ছবি : সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এই দ্বিমুখী রায়ে একদিকে যেমন সংসদের ক্ষমতার বিন্যাস নির্ধারিত হয়েছে, অন্যদিকে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে জনমত স্পষ্ট হয়েছে।
গণভোটের রায়: ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয়জয়কার
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের মানুষ অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছে। ২৯৭টি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী:
‘হ্যাঁ’ ভোট: ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি।
‘না’ ভোট: ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি।
বাতিল ভোট: ৭৪ লাখ ২ হাজার ২৮৫টি।
ভোট প্রদানের হার: ৬০.২৬ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, এই রায়ের ফলে ‘জুলাই সনদ’-এর ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগামী সংসদ আইনত বাধ্য থাকবে। উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ কয়েকটি সীমিত এলাকায় ‘না’ ভোট বেশি পড়লেও সামগ্রিক জাতীয় রায়ে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে।
সংসদের চিত্র: একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিএনপি
ত্রয়োদশ সংসদের ২৯৭টি আসনের বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
বিএনপি: ২০৯টি আসন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ৬৮টি আসন।
জোটগত অবস্থান: বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি।
অন্যান্য দল: এনসিপি (৬), বিকেএম (২), খেলাফত মজলিশ (১), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (১), গণঅধিকার পরিষদ (১), বিজেপি (১) এবং গণসংহতি আন্দোলন (১)।
জুলাই সনদ: ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের ব্যবচ্ছেদ
জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পরিচয় ও ভাষার স্বীকৃতি
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষার স্বীকৃতি নেই। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। অন্যসব মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে। বাংলাদেশের নাগরিকেরা এতদিন বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত হলেও সংস্কারের পর পরিচয় হবে বাংলাদেশি।
২. সংবিধান সংশোধন
বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে, প্রয়োজন নেই গণভোটেরও। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- সংবিধান সংশোধনে সংসদের নিম্নকক্ষে দুই তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। অন্যদিকে সংবিধানের প্রস্তাবনা- ৮, ৪৮, ৫৬ এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনে গণভোট লাগবে।
বর্তমান সংবিধানে ৭ এর ক ও খ অনুযায়ী সংবিধান রহিত করলে, সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান ছিল, জুলাই সনদে সেটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
৩. মূলনীতি
বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ বর্তমান সংবিধানের মূলনীতি। তবে গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের মূলনীতি হবে- সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সম্প্রীতি। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদে সেই অনুচ্ছেদ যুক্ত হবে- সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।
৪. মৌলিক অধিকার
সংবিধানে বর্তমানে ২২টি মৌলিক অধিকার রয়েছে। তবে জুলাই সনদে যুক্ত করা হয়েছে- নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি।
৫. জরুরি অবস্থা
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি হয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে। এর ফলে মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়। সনদে নতুন যে প্রস্তাবনা আনা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে- জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে। সেই সভায় বিরোধী দলীয় নেতা/উপনেতাও উপস্থিত থাকতে হবে। অন্যদিকে, জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারসমূহ খর্ব করা যাবে না।
৬. রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ক্ষমতা
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয় সংসদ সদস্যদের ভোটে। এই ভোট দিতে হয় প্রকাশ্যে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি তাঁর নিজ ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। যদিও এই প্রস্তাবে ভিন্নমত ছিল বিএনপির।
৭. রাষ্ট্রপতির অভিশংসন
রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ভোটের প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদে সেখানে সংসদের উভয় কক্ষের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ দুই কক্ষের দুই তৃতীয়াংশের ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে।
৮. রাষ্ট্রপতির ক্ষমা
আগে সরকারের অনুমোদনে যে কোন অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারতেন রাষ্ট্রপতি। জুলাই সনদে বলা হয়েছে- শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবার সম্মতি দিলে অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
৯. প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ
২০০৮ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চারবার শপথ নিয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা। বিদ্যমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ ছিল না। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- এক ব্যক্তি এক জীবনে ১০ বছরের বেশি অর্থাৎ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
অন্যদিকে, বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারেন। তবে জুলাই সনদে বাস্তবায়ন হলে একাধিক পদে থাকতে পারবেন না প্রধানমন্ত্রী। যদিও এই বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত জানিয়েছিল বিএনপিসহ পাঁচটি দল।
১০. তত্ত্বাবধায়ক সরকার
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান উপদেষ্টাসহ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি দল, বিরোধীদল, দ্বিতীয় বিরোধীদলের মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে।
