়েলের সেই হিসাব-নিকাশের অংশ ছিল, যার ভিত্তিতে ইসরায়েল ধরে নিয়েছিল, ইরাকে গোপনে সামরিক আস্তানা গড়ে সেখান থেকে সামরিক অভিযান চালানো তাদের জন্য নিরাপদ হবে।
দুজন ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, গত বছর জুনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ এবং চলমান সংঘাত-উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের উড়োজাহাজগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে ইরাককে তাদের রাডার বন্ধ করতে বাধ্য করেছিল। এর ফলে বাগদাদ শত্রুর তৎপরতা শনাক্তের জন্য আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
ইসরায়েলের এসব ঘাঁটির উপস্থিতির তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়া ইরাকের জন্যও অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মরুভূমির এক মেষপালকের নজরে পড়ার আগপর্যন্ত সত্যিই কি ইরাকি বাহিনী নিজেদের ভূখণ্ডে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি জানত না? নাকি তারা জানত, কিন্তু উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?
যেকোনো সম্ভাবনাই এই ইঙ্গিত করে, দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের টানাপোড়েনে আটকে থাকা ইরাক এখনো নিজের ভূখণ্ডের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি।
আল-কাদু বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমাদের নিরাপত্তা নেতৃত্বের অবস্থান অত্যন্ত লজ্জাজনক।’
এ নিয়ে ইরাকি সেনাবাহিনীর ওয়েস্টার্ন ইউফ্রেতিস ফোর্সেসের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আল-হামদানি বলেন, মেষপালকের এই আবিষ্কারের এক মাসের বেশি সময় আগে থেকে তাঁর বাহিনী মরুভূমিতে ইসরায়েলি উপস্থিতির বিষয়ে সন্দেহ করে আসছিল।
আল-হামদানি বলেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত ইরাক সরকার এ নিয়ে নীরব।
ইরাকের সরকার এখন পর্যন্ত তাদের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি ঘাঁটির অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। এটি স্বীকার করা তাদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
কারণ, ইসরায়েলের সঙ্গে ইরাকের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। দেশটির জনগণ ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবে দেখে।
ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদ মান নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরাকের কাছে ‘কোনো ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই।’
মরুভূমিতে ইসরায়েলের ঘাঁটির উপস্থিতির তথ্য প্রকাশের পর ইরাকে ক্ষোভ বাড়ছে। ফলে দেশটিতে ইরানের প্রভাব সীমিত করার যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
আঞ্চলিক দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, আওয়াদ যে ঘাঁটির তথ্য প্রকাশ করেছিলেন, সেটি ইসরায়েলের বিমানবাহিনীকে অভিযানে সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ ও চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হতো।
এসব ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছিল, যাতে ইসরায়েলি উড়োজাহাজগুলোকে ইরান পর্যন্ত পৌঁছাতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে হতো, তা কমানো যায়। এটি মূলত সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য একটি অস্থায়ী উপস্থিতির কথা মাথা রেখে তৈরি করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুনে যুদ্ধের সময় এই ঘাঁটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল বলে জানান দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা।
গত বছরের যুদ্ধের পর দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেছিলেন, অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ‘বিমানবাহিনী এবং স্থল কমান্ডো বাহিনীর সমন্বয় ও প্রতারণামূলক কৌশলের কারণে’ ইসরায়েলি অভিযানে সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান তদারকির দায়িত্বে থাকা পেন্টাগনের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরাকে ইসরায়েলি অভিযানের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রশ্নগুলো ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে পাঠাতে বলেছে।
তবে সাবেক শীর্ষ মার্কিন সামরিক কমান্ডার, পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এবং ওই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন কূটনীতিকেরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিজেদের ভেতর যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, তাতে সেন্ট্রাল কমান্ড ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে ইসরায়েলি উপস্থিতির বিষয়ে কিছুই জানে না—এটা কল্পনাতেও বিশ্বাস করা অসম্ভব।
বিপজ্জনক গোপন তথ্য যেভাবে ফাঁস হলো
ইরাকের আঞ্চলিক কমান্ডার জেনারেল আল-হামদানি দাবি করেন, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমির বেদুইন সম্প্রদায়গুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে আঞ্চলিক কমান্ডকে সেখানে অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতার বিষয়ে নানা খবর দিচ্ছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী কাছাকাছি না গিয়ে বরং দূর থেকে ‘সম্ভাব্য ইসরায়েলি বাহিনীর সন্দেহজনক তৎপরতার ওপর নজরদারির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল’।
তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে এ বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়েছিল, কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
আওয়াদ আল-শাম্মারি যেদিন বিদেশি বাহিনীর মুখোমুখি হন, সেদিন তিনিও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর চাচাতো ভাই এবং কারবালা আঞ্চলিক অপারেশন কমান্ডের মুখপাত্র মেজর জেনারেল ফাহিম আল-গুরাইতি।
তার কিছু সময় পর জেনারেল আল-গুরাইতি ও আওয়াদ আল-শাম্মারির পরিবারের সদস্যরা জানান, সেনাবাহিনী ও তাঁর স্বজনেরা তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারছেন না। তাঁর পরিবার দুই দিন ধরে খোঁজাখুঁজি করে, এরপর হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করা বেদুইন বাসিন্দাদের সন্ধান পায়। তাদের কাছ থেকে তাঁরা আওয়াদের শেষ পরিণতির কথা জানতে পারে, জানতে পারে তাঁর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল।
আওয়াদের চাচাতো ভাই আমির বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল, আওয়াদের পিকআপের মতোই দেখতে একটি পুড়ে যাওয়া পিকআপ ট্রাক সেখানে পড়ে আছে, কিন্তু কেউ সেখানে যাওয়ার সাহস করেনি। আমরা সেখানে গিয়ে পোড়া ট্রাক ও পুড়ে যাওয়া মরদেহ দেখতে পাই।’
আওয়াদের পরিবার তাঁর রক্তাক্ত ও পোড়া মরদেহের ছবি দেখিয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, তাঁর মাথা ও আঙুল পুড়ে কালো হয়ে গেছে। ছবিতে পোড়া পিকআপও দেখা যাচ্ছে। জেনারেল আল-গুরাইতি ও জেনারেল আল-হামদানি বলেন, মেষপালকের কাছ থেকে খবর পাওয়ার এক দিন পর ইরাকের আঞ্চলিক কমান্ড একটি পুনর্বীক্ষণ দল সেখানে পাঠায়।
তারও এক দিন পর ইরাকের জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ডের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ইউনিটগুলো এলাকাটির কাছে পৌঁছালে তারা গোলাগুলির মুখে পড়ে। এতে এক সেনা নিহত এবং দুজন আহত হন, দুটি যানবাহনে বোমা হামলা চালানো হয়। এরপর ইউনিটগুলো সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
বাগদাদে ইরাকের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তখনো বোঝার চেষ্টা করছিলেন, সেখানে আসলে কী ঘটেছিল।
দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের কারণে তাঁদের প্রচেষ্টা বারবার ব্যাহত হয়। শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা ঘটনাটিকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাননি বা এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছিলেন।
সেনাদের ওপর হামলা ও সেনা হতাহতের ঘটনার পর জনসমক্ষে ইরাকের জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ড জানিয়েছিল, ‘বিদেশি’ বাহিনী তাদের সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে অভিযোগ করেছে।
আর ইরাকি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল-আমির ইয়ারাল্লাহ গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বলে জানান জেনারেল আল-হামদানি এবং দুজন জ্যেষ্ঠ ইরাকি কর্মকর্তা। তাঁরা বলেন, ‘মার্কিন বাহিনী নিশ্চিত করেছিল, ওই কাজ তাদের বাহিনীর নয়, ওটা মার্কিন বাহিনী নয়। তখন আমরা বুঝতে পারি, এটি ইসরায়েলি বাহিনী ছিল।’
ইরাকি সেনাদের ওপর হামলার চার দিন পর, ৮ মার্চ ইরাকি পার্লামেন্ট সামরিক নেতৃত্বকে একটি গোপন ব্রিফিং আয়োজনে বাধ্য করে। ওই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত পার্লামেন্ট সদস্যরা জানান, তাঁরা এর বিস্তারিত প্রকাশ করতে পারেননি। তবে তাঁদের একজন হাসান ফাদাম নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইসরায়েল ইরাকের ভেতরে অন্তত আরও একটি ফাঁড়ি স্থাপন করেছিল।
হাসান ফাদাম বলেন, আল-নুখাইবেরটি সেই ঘাঁটিগুলোর একটি, শুধু এটির অবস্থান ফাঁস হয়েছে।
আরেক ইরাকি কর্মকর্তা দ্বিতীয় ঘাঁটির অস্তিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, তবে সেটির অবস্থান সম্পর্কে আলাদা কিছু জানাননি। শুধু বলেছেন, সেটিও দেশটির পশ্চিমের মরুভূমি অঞ্চলে অবস্থিত।
সাবেক ও বর্তমান দুজন জ্যেষ্ঠ ইরাকি কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রটোকল অনুযায়ী ইরাকি ভূখণ্ডে কোনো কার্যক্রম চালালে তা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বাগদাদকে জানানো বাধ্যতামূলক।
ওই দুই কর্মকর্তা বলেন, এর অর্থ দাঁড়ায়, ওয়াশিংটন হয় ইসরায়েলি কার্যক্রম গোপন রেখেছিল অথবা ইরাকের শীর্ষ কমান্ডকে জানানো হয়েছিল, তারা তা গোপন রেখেছিল।
তবে কর্মকর্তারা এ–ও বিশ্বাস করেন, মরুভূমির ওই মেষপালক ঘটনাটি প্রকাশ করার আগপর্যন্ত ইরাকি নেতৃত্ব বিদেশি সামরিক বাহিনীর ওই উপস্থিতি যে ইসরায়েলি বাহিনী ছিল, তা তারা জানত-এমনটা প্রায় অসম্ভব। বরং খুব সম্ভবত তারা সেটিকে মার্কিন ঘাঁটি বলে ধরে নিয়েছিল।
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের অরুণাচল প্রদেশে সীমান্তের একাধিক স্থানে ভারত ও চীনা সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুর।
