ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এসেছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এ সময় ইন্ডিয়া টুডে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। ইউটিউব চ্যানেল থেকে নেওয়া সাক্ষাৎকারটি নওরোজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
ইন্ডিয়া টুডে
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। চলুন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আপনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক দিয়ে শুরু করা যাক। একটি হলো সেই আইকনিক ছবি; যেখানে এই নেতা আপনার হাত ধরে গ্যালারির মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, ৪৫ মিনিটব্যাপী দীর্ঘ একটি আলোচনা। আমাদের বলুন প্রকৃতপক্ষে সেখানে কী ঘটেছিল? আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু কী ছিল?
মাসুদ পেজেশকিয়ান
আমি বলতে চাই, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বস্তুত, আমাদের মধ্যকার সেই গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে ইরান ও ভারত-এই দুই দেশ কয়েক হাজার বছর ধরে এক দীর্ঘ ইতিহাস উদযাপন করে আসছে। এটি এমন কিছু নয়, যা সময়ের সঙ্গে বদলে যাবে। স্বাভাবিকভাবে আমরা এই গভীরভাবে গেঁথে থাকা সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে দিনে দিনে এ সম্পর্ককে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি, যাতে এর ওপর একটি নতুন অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারি এবং বিশ্বে ক্রমবিকাশমান সর্বগ্রাসী একনায়কত্ব বা একচ্ছত্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একে অপরকে সাহায্য করতে পারি।
ইন্ডিয়া টুডে
ঠিক আছে, এটি আপনি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট বলেছেন। কিন্তু আমরা এমন একটি দেশকে নিয়ে কথা বলছি, যা এখন যুদ্ধে লিপ্ত এবং ইরানে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। চাবাহার বন্দর তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুদ্ধ, সংঘাত এবং চাবাহারে আমরা যেসব হামলা দেখেছি, তার মাঝে ভারতের জন্য চাবাহার কতটা টেকসই বলে আপনি মনে করেন এবং ভারতের জন্য তা কতটুকু সম্ভাবনাময় থাকবে?
মাসুদ পেজেশকিয়ান
দেখুন, যুদ্ধ আমরা শুরু করিনি। তারা যুদ্ধ শুরু করেছে। আপনি যদি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো নীতি কিংবা মানবতাবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখতে চান, তবে তারা প্রতিষ্ঠিত কোনো কাঠামোর তোয়াক্কা না করে আমাদের দেশ আক্রমণ করেছে। তারা আমাদের নেতাকে শহীদ করেছে, আমাদের সামরিক কমান্ডারদের শহীদ করেছে, এক দিনেই স্কুলের নির্দোষ শিক্ষার্থীদের শহীদ করেছে। তারা তাদের সবাইকে শহীদ করেছে। তারা আমাদের বিজ্ঞানীদের শহীদ করেছে এবং আমাদের অবকাঠামোতে বোমা বর্ষণ করেছে। দুঃখজনকভাবে, তারা যা করেছে তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো নীতির আলোকে মেনে নেওয়া যায় না। অতএব, তারা যে পথ অনুসরণ করছে, আমরা আসলে কেবল আত্মরক্ষা করেছি।
ইন্ডিয়া টুডে
ঠিক আছে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সময় কি এই চাবাহার এবং চাবাহারে ভারতের বিনিয়োগের বিষয়টি উঠেছিল?
মাসুদ পেজেশকিয়ান
আমাদের মধ্যকার আলোচনার সময় সামগ্রিকভাবে আমরা বিভিন্ন দিক ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলেছি। ভারত সেখানে বিনোয়োগ করতে পারে। বর্তমানে তাদের কিছু বিনিয়োগ সেখানে রয়েছে এবং তা চলমান। তারা এসে অংশীদারিত্ব করতে পারে অথবা বাণিজ্যের দিক থেকে আমরা এক ধরনের অংশীদারিত্ব বা সহযোগিতা বজায় রাখতে পারি। সুতরাং বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের যোগাযোগের একটি নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। আমরা প্রস্তুত এবং এসব বিষয়ে আমরা সহযোগিতা করতে রাজি।
ইন্ডিয়া টুডে
ঠিক আছে। আপনি বিজনেস ইকোনমিক ফোরামেও বক্তব্য রেখেছেন। বিনিয়োগকারীদের ইরানকে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে দেশটি কতটা সম্ভাবনাময়? কারণ এমন একটি সময়ে যখন আপনি নিষেধাজ্ঞা দেখছেন-এগুলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নয়, এগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, দেশভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা, কোনো দেশেরই তা মানা উচিত নয়। তা সত্ত্বেও এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ভারতীয় ব্যবসাগুলো ইরানে বা ইরানের সঙ্গে কীভাবে কাজ করতে পারে?
