ইরানের সরকার রাজনৈতিক বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় দেশটির প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার হোয়াইট হাউজ ছাড়ার প্রাক্কালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই বিরল প্রতিক্রিয়া জানান।
ফ্লোরিডার পাম বিচে নিজের মার-এ-লাগো রিসোর্টে সপ্তাহান্তের ছুটি কাটাতে যাওয়ার সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “ইরান ৮০০-এর বেশি মানুষের ফাঁসি বাতিল করেছে।” ট্রাম্প আরও যোগ করেন, “তাদের এই সিদ্ধান্তকে আমি অত্যন্ত সম্মান জানাই।”
রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও ইরানের এই সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি জানান, ইরানে ৮০০-র বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা ছিল, যা এখন আর হচ্ছে না।
পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, “ধন্যবাদ”
ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ চলাকালে দেশটির সরকার যদি গণহারে মানুষ হত্যা শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সামরিক হামলা চালাতে পারে, ট্রাম্পের এমন হুঁশিয়ারির কয়েক দিন পরই তার এই ইতিবাচক মন্তব্য সামনে এলো।
যদিও বর্তমানে ইরানে সেই বিক্ষোভের রেশ অনেকটা কমে এসেছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ইরানে চলমান বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে এটিই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ইরান মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা আপাতত কমে আসছে।
ইরানের বর্তমান জটিল পরিস্থিতির সঙ্গে প্রেসিডেন্টের এই ইতিবাচক মূল্যায়নের তেমন সামঞ্জস্য দেখা যায়নি। তা সত্ত্বেও, তার এই বক্তব্য এটিই প্রমাণ করে যে—দেশটিতে মার্কিন হামলা আসন্ন বলে তিনি আগে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা থেকে তিনি এখন সরে আসছেন।
এর আগে ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, “সাহায্য আসছে।”
তবে শুক্রবার যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে সেই প্রতিশ্রুতি এখনও বহাল আছে কি না, তখন তিনি উত্তর দেন, “দেখা যাক কী হয়।”
আরব এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের চাপে কি তিনি ইরান হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন— সাংবাদিকদের এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “কেউ আমাকে বোঝায়নি। আমি নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “গতকাল ৮০০ জনেরও বেশি মানুষের ফাঁসি কার্যকর করার কথা ছিল। তারা কাউকে ফাঁসি দেয়নি। তারা এই মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে এবং বিষয়টি (আমার ওপর) বড় প্রভাব ফেলেছে।”
তবে ইরান সরকারের কার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তিনি এই ফাঁসি বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন, সে ব্যাপারে ট্রাম্প পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, একদিকে ট্রাম্প যখন ইরানের প্রশংসা করছেন, অন্যদিকে কঠোর দমনের মাধ্যমে দেশটিতে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করে বিক্ষোভ স্তিমিত করার অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর নড়বড়ে অর্থনীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরবর্তীতে দেশটির ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি আন্দোলনে রূপ নেয়। তবে বর্তমানে সেই অস্থিরতা থেমে গেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরে রাজধানী তেহরানে কোনো বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। সেখানে কেনাকাটা ও জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। যদিও সপ্তাহব্যাপী চলা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি এখনও অব্যাহত রয়েছে।
দেশটির অন্যান্য স্থানেও নতুন করে কোনো সহিংসতার খবর জানায়নি কর্তৃপক্ষ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি’ শুক্রবার জানিয়েছে, বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৭৯৭ জনে দাঁড়িয়েছে এবং এই সংখ্যা এখনও বাড়ছে।
এদিকে, ইরানের নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দেওয়া হস্তক্ষেপের প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানিয়েছেন। পাহলভি আশা প্রকাশ করেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবেন না।
ছবি : সংগৃহীত
ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলনের মধ্যে সরকারের সঙ্গে বৈঠকেও নিজেদের প্রধান দাবি থেকে সরে আসেনি ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনটি জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি ‘আলোচনার অযোগ্য’ এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় সিজেপি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানিয়েছে দ্য হিন্দু। সরকারের পক্ষে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং অংশ নেন। সিজেপির প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আরেক তরুণ প্রতিনিধি।
বৈঠক শেষে সৌরভ দাস বলেন, তারা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি নিয়ে কোনো আপস হবে না।
তিনি আরও জানান, আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব এফআইআর প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়েছে।