গত জুলাইয়ের পর থেকে সীমান্তে উত্তেজনা কতটা বিস্তৃত হয়েছে, এ বিষয়ে এটিই ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। এছাড়া প্রদেশটির কয়েক কিলোমিটার ভেতরে চীনা সেনারা অবস্থান করছে বলেও জানা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজস্থানের আলওয়ারে আইটিবিপির সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজে বাহিনীর বার্ষিক সম্মাননা অনুষ্ঠান ‘হিমবীর সম্মান সমারোহে’ বক্তব্য দেয়ার সময় উভয় দেশের সেনাদের মধ্যে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিষয়ে কথা বলেন কাপুর।
দ্য হিন্দু তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘গত কয়েক দিনে অরুণাচলের একাধিক স্থানে মুখোমুখি অবস্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তা এখনো চলছে।’
বাহিনীর নবগঠিত ‘শৌর্য কমান্ডো’ ইউনিটের ভূমিকার প্রশংসা করে কাপুর জানান, এ পরিস্থিতিতে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। ২০০৪ সালে চীনের সঙ্গে সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব পাওয়ার আগে আইটিবিপি একটি পার্বত্য গেরিলা বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কাপুর বলেন, ‘বাহিনীকে তার মূল দায়িত্ব থেকে সরে আসার প্রয়োজন নেই, বরং সেনাবাহিনী থেকে পৃথক একটি বিশেষায়িত উচ্চ পার্বত্য যুদ্ধবাহিনী গড়ে তোলা হচ্ছে। শিগগিরই শৌর্য কমান্ডোদের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে। উচ্চ পার্বত্য এলাকায় মোতায়েনই আমাদের শক্তি।’
মাজা এলাকায় তাঁবু স্থাপন চীনা সেনাদের
সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দু জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের টাকসিংয়ের কাছে আসাফিলা এলাকায় জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা চলছে। আপার সুবানসিরি জেলার টাকসিং সার্কেলের মাজা কোম্পানি অপারেটিং বেসের কাছে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সদস্যরা উঁচু এলাকায় তাঁবু স্থাপন করেছেন। ভারত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) যেখানে রয়েছে বলে মনে করে, সেখান থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাঁবুগুলো স্থাপন করা হয়েছে।
একটি সূত্র সংবাদমাধ্যমটিকে জানায়, জুলাইয়ে নিয়মিত টহলের সময় মাজা এলাকায় ভারতীয় ও চীনা সেনারা মুখোমুখি হন। সংক্ষিপ্ত উত্তেজনার পর দুই পক্ষ ফিরে গেলেও কয়েক দিন পর আরও বেশি সদস্য নিয়ে ফিরে আসে চীনা সেনারা।
এরপর ভারতের ধারণা অনুযায়ী, এলএসি থেকে ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করে তারা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর থেকে ওই এলাকায় নিজেদের সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে ভারতও।
আধুনিক অস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
কাপুর জানান, আইটিবিপির অস্ত্রশস্ত্র প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। এখন সেগুলো আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। অস্ত্র ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের বড় বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে চীনের মোকাবিলা করা যথেষ্ট নাও হতে পারে। এ জন্য ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কাপুর উল্লেখ করেন, ড্রোনের মাধ্যমে ছোট একটি দেশও বড় দেশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। রাশিয়ার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধ এবং ড্রোনের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ইরানের উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ড্রোন ও ড্রোনবিরোধী ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। ৪০০ কোটি রুপির আধুনিকায়ন তহবিলের ৭০ শতাংশ আমরা ড্রোনের পেছনে ব্যয় করেছি। সীমান্ত পাহারার প্রতিটি ব্যাটালিয়নে একটি করে ড্রোন প্লাটুন রয়েছে। ড্রোন চালক তৈরির প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে এবং নিজস্ব উদ্যোগে ড্রোন তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৩ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৪ হাজার কোটি রুপির আরেকটি আধুনিকায়ন প্রকল্প থেকে ড্রোনের জন্য ১ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’
আলোচনার পরও কমেনি উত্তেজনা
কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হলেও সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। জুলাইয়ের পর সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে তিনটি আলোচনাও হয়েছে। গত ৬ আগস্ট ভারত-চীন সীমান্তবিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয়ের জন্য গঠিত ওয়ার্কিং মেকানিজমের ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
২৬ আগস্ট বেইজিংয়ে সীমান্ত প্রশ্নে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম আলোচনায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর অরুণাচল প্রদেশের ওয়াচা-দামাই সীমান্ত বৈঠককেন্দ্রে পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরে প্রথমবারের মতো ‘কর্পস কমান্ডার’ পর্যায়ের বৈঠক করেন ভারত ও চীনের সেনাবাহিনী।
মোদি সরকারের সমালোচনায় কংগ্রেস
আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের পর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ। সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রশাসনের ‘গভীর ও অস্বস্তিকর নীরবতা’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রমেশ লেখেন, ‘তথাকথিত ‘বিশ্বগুরু’ যখন চীনের কাছে একের পর এক ছাড় দিয়ে চলেছেন, তখন আইটিবিপির মহাপরিচালক অরুণাচল প্রদেশে পিএলএ’র সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের ঘটনায় বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন- যা যথার্থই প্রশংসনীয়। অথচ, এই পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক গভীর নীরবতা পালন করা হচ্ছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘গত মাসে ‘তাকসিং’ এলাকায় মুখোমুখি সংঘাতের পর অরুণাচল প্রদেশের ওয়াচা ও দামাইতে কর্পস কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, লাদাখের মতোই এখানেও ভারতীয় বাহিনীর টহল দেয়ার জায়গাগুলো হাতছাড়া হয়ে গেছে। চীন ক্রমাগত অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তন করে চলেছে এবং সেখানে ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বাঁধ নির্মাণ করছে, যা আমাদের পরিবেশগত ও পানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।’
নিজেই পা কেটে ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন ইউক্রেনে
বোমায় বিধ্বস্ত একটি স্কুলের ধ্বংসস্তূপের নিচে ছোট্ট এক গর্তে আটকে ছিলেন ইউক্রেনীয় সেনা কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। বেঁচে থাকার তাগিদে একপর্যায়ে তাকে নিতে হয় ভয়াবহ এক সিদ্ধান্ত-নিজের অবশিষ্ট পা-টিও কেটে ফেলতে হবে।
৪৯ বছর বয়সী এই পদাতিক সেনা গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ ড্রোন হামলায় বাঁ পা হারান। একই হামলায় তার ডান পা-ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে হামাগুড়ি দিয়ে চলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন তিনি।
প্রায় তিন মাস পর, পচে যাওয়া ও হাড় বেরিয়ে আসা ডান পা-টি নিজের ছুরি দিয়ে কেটে ফেলতে বাধ্য হন ভ্লাসেনকো। এরপর রক্তপাত বন্ধ করতে ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধেন।
সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার পরও শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফেরেন তিনি। গত ৪ অক্টোবর এক নজিরবিহীন অভিযানে বিশাল একটি ড্রোনের সঙ্গে ঝুলিয়ে তাকে উদ্ধার করে ইউক্রেনীয় বাহিনী। আট মাসের মতো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরেন তিনি। এর আগে ইউক্রেনের ড্রোন-অধ্যুষিত যুদ্ধক্ষেত্রে টানা ৪৯১ দিন কাটাতে হয়েছিল তাকে।
ছয় পাখার একটি ভারী ড্রোনের সঙ্গে নিরাপত্তা বেল্টে ঝুলিয়ে তাকে প্রায় ৭০ মিটার উঁচুতে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায় ড্রোনটি। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আকাশপথে ড্রোন ব্যবহার করে কোনো সেনাকে উদ্ধারের এটিই প্রথম জানা ঘটনা।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের ধরন পাল্টে দিয়েছে। বিশেষ করে সম্মুখসারির কিছু এলাকা এখন ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরী হিসেবে পরিচিত। সেখানে সারাক্ষণ নজরদারি ও হামলায় নিয়োজিত থাকে ড্রোন। ফলে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়টার্সকে ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি নিজেকে কবর দিয়েই ফেলেছিলাম।’ ব্যান্ডেজে মোড়ানো দুই পায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম, বেঁচে ফেরার আর কোনো আশা নেই।’
ভ্লাসেনকোর দুর্দশা ও উদ্ধার অভিযানের বিষয়টি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে। উদ্ধারকারী ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজেও অভিযানের দৃশ্য দেখা গেছে।
তবে রয়টার্স জানিয়েছে, তার বর্ণনার প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার দিনগুলো
ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের হয়ে খারকিভ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত বছরের মে মাসে তাকে সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে বাস্কি নামের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে অবস্থান করতেন তিনি।
দুজন একটি ছোট মাটির গর্তে গাদাগাদি করে থাকতেন। ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত তাদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে ওপর থেকে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল। তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত কঠিন। গত বছরের শরৎকালে তাদের বদলি করতে নতুন দুই সেনাকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নিহত হন। তাদের মরদেহ উদ্ধারে পাঠানো আরও দুই সেনাও প্রাণ হারান।
বিবাহিত ভ্লাসেনকো বলেন, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে যাচ্ছে। তার ভাষায়, ‘বুঝতে পেরেছিলাম, এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’
একটানা প্রায় ১০ মাস একই জায়গায় থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ভ্লাসেনকো ও বাস্কিকে অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। তাদের গর্তে পানি ঢুকে পড়ায় তারা একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন।
কিন্তু সেখানেও বিপদ এড়ানো যায়নি। সহযোদ্ধাদের ফেলে যাওয়া শুকনা কাপড় ও খাবারের প্যাকেট আনতে বাইরে বের হলে একটি রুশ নজরদারি ড্রোন তাদের শনাক্ত করে। এরপর আরেকটি ড্রোন তাদের ওপর বোমা ফেলে।