মাসুদ পেজেশকিয়ান
দেখুন, ব্রিকসের উদ্দেশ্য এবং আমরা যা করতে এখানে এসেছি তা হলো-আমেরিকা যে ধারা শুরু করেছে, অর্থাৎ তারা মন চাইলেই যে কোনো দেশকে নিষেধাজ্ঞা দেয়, এর বিপরীতে ব্রিকসের উদ্দেশ্য হলো এই ধরনের সর্বগ্রাসী বা একচ্ছত্রবাদ ভেঙে দেওয়া। সেই কারণে ব্রিকস গঠিত হয়েছিল এবং কোনো দেশ নিজের খেয়ালখুশিমতো অন্য দেশকে নিষেধাজ্ঞা দেবে, তা থেকে স্বাধীন থেকে আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও সহযোগিতার ধরনে পরিবর্তন আনার কথা। তাই আমরা এখানে একে অপরকে সাহায্য ও সমর্থন করতে এসেছি, যাতে এই একতরফাবাদ বা একপাক্ষিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়। চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো বিশ্বের বড় বড় দেশকে নিয়ে আয়োজিত এই শীর্ষ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্যই এটি। তাই আমরা এখানে এসেছি এবং আমেরিকাকে এই একতরফাবাদ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করছি। এটিই আমাদের এই শীর্ষ সম্মেলনের লক্ষ্য ও দায়িত্ব, যা আমাদের পূরণ করতে হবে।
ইন্ডিয়া টুডে
কিন্তু ব্রিকসের সফলতা আসবে তখনই যদি একটি যৌথ ঘোষণাপত্র আসে। দেখে মনে হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরানের মধ্যকার সমস্যাগুলো যৌথ ঘোষণাপত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাসুদ পেজেশকিয়ান
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। ওই অঞ্চলের কোনো দেশের সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমাদের সমস্যা হলো ওইসব দেশে অবস্থিত আমেরিকান ঘাঁটিগুলো নিয়ে, যেখান থেকে তারা আমাদের দেশে হামলা চালাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অঞ্চলের অন্যান্য দেশ আমাদের ভাই। আমরা বহুদিন ধরে একসঙ্গে বসবাস করছি, আমাদের বাণিজ্য ছিল, আমরা একে অপরকে সমর্থন করেছি। সুতরাং এটি আমেরিকা-যারা এখানে এসে ঘাঁটি তৈরি করেছে এবং সেসব ঘাঁটি থেকে তারা আমাদের সন্তানদের শহীদ করছে, আমাদের অবকাঠামো আক্রমণ করছে এবং আমাদের নেতা, কমান্ডার ও জনগণকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সমস্যা হলো, বন্ধুভাবাপন্ন ও প্রতিবেশী দেশগুলোর উচিত নয় শত্রুদের তাদের মাটি ব্যবহার করে আমাদের দেশে আক্রমণ করার সুযোগ দেওয়া। এই মুহূর্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং আমরা তা আরও প্রসারিত করতে পারি। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমরা তাদের সবার সঙ্গে একটি আন্তরিক সম্পর্ক রাখতে চাই। তবে আমেরিকা চায় না যে এটি ঘটুক।
ইন্ডিয়া টুডে
ঠিক আছে। আমি সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং আরববিশ্বের অন্য দেশগুলোকে নিয়ে কথা বলব, তবে তার আগে আমরা কি আশাবাদী হতে পারি যে এবার একটি যৌথ ঘোষণাপত্র বা ফলাফলের নথি পাওয়া যাবে?
