হযরত শাহজালাল (রহ:) মাজারে ব্রিটিশ হাই কমিশনার
স্মৃতি মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। স্মৃতি মানুষকে সুখ দেয় এবং দুঃখও দেয়। তেমনি এক স্মৃতি নিয়ে আমি বেঁচে আছি। ২০০৪ সালের ২১ মে শুক্রবার হযরত শাহজালাল (রহ:) এর মাজার জিয়ারতে আসেন তৎকালীন বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী। এ সময় তিনি সহ আমরা অনেকেই গ্রেনেড হামলার শিকার হই। গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি আজও ভুলতে পারিনি। ঘটনাটি আমাকে বার বার পীড়া দেয়। এ ভয়াবহ ঘটনার দীর্ঘ ২২ বছর অতিবাহিত হচ্ছে।
তারপরও মনের ওই ভয়ংকর স্মৃতি আজও মন থেকে চলে যায়নি। ঘটনার দিন হযরত শাহজালাল (রহ:) মাজার প্রাঙ্গণে গেলে বৃটিশ হাই কমিশনারের সাথে গ্রেনেড হামলার শিকার হই। দীর্ঘ ১৮ দিন এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরলেও এখনও পায়ে ও হাতে অসংখ্য প্লিন্টার নিয়ে অসহ্য যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে জীবন ধারণ করছি। আজও সেই ২১মে’র দিনটি আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সেই ভয়ংকর ঘটনার কথা।
সিলেটের ইতিহাসে ২০০৪ সালের ২১ মে নির্মম একটি দিন। এ দিনে আমাদের গৌরব সিলেটি বংশোদ্ভুত বৃটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীসহ সরকারী কর্মকর্তা, আইনজীবী সাংবাদিকসহ সিলেটের অনেক মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয় হযরত শাহজালাল (রহ:) মাজার প্রাঙ্গণ। এ ঘটনার বিচারও হয়েছে।
২১ মে শুক্রবার ২০০৪ সাল। সকাল ১১টা। গোসল সেরে বের হই হযরত শাহজালাল (রহ:) মাজার প্রাঙ্গণের উদ্দেশ্যে। তখন সিলেটের প্রাচীনতম পত্রিকা দৈনিক যুগভেরীতে কাজ করতাম। বাসা ছিল নগরীর মীরবক্সটুলায়। বাসা থেকে হেটে হেটে যাত্রা শুরু করি। তখন সম্ভবত বেলা ১২ টা বা তার চাইতে বেশি হবে। হযরত শাহজালাল (রহ:) দরগা প্রাঙ্গণের প্রধান ফটকের কাছে গিয়ে দেখি তৎকালীন সিলেটের জেলা প্রশাসক আবুল হোসেন ও তার গানম্যান জীবন মিয়াকে নিয়ে দাঁড়ানো। এ এলাকায় তেমন পুলিশ মোতায়েন করা হয়নি।
তখন আমি সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে একজন পুলিশকে জিজ্ঞেস করলাম কোনো ভিআইপির আসবেন না কি? জবাবে বৃটিশ হাই কমিশনারের আগমন সম্পর্কে জানলাম। তবে আগে জানতাম তিনি সিলেট আসছেন। মনে হয় দরগায় আসাটা স্বাভাবিক। কারণ যেকোনো ভিআইপি সিলেট আসলে দরগাহ হযরত শাহজালাল (রহ:) এর মাজারে আসেন। এ বিষয়ে আগের দিন অফিসেও আলোচনা হয়েছে তার সফরসূচি নিয়ে। শহরের অভ্যন্তরে আমাকেও নিউজ কভার এর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তবে মাজারে আসবেন এটা আমাকে নিশ্চিত করা হয়নি। যাক দরগার অবস্থানের কিছু সময় যাওয়ার পর তৎকালীন বৃটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী সেখানে আসলে জেলা প্রশাসক আবুল হোসেন তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে শাহজালাল (রহ:) মাজারে নিয়ে যান। তখন ব্রিটিশ হাই কমিশনারের সাথে কুশল বিনিময় করে পরিচয় দিই। তাকে কেমন আছেন বললে, তিনি ভাল আছেন বলে জানান। সিলেটি ভাষায় তিনি একথা বলেন। তারপর তাকে মাজারে জিয়ারতে নিয়ে যাওয়া হয়। মাজার জিয়ারত শেষে হযরত শাহজালাল (রহ:) মসজিদে ঢুকে প্রথম কাতারে জুমার নামাজ আদায় করেন।
তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী হযরত শাহজালাল (রহ:) মাজারে জুমার নামাজ শেষে প্রচন্ড ভীড়ের মধ্যে বের হন। এ সময় আমিও মসজিদের প্রধান সিড়ি থেকে নামার সময় তার কাছ থেকে কুশল বিনিময় করে বিদায় নেই। উৎসুক জনতা তাদের প্রিয় হাই কমিশনার বের হওয়ার সাথে সাথে কমমর্দন করতে থাকেন। তিনি যখন মসজিদের সিড়ি থেকে নামেন তখন আমি মহিলা ইবাদতখানার সামনে ছিলাম। তিনি মানুষের ভিড়ের জন্য করমর্দন করতে করতে এগুতে পারছিলেন না। মানুষ আর মানুষ। সবাই চায় প্রিয় হাই কমিশনার এর সাথে করমর্দন করতে।
আমি প্রধান ফটকের বাম দিকের একটি রাস্তা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করি, সেখানেও মানুষের ভিড়। তারপর আর এদিকে যাওয়া হলো না। কারণ প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে বিপুল মানুষের উপস্থিতি হয় দরগাহ মসজিদে। তাই বাধ্য হয়ে প্রধান ফটক দিয়ে যাওয়ার জন্য সামনে আসলাম। তখন আমি মাজার প্রাঙ্গণে খেজুর গাছের পাশে ছিলাম। ইচ্ছা এখন সামনের দিকে যাওয়ার।
তারপর হঠাৎ বিকট শব্দ হলো। কালো ধোয়ায় চারদিক আচ্ছন্ন। বারুদের গন্ধে ও বিকট শব্দ নাক মুখ কান যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। দু’পা তখন মনে হয় অবশ হয়ে গেছে। তখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। কিছু বলতে পারছিনা। পায়ে জ্বালা পোড়া শুরু হয়ে গেছে। সে সময় বোঝা গেছে যে আর বাঁচবো না। কাত হয়ে মাজার প্রাঙ্গণে পড়ে থাকলেও কেউ কাছে আসছেন না। তখন জ্ঞান থাকতে আমি ফোন করি যুগভেরীর তৎকালীন ফটো সাংবাদিক শেখ আশরাফুল আলম নাসির এর মোবাইলে। তখন তিনি ফোন কেটে দেন।
তারপর ফোন করি তৎকালীন যুগভেরীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আজিজ আহমদ সেলিমকে। তিনি ফোন ধরলে আমি বলি মাজারে গ্রেনেড হামলা হয়েছে। আমিও আহত হয়েছি। তারপর আর কিছু বলতে পারি না। কিছু হুশ হলে দেখি এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪র্থ তলায় বারান্দায় পড়ে আছি। পুলিশ ও জনগণ আমাকে হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা চালাচ্ছেন। তখন আমার রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এ সময় দেখি আমাদের এলাকার আকিলপুর গ্রামের সফিক আহমদ নামের এক যুবক হাসপাতালের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছে। সে আমার অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে বলে কী হয়েছে?