সিজেপির এক প্রতিনিধি বলেন, সরকার মৃত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়া তারা কিছু মেনে নেবেন না। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বৈঠক শেষে জে পি নাড্ডা জানান, উভয় পক্ষের মধ্যে শনিবার আবারও আলোচনা হবে।
দ্য হিন্দু বলছে, এটি সিজেপি ও সরকারের মধ্যে তৃতীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠক।
গত ২০ জুলাই দিল্লিতে পার্লামেন্টমুখী মিছিলে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) পেলেট গান ব্যবহার করেছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) জানিয়েছে, তারা এ-সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন যাচাই করছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইন প্রণয়নের ঘোষণা দিলেও সিজেপির অবস্থান, পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনায় সরকারের সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ হওয়া উচিত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অপসারণ করা।
এদিকে সরকারের আশ্বাস পাওয়ার পর শিক্ষাবিদ ও জলবায়ু অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক তার ২৬ দিনের অনশন শেষ করলেও সিজেপি জানিয়েছে, তাদের আন্দোলন দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত চলবে।
হরমুজ প্রণালি
যুদ্ধের পরিণতি অনেক সময় তার শুরুর লক্ষ্য থেকে ভিন্ন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
শুরুতে এই যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল কখনও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, কখনও আবার ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা। কিন্তু প্রায় ছয় মাস পর যুদ্ধটি ভিন্ন এক রূপ নিয়েছে। এর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এখন দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের নির্ধারিত শর্তে চলাচল না করলে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানাতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে।
বর্তমান বাস্তবতায় মূল প্রশ্ন একটাই– হরমুজ প্রণালি কি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবেই থাকবে, নাকি কে কখন এবং কী শর্তে এই পথ ব্যবহার করবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা ইরানের হাতে চলে যাবে? যদি এমনটি ঘটে, তাহলে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার ট্রানজিট ফি আদায়ের পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও ইরানের হাতে চলে যেতে পারে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের প্রায় সব জ্বালানি রপ্তানির প্রধান পথ ছিল এটি। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি রপ্তানিরও গুরুত্বপূর্ণ রুট ছিল হরমুজ। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এমন একটি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে, যেখানে হরমুজ নিয়মিত বন্ধ থাকতে পারে অথবা বাণিজ্যিকভাবে অনির্ভরযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। তাই একক একটি প্রণালির ওপর নির্ভর না করে একাধিক বিকল্প রপ্তানি পথ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সৌদি আরব তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগর উপকূল পর্যন্ত দেশের ভেতর দিয়ে একটি পূর্ব-পশ্চিম (ইস্ট-ওয়েস্ট) পাইপলাইন নির্মাণে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সাম্প্রতিক সংকটের সময় এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হচ্ছে। সৌদি আরব ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ পাইপলাইনটির সক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
হরমুজের দক্ষিণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দর ও পাইপলাইন রয়েছে, যার মাধ্যমে বর্তমানে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৮ লাখ ব্যারেল তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়। দেশটি ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ এই সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ৩৬ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার জন্য সম্প্রসারণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
গত সপ্তাহে ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী হোয়াইট হাউস সফর করেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। সিরিয়ার সঙ্গে সমন্বয়ে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাইপলাইন পুনরায় চালু করা এবং নতুন পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে ইরাক ও কুয়েতের তেল ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে রপ্তানির ব্যবস্থা করা হবে।
ইরাকের পরিকল্পনার মধ্যে কিরকুক থেকে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর জেইহান পর্যন্ত বিদ্যমান পাইপলাইনটির সংস্কারও রয়েছে। জর্ডানে নতুন একটি তেল পাইপলাইন নির্মাণ পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে ইরাক সরকার। এই পাইপলাইন বসরা থেকে পশ্চিম ইরাকের হাদিথা পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে একটি শাখা লাইন জর্ডানের আকাবা বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর পর লোহিত সাগর হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি করা হবে।
বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিদ্যমান এবং নির্মাণাধীন বিকল্প রুটগুলো ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ হরমুজ দিয়ে সাধারণত যে পরিমাণ তেল পরিবহন হয়, তার প্রায় ৬০ শতাংশ বহন করতে সক্ষম হবে।
সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসছে সিজেপি
অনশন ও রাজপথের উত্তাল প্রতিবাদের মুখে অবশেষে আন্দোলনকারী তরুণদের দাবি মেনে নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অনুরোধের পর শুক্রবার (২৪ জুলাই) কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়াতে দুপক্ষ বৈঠকে বসেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো না হলেও আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলো পূরণে সরকারের আশ্বাসের পর বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) গভীর রাতে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক তাঁর ২৬ দিনের অনশন ভঙ্গ করেন।
স্থানীয় সময় আজ শুক্রবার দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে নিরপেক্ষ পরিবেশে এই বৈঠকটি শুরু হয়। সরকারের এমন নমনীয় মনোভাব এবং নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনার প্রস্তাব মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে সিজেপি।
সংগঠনটির জাতীয় মুখপাত্র সৌরভ দাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি আলোচনার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে একটি নিরপেক্ষ স্থানে বৈঠক করার অনুরোধে সরকার শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে এবং আলোচনার জন্য কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে। আশা করি সরকার খোলা মনে আলোচনায় আসবে এবং আন্দোলনরত তরুণদের কথা শুনবে।’
এর আগে সরকারের মন্ত্রী ভবন বা তাদের দাপ্তরিক কার্যালয়ে বৈঠকের সব ধরনের আমন্ত্রণ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিল সিজেপি। সরকারের সঙ্গে যেকোনো পরবর্তী আলোচনার জন্য নিরপেক্ষ স্থান নির্ধারণের বিষয়ে তারা অনড় ছিলেন।
এর আগে গত ২০ জুলাই দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেদিন সিজেপির দুই শীর্ষ প্রতিনিধি সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার বাসভবনে সাক্ষাৎ করতে যান।
পরে অভিযোগ ওঠে, মন্ত্রী ভবন চত্বরে বৈঠক চলাকালীন তাদের প্রায় বন্দি করে রাখা হয়েছিল। ওই অভিজ্ঞতার পর থেকেই আন্দোলনকারীরা সরকারের যেকোনো দাপ্তরিক ভবনের বদলে নিরপেক্ষ স্থানকে প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে আনেন।
এদিকে সিজেপি আরও জানিয়েছে, দেশের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে তাদের গণপ্রতিবাদ কর্মসূচি থামবে না।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পাশাপাশি তাদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে অনিয়মের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং আন্দোলনের কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ আরও তীব্র হচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে হওয়া এই আন্দোলনে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমা চাইতে বলেছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
ফেসবুকে মোদি জানান, যারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে দেওয়া ওই বার্তায় মোদি আরও লেখেন, ‘যারা আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চায়, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
৬ সপ্তাহে সর্বোচ্চ তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এখন ১০০ ডলারের কাছাকাছি চলে গেছে।
আজ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৮৮ ডলার অতিক্রম করেছে।
আজ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৯৩ ডলার বা ২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৪১ ডলার বা ১ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়েছে। খবর রয়টার্স ও টাইমস অব ইন্ডিয়া।
গতকাল তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। ফলে ব্রেন্টের দাম ৮ জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। এর মধ্যে লোহিত সাগরে তেলবাহী ট্যাংকারে নতুন হামলার ঘটনায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের দিকে বাজার সব সময় নজর রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা ১২তম রাতে ইরানে হামলা চালানোর পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান যখনই কোনো জাহাজে হামলা করবে, তখনই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কোনো সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবে। তাঁর এ মন্তব্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়বে, এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে মাইন পাতা আছে- এমন পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বিস্ফোরণে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। তাদের ভাষ্য, ওই ঘটনার পর আরও দুটি ট্যাংকার যাত্রাপথ থেকে ফিরে যায়।
