মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে এক বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, আমরা না থাকলে, এখন তোমরা সবাই জার্মান ভাষায় কথা বলতে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মান ভাষাই সুইজারল্যান্ডের চারটি সরকারি ভাষার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে ব্রাসেলস থেকে বার্লিন ও প্যারিসসহ ইউরোপের বহু রাজধানীতে তার এই বক্তব্যকে অপমানজনক, আধিপত্যবাদী ও তথ্যগতভাবে ভুল বলে মনে করা হচ্ছে।
ভাষণে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, ইউরোপ ভুল পথে এগোচ্ছে। এই বক্তব্য তিনি আগেও বহুবার দিয়েছেন। তবে ইউরোপের মাটিতে দাঁড়িয়ে মিত্র ও বন্ধুদেশগুলোর সামনে এমন মন্তব্যের ফলে ভিন্ন ও আরও তীব্র প্রভাব পড়তে পারে।
ফোরাম শেষে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি ইউরোপের আটটি দেশের ওপর আরোপের হুমকি দেওয়া নতুন শুল্ক প্রত্যাহার করছেন। তিনি বলেন, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর গ্রিনল্যান্ড ও পুরো আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে একটি ‘চুক্তির কাঠামো’ তৈরি হয়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা কীভাবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর সরাসরি মালিকানার ট্রাম্পের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে, তা স্পষ্ট নয়। তার প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ শুল্ক আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লক্কে রাসমুসেন কোপেনহেগেনে সাংবাদিকদের বলেন, এই ভাষণের পর পরিষ্কার যে প্রেসিডেন্টের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখনও অটুট। তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার না করার বক্তব্যকে আলাদাভাবে ‘ইতিবাচক’ বললেও সামগ্রিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ন্যাটোর এক মুখপাত্র জানান, ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চলবে। এর লক্ষ্য হবে গ্রিনল্যান্ডে রাশিয়া ও চীনের কোনো ধরনের অর্থনৈতিক বা সামরিক উপস্থিতি ঠেকানো। তবে আলোচনার সময়সূচি বা স্থান এখনও নির্ধারিত হয়নি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই আলোচনায় অংশ নিতে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং দূত স্টিভ উইটকফকে দায়িত্ব দিয়েছেন।
এর আগে দাভোসে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে না। অনেকে মনে করেছিল আমি শক্তি প্রয়োগ করব, কিন্তু আমি তা করব না। আমি বলপ্রয়োগ চাই না।
ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দুই মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় একদিনের উত্থান ঘটেছে। তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা বলছেন, ট্রাম্পের সুর নরম হওয়ায় উত্তেজনা কিছুটা কমলেও গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মূল বিরোধ এখনো মীমাংসিত হয়নি। গ্রিনল্যান্ডের সরকার এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
গতকাল বুধবার বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।
বক্তব্যে গ্রিনল্যান্ডের ইতিহাস বিকৃত করে কথা বলেছেন ট্রাম্প। তিনি পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোকে আক্রমণ করেছেন এবং অর্থনীতি ও নিজের রেকর্ড নিয়ে পুরোনো কিছু মিথ্যা তথ্যের পুনরাবৃত্তি করেছেন।
এখানে ট্রাম্পের বক্তব্যের তথ্য-যাচাই তুলে ধরা হলো।
ট্রাম্প যা বলেছেন
‘যুদ্ধের পর আমরা ডেনমার্কের কাছে গ্রিনল্যান্ড দ্বীপটি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। এটি অত্যন্ত বোকামি ছিল; কিন্তু আমরা তা করেছি। আমরা এটি ফিরিয়ে দিয়েছি।’
ট্রাম্পের এ বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। এখানে তিনি সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা বোঝাচ্ছিলেন; কিন্তু সেই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর সার্বভৌমত্ব বা নিয়ন্ত্রণ দেয়নি।
১৯৪১ সালে নাৎসিরা ডেনমার্ক আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ডেনিশ রাষ্ট্রদূত এ চুক্তি করেন। চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অধিকার দেওয়া হয়।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক স্টিভেন প্রেস বলেন, ‘চুক্তিটি আইনিভাবে নড়বড়ে ছিল। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ডেনিশ রাষ্ট্রদূত ছাড়া ডেনমার্ক রাষ্ট্রের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। ওই রাষ্ট্রদূত মূলত একটি নির্বাসিত সরকার হিসেবে কাজ করছিলেন।’