১১. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ
স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের সংসদ এক কক্ষ বিশিষ্ট থাকলেও এবার জুলাই সনদে সেটি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ জন। এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারেই উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন করা হবে।
১২. সংসদে নারী
দেশের জাতীয় সংসদে বর্তমানে নারীদের সংরক্ষিত আসন রয়েছে ৫০টি। এটি বাড়ানোর কোনো কথা বলা নেই বিদ্যমান সংবিধানে। সেটি ক্রমান্বয়ে ১০০তে উন্নীত করা এবং সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে আসার সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই সনদে।
১৩. স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার
সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সরকারি দল থেকেই নির্বাচিত হয়ে থাকেন। গণভোটে সনদ কার্যকর হলে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন বিরোধী দল থেকে।
১৪. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদে এমপিরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়। তবে, জুলাই সনদে বলা হয়েছে- বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
১৫. বিদেশি চুক্তিতে সংসদের অনুমোদন
এতদিন বিদেশের সঙ্গে সরকারের কোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হতো না। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের উভয় কক্ষে তা অনুমোদন করতে হবে।
সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে এতদিন নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব থাকলেও গণভোটে জুলাই সনদে ইসির একক কর্তৃত্ব না রাখার কথা বলা হয়েছে। ইসির সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটিও এই দায়িত্ব পালন করবে।
১৬. নির্বাচন কমিশন গঠন
এর আগে নানা নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি থাকলেও এর নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর হাতে। জুলাই সনদে বলা হয়েছে- স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে।
১৭. প্রধান বিচারপতি নিয়োগ
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে বলা আছে রাষ্ট্রপতি যে কাউকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। তবে, জুলাই সনদের এই অংশে বলা হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে আপিল বিভাগ থেকে।
১৮. আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যা
আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যা সরকার নির্ধারণ করার কথা আছে বিদ্যমান সংবিধানে। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে প্রধান বিচারপতির চাহিদার ভিত্তিতে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। আগে হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণেও থাকলেও জুলাই সনদে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
১৯. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
এ ছাড়া বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেওয়া, প্রত্যেক বিভাগে হাইকোর্টের এক বা একাধিক বেঞ্চ স্থাপন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা, নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টে ন্যস্ত করার মতো বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে জুলাই সনদে।
২০. ন্যায়পাল ও অন্যান্য পদে নিয়োগ
এর আগে সংবিধানে থাকলেও কখনো ন্যায়পাল নিয়োগ হয়নি। জুলাই সনদে বলা হয়েছে- স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি এবং আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত সাত সদস্যের কমিটির মাধ্যমে ন্যায়পাল নিয়োগ হবে।
একইভাবে সরকারি কর্মকমিশন নিয়োগ, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগ, দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ বিরোধী দলের সমন্বয়ে আলাদা আলাদা কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদে। যদিও এগুলো নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি জানিয়েছে বিএনপিসহ সাতটি দল। সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থা বিদ্যমান আইনে না থাকলেও জুলাই সনদে তা যুক্ত করা হয়েছে।
৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কারের বাইরে আর যে ৩৭টি সংস্কার প্রস্তাব আছে জুলাই সনদে সেগুলো সংশোধন করা যাবে ’আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংসদের কমিটিসমূহ ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার, অধিকারের সীমা এবং দায় নির্ধারণের অঙ্গীকার থাকছে জুলাই সনদে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সীমানা পুনঃনির্ধারণে আইন প্রণয়ন, বিচারকদের জন্য অবশ্য পালনীয় আচরণবিধি, সাবেক বিচারপতিদের জন্য অবশ্য পালনীয় আচরণবিধি, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন, বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধি, জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থাকে অধিদপ্তরে রূপান্তর, বিচারক ও সহায়ক কর্মচারীদের সম্পত্তির বিবরণ, আদালত ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও ডিজিটালাইজ করা, আইনজীবীদের আচরণবিধি সংক্রান্ত বিষয় রাখা হয়েছে ’আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কারের জন্য।
এ ছাড়া জনপ্রশাসন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন, প্রজাতন্ত্রের কর্মে জনবল নিয়োগের জন্য সরকারি কর্ম কমিশন (সাধারণ), সরকারি কর্ম কমিশন (শিক্ষা) এবং সরকারি কর্ম কমিশন (স্বাস্থ্য) গঠন করার কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদে।
অন্যদিকে, ভৌগোলিক অবস্থান ও যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করার কথাও বলা হয়েছে জুলাই সনদে। তবে গণভোটের ব্যালটে এসব কিছু বিস্তারিত লেখা ছিল না। সেখানে মোট চারটি বিষয়ের উল্লেখ করে হ্যাঁ/না ভোট দিতে বলা হয়েছে।
গণভোটের বিষয়
প্রশ্ন: জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি ভোটারগণ সম্মতি জ্ঞাপন করেন কি না (হ্যাঁ/না) সেই বিষয়ে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ. আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হতে ডেপুটি স্পীকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে- সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।’