মাসুদ পেজেশকিয়ান
ব্রিকসের বিষয়ে আমরা চেষ্টা করছি যাতে এটি ঘটে। এই গতিধারা দিনে দিনে ভালো ও উন্নত হচ্ছে। এসব বিষয়ে আমরা একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারি এবং ব্রিকসের যে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার লক্ষ্যই হলো সদস্যদেশগুলো যৌথ বিনিয়োগ করবে, একে অপরকে সমর্থন করবে এবং আমরা উন্নয়ন ত্বরান্বিত করব। অবশ্য এটি আমেরিকার বিষয়ে দেশগুলোর কিছু নিজস্ব বিবেচনার ওপরও নির্ভর করে।
বর্তমান ধারা অনুযায়ী, আমেরিকা সব দেশকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। মার্কিন অর্থনীতি বা মার্কিন ডলারের ওপর এই নির্ভরতা যেন দুর্বল ও কমানো যায়, তার জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চলছে। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে এসব দেশের সমস্ত প্রচেষ্টা এই দিকে নির্দেশিত যেন আমরা একতরফাবাদ নির্মূল করতে পারি এবং একটি একমেরু বিশ্ব নয়; বরং এমন একটি বিশ্ব পেতে পারি; যেখানে আমরা একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারব এবং স্বাধীনভাবে এগিয়ে যেতে পারব।
ইন্ডিয়া টুডে
ঠিক আছে। তাহলে সংঘাতের ছয় মাস পর ইরান কোথায় দাঁড়িয়ে আছে-এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? সামরিক, অর্থনৈতিক বা কৌশলগত দিক থেকে আপনারা কি দুর্বল নাকি শক্তিশালী হয়েছেন?
মাসুদ পেজেশকিয়ান
আপনি জানেন, এটি সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য। তাদের নিজস্ব সমস্যা থাকে এবং আমাদেরও কিছু সমস্যা ছিল। এখনও আছে। কিন্তু আমেরিকা যা করেছে তা আমাদের আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে, এমনকি এই অঞ্চলের জনগণকেও। এবং এখন তারা আমেরিকার প্রতি আরও বেশি ঘৃণাপরায়ণ, কারণ আমরা নিপীড়িত হয়েছি। তারা কেবল ক্ষমতার দম্ভে বিনা উস্কানিতে আমাদের দেশে হামলা চালিয়েছে। তারা কল্পনা করেছিল যে ভেনেজুয়েলার মতো তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের দেশ দখল করে নেবে এবং ইরানে তাদের নিজস্ব পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। তারা ভেবেছিল সিরিয়াতে তারা যা করেছিল, এটি তেমনই হবে। তারা ভেবেছিল আমাদের নেতা, সামরিক কমান্ডার, ম্যানেজার, পরিচালক ও মন্ত্রীদের শহীদ করার পর কয়েক দিনের মধ্যে সমাজ শান্ত হয়ে যাবে এবং তারা তাদের নিজেদের লক্ষ্য হাসিল করতে পারবে।
কেবল যে এমনটা ঘটেনি তা নয়, বরং সাধারণ মানুষ পূর্ণশক্তি নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছে। এখন কয়েক মাসেরও বেশি সময় ধরে মানুষ রাজপথে নামছে এবং আমাদের সামরিক বাহিনী সব প্রযুক্তি দিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে নিজেদের উৎসর্গ করছে। শত্রুদের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং সরকার জনগণের সহায়তায় এবং সামরিক ও সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থনে নিজের সমস্যাগুলো সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে, যা শত্রুরা কল্পনাও করেনি। তারা যা করেছে, তার ওপর ভিত্তি করে আমরা দিনে দিনে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছি। এমনকি আমাদের দেশের যারা কিছুটা অসন্তুষ্ট ছিলেন-হ্যাঁ, আমাদের কিছু অভ্যন্তরীণ বিরোধ ছিল-তারাও আমাদের দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর জোর দিয়েছেন এবং শত্রুদের এই আক্রমণ ও আগ্রাসন তারা মেনে নেননি। এমনকি বিদেশে বসবাসকারী ইরানিরাও আমাদের দেশে ফিরে এসেছেন।
হ্যাঁ, এটি সত্য। আমাদের বর্তমানে যেসব সমস্যা রয়েছে তা সত্ত্বেও-আমেরিকা যা করেছে তা হলো, তারা সামরিকভাবে সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা করেছিল। তারা ব্যর্থ হয়েছে। এরপর তারা অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। আবারও তারা ব্যর্থ হয়েছে। এখন তারা পণ্য, এমনকি খাদ্য ও ওষুধ আমদানির পথ অবরুদ্ধ করছে এবং তারা সামুদ্রিক পথ বন্ধ করে দিয়েছে। তারা স্থলপথও অবরুদ্ধ করতে চায়। অথচ আমেরিকা মানবাধিকারের দাবিদার! এখন তারা আমাদের দেশের মানুষের সঙ্গে, আমাদের রোগীদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে–তারা আমাদের জনগণকে অভুক্ত রেখে মারতে চায় বা তাদের জন্য অন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে চায়। তারা চায় আমরা নতিস্বীকার করি এবং আত্মসমর্পণ করি। এটি মানবিক নয়। এটি সবচেয়ে বর্বর কাজ, যা তারা করতে পারে।
ইন্ডিয়া টুডে
আপনারা কি পারমাণবিক অস্ত্র খুঁজছেন? পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কি ইরানের জন্য একটি অ-আলোচনাযোগ্য বিষয়? এই বিষয়ে বর্তমান অবস্থা কী, কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঠিক এই কথাটিই বারবার বলছেন?