তখন তাকে আমার পকেটে থাকা মোবাইল বের করতে বলি এবং আমার বাড়ীর মোবাইল নম্বর দেখিয়ে বাড়ীতে জানাতে বলি। তারপর সফিকের সাথে পুলিশসহ অন্যান্য লোকজন আমাকে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪র্থ তলার ৪নং ওয়ার্ডে মেঝেতে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। আমাকে মেঝেতে ফেলে রাখলেও কোন ডাক্তার তখন আসেননি। এ সময় আবার প্রচুর রক্তকরণ হচ্ছে।
মাজার প্রাঙ্গণ থেকে ওসমানী হাসপাতাল পর্যন্ত কিন্তু প্রচুর রক্তকরণ হয়েছে। এতে আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। তারপর ওসমানী হাসপাতালে তখনকার দৈনিক যুগভেরীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মরহুম আজিজ আহমদ সেলিম, জাবের আহমদ চৌধুরী ও সাংবাদিক মির্জা সোহেল আমাকে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করেন। তখন আমাকে প্রচুর স্যালাইন দেওয়া হয়। তারপর রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। আমার মনে কিছুটা শান্তি আসে এবং কখন ঘুমিয়ে পড়ি তা বলতে পারি না। তারপর বাড়ি থেকে আমার আত্মীয় স্বজন আসেন। হাসপাতালে দীর্ঘ ১৮ দিন চিকিৎসাধীন ছিলাম। এ সময় আমার ডান পায়ের উরুতে মেজর অপারেশন করে গ্রেনেডের অংশ বের করা হয়। এটা ছিল বড় আকারের। তারপরও শরীরের অনেক স্থানে প্রিন্টার রয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে অনেক গণ্যমান্য লোকজন আমাকে দেখেন ও সান্ত্বনা দেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বষির্য়ান আওয়ামীলীগ নেতা মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ, সাবেক নৌ পরিবহন মন্ত্রী মরহুম মরহুম আকবর হোসেন, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের হুইপ মরহুম ফজলুল হক আসপিয়া, আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতা প্রয়াত সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম আবুল মাল আবদুল মুহিত, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম ইনাম আহমদ চৌধুরী, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মরহুম বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, নিখোজ বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি এম. ইলিয়াস আলী, জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি মরহম আ.ন.ম শফিকুল হক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম ইফতেখার হোসেন শামীম,
কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলার সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, আওয়ামলীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুর রহমান, সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামীলীগ নেতা মো. আশফাক আহমদ, সিলেট সিটি করর্পোরেশন এর সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি বদরুজ্জামান সেলিম, মহানগর আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি আব্দুল খালিক, কাউন্সিলর মখলিছুর রহমান কামরান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাটির সিলেট ইউনিটের সেক্রেটারী আব্দুর রহমান জামিল, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, বিএনপি নেতা আব্দুল মালেক খান, সাবেক মহানগর আওয়ামীলীগ নেতা মরহুম আলহাজ্ব মাহমুদ হোসেন মঞ্জু, এডভোকেট কল্যাণ চৌধুরী, সিলেট ল কলেজের সাবেক জিএস মো. আলমগীর হোসেন, সুরমা বয়েজ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও যুব সংগঠক আনোয়ার হোসেন, সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্টির নেতৃবৃন্দ, বৃটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাষ্ট্রির নেতৃবৃন্দ, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সিলেট ইউনিটের নেতৃবৃন্দ, সিলেট প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ, বিএমএ’র নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাসহ সাংবাদিক সহকর্মীরা।
এ ছাড়া সুরমা বয়েজ ক্লাবের সভাপতি বিশিষ্ট শিল্পপতি আফজাল রশীদ চৌধুরী বিশেষভাবে খোঁজ খবর নিয়েছেন। তারা আমার খোজ খবর নেন ও আশু সুস্থতা কামনা করেন। সকলের দোয়ায় আমি বেঁচে গেলেও বুক, হাত ও পায়ে অনেক প্লিন্টার নিয়ে জীবন যাপন করছি। এগুলোর জন্য হাতে ও পায়ে মাঝে মধ্যে যন্ত্রণাও হয়। এ গ্রেনেড হামলার ঘটনায় এতো রক্তকরণ হওয়ায় আমার শরীর রক্তে ভেসে গিয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল হয়তো আমি আর বাঁচব না। কিন্তু আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে শরীরে প্লিন্টার নিয়ে এখনও বেঁচে আছি।
হাসপাতালে থাকাকালীন পুলিশ, সিআইডিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকরা দেখা করেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