ঘ. জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত (Note of Dissent)
জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হলেও কয়েকটি বিষয়ে প্রধান দলগুলোর ভিন্নমত ছিল:
বিএনপির আপত্তি: প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করে রাষ্ট্রপতির এককভাবে নিয়োগ প্রদানের কিছু বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত পোষণ করেছে। এ ছাড়া উচ্চকক্ষ গঠন প্রক্রিয়া, ন্যায়পাল ও অন্যান্য সাংবিধানিক পদে নিয়োগের কমিটির কাঠামো নিয়েও তাদের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে।
জামায়াত ও অন্যান্য দল: আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি এবং উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের নিজস্ব প্রস্তাব ছিল।
আগামী দিনের পথনকশা
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। তাঁরা পরবর্তী ১৮০ দিন বা ৬ মাসের মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী সাংবিধানিক সংশোধনী সম্পন্ন করতে বাধ্য থাকবেন। এই সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত হবে।
বাংলাদেশের পাসপোর্ট-এনআইডি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ছবি: গ্রাফিক্স
প্রবাসীদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট সেবা আরও সহজ, দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে ১৭টি দেশের ২৭টি বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা চালু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে মোট ৪১টি দেশে এই নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
একই সঙ্গে ই-পাসপোর্ট, অনলাইন সত্যায়ন, ‘ই-অ্যাপোস্টিল’ এবং সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোগান্তি কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের লিখিত জবাবে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও এনআইডি সেবা দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রক্রিয়াগুলো সহজ ও স্বচ্ছ করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ই-পাসপোর্ট চালু থাকা বিদেশি মিশনগুলোতে প্রবাসীরা অনলাইনে আবেদন করতে পারছেন, নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে পারছেন এবং আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, দূতাবাস বা মিশন থেকে এনআইডি ও পাসপোর্টের মূল নথি ইস্যু করা হয় না। এগুলো ঢাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। পাসপোর্টের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে। পাসপোর্ট বিতরণের জন্য প্রস্তুত হলে আবেদনকারীকে এসএমএস অথবা ই-মেইলের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়।
খলিলুর রহমান জানান, এ পর্যন্ত ১৭টি রাষ্ট্রের ২৭টি বাংলাদেশ কূটনৈতিক দপ্তরের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন এবং এনআইডি কার্ড বিতরণের কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে মোট ৪১টি দেশে এই সেবা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
সৌদি-আমিরাতে বিশেষ নজর
বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও এনআইডি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রামের’ আওতায় ঢাকা থেকে দক্ষ কারিগরি দল পাঠিয়ে এসব দেশে সেবার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনলাইনেই সত্যায়ন, চালু ‘ই-অ্যাপোস্টিল’
প্রবাসীদের কনস্যুলার সেবা আরও সহজ করতে অনলাইন সত্যায়ন ব্যবস্থা ও ‘ই-অ্যাপোস্টিল’ চালু করা হয়েছে। এর ফলে সেবাগ্রহীতাদের সময় ও খরচের পাশাপাশি ভোগান্তিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
মন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনায় পাসপোর্ট, ভিসা এবং জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন বা সনদের তথ্য যাচাই সহজ করতে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে একটি একক ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা সমন্বিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ নিষ্পত্তিতেও অনলাইন ব্যবস্থা
প্রবাসীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সব বৈদেশিক মিশনে অনলাইন ‘গ্রিভ্যান্স রিড্রেস সিস্টেম’ চালু রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারণসহ এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তি কমানো এবং পাসপোর্ট ও এনআইডি-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করাই সরকারের লক্ষ্য।
বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে: প্রধানমন্ত্রী
বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লংঘন না করে সেজন্য সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতি যাতে গালাগালিতে পরিণত না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানান। জুলাই শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। সরকারি দল ও বিরোধীদল মিলে গালাগালির পরিবর্তে কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ার আহ্বান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে বিভেদ পরাজিত ফ্যাসিস্টদের ফিরে আসার পথ সুগম করতে পারে। এজন্য ঐক্য রাখা একান্ত কাম্য। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু ভিন্নমত যাতে শত্রুতায় পরিণত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
সরকারপ্রধান বলেন, “ফ্যাসিবাদ শাসনকালে জনগণের সব গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বাকস্বাধীনতা। বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক একটি পরিবেশ বিরাজ করছে, বাকস্বাধীনতা অবারিত। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে।”
তারেক রহমান বলেন, “আমরা যেরকম চাই না, দেশের জনগণের কাঁধে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী শাসন চেপে বসুক, যেকোনো বিবেকবান মানুষ, যেকোনো দেশপ্রেমিক রাজনীতিক অবশ্যই আমরা চাই না, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন গালাগালিতে পরিণত হয়।