মাসুদ পেজেশকিয়ান
আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, আমেরিকা কিছু অপপ্রচার চালাচ্ছে। এটি কেবলই অপপ্রচার। আমরা এনপিটির সদস্য এবং এর নিয়মকানুন স্পষ্ট। তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ডের ওপর সবচেয়ে বড় মাপের নজরদারি চালায়। তারা প্রতিদিন এসে পর্যবেক্ষণ করেছে। আমরা সবকিছু আন্তর্জাতিক কাঠামোর নীতিমালার মধ্যে থেকে করেছি। আমরা যদি পারমাণবিক অস্ত্র খুঁজতাম, তবে আমরা এনপিটির সদস্য হতাম না। এখন তারা আমাদের মাটিতে আক্রমণ করার জন্য নানা অজুহাত ও বাহানা দাঁড় করাচ্ছে। আমাদের প্রয়াত পরম শ্রদ্ধেয় নেতা; যিনি নেতৃত্বের দিক থেকে এবং মর্যাদার দিক থেকে অত্যন্ত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত এবং আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকেও যার বাণী শেষ কথা–তিনি বেশ কয়েকবার ঘোষণা করেছিলেন যে, আমরা পারমাণবিক অস্ত্র খুঁজছি না। আমরা কীভাবে বলব যে, আমরা পারমাণবিক অস্ত্র খুঁজছি না? তারা এমন কী তথ্যপ্রমাণমূলক নথি পেয়েছে, যা তাদের আমাদের ওপর আক্রমণ করার অধিকার দেয়? এগুলো মিথ্যা। এগুলো সব মিথ্যা।
ইন্ডিয়া টুডে
তাহলে এখানে উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য কি ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়ানো? ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী বা পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে যাচ্ছে-এটি বলার পেছনে উদ্দেশ্য কী? কারণ আমরা দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলের কাছ থেকে এটি শুনে আসছি।
মাসুদ পেজেশকিয়ান
আপনার কি মনে হয়, ইসরায়েল পারমাণবিক শক্তিধর না হওয়ার চেষ্টা করছে? ইসরায়েল এনপিটির সদস্য নয় এবং তাদের কাছে বিশাল অঙ্কের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তাহলে কেন তাদের কাছে এই ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে-তা নিয়ে প্রতিবাদ করার মতো কি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে? আপনারা স্বচক্ষে দেখেছেন তারা গাজা ও লেবাননে কী করছে। তারা ৭০ হাজারেরও বেশি নির্দোষ মানুষকে হত্যা করেছে এবং তারা প্রতিদিন এই অঞ্চলগুলোতে বোমা বর্ষণ করছে। কোনো মানবিক বিবেক মেনে নেবে যে মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত? তারা পানি, খাদ্য এবং সবকিছুর পথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
পুরো বিশ্ব তা দেখছে এবং বুঝছে, কিন্তু কেন কেউ ইসরায়েলকে কিছু বলছে না? এটি এক ধরনের বর্বর বিশ্ব, যেখানে কিছু লোককে মানুষ, নারী ও শিশু হত্যা করার এবং হাসপাতাল ও স্কুলে বোমা মারার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবুও তারা তাদের রক্ষা করে। এটি একটি বিপর্যয়।
ইসরায়েল ও আমেরিকার এই অত্যাচারী আচরণের বিষয়ে আমরা তাদের বিরোধিতা করি এবং আমরা বলি যে তাদের উচিত নয় অন্য মানুষকে অত্যাচার করা এবং নির্দোষ মানুষকে হত্যা করা। যেহেতু আমরা বলি যে, আমরা তাদের বিরোধিতা করি, তাই আমাদের হত্যা করতে হবে। সুতরাং এটি একটি নিপীড়ন এবং পুরো বিশ্ব কেবল তা চেয়ে চেয়ে দেখছে। আর মাঝে মাঝে তারা সহানুভূতি দেখায়।
রুনা খান
এশিয়ার নোবেলখ্যাত ৬৮তম র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ পেয়েছেন বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান। দুর্গম চর ও নদীবেষ্টিত এলাকার প্রান্তিক মানুষের জীবন বদলে দিতে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন তিনি। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সাহস ও মানবিক দর্শনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেন। ২০০২ সালে একটি ভাসমান হাসপাতাল দিয়ে যাত্রা শুরু করা ফ্রেন্ডশিপ এখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা, জীবিকা, নাগরিক অধিকারসহ নানা ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। পুরস্কার ঘোষণার পর গতকাল মঙ্গলবার একান্ত আলাপচারিতায় রুনা খান বলেছেন তাঁর দীর্ঘ পথচলা, প্রান্তিক মানুষের ব্যথা, ফ্রেন্ডশিপের অর্জন, মূল্যবোধ ও আগামী দিনের স্বপ্নের কথা।
প্রশ্ন: এশিয়ার নোবেলখ্যাত র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়ার খবরটি প্রথম যখন শুনলেন, তখন কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
রুনা খান: প্রথমে অবশ্যই খুশি হয়েছিলাম। তবে সেই খুশি ‘আমি এটা করেছি’– এমন ছিল না; বরং মনে হয়েছিল, আল্লাহকে ধন্যবাদ। যারা ২৫ বছর ধরে আমাদের ওপর আস্থা রেখেছে, আমাদের সঙ্গে হেঁটেছে, তারা এখন অনুভব করবে– তাদের বিশ্বাস সঠিক ছিল। আমাদের সঙ্গে যারা কাজ করেছে, গত ২৫ বছর ধরে যাদের নিষ্ঠা ও শ্রম রয়েছে, তাদের সবার কথা মনে পড়েছে। অনেকে কাজ করে চলে গেছে, কেউ বিদেশে গেছে; কিন্তু তাদের অবদানও কম নয়। আমাদের আন্তর্জাতিক সহযোগীরাও সব সময় মাঠে এসে কাজ দেখতে পারেনি। তারা শুধু আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই পুরস্কার শুধু কাজের স্বীকৃতি নয়; মহানুভবতা, নেতৃত্ব এবং সেই নেতৃত্বের মাধ্যমে যা অর্জন করা হয়েছে, তারও স্বীকৃতি। আমার কাছে মূল্যবোধ খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে কাজ আমি বিশ্বাস করি না, তা করব না। যে পথে বিশ্বাস নেই, সে পথে হাঁটব না। যে মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করতে হয়, সে কাজও করব না। আমাদের সংগঠন শুরু থেকেই এই মূল্যবোধ ধারণ করে এগিয়েছে। তাই এই স্বীকৃতি আমার কাছে শুধু আনন্দের নয়, এটি আবারও বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার মতো।
প্রশ্ন: ২৫ বছরের এই পথচলা কতটা কঠিন ছিল?
রুনা খান: ভীষণ কঠিন। ভাবুন, একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা একটি মেয়ে– যে আর্থিক কষ্ট কী, তা ঠিকমতো কখনও বুঝতে হয়নি; যে প্রকৃত দারিদ্র্য কাছ থেকে দেখেনি, হাসপাতাল বা চরাঞ্চলের বাস্তবতাও জানত না– সে ভাবছে, একটি জাহাজ নিয়ে এমন একটি চরাঞ্চলে যাবে, যেখানে মানুষের কাছে পৌঁছানোই কঠিন! পুরো যাত্রাটাই ছিল প্রায় অসম্ভব। চারপাশ থেকে প্রশ্ন এসেছে– রুনা, তুমি এটা কীভাবে করবে?
অনেকে বিশ্বাসই করেনি যে সামাজিক-সচ্ছল একটি পরিবারের একজন মানুষ বছরের পর বছর সবকিছু ছেড়ে এভাবে কাজ করতে পারে। সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্লাব, দাওয়াত– সবকিছু থেকেই আমাকে দূরে থাকতে হয়েছে। হয়তো কোনো অনুষ্ঠানে ৫ বা ১০ মিনিটের জন্য গেছি, তারপর আবার কাজে ফিরেছি। বছরের পর বছর এভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে– এটি কেউ বিশ্বাস করেনি। এমনকি সরকারও প্রথম দিকে বিশ্বাস করেনি।
প্রশ্ন: প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে?