কোপেনহেগেনের ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মিকেল রুঞ্জ ওলেসেন বলেছেন, ওই রাষ্ট্রদূত একতরফাভাবে চুক্তিটি করলেও তিনি নিশ্চিতভাবেই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করেননি। তিনি শুধু সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অধিকার দিয়েছিলেন।
চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের কথা একাধিকবার উল্লেখ আছে। সেখানে ডেনমার্ককে দ্বীপটির মাতৃভূমি বলা হয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি স্বীকৃতি ও সম্মানের কথা পুনর্ব্যক্ত করছে।
ওলেসেন আরও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখল করার সিদ্ধান্ত নিলে ডেনমার্কের কিছুই করার থাকত না; কিন্তু এর কোনো আইনি ভিত্তি থাকত না।
অধ্যাপক স্টিভেন প্রেস বলেন, ‘ট্রাম্পের বক্তব্য তখনই সঠিক বলে গণ্য হতো, ‘যদি আমরা আন্তর্জাতিক চুক্তি বা জনমতের চেয়ে নিছক পেশিশক্তিকেই সার্বভৌমত্বের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিশ্বাস করতাম।’
কিন্তু অধ্যাপক প্রেস বলেন, ‘জোর যার মুল্লুক তার—এমন পেশিশক্তির রাজনীতির বাইরে গ্রিনল্যান্ড দখল করা কিংবা এর ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করার কোনো আইনি অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না।’
১৯৫১ সালেও তৎকালীন ট্রুম্যান প্রশাসন গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একটি সামরিক চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আবার দ্বীপটির ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়, যার বিনিময়ে তারা সেখানে কেবল সামরিক ঘাঁটি তৈরির সুযোগ পায়।
অধ্যাপক প্রেস বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বই সেখানে অতীত ও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির আইনি ভিত্তি দিয়েছে।
ট্রাম্প যা বলেছেন
‘আমি (ক্ষমতায়) আসার আগ পর্যন্ত ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর (প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির) ২ শতাংশ ব্যয় করার কথা ছিল; কিন্তু তারা তা করত না। এমনকি বেশির ভাগ দেশ কোনো অর্থ ব্যয় করত না। বলতে গেলে ন্যাটোর শতভাগ ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হতো। আমি সেটি বন্ধ করেছি। আমি বলেছি, এটা অন্যায্য। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমি ন্যাটোর দেশগুলোকে ৫ শতাংশ ব্যয় করতে রাজি করিয়েছি এবং এখন তারা তা দিচ্ছে।’
ট্রাম্পের এই দাবিও বিভ্রান্তিকর। কয়েক বছর ধরেই তিনি ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর সামরিক ব্যয়ের বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করে আসছেন। মূলত সদস্যদেশগুলো তাদের জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে সরাসরি এই জোটে অর্থ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া দেশগুলো তাদের জিডিপির একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজেদের সামরিক খাতে ব্যয় করতেও রাজি আছে।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের চাপের কারণে ন্যাটোর সাধারণ তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান কিছুটা কমেছে। আগে এই জোটের কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ দিত যুক্তরাষ্ট্র, যা ২০১৯ সালে ১৬ শতাংশে এবং এই মাসে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
২০১৪ সালে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে তাদের সামরিক ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছিল। ২০১৬ সালে ৩০টির বেশি দেশের মধ্যে মাত্র চারটি দেশ এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছিল। ২০২০ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আটটিতে।
তবে ২০২৪ সালে ১৮টি এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ৩১টি দেশ এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। ন্যাটো কর্মকর্তারা সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পকে কিছুটা কৃতিত্ব দিলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণই দেশগুলোকে ব্যয় বাড়াতে বেশি বাধ্য করেছে।
এ ছাড়া গত বছর ট্রাম্পের জোরাজুরিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিক ব্যয় ৫ শতাংশে উন্নীত করতে সদস্যদেশগুলো সম্মত হলেও ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কোনো দেশই সেই লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি।