আইআরজিসি আরও বলেছে, এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযান চলাকালে হরমুজ প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। এই প্রণালি এখন পুরোপুরি বন্ধ। ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো ট্যাংকার প্রণালিতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হতে দেওয়া হবে না বলেও তারা সতর্ক করেছে। এদিকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে অভিযান আরও জোরদার করায় সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কা বেড়েছে।
হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল বহনকারী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে। তাদের দাবি, সামরিক অভিযানে তারা সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা করেছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি পতাকাবাহী ট্যাংকার এনসেলিয়া লোহিত সাগরে হামলার শিকার হয়েছে।
এ ছাড়া হুতিদের দাবি, সৌদি বন্দরের দিকে যেতে নিষেধ করে সতর্কবার্তা দেওয়ার পর প্রায় ১০টি জাহাজ ফিরে গেছে। তবে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এসব ঘটনায় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই নৌপথ-হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালি-দিয়ে তেল পরিবহন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আইআরজিসির এক মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) শিপিং কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাঞ্চলে মাইন পাতা আছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অকার্যকর ঘোষণার পর এবার তেলের দাম এখনো ১০০ ডলারের নিচেই আছে। যদিও প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত আছে।
এর আগে তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে উঠেছিল, এখন দাম তার চেয়ে ৩০ ডলার কম।
শাহবাজ শরিফ, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আসিম মুনির
অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা সুবিধা চেয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। দেশটির অর্থনীতি চাঙ্গা করতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের মেয়াদে এই সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার (২২ জুলাই) রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের এই অনুরোধ এমন সময় এসেছে, যখন দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান সহায়তা কর্মসূচির অধীনে অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের সময় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করায় ইসলামাবাদের কূটনৈতিক অবস্থানও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে দেশটি।
অনুমোদন মিললে এই তহবিল পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে, রুপির ওপর চাপ কমাতে এবং বহুপাক্ষিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসে সহায়ক হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র বা পাকিস্তান। তবে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব জানান, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতির ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বৈঠকে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে সহজ প্রবেশাধিকার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং দেশের সার্বভৌম ঋণমান উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সহযোগিতা চেয়েছেন আওরঙ্গজেব। পাশাপাশি দুই দেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৌশলগত প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বর্তমানে পাকিস্তান ৭ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এই কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী কর বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করছে দেশটি। ২০২৩ সালে সার্বভৌম ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে পাকিস্তান প্রথমে ৩ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ স্ট্যান্ডবাই ঋণ পায়।
পরে আরও ৭ বিলিয়ন ডলারের ‘এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি’ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অতিরিক্ত ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদিত হয়।
তবুও পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনো মূলত আইএমএফের অর্থছাড়, দ্বিপক্ষীয় সহায়তা এবং চীন ও সৌদি আরবের মতো অংশীদারদের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের জানুয়ারিতে জানিয়েছিল, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
উল্লেখ্য, মুদ্রা স্থিতিশীলতা সহায়তা সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’-এর মাধ্যমে দেওয়া বিশেষ আর্থিক ব্যবস্থা। এর আওতায় ডলার সহায়তা, মুদ্রা বিনিময় চুক্তি বা গ্যারান্টির মাধ্যমে কোনো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করা হয়।
রয়টার্স জানিয়েছে, এ ধরনের সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থায়ী ডলার সোয়াপ লাইনের বাইরে একটি পৃথক ব্যবস্থা। ২০২৫ সালে আর্জেন্টিনাকে দেওয়া সহায়তার আগে সর্বশেষ বড় ধরনের এমন প্যাকেজ ২০০২ সালে উরুগুয়েকে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া মেক্সিকোর সঙ্গে ১৯৪০-এর দশক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা রয়েছে।