রুনা খান: মানুষের ব্যথা। দারিদ্র্য থেকে মানুষের ব্যথা হয়। পরিবেশ যখন মানুষের বিরুদ্ধে থাকে, তখন ব্যথা হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে যখন কারও কাছে পৌঁছানো যায় না, তখনও ব্যথা হয়। আর একটি জনগোষ্ঠীকে যখন ভুলে যাওয়া হয়, যখন তাদের কথা শোনার কেউ থাকে না– সেটিই সবচেয়ে বড় ব্যথা। আমার কাছে মানুষ সব সময় এক নম্বরে। মানুষকে সাহায্য করতে হলে তার বাস্তবতাকেও সম্মান করতে হবে। একটি চর ভাঙবে, বৃষ্টি আসবে, মানুষ এক চর থেকে আরেক চরে যাবে– এসব আমি বন্ধ করতে পারব না। তাই তাদের বাস্তবতাকে সম্মান করেই কাজ করতে হবে।
একটি ঘটনা কখনও ভুলতে পারি না। আমাদের একটি স্বাস্থ্য ক্যাম্পে এক নারী এসেছিলেন; সঙ্গে তাঁর ছিল দুটি সন্তান। তাঁর স্বামী অসুস্থ, কাজ করতে পারেন না। তারা থাকতেন চরের মধ্যে একটি ছোট ঘরে। চারপাশে শুধু বালু। আমি জানতে চাইলাম, ‘আপনি আয় করেন কীভাবে? কী খান?’ তিনি বললেন, ‘আমি দুদিন হেঁটে ঢাকায় যাই।’
ভাবুন! দুদিন হেঁটে ঢাকায় আসেন। পথে কোনো গাড়ি বা বাস পেলে ওঠেন। ঢাকায় কয়েক দিন ভিক্ষা করেন। তারপর যা পান, তা নিয়ে আবার বাড়ি ফেরেন। স্বামী ও সন্তানদের জন্য ডাল, ভাত, সামান্য তেল ও মরিচ রেখে যান। সন্তান দুটি রান্না করে বাবাকে খাওয়ায়, নিজেরাও খায়। এরপর ওই নারী আবার ঢাকায় আসেন।
আপনি যদি মানুষ হন, এই দৃশ্য আপনার মনে দাগ কাটবেই। আর যখন দেখবেন, আপনি হয়তো কিছু একটা করতে পারবেন, তখন সেটি আপনার কাছে দায়িত্ব হয়ে যাবে। আমার মনে হয়, সেই দায়িত্ববোধ নিয়েই এতদূর এসেছি।
প্রশ্ন: ফ্রেন্ডশিপ প্রান্তিক মানুষের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে?
রুনা খান: আমি বলব, ফ্রেন্ডশিপ মানুষের জীবনে সুখ, আশা ও সুযোগ আনতে পেরেছে।
আমরা এমনভাবে কাজ করতে চাই, যাতে একদিন ফ্রেন্ডশিপ সেখানে না থাকলেও মানুষ নিজেদের অর্জিত জ্ঞান ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তারা ছোট ছোট সামাজিক উদ্যোক্তা হতে পারে। আমরা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করেছি। তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের স্বীকৃতির ব্যবস্থাও হয়েছে। আমাদের ছেলেমেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কোডিং শেখানো হয়। এবার ৪০ জন শিক্ষার্থী কোডিং প্রশিক্ষণ নিয়ে বের হয়েছে। তারা চরে বসেই অনলাইনে মাসে এক হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ ডলার পর্যন্ত আয় করছে। এর চেয়ে বড় পরিবর্তন আর কী হতে পারে?
আরেকটি উদাহরণ ইপিআই। আমরা যখন প্রথম যাই, কোনো কোনো চরে ইপিআই হতোই না। যেখানে হতো, সেখানেও কাভারেজ ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। আমাদের এক-দুই বছরের হস্তক্ষেপের মধ্যে সেটি ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অবশ্যই ইপিআই আমরা একা করি না। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে করি। আমরা গ্যাপটি চিহ্নিত করি, তারপর সরকারের সঙ্গে কাজ করি। একবার একজন পুলিশ সুপার একটি টেলিভিশন ক্রুর সামনে বলেছিলেন, ‘ফ্রেন্ডশিপ আসার পর চরে আমাদের কাজ কমে গেছে।’ আমার কাছে সেটিই অনেক বড় স্বীকৃতি।
প্রশ্ন: এত দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
রুনা খান: চ্যালেঞ্জ এসেছে মুহূর্তে মুহূর্তে। শুরুতে এমনও হয়েছে, মনে হয়েছে– আল্লাহ, আর এক সপ্তাহ চালাতে পারব। এর বেশি পারব না। কারণ, তখন কেউ আমাদের বিশ্বাস করত না। টাকা দেবে কে! এমন সময়ও গেছে, যখন সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে একটি পরিবারের জীবন বদলে দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু আমাদের হাতে সেই অর্থ ছিল না। কোনো অতিরিক্ত অর্থ ছিল না, মাইক্রোফাইন্যান্সও ছিল না। সে কারণেই ফ্রেন্ডশিপ ইন্টারন্যাশনাল করেছি। আমি আমাদের আন্তর্জাতিক সহযোগীদের বলতাম, আমি এই সমস্যা দেখেছি, দয়া করে টাকা পাঠান। তারা পাঠাতেন। আজ লুক্সেমবার্গ সরকার, ফরাসি সরকারসহ অনেক প্রতিষ্ঠান আমাদের ওপর আস্থা রাখে। তারা জানে, তারা যে অর্থ দিয়েছে, তা দিয়ে কী কাজ হয়েছে। এই বিশ্বাস অর্জন করাও আমাদের একটি বড় অর্জন।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, এই পুরস্কার শুধু স্বীকৃতি নয়, দায়িত্বও। সেই দায়িত্ব কতটা বেড়েছে?
রুনা খান: অবশ্যই এটি বড় দায়িত্ব। তবে আমার জীবনে এমন কোনো কাজ নেই, যেটাকে আমি দায়িত্ব মনে করি না। সবকিছুই আমার কাছে দায়িত্ব হয়ে যায়। এখন আমাদের দাতারা আরও বেশি মানুষের নজরে আসবেন। তাই আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। যে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাবের জন্য আমরা এই পুরস্কার পেয়েছি, সেগুলো যেন আরও শক্তিশালী হয়– এটাই গুরুত্বপূর্ণ। পুরস্কার পাওয়ার পর আমাদের কাজের মান আরও ভালো হতে হবে, আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।
প্রশ্ন: আপনার কর্মীদের জন্য এই মুহূর্তে কী বার্তা দিতে চান?
রুনা খান: প্রথমেই তাদের অভিনন্দন জানাতে চাই। কারণ কোনো নেতা কখনও একা নেতা হন না। বিপুলসংখ্যক মানুষ যখন একজন নেতাকে বিশ্বাস করে এবং সেই বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করে, তখনই নেতৃত্ব তৈরি হয়। আমি শুধু র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের জুরি বা কমিটির বিশ্বাস অর্জন করিনি; আমার কর্মীরাও সেই বিশ্বাস অর্জন করেছে।
তাদের ধন্যবাদ দিতে চাই। কারণ অনেক সময় আমার সিদ্ধান্ত বাইরে থেকে সংগঠনের বিরুদ্ধে মনে হতে পারে। কিন্তু তারা আমার পাশে থেকেছেন। একবার ২০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প এসেছিল। কিছু বিষয়ে আমাদের মতের মিল হয়নি। তাই আমি প্রকল্পটি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।
আমার কর্মীরা তখন বলেছিল, ‘আমরা মনে করি, আপনি সঠিক কাজ করেছেন।’ ছয় মাস পর প্রকল্পটি আবার আসে। তখন তারা বলেছিল, বিশ্বের ১৮৭টি সংগঠন এই প্রকল্পটি করতে চাইছে। আমি বলেছিলাম, হবে না। কারণ আমার কর্মীদের শ্রম, তাদের সময়– আমি এমন একটি কাজে নষ্ট করতে পারি না, যেটি আমি জানি কাজ করবে না। তাই তাদের প্রতি আমার বার্তা– সাহস রাখুন। আপনাদের সাহসের জন্যই আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাই।
প্রশ্ন: প্রান্তিক মানুষের জন্য ফ্রেন্ডশিপের পরবর্তী স্বপ্ন কী?