ট্রাম্প যা বলেছেন
‘ইউরোপকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এখন রাশিয়ার কবল থেকে রক্ষা করা ছাড়া ন্যাটোর কাছ থেকে আমরা কিছুই পাইনি।’
এটি মিথ্যা। ন্যাটো তাদের ইতিহাসে মাত্র একবারই ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা’ (আর্টিকেল ৫) কার্যকর করেছিল, আর তা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে নাইন ইলেভেন হামলার পর।
ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্যদেশের ওপর আক্রমণের অর্থ তা জোটের সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধারার অধীন ন্যাটোর মিত্রদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় রাডার বিমান মোতায়েন থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরে নৌবাহিনীর টহল—সবখানেই মিত্ররা পাশে ছিল।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে যুদ্ধ করতে মিত্র দেশগুলো হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিল। শুধু ডেনমার্কই ১৮ হাজার সেনা পাঠিয়েছিল, যাদের মধ্যে ২০০২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ৪৩ জন নিহত হন।
ট্রাম্পের অন্যান্য মিথ্যা দাবি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও কিছু ভুল ও ভিত্তিহীন দাবি করেছেন, যা ইতিপূর্বে নিউইয়র্ক টাইমস যাচাই করেছে—
১. ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে এসেছেন, যা সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে এই অঙ্ক তাঁর নিজের হোয়াইট হাউসের হিসাবের চেয়েও দ্বিগুণ এবং এর বড় অংশই কেবল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ‘প্রতিশ্রুতি’, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
২. ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত গ্রীষ্মে তাঁর স্বাক্ষরিত রিপাবলিকান কর ও অভ্যন্তরীণ নীতি বিলে ‘সামাজিক নিরাপত্তার ওপর কোনো কর রাখা হয়নি’। এটি বিভ্রান্তিকর। কারণ, ওই আইনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা আয়ের ওপর কর কিছুটা কমানো হলেও তা পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হয়নি।
৩. ট্রাম্পের দাবি, চীনে কোনো বায়ুকল নেই। অথচ বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে চীনের সবচেয়ে বেশি বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।
৪. জো বাইডেনের প্রশাসন ইউক্রেনকে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। তবে সরকারি ও স্বতন্ত্র বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃত অঙ্কটি ট্রাম্পের দাবি করা অর্থের প্রায় অর্ধেক।
৫. ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন বলে দাবি করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং অন্যগুলোতে এখনো যুদ্ধ থামেনি।
৬. ট্রাম্প দাবি করেন, বাজারে মুদিপণ্যের দাম ‘কমে আসছে’। অথচ বাস্তবে এখনো নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।
৭. ট্রাম্প বলেছেন, ওষুধের দাম ৫০০ থেকে ৮০০ শতাংশ এমনকি ২০০০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সরকারি ও স্বতন্ত্র পরিসংখ্যান বলছে, ওষুধের দাম উল্টো বেড়েছে।
৮. বাইডেন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে ১১ হাজার ৮৮৮ জন খুনিকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে বলে ট্রাম্প দাবি করেছেন। তাঁর এ দাবি ভুল ও বিভ্রান্তিকর। এই সংখ্যার মধ্যে এমন অভিবাসীও রয়েছেন, যাঁরা ৪০ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে দেশটিতে ঢুকেছেন।
৯. কোনো প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প দাবি করেছেন, জাহাজে তাঁর সামরিক হামলার ফলে সমুদ্রপথে মাদক পাচার ৯৭ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনটি ঘটার কোনো আশঙ্কা নেই।
ছবি: সংগৃহীত