সাবেক ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর হামলার ২২ বছর অতিক্রম হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার ৫ জনের মধ্যে ৩ জনের ফাঁসি কার্যকর ও দু’জনের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডের রায় হয়েছে। বিস্ফোরক মামলার বিচার আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ ঘটনায় সিআইডি পুলিশ আমাদের আহতদের বিভিন্নভাবে স্বাক্ষ্য নিয়েছে। ঘটনাস্থলে এনে সাক্ষীদের ডামি ছবি তুলেছেন। এছাড়া আমার কাছ থেকে স্থানীয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এ বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর সাথে গ্রেনেড হামলার দীর্ঘদিন পর কোতোয়ালী থানার এক এসআই নোটিশ দেন কোতোয়ালী থানায় উপস্থিত হওয়ার জন্য। রাষ্ট্রীয় কাজের স্বার্থে কোতোয়ালী থানায় গেলে সিআইডির তৎকালীন এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান, তৎকালীন কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতে আমিসহ কয়েক জন আহত লোকের সাক্ষ্য নেন এবং আহতদের একটি গাড়ীতে করে দরগাহ গেইট প্রাঙ্গণে নিয়ে আসেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সবাই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে ডামি ছবি তুলতে হবে। তখন আমরা সেদিনের অবস্থানের ডামি ছবি তুলতে যাই এবং আমাদের বক্তব্যও তিনি রেকর্ড করেন। তখন আমরা এ ঘটনার সুবিচার দাবি করি। তারপর সিলেট বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৫ম আদালত ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল৬ এ হত্যা ও বিস্ফোরন মামলার স্বাক্ষ্য প্রদান করি।
তবে সিলেট বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ৩ জনের ফাঁসি ও দু’জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন এবং তা কার্যকরও হয়েছে। এছাড়া সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৫ম আদালত ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৬ এ চার্জশীট ভূক্ত আমরা ৫৬ জন স্বাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। পরে মামলাটি অধিকতর তদন্তে চলে যায়। তারপর আরো ২জনকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়।
এ মামলাটি প্রথমে সিলেট চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত ও মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচার চলে। বর্তমানে মামলাটি স্থানান্তর হয়ে জন নিরাপত্তা বিঘ্নকারি অপরাধ নিরোধ ট্রাইব্যুনালে বিচারধীন রয়েছে। এ রকম জঘন্য ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে এবং প্রাণহানীসহ আমাদের মতো মানুষের যাতে প্রাত্যহিক যন্ত্রণা পেতে না হয় তা চাই।
পূর্বশত্রুতার জেরে যুবদল নেতা রাসেলসহ তিনজনের ওপর হামলা ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণের আংটি, হাতঘড়ি ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে।
আজ বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার রূপগঞ্জ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাগবেড় সিটি মার্কেটের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
আহত রাসেল (৪৪) রূপগঞ্জ থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে জানান, তিনি তাঁর ভাগিনা জসিম (৩৯) ও বন্ধু শামীম ভূঁইয়াকে (৪৯) সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে গোলাকান্দাইলের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন।
বাগবেড় সিটি মার্কেটের সামনে পৌঁছালে সাব্বির (২৩), কামরুল (৪৫), সোহান (২৩), ইয়ামিন (২৪), জিহাদ (২৪) ও রাব্বিসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন তাদের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করেন।
অভিযোগে রাসেল দাবি করেন, অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালান। এ সময় তাঁকে লোহার রড ও স্টিলের পাইপ দিয়ে মারধর করা হয়। হামলায় তাঁর মাথা ও হাতে গুরুতর জখম হয়। তাঁর ভাগিনা জসিমকে গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা এবং মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একই ঘটনায় শামীম ভূঁইয়াও আহত হন।
রাসেলের অভিযোগ, হামলার একপর্যায়ে তাঁর হাত থেকে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের স্বর্ণের আংটি ও ১৫ হাজার টাকা মূল্যের হাতঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। এ ছাড়া জসিমের কাছে থাকা ড্রেজার ব্যবসার ১ লাখ টাকা এবং শামীমের ব্যবহৃত প্রায় ২৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি স্যামসাং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাদের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় আহত তিনজনকে উদ্ধার করে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে চিকিৎসা নেন। এ ঘটনায় রাসেল রূপগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এইচ এম সালাউদ্দিন বলেন, “হামলার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
ছবি : সংগৃহীত
সিরাজগঞ্জ জেলা শহরের হোসেনপুরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বাসভবনের প্রধান ফটকে বজ্রপাতের পর গ্যাসের রাইজারে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।
ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত তৎপরতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। আজ বুধবার দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের দিকে আল মাহমুদ এভিনিউয়ে মন্ত্রীর বাসভবনে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, দুপুরে বৃষ্টির সময় হঠাৎ বিকট শব্দে বাসভবনের প্রধান ফটকে বজ্রপাত হয়। এতে গেটের পাশে থাকা ডাবল চেইন গ্যাসলাইনের রাইজারে মুহূর্তেই আগুন ধরে যায়।
আগুনের শিখা দেখতে পেয়ে বাসভবনের নিরাপত্তাকর্মী মো. শফিকুল ইসলাম দ্রুত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ ও ফায়ার সার্ভিসের স্থানীয় কন্ট্রোল রুমে খবর দেন। খবর পেয়ে সিরাজগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট দুপুর ১টা ১৭ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। প্রায় পাঁচ মিনিটের চেষ্টায় দুপুর ১টা ২৩ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে।
সিরাজগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের স্টেশন অফিসার মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, বজ্রপাতের আঘাতে গ্যাসের রাইজারে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোয় বাসভবন ও আশপাশের প্রায় দুই লাখ টাকার সম্পদ অক্ষত অবস্থায় রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এতে সামান্য অবকাঠামোগত ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
প্রতীকী ছবি
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় ছাগলে শিমগাছ খাওয়াকে কেন্দ্র করে কুলছুমা (৩০) নামে এক নারীর শরীরে ফুটন্ত গরম ভাতের মাড় ঢেলে ঝলসে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পুলিশ দুই নারীকে গ্রেপ্তার করেছে। গুরুতর আহত কুলছুমা বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আজ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালে ভুক্তভোগীর বাবা মো. জামসেদ বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। এর আগে, গত রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার মোহাম্মদপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আব্দুল গনি কুলছুমাকে বিয়ে করেন। গনির আগের সংসারের ছেলে সাইফুলের একটি ছাগল কয়েকদিন আগে কুলছুমার রোপণ করা একটি শিমগাছ খেয়ে ফেলে। এ নিয়ে কুলছুমা প্রতিবাদ করলে সাইফুল ও তার বোনদের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। ঝগড়ার একপর্যায়ে কুলছুমার শরীরে ফুটন্ত গরম ভাতের মাড় ঢেলে দেয় সাইফুল ও তার বোনেরা। এতে তার পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়।
ঘটনার পর অভিযুক্তরা বিষয়টি কৌশলে পুলিশ বা স্থানীয় কাউকে না জানিয়ে গোপন রাখার চেষ্টা করেন। তারা গোপনে চিকিৎসা করানোর প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে ৫ হাজার টাকা দেয় এবং পরে আরও ২০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘটনাটি চেপে যেতে বলে। তবে প্রতিশ্রুত টাকা না দেওয়া এবং কুলছুমার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ঘটনাটি জানাজানি হয়।
চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল হাসান বলেন, ঘটনার কয়েকদিন পার হলেও বিষয়টি পুলিশকে জানিয়ে গোপন রাখা হয়েছিল। খবর পেয়ে মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে নাজমা ও আকলিমা নামে দুই অভিযুক্ত নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কক্সবাজারের চকরিয়ায় আলোচিত পুলিশ সদস্যের স্ত্রীকে ধর্ষণ মামলায় পারভেজ মো. আবুল কালাম নামে একজনকে যাব্বজ্জীবন দিয়েছে আদালত।
বুধবার দুপুরে কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন আদালত-১ এর বিচারক আবু হানিফ এ রায় প্রদান করেন।
সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) ইফতেখার মাহমুদ জানিয়েছেন, '২০২৫ সালের ১৫ জুলাই রাতে চকরিয়া থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যের স্ত্রীর বাড়িতে হানা দেয় পারভেজরা। এসময় সবকিছু লুটে নেয়ার পর স্ত্রীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এ ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হলে পুলিশ আসামীদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে।