রুনা খান: আমার স্বপ্ন হলো মানুষ যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। দেশের ওপর তাদের বিশ্বাস থাকে– তারা ন্যায়বিচার পাবে, প্রয়োজনীয় সেবায় প্রবেশাধিকার পাবে। তবে শুধু সেবা দিলেই হবে না। সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা থাকতে হবে। কারণ নির্ভরযোগ্যতা ও মানই বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। আমি চাই মানুষ নিজেরাই এসব সেবা পাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করুক। তারা আয় করুক, নিজের পায়ে দাঁড়াক। আমাদের প্রয়োজন হলে আমাদের সঙ্গে পথ খুঁজে নিক, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেন নিজেদের শক্তিতে দাঁড়াতে পারে।
একটি দেশের ৩০ শতাংশ মানুষ যদি দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বাস করে, তাহলে সেটি তো লাখ লাখ মানুষ। দেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দেশ এগোতে পারে না। তাদের সবাইকে সঙ্গে নিতে হবে। আর আমি বিশ্বাস করি, তাদের সেই সক্ষমতা আছে। একটি চরের একজন শিক্ষক কতটা লড়াই করেন, সেটি দেখুন। তাঁর একজন শিক্ষার্থীও রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। মানুষের সক্ষমতা আছে। আমাদের বাঙালিদের মধ্যেও সেই সক্ষমতা আছে। তাহলে আমরা পারব না কেন?
প্রশ্ন: আগামী দিনে ফ্রেন্ডশিপকে কোথায় দেখতে চান?
রুনা খান: আমি আমার প্রতিষ্ঠানকে এমন জায়গায় দেখতে চাই, যেখানে ১০০ বছর পরও একই মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করা হবে– যে মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সবকিছু বদলে যাবে। আজ হয়তো ভাসমান হাসপাতালের প্রয়োজন আছে, কাল হয়তো থাকবে না। একদিন হয়তো আমাদের বর্তমান কাঠামোটিও থাকবে না।
কিন্তু মানুষের প্রয়োজন সব সময় থাকবে। মানুষের প্রয়োজন শুনতে হবে, সেই প্রয়োজন পূরণ করতে হবে, যেখানে ঘাটতি আছে সেটি পূরণ করতে হবে এবং যে মূল্যবোধের ওপর আমি এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি, সেই মূল্যবোধ নিয়েই কাজ করতে হবে। নিজেকে আমি ভবিষ্যতে এমন জায়গায় দেখতে চাই, যেখানে পরবর্তী নেতৃত্ব, তার পরের নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যতের সব নেতৃত্বের মধ্যে এই দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। আমি যদি সেটি করতে পারি, তাহলেই মনে করব– আমি যা করতে চেয়েছিলাম, তা করতে পেরেছি।
৩ শর্তে জাতীয় সরকার গঠন করতে চান জামায়াত আমির
হাসপাতালের সংকটময় বিছানায় শুয়ে থাকা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চারপাশে এখন সমগ্র জাতি নিঃশব্দ প্রার্থনায় নিমগ্ন। দল-মত-ধর্ম-বর্ণের ব্যবধান ভুলে সবাই তার জন্যই হাত তুলছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ পর্যন্ত সবার হৃদয়ে একই মিনতি—তিনি সুস্থ হোন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো নেতার অসুস্থতা নিয়ে এমন সামষ্টিক আবেগ, এমন ঐক্যের বিস্তার আগে কখনো দেখা যায়নি। এই দৃশ্য বলে দেয়, খালেদা জিয়া শুধু একটি দলের নেত্রী নন; তিনি হয়ে উঠেছেন দেশের মানুষের গভীরতম মানবিক অনুভূতির প্রতীক।
এই ভালোবাসা, এই ঐক্যের উৎস শুধুই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় নয়; উৎস তার চরিত্রে, তার মহত্ত্বে, তার অসীম সহিষ্ণু ও নিঃস্বার্থ হৃদয়ে।
খালেদা জিয়া সেই বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন, যিনি ক্ষমতায় থেকেও প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করেননি আর ক্ষমতার বাইরে থেকেও বিদ্বেষকে রাজনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি।
বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তপ্ত বছরগুলোয় তার আচরণ বারবার দেখিয়েছে মানুষকে ভালোবাসা, দেশকে ভালোবাসা, অন্যায়ের কাছে মাথানত না করা—এগুলোই তার রাজনীতির প্রধান ভিত্তি।