সেই হামলায় বাস্কি নিহত হন। দিনটি ছিল তার ৫০তম জন্মদিন। বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ডান পায়েও গুরুতর আঘাত পান তিনি। নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে কোনোমতে একটি ছোট গর্তে আশ্রয় নেন। গর্তটি ছিল স্কুল ভবন গরম রাখার কাজে ব্যবহৃত একটি পুরোনো ধাতব বয়লারের নিচে।
‘আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না’
গর্তের মধ্যে আটকে থাকা অবস্থায় ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের ক্ষত ধীরে ধীরে পচে যেতে থাকে। ডান পায়ের অবস্থাও ছিল ভয়াবহ। নিচের অংশে এতটাই আঘাত লেগেছিল যে হাড় বেরিয়ে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে থাকা ছুরি দিয়ে ডান পা-টিও কেটে ফেলেন তিনি। এরপর ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
ঘটনাটি স্মরণ করতে গিয়ে ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমাকে পা-টা কাটতেই হতো। কারণ, এটা আমার পেছন পেছন ঝুলছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘পা-টা এতটাই ঝুলছিল যে হাড় আরও বেশি করে বাইরে বেরিয়ে আসছিল।’ এরপর আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘ফলে আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না।’
উদ্ধার অভিযানে নতুন ধরনের ভারী ড্রোন
ভ্লাসেনকো যখন বেঁচে ফেরার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তখন তার কমান্ডাররা তাকে উদ্ধারের উপায় খুঁজছিলেন। এ কাজে ৯২তম অ্যাসল্ট ব্রিগেডসহ ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিভিন্ন দল যুক্ত হয়।
উদ্ধার পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ‘অ্যালেক্স’ ছদ্মনামের এক কর্মকর্তা জানান, ড্রোনের হুমকির কারণে পিকআপ ট্রাক বা সাঁজোয়া যান দিয়ে আহত সেনাদের উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
বিকল্প হিসেবে চালকবিহীন স্থলযান পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছানোর পথে এমন দুটি যানই রুশ ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে তাঁকে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে কর্মকর্তারা গুরজুফ ডিফেন্স নামের একটি স্থানীয় কোম্পানির তৈরি ভারী ড্রোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। ছয়টি খাড়া পাখা ও কালো কাঠামোর এই ড্রোনটি দেখতে বিশাল পোকার মতো। এটি সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে ৯০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে।
কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, দীর্ঘদিন যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকার পর ভ্লাসেনকোর ওজন প্রায় ৭০ কেজি। ফলে তাঁকে ড্রোনে ঝুলিয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।
তবে ঝুঁকি ছিল বড়। ইউক্রেনের ভারী ড্রোনগুলো প্রায়ই রাশিয়ার ছোট ড্রোনের হামলার শিকার হয়। এসব ড্রোনে থাকা ক্যামেরার মাধ্যমে চালকেরা দূর থেকে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
অবশেষে মৃত্যুপুরী থেকে উদ্ধার
অক্টোবরের শুরুতে ভ্লাসেনকো নিয়মিত সরবরাহের একটি প্যাকেটে অপ্রত্যাশিত কিছু জিনিস পান। সেখানে ছিল একটি নিরাপত্তা বেল্ট এবং উদ্ধার অভিযানের নির্দেশনাসংবলিত ভিডিও রাখা একটি ফোন।
ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতে পারলেও ভ্লাসেনকো জানতেন, বেঁচে ফেরার জন্য এটাই তার সবচেয়ে বড় সুযোগ।
৪ অক্টোবর ছয় পাখার ভারী ড্রোনটি তার কাছে পৌঁছায়। ড্রোনের সঙ্গে ঝুলে থাকা একটি ধাতব সংযোগের হুকে নিজেকে আটকে নেন তিনি। এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার ওপরে তুলে নেয়। অভিযানের সময় তিনটি ছোট ড্রোন ভারী ড্রোনটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়, যাতে রুশ ড্রোনগুলো সহজে হামলা চালাতে না পারে। শত্রুপক্ষের ড্রোনের অবস্থানে হামলা চালাতে ইউক্রেনের চারটি ছোট ড্রোন, গোলন্দাজ বাহিনী এবং বড় ডানাযুক্ত ড্রোনও অংশ নেয়। এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অভিযান চালানো হয়।
টানটান উত্তেজনার মধ্যে প্রায় ১৫ মিনিটের উড্ডয়ন শেষে উদ্ধারকারী ড্রোনটি গন্তব্যে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী উদ্ধারস্থলের সঠিক অবস্থান প্রকাশ করেনি।
দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরলেও যাত্রাপথে ভয় একেবারে কাটেনি ভ্লাসেনকোর। তবে তার ভয় ছিল ড্রোন থেকে পড়ে যাওয়া নিয়ে নয়, বরং পানিতে পড়ে যাওয়া নিয়ে।
তিনি বলেন, ‘আমি নিচে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম না। ধরুন, বনের মধ্যে কোথাও পড়ে গেলে আমার ভয় লাগত না।’ এরপর নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে আমি পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ, আমি সাঁতার জানি না।’
যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা, সহযোদ্ধাকে হারানো, নিজের দুই পা হারিয়েও বেঁচে থাকার লড়াই-সবকিছুর পর শেষ পর্যন্ত ড্রোনের সাহায্যে মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে আসেন ভ্লাসেনকো।
ছবি : সংগৃহীত