দীর্ঘ শুনানী শেষে আদালতের বিজ্ঞ বিচারক পারভেজকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। একই সঙ্গে দুই লাখ টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে আরও ১০ বছরের কারাদন্ড দেন।
সট:- ইফতেখার মাহমুদ এপিপি, কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন আদালত-১।
এদিকে, আদালতের রায়ে সস্তুষ্টি প্রকাশ করেছে বাদীপক্ষ। একই সঙ্গে মামলার বাদীর প্রত্যাশা অন্যকোন পরিবারে যেন এমন জুলুম না হয়।
বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সিরাজগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা এবং মাদক বিক্রির নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়।
ডিএনসি, সিরাজগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোঃ নজরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এবং কামারখন্দ উপজেলার বিশেষ প্রতিনিধির সমন্বয়ে 'ক' সার্কেলের একটি দল এই অভিযানটি পরিচালনা করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আজ বুধবার (০৯/০৯/২০২৬) কামারখন্দের ভদ্রঘাট পশ্চিম খান পাড়া এলাকায় এই অভিযান চালানো হয়।
অভিযানের সময় মোঃ শাকিল শেখ (৩২), পিতা: মোঃ মকবুল হোসেন শেখ নামের এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৮০০ (দুই হাজার আটশত) পিস ইয়াবা ট্যাবলেট এবং মাদক বিক্রির নগদ ১১,৩০০ (এগারো হাজার তিনশত) টাকা।
কামারখন্দ উপজেলায় এটি ছিল ডিএনসির চতুর্থ অভিযান। এই ঘটনায় সহকারী পরিচালক মোঃ নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে কামারখন্দ থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন। গ্রেফতারকৃত আসামীকে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তাদের এই ধরনের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
মিয়ানমারে যাচ্ছে সার আসছে মাদক
বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের জল ও স্থলপথে মাদকদ্রব্যের বিনিময়ে এবার শুরু হয়েছে ব্যাপকভাবে সার পাচার। সক্রিয় রয়েছে চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারের অধিকাংশ সার ডিলার এবং চোরাচালানী সিন্ডিকেট।
ইতিমধ্যে টেকনাফ,উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে সার পাচারের ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি ইয়াবা, খ্রীস্ট্রাল মেথ আসছে মিয়ানমার থেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন বাহিনীর কাছে গত একমাসে ২৩ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে প্রায় ২ শতাধিক পাচারকারী। এর মধ্যে রোহিঙ্গা রয়েছে ৯৩ জন ও এপিবিএন সদস্য ১ জন। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা কর্মী আছেন ২১ জন, আর অন্যরা হচ্ছে সাধারণ পরিবহন শ্রমিক, মহিলা আছেন ১৮ জন। মামলা হয়েছে ৭২ টি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্য, জীবন রক্ষাকারী ঔষধ পাচারের পাশাপাশি আশংকাজনক ভাবে বেড়েছে সার পাচার।
মিয়ানমারে পাচারকালে বিজিবি ও কোস্টগার্ড বেশ কয়েক দফায় সার আটক করেছেন। নতুন করে সার পাচার হওয়ার খবরে সীমান্তের কৃষকসহ সচেতন মহলের মাঝে চরম উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত বেশ কয়েকবছর ধরে মিয়ানমারে সার পাচার অনেকটা বন্ধ ছিল। এমনকি ওই সময়ে সার পাচার ও আটকের ঘটনা ছিল বিরল। তবে সাম্প্রতিককালে নতুন করে সার পাচারের ঘটনায় কৃষি সংশ্লিষ্টদের মাঝে উদ্বেগ উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে। এদিকে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট এলাকায় সার পাচারে জড়িত চোরাকারবারীদের চিহ্নিত করে তাদেরকে কঠোর হস্তে দমনের দাবী জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারে সরকার ও বিদ্রোহীদের মাঝে চলমান সংঘাতের কারণে রাখাইন রাজ্যে এক ধরণের সংকট চলছে। আরাকান আর্মি শাসিত ওই রাজ্যের কৃষকরা জমিতে সার প্রয়োগে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছেন। এদিকে পাচারে জড়িতদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারে ইউরিয়া সারের বেশ কদর রয়েছে। সেখানে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার দ্বি-গুণ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩হাজার টাকা ধরে প্রতি বস্তা সার মিয়ানমারের চোরাকারবারীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন এখানকার চোরাকারবারীরা।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সে দেশে (মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে) সারের বস্তা দ্বি-গুণ বেশী দামে বিক্রির সুযোগে এ দেশীয় চোরকারবারীরা সার পাচারে তৎপর রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের হালিশহর, পতেঙ্গা, ভাটিয়ারী, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী কেন্দ্রীক বড় বড় চোরাকারবারীরা বিভিন্ন সার ডিলারদের সাথে আতাঁত করে সাগরপথে জাহাজ বা ট্রলারে করে মিয়ানমারে সার পাচার করছেন। আবার স্থল পথের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে যাচ্ছে সারসহ অন্যান্য পণ্য।