“এজন্যই আমাদের সবাইকে দলমত নির্বিশেষে, আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পারিবারিক পরিবেশে আমরা যেসব কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, কেন আমরা জনপরিষদে সেসব শব্দ ব্যবহার করব? কেন আমরা জনপরিসরেও সেই শব্দগুলোকে পরিহার করব না মাননীয় স্পিকার? আপনার মাধ্যমে আমি এটি সব সদস্যের কাছে, দেশের সব বিবেকবান নাগরিকের কাছে প্রশ্ন রেখে যেতে চাই।
“আমরা যদি সত্যিকারভাবে সবাই এ ব্যাপারে একমত হই, আসুন আমরা তাহলে গালাগালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা গ্রহণ করি।”
এ সময়ে সংসদ অধিবেশনের কক্ষে সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সমর্থন জানান।
এদিন বিকাল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। মাগরিবের নামাজের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ অধিবেশন সমাপনীসংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ সংসদে পড়ে শোনান।
সমাপনীতে সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী ৭টা ৪৫ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন।
সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় গত ২৭ অগাস্ট।
‘বিরোধ-বিভেদ ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুরুজ্জীবিত করবে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘সরকারি দলই বলি, বিরোধী দলই বলি, আমরা সবাই মিলে আসুন একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলি। সে কারণে মাননীয় স্পিকার, সবসময় আমি বলার চেষ্টা করি, আমি বলে থাকি, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’।
“জনগণের কাছে আমার আহ্বান, আসুন গণতন্ত্র, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ, বিরোধ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, সেই পথকেই হয়তো সুগম করতে পারে…। এটি যেন আমরা ভুলে না যাই।”
সরকারপ্রধান বলেন, “ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই, শহীদদের প্রতি কর্তব্যের অংশ হিসেবে অবশ্যই আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।”
তিনি বলেন, “গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা— আমাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকবে। সারা পৃথিবীতেই সেটি থাকে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে। এটিও ডেমোক্রেটিক প্র্যাকটিস।
“কিন্তু ভিন্নমত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, মাননীয় স্পিকার, সে ব্যাপারে অবশ্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।”
‘সংসদ সব কর্মের কেন্দ্রবিন্দু’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সংসদকে আমরা সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করতে চাই। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের কারোরই সদিচ্ছার অভাব ছিল না, সেটি নিশ্চয়ই প্রমাণিত হয়েছে। আমরা উভয়পক্ষ দেশ এবং দেশের জনগণের স্বার্থে যে কাজ করছি, দেশ এবং দেশের জনগণের স্বার্থে যে আলোচনা করেছি ও কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করার চেষ্টা করেছি, সে ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
“এই জাতীয় সংসদকে কার্যকর এবং প্রাণবন্ত রাখার জন্য আমি আজ উপস্থিত সকল সংসদ সদস্যকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই। প্রত্যেকটি গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রত্যাশা এই জাতীয় সংসদের কাছে। এই জাতীয় সংসদে আলোচনা করে জনগণের সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব হবে; এই সংসদ তাদের জন্য শান্তি এবং সমৃদ্ধি বয়ে আনবে, এটিই জনগণের প্রত্যাশা।”
‘গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের কারণে জনগণের ভোগান্তির বিষয়ে সরকার সচেতন। এ সমস্যা হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। ফ্যাসিবাদের শাসনামলে দেশীয় সোর্স থেকে গ্যাস তোলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয়নি। খুবই আশ্চর্যের বিষয়, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ডানে এবং বামে যে প্রতিবেশী দেশগুলো আছে, তারা সমুদ্র থেকে গ্যাস তুলছে। কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় মাঝখানে বাংলাদেশ, মাঝখানে বঙ্গোপসাগর, সেই বঙ্গোপসাগর থেকে বিগত এক যুগের বেশি সময় ফ্যাসিবাদের আমলে গ্যাস উত্তোলনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয়নি।
“অনেকে বলে, বিশেষ কোনো দেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, কিংবা তারা যেন গ্যাস নিয়ে যেতে পারে, সেজন্যই বাংলাদেশ অংশে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস উৎপাদন করা হয়নি। অপরদিকে পশ্চিম এশিয়া ছিল আমাদের গ্যাস আমদানির প্রধান উৎস। এমন পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণভাবেই দেশকে জ্বালানি-নির্ভর করে ফেলা হয়েছিল।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিপক্ষে ইরানের চলমান যুদ্ধের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “সরকার গঠন করার ১০-১২ দিন পরেই মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় যুদ্ধ পরিস্থিতি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে তেল এবং গ্যাস আমদানি করা হতো, সে ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি হলো। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এই পরিস্থিতির ভেতরেই আমাদের যে দুটি এফএসআরইউ আছে, তার একটিতে ইলেকট্রিক শকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে এবং সম্পূর্ণভাবে সেই এফএসআরইউতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে এটি বিকল হয়ে যায়। এ কারণেই বর্তমানে গ্যাস এবং বিদ্যুতের জন্য সমগ্র দেশের মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।”
‘বিরোধী দলের লংমার্চ’
দেশের জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ৬ দাবিতে গত শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লং মার্চ করে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
তাদের সেই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সমস্যা সমাধানে আমরা আমাদের বিরোধীদলীয় বন্ধুদের কাছে সহযোগিতা আশা করেছিলাম। অথচ আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়িবহরের লং মার্চ আয়োজন করা হয়েছিল।