ভালোবাসার সাধারণ এক আলিঙ্গন যে শেষ পর্যন্ত হাড় ভাঙার কারণ হতে পারে, তা হয়তো কল্পনাও করেননি চীনের এক দম্পতি। স্বামীর মৃদু জড়িয়ে ধরাতেই ভেঙে গেছে স্ত্রীর পাঁচটি পাঁজর, ফাটল ধরেছে আরও একটিতে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তোলা এ ঘটনার পর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় জানা গেছে, ওই নারী তীব্র ‘অস্টিওপোরোসিস’ বা হাড়ক্ষয় রোগে ভুগছিলেন।
চীনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘জিংসি লাইভ’-এর বরাতে জানা যায়, শীত লাগছে জানানোয় স্ত্রীকে উষ্ণতা দিতে জড়িয়ে ধরেছিলেন ওয়াং পদবির ওই ব্যক্তি।
তবে আলিঙ্গনের মুহূর্তেই হাড় ভেঙে যাওয়ার শব্দ শুনতে পান তিনি। ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়ে স্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে মাটিতে বসে পড়েন।
স্বামীর দাবি, তিনি কোনো অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেননি; স্বাভাবিকভাবেই স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। বিষয়টি যে এতটাই গুরুতর রূপ নিতে পারে, তা আঁচ করতে পারেননি ওই দম্পতি। ফলে সারা রাত অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে পরদিন সকালে তারা হাসপাতালে যান। সেখানে বুকের সিটি স্ক্যান করার পর চিকিৎসকেরা দেখতে পান, তার পাঁচটি পাঁজর ভেঙে গেছে এবং ষষ্ঠ পাঁজরে চিড় (হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার) ধরেছে।
চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াং জানান, তার স্ত্রীর হাড় অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ার মূল কারণ অস্টিওপোরোসিস।
তিনি জানান, ৪৫ থেকে ৫০ কেজি ওজনের তার স্ত্রী মাত্রাতিরিক্ত ডায়েট করতেন এবং প্রায়ই রাতের খাবার বাদ দিতেন। এ ছাড়া তিনি সূর্যালোকের সংস্পর্শেও আসতেন না বললেই চলে। বাসা থেকে মাত্র দুই-তিন মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত পারিবারিক দোকানেই তার বেশির ভাগ সময় কাটত।
উহান এশিয়া হার্ট জেনারেল হাসপাতালের অস্থিশল্য বিশেষজ্ঞ (অর্থোপেডিক ফিজিশিয়ান) ইয়ান ইয়ানসিয়াং বলেন, সাধারণত তরুণ বয়সে শুধু আলিঙ্গনের চাপে পাঁজর ভেঙে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ব্যক্তির অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার সঙ্গে হাড়ের এই অস্বাভাবিক দুর্বলতার গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
তিনি আরও জানান, পাঁজরের এই ধরনের ভাঙনে ফুসফুস বা ফুসফুসের পর্দায় কোনো জটিলতা তৈরি না হলে সচরাচর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে না। সে কারণে চিকিৎসকেরা ওই নারীকে কোনো অস্ত্রোপচার না দিয়ে ওষুধ, বিশেষ প্যাচ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের মাধ্যমে নিরাময়ের পরামর্শ দিয়েছেন।
বিক্ষোভ ফের দানা বাঁধছে ফ্রান্সে
গত সপ্তাহে কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম দাঙ্গার পর শনিবার আবারও দেশজুড়ে বিক্ষোভের আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এরপরও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থী, শ্রমিক ইউনিয়ন ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে দ্বিতীয় দফায় এ বিক্ষোভের আয়োজন করা হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গার ব্যাপকতা আগে থেকে আঁচ করতে না পারায় সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা উঠেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, ‘আমরা কোনো কিছুই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেব না।’
তিনি আরও বলেন, ভাঙচুরকারী, লুটপাটকারী ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিকল্পিত বিক্ষোভের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র বামপন্থীদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সহিংসতার আহ্বানও দেখা গেছে বলে জানান তিনি।
গত কয়েক দিনে দ্রুত বিচার কার্যক্রমের মাধ্যমে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় কয়েক শ মানুষকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আজ শনিবারের বিক্ষোভের আগে শুক্রবার শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ।
শিক্ষার্থী নেতারা জানান, তাদের সঙ্গে আলোচনায় মাখোঁ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে মাখোঁ ঘোষণা দেন, শনিবার কেবল স্বীকৃত শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভই অনুমোদন পাবে। লিওঁ, নিস ও মনপেলিয়েরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে সব ধরনের সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ বিক্ষোভের আয়োজকদের নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। দেশজুড়ে ছোট-বড় শত শত বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গত সপ্তাহের সহিংসতার পর ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছিল। রাজধানী প্যারিসের কিছু এলাকাও এর আওতায় ছিল। এখনো শহরভেদে বিক্ষোভের অনুমতি ও নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে।
কিছু শহরের মেয়র ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও অন্যরা কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছেন। যেমন মার্সেইয়ে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার আগের নির্দেশ দ্রুত প্রত্যাহার করে শ্রমিক ইউনিয়নের আয়োজিত মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