হরমুজে ৭ জাহাজে মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি ইরানের। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে সাতটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এই জলপথে জাহাজ চলাচলে সহায়তা অব্যাহত রাখলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার রাতভর হামলার শিকার হওয়া সাতটি জাহাজের মধ্যে চারটি থেকে তেল স্থানান্তরের কাজ চলছিল। হামলার পর জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। অন্য তিনটি জাহাজ মাইনে আঘাত হানার পর চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে বলে দাবি করেছে ইরান। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হামলায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর কোন দেশের পতাকা ছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি। তাদের বক্তব্য, ওয়াশিংটন যদি প্রণালির অন্যান্য অংশ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে সহায়তা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংঘাত এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।’ এটিকে তারা গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই জলপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
কিম জং উন। ছবি: সংগৃহীত
সীমান্তের নতুন সেতু অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন চীনের দানদং শহরে অত্যন্ত গোপনে এক ঝটিকা সফর সম্পন্ন করেছেন। দীর্ঘ ১২ বছর আগে নির্মিত ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় এই প্রতীকী সফর অনুষ্ঠিত হলো। শনিবারের (২৪ অক্টোবর) এই একদিনের ঝটিকা সফর শেষে তিনি ইতোমধ্যেই স্বদেশে ফিরে গেছেন।
সফরকালে কিম জং উনের সঙ্গী ছিলেন চীনের চতুর্থ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ওয়াং হুনিং। তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের পক্ষ থেকে উত্তর কোরীয় নেতার কাছে আন্তরিক শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। দুই নেতা একসঙ্গে স্থানীয় একটি অটোমোবাইল কারখানা পরিদর্শন করেন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। এসময় কিম জানান, চীনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব রক্ষা এবং ব্যবহারিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রস্তুত রয়েছে পিয়ংইয়ং।
বিশেষ এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যা ১৯৫০-১৯৫৩ সালের কোরিয় যুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণের বর্ষপূর্তির ঠিক আগের দিন। সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দানদং-এর কোরিয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে যান কিম ও ওয়াং। সেখানে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করে প্রাণ উৎসর্গকারী চীনা সৈন্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কিম জং উন। সফর শেষে নতুন সেতুর গোড়ায় এসে কিমকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান ওয়াং হুনিং।
বিশ্লেষকদের মতে, ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নতুন চার লেনের সেতু চালুর মাধ্যমে চীন ও উত্তর কোরিয়ার বাণিজ্যের বড় বাধা দূর হলো। তবে কেবল অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থেকে নিজের অবস্থান শক্ত করার কৌশল হিসেবেই কিম জং উনের এই হঠাৎ ও রহস্যময় চীন সফরকে দেখছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র:আল-জাজিরা
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আবারও বড় ধরনের হামলা বা কড়া অবরোধের চিন্তাভাবনা করছেন। তবে এতে একটুও দমে না গিয়ে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পারস্য উপসাগরে তারা কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ঘেঁষতে দেবে না।
ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলি আবদুল্লাহি কড়া ভাষায় ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পারস্য উপসাগরে আবার মার্কিন সৈন্য পাঠানোর স্বপ্ন ট্রাম্পকে কবরে নিয়ে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে তারা নাকি ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করেছে, অথচ নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের সীমানার কাছে পাঠাতে তারা ভয় পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যেকোনো হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে তেহরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
চীনে কিম জং উনের ২৪ ঘন্টার ‘রহস্যজনক’ সফর
এই সংঘাতের আতঙ্কে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু-হু করে বেড়ে প্রতি ব্যারেলে ১১৭ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’-তে একের পর এক তেলবাহী জাহাজে হামলা চলছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের সঙ্গে সৌদি আরবের লড়াইও নতুন করে বেড়ে চলেছে।