“বিভিন্ন মানুষ বাইরে একটি কথা বলে, জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কিনা? গাড়ির লং মার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।”
তিনি বলেন, “একটি কথা সবারই মনে আছে, তাও এটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, রাশিয়া ও ইউক্রেইন যুদ্ধ যখন শুরু হলো, সেই ২০২২ সালে যুদ্ধের অজুহাতে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করার জন্য, তখন অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন করে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত করা হয়েছিল। শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্কুলগুলোকে এক দিনের জায়গায় বাড়িয়ে দুই দিন ছুটি করা হয়েছিল। ব্যাংকের লেনদেনের কর্মসূচিও পরিবর্তন করা হয়েছিল।
“আমরা আগেই বলেছি, কোনো অজুহাত তুলে আমরা জনগণের দুর্ভোগ বা সমস্যার সমাধানকে এড়িয়ে যেতে চাই না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যারা ২০০৯ সাল থেকে একটানা বছরের পর বছর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল, মানুষের কথা বলার অধিকারকে কেড়ে নিয়ে, ভোটের অধিকারকে কেড়ে নিয়ে, তাদেরও, মাননীয় স্পিকার, বিদ্যুৎ সমস্যা মোকাবিলায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল বা করেছিল। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত রাখার জন্য ‘সো-কল্ড নিশ্চিত’ কুইক রেন্টাল বসানো হয়েছিল। এই কুইক রেন্টালের নামে কিছু মানুষকে সুবিধা দিয়ে এই রাষ্ট্রকে ফতুর করে দেওয়া হয়েছিল, ঋণগ্রস্ত করে দেওয়া হয়েছিল। তারপরেও তারা বিদ্যুৎ সমস্যা বা জ্বালানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান বের করে আনতে পারেনি।”
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রেক্ষাপটের বিষয়ে তিনি বলেন, “অথচ বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের ভেতরেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সেই ইউক্রেইন যুদ্ধকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন পদক্ষেপ তখন তারা নিয়েছিল, সেই ইউক্রেইন যুদ্ধ এখনো চলমান। এর মধ্যে পড়ল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি।
“এর পাশাপাশি দুটি এফএসআরইউ, দুটি এলএনজি টার্মিনাল— একটি গেল নষ্ট হয়ে। আমরা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। এসব সমস্যা বর্তমান সরকার এবং যেহেতু আমি বলেছি বিরোধী দল সরকারের একটি অংশ, আমরা সকলেই এসব সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছি।”
তারেক রহমান বলেন, জনগণের সামনে বিদ্যমান পরিস্থিতি তুলে ধরার দায়িত্ব আমাদের যেমন রয়েছে, যেহেতু জনগণ আমাদের সকলকেই ভোট দিয়ে পাঠিয়েছে, তাই আমি মনে করি, এই সংসদের প্রত্যেক সদস্য, তিনি বিরোধী দলের হোন কিংবা সরকারি দলের হোন— আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সঠিক চিত্র বা বাস্তব পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরা। প্রকৃত পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন না করে এটি যদি করার সুযোগ না হয়, তাহলে পতিত, পরাজিত, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্রই লাভবান হবে। তাহলে এতগুলো আত্মদানের কী মূল্য থাকবে?”
সরকার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা মোকাবিলায় কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, তা চলতি সংসদে তুলে ধরার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
স্পিকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “আমি আপনার মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত করে বলতে চাই, ইতোমধ্যেই আমরা যথাসম্ভব অনেকগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি এবং আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, ইনশাআল্লাহ আমরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই যে সমস্যা যাচ্ছে, যেটি গ্যাস বা বিদ্যুতের, সেই সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হব।
“দেশ এবং জাতিকে অবশ্যই আমাদের বিরোধীদলীয় বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে আমরা এ সমস্যা থেকে ইনশাআল্লাহ বের করে আনতে সক্ষম হব।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এতদিন আমরা আমদানিনির্ভর উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গ্রাহক ছিলাম। বর্তমান সরকার যে ব্যবস্থা বা যে উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা যদি আমরা ইনশাআল্লাহ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আমরা শুধু গ্রাহক নয়, বরং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক হব ইনশাআল্লাহ।
“সেই সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। কারণ আমাদের এই আত্মবিশ্বাসের কারণ হচ্ছে আমাদের অভিজ্ঞতা, আমাদের এই আত্মবিশ্বাসের কারণ হচ্ছে বিএনপির গৌরবময় অতীত ইতিহাস। বিএনপি— বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল— যতবারই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, প্রত্যেকটি বার, মাননীয় স্পিকার, দেশকে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত দেশ এবং জনগণের প্রতিটি সংকটে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি দেশের হাল ধরেছে এবং সফল হয়েছে।”
‘অর্থনীতি প্রসঙ্গে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “২০০১ সালে জনগণের রায়ে প্রত্যাখ্যাত অপশক্তি ষড়যন্ত্রের পথ ধরে, যে কথাটি মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা একইভাবে বলেছেন, ২০০৯ সালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আবার রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে। তারা জনগণের অধিকারকে কেড়ে নেয়। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট দেশ ছেড়ে পালানোর আগে পর্যন্ত তাদের দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের কারণে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অপবাদ সইতে হয়েছে। এই ঋণখেলাপির অভিশাপ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার দায়িত্ব এখন বিএনপির কাঁধে পড়েছে।