প্যারিসে শিক্ষার্থী ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমর্থনে আয়োজিত একটি মিছিলকে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা এড়িয়ে নির্ধারিত পথে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নতুন করে সহিংসতা ও লুটপাটের আশঙ্কায় প্রস্তুতি চলছে।
আজ শনিবার ল্যুভর, ওরসে ও পিকাসো জাদুঘর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফুটবল ক্লাব প্যারিস সাঁ জারমাঁর (পিএসজি) নির্ধারিত ঘরের মাঠের ম্যাচও সোমবারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য লুটপাট ঠেকাতে বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের দোকানের জানালায় কাঠের পাটাতন লাগিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমে বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। আজ শনিবার দেশজুড়ে পুনরুজ্জীবিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকদেরও ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যেতে পারে।
মাখোঁর প্রথম মেয়াদে এই আন্দোলন ফ্রান্সজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও জনজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল। আন্দোলনটিতে বাম ও ডান-উভয় ধারার সমর্থকেরাই যুক্ত হয়েছিলেন।
গোষ্ঠীটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইটে শনিবারের জন্য ৫০০টির বেশি বিক্ষোভ এবং আরও প্রায় ২০০টি কর্মসূচির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকে মাখোঁর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।
অনলাইনে দেওয়া আহ্বানে আন্দোলনকারীরা ১৭ অক্টোবরের সহিংসতা নিয়ে চলা নিন্দার স্রোতে নিজেদের যুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলেছে তারা।
গত সপ্তাহের অস্থিরতার রেশ এখনো কাটেনি ফ্রান্সে। সে সময় বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গাকারীদের তুলনায় পুলিশ সদস্যের সংখ্যা অনেক জায়গায় কম ছিল। বিভিন্ন দোকানে লুটপাট এবং ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরের ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি ঐতিহাসিক টাউন হল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ছিল এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
শুক্রবার বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন জানান, ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২৩২ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ২৬০ জনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
লুটপাট কিংবা পুলিশকে আক্রমণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি চেয়ে আবেদন করতে কৌঁসুলিদের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারমন্ত্রী। এসব শাস্তির মধ্যে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ভোটাধিকার প্রত্যাহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বাধা দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও বেড়েছে
তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন দেশ কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ লুইজিয়ানার একটি শোধনাগারে সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত মজুত থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিনিময়ের অনুমোদন দিয়েছে। জার্মানিও কৌশলগত মজুত থেকে ডিজেল, হিটিং অয়েল ও অপরিশোধিত তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে।
এ ছাড়া লিবিয়ার দুটি তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে তেল নেওয়ার পাইপলাইনের একটি ভালভ বন্ধ থাকায় উৎপাদন কমেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডিজেলের দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়া থেকে ডিজেলবাহী একটি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের দিকে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলারের বেশি বেড়ে ১১৬ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গতকাল শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) লেনদেন শেষে অপরিশোধিত তেলের দামের এই বৃদ্ধি দেখা যায়। সৌদি আরবে হুতিদের হামলা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর এ মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলার ৫৫ সেন্ট বা ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ১১৬ ডলার ৭২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। ২৯ এপ্রিলের পর এটি সর্বোচ্চ দাম। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৩ ডলার ৮০ সেন্ট বা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১০৩ ডলার ২৭ সেন্ট। সপ্তাহজুড়ে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ, আর ডব্লিউটিআইয়ের ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
এলপিএল ফাইন্যান্সিয়ালের প্রধান কৌশলবিদ অ্যাডাম টার্নকুইস্ট বলেন, সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থানে ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলার পর সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। এতে তেলের বাজারে দাম বাড়ছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল কুয়াইন উপকূলে একটি জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর জানিয়েছে দেশটির পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে কী কারণে তেল ছড়িয়েছে এবং কোন জাহাজ থেকে তা ঘটেছে, তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
গত ৯ অক্টোবর আমিরাতের আল জাজিরা এলাকার পশ্চিমে একটি অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানার পর ‘জেম নম্বর ২’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলেও জানিয়েছে জাহাজ চলাচল-সংশ্লিষ্ট সূত্র।
তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন দেশ কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ লুইজিয়ানার একটি শোধনাগারে সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত মজুত থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিনিময়ের অনুমোদন দিয়েছে। জার্মানিও কৌশলগত মজুত থেকে ডিজেল, হিটিং অয়েল ও অপরিশোধিত তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে।
এ ছাড়া লিবিয়ার দুটি তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে তেল নেওয়ার পাইপলাইনের একটি ভালভ বন্ধ থাকায় উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডিজেলের দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়া থেকে ডিজেলবাহী একটি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের দিকে যাচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
করোনাভাইরাসের আতঙ্কের দাগ মানুষের মন থেকে পুরোপুরি কেটে যাওয়ার আগেই বিশ্বজুড়ে নতুন এক ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবাদি পশুর শরীরে সংক্রমণ ঘটানো ‘শামোন্ডা ভাইরাস’ এবার মানুষের শরীরেও শনাক্ত হয়েছে।
ফ্রান্সে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়ার ঘটনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য মহলে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
প্রশ্ন উঠেছে- গবাদি পশুর এই ভাইরাসটি কি মানুষের জন্য ভয়াবহ কোনো মহামারির রূপ নিতে পারে?
কী এই শামোন্ডা ভাইরাস?
শামোন্ডা ভাইরাস মূলত ‘অর্থোবুনিয়াভাইরাস’ গোত্রের একটি কীটপতঙ্গবাহিত ভাইরাস, যা সিম্বু সেরোগ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৬০-এর দশকে নাইজেরিয়ার একটি খামারে গবাদি পশুর শরীরে প্রথমবারের মতো এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছিল।
দীর্ঘ সময় ধরে এটি প্রধানত আফ্রিকা, এশিয়া এবং সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গরু, ছাগল, ভেড়া ও ঘোড়ার মতো পশুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
সাধারণত মশা বা রক্তচোষা ক্ষুদ্র পতঙ্গের কামড়ের মাধ্যমে পশুর শরীরে এই ভাইরাস ছড়ায়। পশুর শরীরে এর সংক্রমণে উচ্চ জ্বর, তীব্র ডায়রিয়া, ক্ষুধামন্দা, দুধ উৎপাদন হঠাৎ কমে যাওয়া এবং গর্ভপাত বা জন্মগত ত্রুটির মতো প্রজননজনিত মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়।
মানুষের শরীরে সংক্রমণ ও ফ্রান্সের ঘটনা
ইতিহাসে এই প্রথম ফ্রান্সে কোনো মানুষের শরীরে শামোন্ডা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ষাটোর্ধ্ব ওই ব্যক্তি আগে থেকেই গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতায় বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হীনতায় ভুগছিলেন।
মৃত্যুর আগে তার মস্তিষ্কে যে জটিলতা দেখা দিয়েছিল, তার পেছনে এই ভাইরাসের সংযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওই ব্যক্তির শরীরে কিভাবে ভাইরাসটি প্রবেশ করল, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না গবেষকরা। প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে, আক্রান্ত কোনো পোকা বা মশার কামড়েই তার শরীরে এই সংক্রমণ ঘটে থাকতে পারে।
করোনার চেয়েও কি ভয়ংকর?
শামোন্ডা ভাইরাস মানুষের শরীরে শনাক্ত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়লেও, এটিকে করোনাভাইরাসের মতো অতিমারি বা মহামারির সঙ্গে তুলনা করার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাভাইরাস যেভাবে খুব দ্রুত এক মানুষের দেহ থেকে অন্য মানুষের দেহে বায়ুবাহিত উপায়ে বা সংস্পর্শে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম ছিল, শামোন্ডা ভাইরাসের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।
এটি মূলত পশুবাহিত রোগ এবং পতঙ্গের কামড়ে ছড়ায়। এখন পর্যন্ত মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস সংক্রমণের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আতঙ্কিত না হয়ে এটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ও বিরল ঘটনা হিসেবেই দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বজুড়ে কেন সতর্কতা?
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সম্প্রতি গবাদি পশুর মধ্যে শামোন্ডা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের শরীরে এর প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ও ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (ইসিডিসি) পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ঠিক কীভাবে প্রভাবিত করে এবং এর প্রকৃত ঝুঁকি কতখানি তা নির্ধারণে আরও ব্যাপক গবেষণা ও ডেটা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তবে এখনই একে নিয়ে প্যানিক বা অতিরিক্ত ভয়ের কোনো কারণ নেই বলে মনে করছেন তারা।