সংঘাত থামাতে ইস্তাম্বুলে তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইউরোপীয় দেশগুলো বৈঠক করলেও সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান উপস্থিত ছিল না। তুরস্ক সতর্ক করেছে, ইরানে নতুন হামলা পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। তবে ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন হামলা ও অত্যাচার না থামলে তারা কোনো আলোচনায় বসবে না এবং হরমুজ প্রণালিও মুক্ত করবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা
মেগান মার্কেল ও তার বাবা থমাস মার্কেল। ছবি: সংগৃহীত
ব্রিটিশ রাজপরিবারের বধূ ও প্রিন্স হ্যারির স্ত্রী মেগান মার্কেলের বাবা থমাস মার্কেলের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়নের আপত্তিকর ছবি জমানোর এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চরম ক্ষোভ ও গভীর মানসিক কষ্ট প্রকাশ করেছেন ডাচ অব সাসেক্স মেগান। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এমন বিভৎস খবর শুনে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ও বিপর্যস্ত। ঘটনার শিকার হওয়া নিরীহ শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের ‘দ্য সান’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, মেগানের সৎ ভাই থমাস মার্কেল জুনিয়র ফিলিপাইনে তাদের বাবার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে এই আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও উদ্ধার করেন। তার দাবি, বাবার ড্রয়ার ও কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে শত শত শিশু নির্যাতনের ছবি ছিল। এরপরই তিনি ফিলিপাইন পুলিশ, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থায় গিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেন। ফিলিপাইন প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই বর্তমানে যৌথভাবে এই ঘটনার তদন্ত করছে। তবে মেগানের বাবা থমাস মার্কেল সিনিয়র তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বর্তমানে ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন ৮২ বছর বয়সি থমাস জানান, তার ছেলে সম্পূর্ণ মিথ্যা গল্প ফেঁদেছে। মেগানের বোন সামান্থা মার্কলও বাবার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, এই কম্পিউটারগুলো দুই বছর ধরে অন্য মানুষদের হাতে ছিল এবং তার ভাই বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। এই ঘটনার পর মেগান মার্কেল তার বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্বের আসল কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, আজ থেকে আট বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালেই পুলিশের পক্ষ থেকে তার বাবার বিরুদ্ধে কিছু আপত্তিকর অভিযোগের বিষয়ে তাকে জানানো হয়েছিল।
মেগান বলেন, এতদিন সংবাদমাধ্যমে নানা কথা ছড়ানো হলেও, মূলত সন্তানদের সুরক্ষার কথা ভেবেই তিনি বাবাকে নিজের পরিবার থেকে দূরে রেখেছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার অন্তত মানুষ বুঝতে পারবে যে কেন তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তিনি আশা করেন ভুক্তভোগী শিশুরা যেন দ্রুত ন্যায়বিচার পায়।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য সামনে এক বড় ধরণের ‘চমক’ অপেক্ষা করছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলার ঘটনার পর সেখানে বড় ধরণের সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি এই মন্তব্য করেন।
ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানান, ফিলিস্তিনকে কোনোভাবেই স্বাধীন রাষ্ট্র হতে না দেওয়া তাদের নির্বাচনের মূল লক্ষ্য। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের সোজা উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, হঠাৎ এবং আচমকা পদক্ষেপ নেওয়াই তার বেশি পছন্দ। নেতানিয়াহু আরও জানান, ফিলিস্তিন থেকে আসা যেকোনো সংকট মোকাবিলায় কিছু গোপন কৌশল ব্যবহার করা হবে, যা এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের জন্য খুব শীঘ্রই এক বড় ধাক্কা আসতে চলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের দাবি তুলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়াই তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় আরও কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের চুক্তি বাড়াবেন। অন্তত দুটিরও বেশি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেই দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো শর্ত দেবে না, কারণ তারা ভালো করেই জানে যে ইসরাইল তা কখনোই মেনে নেবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা