প্রতীকী ছবি
মিষ্টি খাবার মানেই যে অস্বাস্থ্যকর, এমনটা নয়। ডেজার্ট তৈরিতে কী ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে খাবারটি কতটা পুষ্টিকর হবে। অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত উপাদানের বদলে ফল, দই, বাদাম, খেজুর কিংবা আঁশযুক্ত উপাদান ব্যবহার করলে মিষ্টি খাবারও তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর হতে পারে।
গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ডা. সৌরভ শেঠি সম্প্রতি অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে এমন সাত ধরনের ডেজার্টের কথা জানিয়েছেন। এসব খাবারে থাকা আঁশ, প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হজম প্রক্রিয়া এবং অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য সহায়ক হতে পারে।
তরমুজ ও লেবু
তরমুজে প্রচুর পানি ও কিছু আঁশ রয়েছে। এর সঙ্গে সামান্য লেবুর রস মিশিয়ে সহজেই তৈরি করা যায় হালকা ও সতেজ একটি ডেজার্ট। গরমের দিনে এটি শরীরে পানির ঘাটতি পূরণেও সহায়তা করতে পারে। চাইলে এর সঙ্গে কয়েকটি পুদিনা পাতা যোগ করা যায়। বাড়তি চিনি না দিলেই খাবারটি আরও স্বাস্থ্যকর থাকে।
খেজুর ও বাদামের মিশ্রণ
চিনি ব্যবহার না করেও খেজুর দিয়ে মিষ্টি খাবার তৈরি করা যায়। বিচি ছাড়ানো খেজুরের সঙ্গে কাজু, কাঠবাদাম বা আখরোট মিশিয়ে ছোট ছোট বল তৈরি করা যেতে পারে। খেজুরে থাকা প্রাকৃতিক মিষ্টতা ও আঁশের পাশাপাশি বাদাম থেকে পাওয়া স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান খাবারটিকে পুষ্টিকর করে। বিকেলের নাশতা হিসেবেও এটি খাওয়া যায়।
ডার্ক চকলেট ও ফল
ডার্ক চকলেটের সঙ্গে স্ট্রবেরি, আপেল বা কমলার মতো ফল মিশিয়ে তৈরি করা যায় সহজ ডেজার্ট। ডার্ক চকলেটে থাকা কোকো পলিফেনল এবং ফলে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের জন্য উপকারী। স্ট্রবেরি সবসময় সহজলভ্য না হলে পেয়ারা, আপেল বা কমলার সঙ্গে অল্প পরিমাণ ডার্ক চকলেট খাওয়া যেতে পারে।
আপেল, দই ও দারুচিনি
আপেল ছোট টুকরো করে এর সঙ্গে টক দই, সামান্য মধু ও এক চিমটি দারুচিনি মিশিয়ে নেওয়া যায়। কয়েক মিনিটেই তৈরি হয়ে যায় এই ডেজার্ট। আপেলের আঁশ এবং দইয়ের প্রোবায়োটিক অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য সহায়ক হতে পারে। বাড়তি চিনি না দিয়ে খেলে এটি আরও ভালো বিকল্প হতে পারে।
মিষ্টি আলু ও দারুচিনি
মিষ্টি আলু সাধারণত ভর্তা বা নাশতা হিসেবে খাওয়া হলেও এটি মিষ্টি খাবার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। সেদ্ধ বা বেক করা মিষ্টি আলুর সঙ্গে সামান্য দারুচিনি ও মধু মিশিয়ে নিতে পারেন। মিষ্টি আলুতে আঁশ ও রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ রয়েছে, যা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য খাবার হিসেবে কাজ করতে পারে।
কিউই ও দই
কিউই ছোট টুকরো করে দই ও সামান্য মধুর সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা যায় সহজ একটি ডেজার্ট। কিউইতে আঁশের পাশাপাশি অ্যাক্টিনিডিন নামের একটি এনজাইম রয়েছে, যা হজম প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। কিউই না পাওয়া গেলে পাকা পেঁপে বা পেয়ারা দিয়েও দইয়ের সঙ্গে একই ধরনের ডেজার্ট তৈরি করা যায়।
ফল ও দইয়ের ঘরোয়া ডেজার্ট
পাকা কলা, পেঁপে, আপেল বা পেয়ারা কেটে এর সঙ্গে টক দই মিশিয়ে নেওয়া যায়। চাইলে সামান্য খেজুর কুচি, চিয়া সিড বা বাদাম যোগ করা যেতে পারে। ফল থেকে আঁশ ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়, আর দইয়ের প্রোবায়োটিক অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। তাই অতিরিক্ত চিনি দেওয়া মিষ্টির পরিবর্তে এটি সহজ একটি বিকল্প হতে পারে।
মিষ্টি খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ডেজার্টে কতটা চিনি, ক্রিম বা প্রক্রিয়াজাত উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি। ফল, দই, বাদাম ও খেজুরের মতো উপাদান দিয়ে ঘরে তৈরি ডেজার্ট তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে এসব খাবার কোনো রোগের চিকিৎসা নয়। অন্ত্র বা হজমের সমস্যা নিয়মিত হলে শুধু খাবারের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস বা পেটে ভারী লাগার সমস্যা অনেকেরই হয়। অনিয়মিত খাবার, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, অতিরিক্ত তেল-মসলা এবং কম শারীরিক পরিশ্রমের কারণে এমন অস্বস্তি বাড়তে পারে। তবে দিনের শুরুতে কয়েকটি সহজ অভ্যাস নিয়মিত করলে হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ঠিক রাখতে সহায়তা করতে পারে।
ইন্টিগ্রেটিভ লাইফস্টাইল বিশেষজ্ঞ লুক কৌটিনহোর পরামর্শ অনুযায়ী, পেটের সুস্থতার জন্য কোনো কঠিন ডায়েট বা দ্রুত সমাধানের পেছনে না ছুটে প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসে গুরুত্ব দেওয়া বেশি জরুরি।
সকালে পানি পান করুন
ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস স্বাভাবিক বা হালকা গরম পানি পান করতে পারেন। রাতে দীর্ঘ সময় পানি না খাওয়ার পর সকালে পানি শরীরের পানির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। পর্যাপ্ত পানি হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারে আঁশ বাড়ান
সবজি, ফল, ডাল, ওটস, চিয়া সিডের মতো খাবারে ভালো পরিমাণে আঁশ থাকে। এগুলো নিয়মিত খাবারের অংশ করলে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে হঠাৎ করে অনেক বেশি আঁশ খাওয়া ঠিক নয়। ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ানো ভালো।
আদা ও মৌরি রাখতে পারেন
আদা ও মৌরি দীর্ঘদিন ধরে হজমের অস্বস্তিতে ঘরোয়া উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সকালে হালকা আদা বা মৌরি দিয়ে গরম পানি খেতে পারেন। এতে পেটের অস্বস্তি কিছুটা কমতে পারে।
চিয়া সিড খেলে আগে ভিজিয়ে নিন
চিয়া সিডে আঁশ থাকে। খাওয়ার আগে পানিতে ভিজিয়ে নিলে এটি নরম হয়ে যায়। অল্প পরিমাণ চিয়া সিড দই, ওটস বা পানিতে মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি।
সকালে একটু হাঁটুন
শুধু খাবারের দিকে নজর দিলেই হবে না। সকালে ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করুন। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা হজম ও অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।
অতিরিক্ত ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন
সকালে খুব বেশি তেল-মসলা, ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার খেলে পেট ভারী লাগতে পারে। দিনের শুরুতে সহজপাচ্য ও পরিমিত খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
খাওয়ার সময়ের দিকে নজর দিন
প্রতিদিন খাবারের সময় মোটামুটি নির্দিষ্ট রাখার চেষ্টা করুন। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এবং পরে একসঙ্গে অনেক বেশি খাবার খাওয়ার অভ্যাস হজমের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
পেটের সুস্থতা একদিনে তৈরি হয় না। পর্যাপ্ত পানি, আঁশযুক্ত খাবার, নিয়মিত হাঁটা, পরিমিত খাবার এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মতো ছোট ছোট অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বেশি কাজে দেয়। কোনো একটি খাবার বা ঘরোয়া উপায়কে পেটের সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। পেট ফাঁপা বা হজমের সমস্যা নিয়মিত হলে, খুব বেশি অস্বস্তি হলে কিংবা এর সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, বমি বা রক্তপাতের মতো সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার জন্য ৮টি অভ্যাস মেনে চললে জীবন অন্তত ২৪ বছর দীর্ঘায়িত করা সম্ভব। গবেষণাটি এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অনুষ্ঠানে গবেষণাটির কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ৪০ বছর বয়সেও যদি এসব স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়া যায়, তাতেও জীবনের সঙ্গে বাড়তি ২৪ বছর যোগ করা সম্ভব। ৫০ বছর বয়সে শুরু করলে ২১ বছর আর ৬০ বছর বয়সে শুরু করলে ১৮ বছর পর্যন্ত জীবন দীর্ঘায়িত করা সম্ভব।
ভিএ বোস্টন হেলথকেয়ার সিস্টেমের মিলিয়ন ভেটেরান প্রোগ্রামের স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ এবং গবেষণাটির প্রধান লেখক জুয়ান-মাই নুয়েন বলেন, 'স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার জন্য ২০ বছর সময়ের মধ্যে এই পরিবর্তনগুলো আনতে হবে। এগুলো ধীরে ধীরেও করা যায়, আবার সবগুলো একসঙ্গেও করা যায়।'
সেই জাদুকরী অভ্যাসগুলো কী কী? এর কোনোটিই কিন্তু একেবারে নতুন নয়। নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, চাপ বা উদ্বেগ (স্ট্রেস) কমানো, ভালো ঘুম, ইতিবাচক সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করা, ধূমপান না করা, অতিরিক্ত পানাহার না করা এবং মাদকে আসক্ত না হওয়া।
৪০-৯৯ বছর বয়সী ৭ লাখ ২০ হাজার সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষের ওপর এই গবেষণাটি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, কোনো পুরুষ যদি এই ৮টি অভ্যাসের অন্তত ১টি ৪০ বছর বয়স থেকে মেনে চলা শুরু করেন, তাহলেও তিনি বাড়তি ৪.৫ বছর বাঁচেন। ৩টি অভ্যাস রপ্ত করতে পারলে এটি বেড়ে ৮.৬ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ফলাফল পাওয়া গেছে। যদিও পুরুষের তুলনায় নারীদের কিছুটা তারতম্য রয়েছে। অন্তত ১টি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মেনে চললে নারীদের জীবন বাড়ে ৩.৫ বছর, ২টি মেনে চললে বাড়ে ৮ বছর আর ৩টি মেনে চললে বাড়ে ১২.৬ বছর।
অভ্যাসগুলো কী কী
মানুষের দীর্ঘায়ুতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে, এমন ৮টি জীবনাচরণের ক্রম করা হয়েছে গবেষণাটিতে।
১. তালিকার প্রথমেই আছে ব্যায়াম। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্বাস্থ্যের জন্য ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নুয়েন বলেন, যারা ব্যায়াম করেন না, তাদের তুলনায় যারা ব্যায়াম করেন তাদের যেকোনো কারণে মৃত্যুঝুঁকি ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত কম থাকে।
অন্যান্য গবেষণায় ফলাফলের সঙ্গেও এর মিল রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, সুস্বাস্থ্যের জন্য খুব কঠিন খেলা বা ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই। বরং কঠিন ব্যায়াম শরীরের ক্ষতিও করতে পারে।
২. দীর্ঘ জীবনের জন্য দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মাদকাসক্ত না হওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকসক্ত না হলে মৃত্যুঝুঁকি কমে ৩৮ শতাংশ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। বিশ্বের অনেক দেশেই, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।
৩. গবেষণাটিতে দেখা গেছে, কখনো তামাক গ্রহণ না করলে মৃত্যুঝুঁকি কমে ২৯ শতাংশ। যিনি আগে ধূমপান করতেন, তার জন্য এই মৃত্যুঝুঁকির হার প্রযোজ্য নয়। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলেছেন, জীবনের যেকোনো পর্যায়ে ধূমপান ছাড়লেই এর ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়।
৪. দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ তালিকার চতুর্থ অবস্থানে আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মৃত্যুঝুঁকি কমে ২২ শতাংশ। মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দুশ্চিন্তার মারাত্মক প্রভাব রয়েছে।
৫. গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবার গ্রহণ করলে দীর্ঘজীবন পাওয়ার সম্ভাবনা ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। নুয়েন বলেন, তবে এর অর্থ এই নয় যে আপনাকে পুরোপুরি নিরামিষভোজী হতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করাটাই মুখ্য।
৬. অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় পরিহার করা আরেকটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। দিনে ৪টির বেশি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় পান না করলে মৃত্যুঝুঁকি ১৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
৭. গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম ১৮ শতাংশ মৃত্যুঝুঁকি কমায়। বহু গবেষণাতেই অপর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে স্বাস্থ্যহানির সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অপর্যাপ্ত ঘুমের ফলে অনেক সময় অল্প বয়সে মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
৮. ইতিবাচক সামাজিক সম্পর্ক দীর্ঘজীবন পাওয়ার সম্ভাবনা ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্ন অবস্থা বিশেষ করে বয়ষ্ক জনগোষ্ঠির মধ্যে খুবই উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
নুয়েন বলেন, '৫ শতাংশকে হয়তো কম মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ছোট ছোট পদক্ষেপই উপকারী।'
প্রতীকী ছবি
অনেকেরই কাজের ফাঁকে বা মনের অজান্তে আঙুল 'মটকানো'-র অভ্যাস আছে। কাজের মাঝে একটানা টাইপ করতে করতে যখনই ক্লান্ত লাগে তখন আঙুল ফোটালে ‘কট’ করে এক ধরনের শব্দ হয়। এতে অদ্ভুত এক ধরনের শান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন আঙুল ফোটানোর সময় অস্থিসন্ধির ভেতরে আসলে ঠিক কী ঘটে?
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,আমাদের প্রতিটি জয়েন্টে 'সাইনোভিয়াল ফ্লুইড' তরল থাকে। আঙুলে চাপ দিলে বা বাঁকালে এই তরলে বুদবুদ তৈরি হয়ে ফেটে যায়, যাকে ডাক্তারি ভাষায় 'ক্রিপিটেশন' বলা হয়। এই গ্যাস বাবল ফেটে যাওয়ার ফলেই শব্দ তৈরি হয়।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাঝে মাঝে আঙুল ফোটালে বা হালকা শব্দ করলে জয়েন্ট বা হাড়ের কোনো বড় ক্ষতি হয় না। অনেকেই ক্লান্তি দূর করতে বা মানসিক তৃপ্তির জন্য আঙুল মটকান। কিন্তু চিকিৎসকরা বলেন, সবসময় নিয়মিত এটা না করলে ভয়ের কোনও কারণ নেই। এর সঙ্গে সরাসরি অস্থিসন্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্পর্ক নেই। তবে অনেক সময় দেখা যায় আঙুল ফাটাতে গিয়ে আঙুলে ব্যথা রয়েছে, সেটা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঝে মাঝে আঙুল ফাটানো ঠিক হলেও বদঅভ্যাসে পরিণত করলেই মুশকিল। অতিরিক্ত চাপ দিয়ে আঙুল মটকালে, খুব জোরে মোচড় দিলে বা অন্য কাউকে দিয়ে জোর করে ফোটালে লিগামেন্ট আলগা হয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত এমন করার ফলে হাতের গ্রিপ বা আঁকড়ে ধরার শক্তি কমে যায়। এমনকি লিগামেন্টে আঘাত লাগার সম্ভাবনাও থাকে। তাই আঙুল মটকানোকে বদঅভ্যাসে পরিণত না করে নিয়ন্ত্রণে রাখাই ভালো। তবে যদি ব্যথা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, বুক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে কাশি এ ধরনের উপসর্গকে অনেকেই সরাসরি অ্যাজমার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। কিন্তু সবসময় এর কারণ অ্যাজমা নয়। কখনও কখনও এসব উপসর্গের পেছনে থাকতে পারে হার্টের বা ফেইলিউর।
হৃদযন্ত্র ঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে না পারলে ফুসফুসে তরল জমতে পারে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও শোঁ শোঁ শব্দের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক সময় ‘কার্ডিয়াক অ্যাজমা’ বলা হয়। তবে এটি প্রকৃত অর্থে অ্যাজমা নয়। হিন্দুস্তান টাইমসে কার্ডিওলজিস্ট ডা. বিনয় কুমার জানিয়েছেন, হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণে হওয়া এসব উপসর্গকে সাধারণ অ্যাজমা ভেবে ভুল করা বিপজ্জনক হতে পারে।
ডা. বিনয় কুমারের মতে, কার্ডিয়াক অ্যাজমা কোনো আলাদা ধরনের অ্যাজমা নয়। বরং হার্ট ফেইলিউরের কারণে তৈরি হওয়া শ্বাসকষ্টের একটি অবস্থা। বিশেষ করে হৃদযন্ত্রের বাম পাশ দুর্বল হয়ে গেলে ফুসফুসে রক্ত ও তরল জমতে শুরু করতে পারে। রাতে শুয়ে পড়লে এই সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। ফলে রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কাশি হয় এবং বুক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যেতে পারে। অর্থাৎ, উপসর্গগুলো দেখতে অ্যাজমার মতো হলেও মূল সমস্যা হতে পারে হৃদযন্ত্রে।
সাধারণ অ্যাজমা থেকে কীভাবে আলাদা
সাধারণ অ্যাজমার ক্ষেত্রে শ্বাসনালিতে সংকোচন বা স্প্যাজম তৈরি হয়। ফলে বাতাস চলাচলের পথ সরু হয়ে যায় এবং শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার সময় শোঁ শোঁ শব্দ হতে পারে। অ্যালার্জি, পরাগরেণু, বায়ুদূষণ, ঋতু পরিবর্তন বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে অ্যাজমার সমস্যা বাড়তে পারে। আবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াও শ্বাসনালি মাঝে মাঝে সংকুচিত হতে পারে। অন্যদিকে, কার্ডিয়াক অ্যাজমার মূল কারণ হলো হার্ট ফেইলিউর এবং ফুসফুসে তরল জমা হওয়া।
কার্ডিয়াক অ্যাজমার লক্ষণ
কার্ডিয়াক অ্যাজমার উপসর্গ সাধারণ অ্যাজমার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যেতে পারে। ফলে অনেক সময় এটি সহজে শনাক্ত করা যায় না। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
> শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
> বুক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া
> দ্রুত শ্বাস নেয়া
> দীর্ঘস্থায়ী কাশি
> রক্ত মেশানো বা ফেনাযুক্ত কফ
> শ্বাস নেওয়ার সময় অস্বাভাবিক শব্দ হওয়া
> শুয়ে পড়লে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া
> রাতে ঘুম থেকে উঠে হাঁসফাঁস করে শ্বাস নেয়া
> ফুসফুসে অস্বাভাবিক শব্দ শোনা
বিশেষ করে শ্বাসকষ্টের সঙ্গে পা ফুলে যাওয়া, বুকে অস্বস্তি বা ব্যথা কিংবা হৃদস্পন্দনের অনিয়ম থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। ডা. কুমারের পরামর্শ, এমন উপসর্গ থাকলে শুধু অ্যাজমা ধরে না নিয়ে হৃদযন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা উচিত।
কারা বেশি ঝুঁকিতে: যাদের হৃদরোগ বা হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি বেশি, তাদের মধ্যে কার্ডিয়াক অ্যাজমার সম্ভাবনাও বেশি হতে পারে। ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
> উচ্চ রক্তচাপ
> ডায়াবেটিস
> হৃদ্স্পন্দনের অনিয়ম
> হাইপোথাইরয়েডিজম
> অন্যান্য হৃদযন্ত্রের রোগ
সাবধানতা : কার্ডিয়াক অ্যাজমা যেহেতু হার্ট ফেইলিউরের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ডা. বিনয় কুমার হার্ট ভালো রাখতে যেসব পরামর্শ দিয়েছেন:
> রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা।
> নিয়মিত শরীরচর্চা করুন এবং সুষম খাবার খান।
> চিকিৎসকের দেয়া হৃদযন্ত্রের ওষুধ নিয়মিত সেবন করুন।
> নিজের ইচ্ছায় ডাইইউরেটিক, রক্তচাপের ওষুধ বা অন্য কোনো হার্টের ওষুধ বন্ধ করবেন না।
> হার্ট ফেইলিউর বা শরীরে পানি জমার সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলুন।
> ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান থেকে দূরে থাকুন।
> চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
> শ্বাসকষ্টকে হালকাভাবে নয়
শ্বাসকষ্ট, কাশি বা বুক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ হলেই যে অ্যাজমা এমনটা ধরে নেয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে এসব উপসর্গের সঙ্গে পা ফুলে যাওয়া, বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি, হৃদস্পন্দনের অনিয়ম কিংবা শুয়ে পড়লে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা করানো জরুরি। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ছবি : সংগৃহীত
ঘরের ভেতরে বা অফিসে সুরক্ষিত থেকেও, প্রতিদিন অজান্তে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে চলেছে, সে বিষয়ে হয়ত অনেকেই সচেতন নয়।
আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে সারাদিন মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার কিংবা এলইডি টিভির স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার কারণে, সেখান থেকে অনবরত নির্গত হচ্ছে এক ধরনের উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন দৃশ্যমান নীল আলো, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘ব্লু লাইট’ বা ‘হাই এনার্জি ভিজিবল (এইচইভি) লাইট নামে পরিচিত।
চর্মরোগ বিজ্ঞানীদের মতে, এই কৃত্রিম নীল আলো সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির মতোই ত্বকের গভীর স্তর পর্যন্ত প্রবেশ করে অকাল বার্ধক্য এবং পিগমেন্টেশনের মতো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিসাধন করছে।
স্ক্রিনের নীল আলো যেভাবে ত্বকের ক্ষতি করে
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অফ ইনভেস্টিগেটিভ ডার্মাটোলজি’-তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ব্লু লাইট বা নীল আলো ত্বকের গভীরে ঢুকে কোষের ডিএনএ কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হসপিটালের কসমেটিক ও ক্লিনিক্যাল রিসার্চের পরিচালক ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জোশুয়া জেইচনার স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেল্থলাইন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন যে, “নীল আলোর কারণে ত্বকের ভেতরে ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ তৈরি হয়, যা প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর ফ্রি-র্যাডিক্যাল উৎপন্ন করে। এই ফ্রি-র্যাডিক্যালগুলো ত্বকের টানটান ভাব ধরে রাখা প্রধান দুটি প্রোটিন ‘কোলাজেন’ এবং ‘ইলাস্টিন’ খুব দ্রুত ভেঙে ফেলে।
ফলে বয়স ৩০ পার হওয়ার আগেই মুখে বলিরেখা পড়া, চামড়া ঝুলে যাওয়া এবং এক ধরনের কালচে ছোপ ছোপ দাগ বা ‘ডিজিটাল পিগমেন্টেইশন’ দেখা দেয়।”
স্ক্রিনের আলো থেকে ত্বক সুরক্ষার ৪টি নিয়ম
মোবাইল ও ল্যাপটপের এই অদৃশ্য ক্ষতি থেকে ঘরের ভেতরেও ত্বককে নিরাপদ রাখতে এই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়মগুলো মেনে চলার পরামর্শ দেন।
জিঙ্ক অক্সাইডযুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার
সাধারণ কেমিক্যাল সানস্ক্রিনগুলো মোবাইলের নীল আলো পুরোপুরি আটকাতে করতে পারে না।
ডা. জোশুয়া জেইচনারের মতে, “ঘরের ভেতরে থাকার সময়ও এমন সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত যাতে ‘জিঙ্ক অক্সাইড’ বা ‘টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড’ উপাদান থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মিনারেল বা ফিজিক্যাল সানস্ক্রিন’ বলে এগুলোকে। এই উপাদানগুলো ত্বকের ওপর একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে আয়নার মতো ব্লু লাইটকে প্রতিফলিত করে বাইরে ফিরিয়ে দেয়।”
আয়রন অক্সাইড যুক্ত টিন্টেড সানস্ক্রিন, নীল আলো প্রতিরোধে বেশি কার্যকর।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সেরামের ব্যবহার
নীল আলোর কারণে তৈরি হওয়া ফ্রি-র্যাডিক্যালগুলোকে ধ্বংস করতে ত্বকে প্রতিদিন সকালে ভিটামিন-সি বা ভিটামিন-ই যুক্ত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সেরাম ব্যবহার করা উপকারী।
এই উপাদানগুলো ত্বকের কোষে এক ধরনের অদৃশ্য রক্ষাকবচ তৈরি করে কোলাজেন ভেঙে যাওয়া প্রতিরোধ করে। আর অকাল বার্ধক্যের ছাপ পড়তে দেয় না।
‘ডিভাইস’-এ নাইট মোড ও ডার্ক ফিল্টার চালু করা
শুধুমাত্র প্রসাধনী মাখাই যথেষ্ট নয়, সরাসরি উৎসের আলো কমানো প্রয়োজন।
প্রতিটি স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের সেটিংসে গিয়ে ‘নাইট লাইট’, ‘আই কমফোর্ট শিল্ড’ বা ‘ডার্ক মোড’ সার্বক্ষণিকভাবে চালু করে রাখা উচিত।
এগুলো স্ক্রিন থেকে বের হওয়া ক্ষতিকর নীল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যকে কমিয়ে একটি মৃদু হলুদ আলোতে রূপান্তর করে, যা চোখ এবং ত্বক উভয়ের জন্যই নিরাপদ।
কোষের অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা ও পানি পানের নিয়ম
ডিজিটাল স্ক্রিন দীর্ঘ সময় ব্যবহারে ত্বক খুব দ্রুত তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা বা পানি হারিয়ে শুষ্ক ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
এর প্রতিকারে মস্তিস্ক ও ত্বকের কোষ সতেজ রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ দূষণ দূর করতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
পরামর্শ
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মোবাইল বা ল্যাপটপ পুরোপুরি বর্জন করা সম্ভব নয়। তবে সচেতনতাই পারে এই ডিজিটাল ক্ষতির হাত থেকে ত্বককে রক্ষা করতে।
‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ডার্মাটোলজি’র চিকিৎসকদের মতে, স্ক্রিন থেকে অন্তত এক হাত বা ১২ থেকে ১৮ ইঞ্চি দূরত্ব বজায় রেখে, ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করা এবং স্ক্রিন টাইম কিছুটা পরিমিত করে এই ডিজিটাল ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।
মারওয়া খায়ের
মারওয়া খায়েরের বাংলা শুনলে মনে হয়, সারাটা জীবন বুঝি বাংলাতেই কাটিয়েছেন। অথচ তাঁর জন্ম সৌদি আরবে, বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে। তারপরও কী সুন্দর ঝরঝরে বাংলা বলেন, গিটার বাজিয়ে পছন্দের বাংলা গানে সুর তোলেন। তাঁর গান কিংবা বাংলাচর্চা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার মতো সময় অবশ্য পাওয়া গেল না।
কেননা কিছুক্ষণ পরই তাঁকে প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্টদের (পিএসএ) প্রশিক্ষণ দিতে ছুটতে হবে। তার আগেই তাঁর পিএসএ থেকে প্রশিক্ষক হয়ে ওঠার গল্পটা শুনতে চাই।
২০১০ সালের দিকে ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকে চাকরি করতেন মারওয়া খায়ের। তার আগে ওষুধের দোকান আর মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছেন। ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর ভেবেছিলেন, এই চাকরিতেই থিতু হবেন। কিন্তু ২০০৮–০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ব্যাংকিং খাতের চাকরিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে নতুন কোনো পেশা খুঁজতে শুরু করেন।
সে সময় ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়েতে (ডিএলআর) কাজ করতেন এক বন্ধু। তিনিই মারওয়াকে রেলওয়েতে আবেদন করার পরামর্শ দেন। তুলনামূলক ভালো বেতন ও দীর্ঘমেয়াদি চাকরির নিশ্চয়তা তাঁকে এই পেশার প্রতি আগ্রহী করে।
আন্ডারগ্রাউন্ড, ওভারগ্রাউন্ড ও ডিএলআর—মূলত এই তিন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলে লন্ডনের মেট্রোরেলব্যবস্থা। এর মধ্যে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করেছে ৪৫টি স্টেশনে বিস্তৃত ডিএলআর। প্রায় ৪০ বছর আগে চালু হওয়া এই স্বয়ংক্রিয় রেলব্যবস্থা প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করে। স্বয়ংক্রিয় প্রতিটি ট্রেনে চালকের বদলে একজন করে পিএসএ থাকেন। প্রতিটি স্টেশনে ট্রেন থামার পর আবার যাত্রা শুরুর আগে দরজা নিরাপদে বন্ধ করা এবং ট্রেনকে পরবর্তী যাত্রার জন্য প্রস্তুত করা পিএসএর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পাশাপাশি যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কাস্টমার সার্ভিস দেওয়াও তাঁর কাজের অংশ। ট্রেনে নিয়মিত ঘোষণা দেওয়া, যাত্রীদের গন্তব্য খুঁজে পেতে সহায়তা করা, ম্যাপ বুঝিয়ে দেওয়া—এসবও করতে হয়।
লন্ডনে বিভিন্ন দেশের মানুষ বসবাস করেন, পর্যটকের সংখ্যাও কম নয়। বিশেষ করে ইস্ট লন্ডনে অনেক যাত্রী আছেন, যাঁদের কেউ কেউ ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন কিংবা লন্ডনের ম্যাপ বুঝতে সমস্যায় পড়েন। তাঁদের গন্তব্যে যাওয়ার পথ বুঝিয়ে দেওয়াও প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্টের দায়িত্ব। খোঁজখবর নিয়েই ডিএলআর পদে আবেদন করেন মারওয়া। ‘এখানে কাজ করতে টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড বাধ্যতামূলক নয়। প্রয়োজনীয় সবকিছুই চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়,’ বলছিলেন মারওয়া।
প্রায় চার মাসের প্রশিক্ষণ। এরপর আরও দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন। এ সময় লিখিত ও ব্যবহারিক—দুই ধরনের পরীক্ষাই দিতে হয়। সব ধাপ সফলভাবে শেষ করার পর মেলে ট্রেন পরিচালনার লাইসেন্স। ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএলআরে ট্রেন অপারেটর হিসেবে যোগ দেন মারওয়া।
প্যারালিম্পিক মশাল বহনকারী ট্রেন
রেলওয়েতে কাজ করার সিদ্ধান্তটা অবশ্য সহজ ছিল না। সবচেয়ে বড় বাধাটি নিজের পরিবার থেকেই এসেছিল। পরিবারের ধারণা ছিল, এটা ছেলেদের কাজ। মেয়েরা এ ধরনের কাজ করে না। একসময় পরিবারের মনোভাব বদলে যায়। তাঁরাই এখন মারওয়ার সবচেয়ে বড় সমর্থক।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরের বছরই মারওয়ার কর্মজীবনে আসে স্মরণীয় এক মুহূর্ত। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের সময় ক্যানারি ওয়ার্ফ থেকে প্যারালিম্পিক মশাল বহন করে স্ট্র্যাটফোর্ডে নিয়ে যাওয়া ডিএলআর ট্রেনটির অপারেটর হিসেবে তাঁকে নির্বাচিত করা হয়।
অনেক পিএসএর মধ্য থেকে মারওয়াকে বেছে নেওয়ার কারণ—যাত্রীদের উদ্দেশে তাঁর ঘোষণা দেওয়ার ধরন। তাঁর ঘোষণার কণ্ঠস্বর তত দিনে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিল। প্যারালিম্পিক মশাল বহনের সেই বিশেষ যাত্রায় বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উপস্থিত ছিল। যাত্রার বিভিন্ন মুহূর্ত ধারণ করার পাশাপাশি ডিএলআরের প্রতিনিধিত্বকারী কণ্ঠ হিসেবে মারওয়ার ঘোষণাও সেই আয়োজনের অংশ হয়ে ওঠে।
মারওয়ার সেই কণ্ঠ এখনো ডিএলআরের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। ট্রেন অপারেটরদের জন্য তৈরি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ভিডিওতে পরিচালন পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনার বর্ণনা তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়েছে।
ম্যানুয়াল ড্রাইভিংয়ের দিনগুলো
‘আমি যখন পিএসএ হিসেবে কাজ করতাম, তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ সিগন্যালিং সিস্টেম,’ বলেন মারওয়া। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের আগে ডিএলআরের সিগন্যালিং ব্যবস্থা ছিল খুবই অনির্ভরযোগ্য। এমনও হয়েছে, সিগন্যালিং-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে দিনে পাঁচ-ছয়বার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে ম্যানুয়ালি ট্রেন চালাতে হয়েছে। পরে অলিম্পিকের সময় সিগন্যালিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হয়। এরপর সিস্টেম হয়ে ওঠে অনেক নির্ভরযোগ্য।
ম্যানুয়ালি ট্রেন চালানোর অভিজ্ঞতা মারওয়ার কাছে একদিকে ছিল রোমাঞ্চকর, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জেরও। ইচ্ছা করলেই ম্যানুয়াল মোডে যাওয়া যায় না। অনুমতি ও নির্দেশনা নিয়ে নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন চালাতে হয়।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যাত্রীদের সামলানো। এসব ট্রেনে চালকের জন্য আলাদা কোনো কেবিন নেই। ফলে যাত্রীরা সরাসরি চালকের কাছে এসে কথা বলতে পারেন। কিন্তু ম্যানুয়াল ড্রাইভিংয়ের সময় চালককে পুরো মনোযোগ সামনের দিকে রাখতে হয়। ‘তাই আমরা আগে থেকেই ঘোষণা দিয়ে যাত্রীদের জানিয়ে দিতাম যে ট্রেনটি এখন ম্যানুয়াল মোডে চলছে। তাঁদের অনুরোধ করতাম, যেন আমাদের সঙ্গে কথা বলে বা প্রশ্ন করে মনোযোগে ব্যাঘাত না ঘটান। একই সঙ্গে জানিয়ে দিতাম, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার তুলনায় ট্রেনের গতি কিছুটা কম থাকবে এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগবে।’
তারপরও অনেক যাত্রী এসে প্রশ্ন করতেন—ট্রেন এত ধীরে চলছে কেন, আরও দ্রুত চালানো যাচ্ছে না কেন। তাঁদের হয়তো কোথাও পৌঁছানোর তাড়া। কিন্তু চালকের কাছে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিরাপত্তা।
রেলওয়ের কাজ করতে গেলে নানা ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে কখনো কেউ ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী ট্রেন সরিয়ে নেওয়া বা রিভার্স করার মতো কঠিন দায়িত্বও পিএসএকে পালন করতে হয়। ‘আমার কয়েকজন সহকর্মী এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁরা তখন এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তাঁদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে আমাকে নিয়ে গিয়ে ট্রেনটি সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়।’
অপারেটর থেকে প্রশিক্ষক
চার বছর ট্রেন পরিচালনার পর নতুন দায়িত্ব পান মারওয়া—অপারেটরদের প্রশিক্ষক। কাজটি ভিন্ন। এত দিন নিজে যে দায়িত্ব পালন করেছেন, এখন অন্য একজনকে সেই দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। ‘নতুন এই পেশায় টিকে থাকতে আমাকে আরও কর্তৃত্বপূর্ণ হতে হয়েছে। বিশেষ করে আমার বয়স এবং আমি একজন নারী—এই দুটি কারণে,’ বলেন মারওয়া।
পুরুষ-প্রধান কর্মপরিবেশে কখনো কখনো সরাসরি প্রতিরোধের মুখেও পড়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নারীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে—শুধু এই কারণে কোর্স ছেড়ে দিয়েছিলেন দুজন প্রশিক্ষণার্থী। আরেকজন তাঁকে সরাসরি বলেছিলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়েছি, কারণ আমি চাই না কোনো নারী আমাকে কী করতে হবে, তা বলে দিক।’ এসব অভিজ্ঞতা কষ্ট দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। শিখেছেন কোথায় সীমারেখা টানতে হয় এবং কীভাবে নিজের অবস্থানে অটল থাকতে হয়।
বর্তমানে মারওয়া ডিএলআরের একজন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক। তাঁর দাবি, তাঁর বিভাগে কর্মরত প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অপারেটর কোনো না কোনো সময়ে তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
শিকড় সিলেটে
মারওয়ার দাদাবাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। সুযোগ পেলেই দেশে যান। সর্বশেষ গত অক্টোবরে ঘুরে গেছেন। তবে দেশের মেট্রোরেলে এখনো ওঠা হয়নি—এ নিয়ে তাঁর আক্ষেপ আছে।
তাঁর বাবা প্রকৌশলী হিসেবে পেশা জীবনের বড় সময় কাটিয়েছেন সৌদি আরবে। খুব অল্প বয়সে লেখাপড়ার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। দক্ষিণ লন্ডনের বিভিন্ন স্কুল ও সিক্সথ ফর্ম কলেজে পড়াশোনা করেছেন। পরে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু করেন। চাকরির পাশাপাশি এখনো সেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানই এই শিক্ষার ব্যয় বহন করছে।
চার বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মারওয়া মনে করেন, তাঁর আজকের অবস্থানের পেছনে মা-বাবার বড় অবদান রয়েছে। মেয়েদের জন্য সুযোগ তৈরিতে তাঁরা কখনো ছেলে-মেয়ের পার্থক্য করেননি। পড়াশোনার পাশাপাশি গান, বাদ্যযন্ত্রসহ নানা বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার সুযোগও দিয়েছেন তাঁরা।
তিনি চান, নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়েরা প্রচলিত কয়েকটি পেশার বাইরেও নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে শিখুক। ডাক্তার, শিক্ষক কিংবা সংসারের গণ্ডির বাইরেও যে রেলওয়ে, প্রকৌশল, প্রযুক্তিসহ অসংখ্য পেশা তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে—সেটা তাঁরা জানুক।