“এরা পালিয়ে গিয়েছে, কিন্তু এই ঋণ রেখে গিয়েছে এই দেশের কাঁধে, এই দেশের জনগণের কাঁধে। যারা পালিয়ে গিয়েছে, তারা শুধু ঋণখেলাপিই করেনি, বরং ঋণখেলাপির পরিমাপের যে হিসাব-নিকাশ, সেটির মধ্যেও তারা জালিয়াতি করেছে। এমন পরিস্থিতিতেই বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অভিশাপ থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বর্তমানে ঋণখেলাপির অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে। বিগত নির্বাচনের পরে যেখানে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেখানে এটি নেমে এসেছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে। অর্থাৎ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে শুরু করেছে বর্তমান বিএনপি সরকারের অধীনে।”
তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্ট চক্রের অনাচার, লুটপাট, দুর্নীতি— এসব উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কলঙ্ক থেকে বিএনপি যেভাবে বাংলাদেশকে মুক্ত করে নিয়ে এসেছিল, একই চক্রের কারণে ২০২৪ সালে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঋণখেলাপির যে কলঙ্ক, এর থেকেও বিএনপি বাংলাদেশকে ইনশাআল্লাহ মুক্ত করে নিয়ে আসবে।
“বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত একটি রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি। যারা বাংলাদেশকে ঋণের ভারে জর্জরিত করেছে, তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে; কিন্তু বাংলাদেশকে এখনো সেই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার গত পাঁচ মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল এবং সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লাখি ডলার পরিশোধ করেছে। যদিও ফ্যাসিবাদের লুটতরাজ, টাকা পাচারের কারণে এখনো দেশের কাঁধে, জনগণের কাঁধে হাজারো কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ বাকি রয়ে গেছে।”
আজ দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের ম্যানেজিং কমিটির ১২ সদস্যের একটি দল রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণতন্ত্রের মূল শক্তি হচ্ছে গণমাধ্যম। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে গণমাধ্যমকেও বাঁচাতে হবে। গণমাধ্যমকে সঠিক পথে থেকে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সুশাসনের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
আজ দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ম্যানেজিং কমিটির ১২ সদস্যের একটি দল রাষ্ট্রপতির সাথে বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি এ কথা বলেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাথে সম্পর্কের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রেস ক্লাবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক। আমার সবচেয়ে দুঃসময়ে আপনারা আমার পাশে ছিলেন, যা আমার জন্য বিরাট প্রাপ্তি।
এ সময় তিনি সাংবাদিকদের কল্যাণে সার্বিক সহযোগিতা করার আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমার জায়গা থেকে আপনাদের জন্য যেটুকু করার আছে, আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, আমি সেটুকু করার চেষ্টা করবো।
সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ঐক্য অত্যন্ত জরুরি, বিভক্তি কখনো সাফল্য এনে দিতে পারে না। আপনারা মৌলিক জায়গাগুলোতে এক হতে পারলে সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গেও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবেন।’
এ সময় তিনি নিজেদের সুরক্ষার জন্য এবং অনিয়ম ও গণহারে সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
একইসাথে রাষ্ট্রপতি সংবাদকর্মীদের কর্মসংস্থানের সংকট নিরসনে বন্ধ হয়ে যাওয়া পত্রিকাগুলো পুনরায় চালু করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘বন্ধ পত্রিকাগুলো, বিশেষ ট্রাস্টের অধীনে থাকা পত্রিকাগুলো পুনরায় চালু করা গেলে অন্তত ১ হাজার সাংবাদিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
এসময় তিনি দৈনিক বাংলা-সহ বন্ধ থাকা অন্যান্য পত্রিকা পুনরায় চালু করার উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান।
তিনি দেশে গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে তরুণ প্রজন্মের মন-মানসিকতা পরিবর্তনে সাংবাদিকদের কাজ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র হচ্ছে একটা সংস্কৃতি। একে প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে। সেজন্য মন-মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন করতে হবে। পুরোনো কর্তৃত্ববাদী চিন্তা-ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের মধ্যেও গণতান্ত্রিক ভাষা ও মানসিকতা তৈরি করা জরুরি। আন্দোলন করে পরিবর্তন আনার পরও যদি পুরোনো মানসিকতা থেকে যায়, তাহলে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব হবে না।’
এ সময় তিনি সরকারের যৌক্তিক ও গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের ভালো কাজগুলো গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে যথাযথভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, জনগণের নির্বাচিত সরকারকে কাজ করার জন্য সময় দিতে হবে। এ সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধসহ বৈশ্বিক কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের কথা যথাযথভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
একইসাথে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি এই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করেন।
তিনি দেশের গণমাধ্যমের প্রাণকেন্দ্র এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সরকারের সাথে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর জোর দেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ উপস্থিত অন্য সদস্যদের রাষ্ট্রপতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। এ সময় তিনি রাষ্ট্রপতিকে সুবিধাজনক সময়ে প্রেস ক্লাবে আমন্ত্রণ জানান।
প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, প্রেস ক্লাবে আপনি আমাদের পরিবারের একজন সদস্যের মতো ছিলেন। আমরা গর্বিত ও আনন্দিত যে, প্রেস ক্লাবেরই একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
সদস্য কাদের গনি চৌধুরী বিগত সময়ের অপসাংবাদিকতার কথা তুলে ধরেন এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ধারা অব্যাহত রাখতে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছর সাংবাদিকদের ওপর যে ধরনের বাধা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল, তাতে সাংবাদিকতার সংজ্ঞাই পরিবর্তন করতে হয়েছিল। কিন্তু গত কিছুদিনে আমরা মুক্তভাবে লিখতে পারছি, মুক্তভাবে বলতে পারছি। এই স্বাধীনতা যেন অক্ষুণ্ন ও অব্যাহত থাকে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকরা আপনাদের সামনে সত্যটা তুলে ধরেন। আপনারা অন্যান্য জায়গায় হয়তো সবসময় আপনাদের খুশি রাখার মতো কথা শুনবেন। কিন্তু সত্যটা জানতে হলে সাংবাদিকদের কাছে আসতে হবে। এই পথ যেন অব্যাহত থাকে, এই স্বাধীনতা যেন অক্ষুণ্ন থাকে।
এ সময় তিনি সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকদের কল্যাণে দ্রুত দশম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকার ও রাষ্ট্রপতির নিকট সহযোগিতা কামনা করেন।
সদস্য সৈয়দ আবদাল আহমদ এ সময় রাষ্ট্রপতির সাথে অতীতের স্মৃতিচারণ করেন এবং গণতন্ত্র রক্ষায় রাষ্ট্রপতির ত্যাগ ও অবদানের কথা স্মরণ করেন।
উপস্থিত সাংবাদিক নেতারা এ সময় প্রেস ক্লাবের অবকাঠামো সম্প্রসারণে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা কামনা করলে রাষ্ট্রপতি সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের পক্ষে প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও) সৈয়দ আবদাল আহমদ, কোষাধ্যক্ষ বখতিয়ার রাণা, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও মাসিক সরগম-এর সম্পাদক কাজী রওনাক হোসেন, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য শাহনাজ বেগম পলি, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মাসুমুর রহমান খলিলী, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য এ কে এম মোহসিন এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মোমিন হোসেন।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব ও প্রেস সচিবসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান আজ তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি ও সমসাময়িক বিষয়ে সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।
ভারতে পলাতক শেখ হাসিনাকে দেশটির প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার দেওয়ার সুযোগ দেওয়াকে অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ও ইরিটেটিং (অস্বস্তিকর) বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখতে ভারত সরকারের উচিত সেখানে বসে তাকে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখা। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।’
আজ দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি ও সমসাময়িক বিষয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর নিশ্চিত করেছেন যে শেখ হাসিনার আর আপিল করার সুযোগ নেই। তাকে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় অনুযায়ী সাজা কার্যকর করাই এখন সরকারের লক্ষ্য।’
ভারত সরকার যেন তাকে মিডিয়াতে কথা বলতে না দেওয়ার মাধ্যমে সম্পর্কের উন্নয়নে পজিটিভ সিগন্যাল দেয়—সে বিষয়ে নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান।
অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি মাফিয়া গ্যাং। তাদের মধ্যে নূন্যতম অনুশোচনা নেই।’
এ ঘটনায় যুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং সরকার কাউকে ছাড় দেবে না বলে জানান তিনি।
সরকারি চাকুরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইবা) নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে বা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য নয়, বরং দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই সরকার এই পরিবর্তন এনেছে।
নতুন বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, বোয়িং কেনার অর্থ সরকারকে এখনই এককালীন পরিশোধ করতে হচ্ছে না, ধাপে ধাপে দীর্ঘ সময় ধরে এই পেমেন্ট দেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এয়ারবাস’ থেকেও বিমান ক্রয়ের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের দীর্ঘসূত্রিতার সমালোচনা করে ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টা বলেন, দেড় বছর সময় পাওয়া সত্ত্বেও বিগত সময়ে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে বর্তমান সরকারকে দ্রুততম সময়ে জনগণের সাময়িক ক্রাইসিস কমাতে চীনের সাথে চুক্তিসহ জরুরি পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী ‘এল নিনো’ আবহাওয়া পরিস্থিতির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তবে বর্তমানে দেশে ইতিহাসের যে কোনো সময়ের চেয়ে খাদ্যের সর্বোচ্চ মজুদ রয়েছে। সম্ভাব্য খাদ্য সংকট সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে।
ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আবদুল ওয়াদুদ এবং তথ্য অধিদপ্তরের উপ-প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নেত্রকোনার কলমাকান্দা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ছবি : পিএমও
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজেদের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। নিজেদের ঘরবাড়ি ও আশপাশে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।’
আজ মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে নেত্রকোনার কলমাকান্দা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
একই সঙ্গে পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধুলা করা এবং প্রাণী ও জীবজন্তুর প্রতি যত্নশীল হওয়ার পরামর্শও দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এ কথা জানান।
পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস নিজের পরিবার থেকেই শুরু করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘তোমরা নিজেরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে এবং পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও প্রতিবেশীদেরকেও সচেতন করবে। তোমাদের ছোট ছোট উদ্যোগই একটি পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।’
সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খোঁজখবর নেন। তারা কোন শ্রেণিতে পড়ে, কীভাবে পড়াশোনা করছে এবং ভবিষ্যতে কী হতে চায়; এসব বিষয়েও তাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
পড়াশোনার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু পাঠ্যবইয়ে মনোযোগ দিলেই হবে না; সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে নিয়মিত খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করতে হবে। সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হবে এবং নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’
মানুষের পাশাপাশি প্রাণী ও জীবজন্তুর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের চারপাশের অসহায় ও অবলা প্রাণীদের প্রতিও যত্নবান হতে হবে। কোনো প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা যাবে না। জীবজন্তুর প্রতি মমতা ও দায়িত্ববোধ মানবিক সমাজের পরিচয়।’
ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ৪২ জন শিক্ষার্থী আজ জাতীয় সংসদের অধিবেশন দেখতে সংসদ ভবনে আসেন।
তাদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের পাঁচজন শিক্ষক এবং পরিচালনা কমিটির দুজন সদস্যও ছিলেন। সংসদ অধিবেশন প্রত্যক্ষ করার একপর্যায়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ ও উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পরামর্শ নিজেদের জীবনে অনুসরণ করার পাশাপাশি পরিবার, বিদ্যালয় ও এলাকার মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন তারা।
আজ রাজধানীর ধানমন্ডি লেকে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম। ছবি: সংগৃহীত
দেশের কোনো জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশা চলাচলের কোনো ধরনের আইনি সুযোগ নেই বলে পরিষ্কার জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম।
তবে দেশের একটি বিরাট অংশের মানুষের জীবন-জীবিকা ও কর্মসংস্থান এই পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তাঁদের মানবিক দিক বিবেচনা করে ধাপে ধাপে একটি টেকসই ও শৃঙ্খলাবদ্ধ নীতিমালার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
জীবন-জীবিকার বিষয় থাকায় অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ নেই। তবে অটোরিকশার সঙ্গে অনেক মানুষ সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ায় বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি তাদের জীবন-জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আজ রাজধানীর ধানমন্ডি লেকে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। সামাজিক সংগঠন ধানমন্ডি ইয়ুথ ক্লাব এই পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির আয়োজন করে।
সড়ক মন্ত্রী জোরালো কণ্ঠে বলেন, ‘সরকার কোনোভাবেই মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলের পক্ষে নয় এবং এটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে একাধিক সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে অটোরিকশা ঠিক কোন পরিসরে চলবে এবং কোথায় কোনোভাবেই চলাচল করতে পারবে না—এ বিষয়ে সর্বজনগ্রাহ্য একটি সমন্বিত নীতিমালা চূড়ান্ত করা এখন সময়ের দাবি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলের সম্পূর্ণ বিরোধী। আমরা এটি দ্রুততার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করছি। অটোরিকশা স্থানীয় বা ফিডার রোডে কীভাবে চলবে এবং মহাসড়কে এর অনুপ্রবেশ কীভাবে বন্ধ থাকবে—নীতিমালায় তার স্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন।’
শেখ রাবিউল আলম জানান, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সকল স্টেকহোল্ডারের যৌথ সমন্বয়ে নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। তবে সেই নীতিমালায় কোনোভাবেই জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলের আইনি অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
হঠাৎ চরম সিদ্ধান্ত না নিয়ে কেন পর্যায়ক্রমে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—তার ব্যাখ্যায় মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের লাখ লাখ সাধারণ মানুষ সরাসরি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তারাও আমাদেরই সমাজের অংশ। ফলে হঠাৎ একক সিদ্ধান্তে গাড়ি বন্ধ করে দিলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই শুধু যানবাহন বন্ধ করাই মূল সমাধান নয়; বরং বিকল্প কর্মসংস্থান ও শৃঙ্খলিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের কারণে যারা সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, তাদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সরকার সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি রাখবে। তাদের কীভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত কোনো স্থানীয় রুটের আওতায় আনা যায় কিংবা শৃঙ্খলার মধ্যে আনা যায়-সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।’
পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, নির্ধারিত কোনো আঞ্চলিক বা অভ্যন্তরীণ সড়কে অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি থাকলেও চালকের নূন্যতম ড্রাইভিং দক্ষতা ও বয়সের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের কাজের পরিধি উল্লেখ করে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজই হলো উচ্চমানের রাস্তা ও মহাসড়ক নির্মাণ, সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা। সে অনুযায়ী কাজ দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মহাসড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে এককভাবে শুধু সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় দায়ী নয় উল্লেখ করে শেখ রাবিউল আলম বলেন, হাইওয়ে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও হাইওয়ে পুলিশ জড়িত। সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে মহাসড়কের কোনো বিশৃঙ্খলা বা অনিয়মের পুরো দায়ভার এককভাবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয়; কারণ সার্বিক আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে ধানমন্ডি ইয়ুথ ক্লাবের সভাপতি ও ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শেখ খালিদ হাসান জ্যাকীর সভাপতিত্বে সংগঠনটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।