সমুদ্রপথে সার পাচার করতে গিয়ে কোষ্টগার্ডের হাতে একাধিক চালান আটক হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাগরপথে জাহাজে করে সার পাচারের ঘটনার পরপরই টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টের চোরাকারবারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। টেকনাফ-উখিয়ার সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে পাচারকালে বিজিবি সারসহ ইতিমেধ্য বেশ কয়েকজন পাচারকারীকে আটক করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৮সেপ্টেম্বর ভোরে টেকনাফের দমদমিয়া সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে ৫বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করেছেন বিজিবি। এর আগে ২সেপ্টেম্বর একই সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে পাচারের সময় ৩৫ বস্তা সারসহ একটি হস্তচালিত নৌকা জব্দ করেন বিজিবি। গত ২০ আগষ্ট সাবরাং বিওপির জওয়ানেরা নাফনদীতে অভিযান চালিয়ে ৫৩ বস্তা সারসহ একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা আটক করেন। এদিকে ৬ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে ট্রাকে করে পরিবহনের সময় ৩০০ বস্তা সারের একটি বড় চালান জব্দ করেন মরিচ্যা বিজিবি। ৩ সেপ্টেম্বর ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে ৩৪ বিজিবির জওয়ানেরা ৮৮ বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি সার জব্দ করেন। ১৫ জুলাই রাতে পালংখালী সীমান্ত দিয়ে পচারকালে ১৩ বস্তা ইউরিয়া সারসহ ৪ রোহিঙ্গাকে হাতে নাতে আটক করেন পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা। ১৩ জুলাই পালংখালী সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে ৬৪ বিজিবির অধীনস্থ পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা ১৩০ বস্তা সার আটক করেন। ৮ জুলাই পালংখালীর বিওপির জওয়ানেরা আনজুমানপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইজিবাইকসহ ২২ বস্তা ইউরিয়া সার আটক করেন। ১ জুলাই পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা ফারিরবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২০ বস্তা ইউরিয়া সারসহ এক পাচারকারীকে হাতে নাতে আটক করেন। এছাড়া চট্টগ্রামের হালিশহর, ভাটিয়ারী, পতেঙ্গা, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া সীমান্ত দিয়ে জাহাজে করে মিয়ানমারে পাচারের সময় সারের বেশ কয়েকটি চালান আটক করেন কোস্টগার্ড।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: হুমায়ুন কবির জানান, গত মাসে (আগষ্টে) উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্টিত হয়েছে। ওই সভায় সার পাচাররোধে সীমান্ত এলাকায় নজরদারী বৃদ্ধি, ডিলার পর্যায়ে মনিটরিং বাড়ানো, সারের বস্তার মুখ খোলা দেওয়া, ৫টার পরে সার বিক্রি না করার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
তিনি আরো জানান,সার পাচার শুন্যের কোটায় নিয়ে আসতে আমাদের প্রচেষ্ঠা অব্যাহত আছে এবং থাকবে। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্ঠা ও মনিটিরিংয়ের মাধ্যমে সার পাচার ঠেকানো সম্ভব জানিয়ে এই কৃষি কর্মকর্তা আরো বলেন, দুয়েকদিনের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র্যাবের সমন্বয়ে আরো একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে। কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে: কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন জানান, সার পাচারসহ যাবতীয় চোরাচালান রোধে কোস্টগার্ড তৎপর রয়েছে। ভবিষ্যতেও এধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন কোস্টগার্ডের এই মিডিয়া কর্মকর্তা।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক (ডিডি) ডক্টর বিমল কুমার প্রমাণিক বলেন, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন সার পাচার ঠেকাতে বহুমূখী পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। কোন ডিলার সার পাচারে জড়িত প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে যথাযত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে ৬৪বিজিবির অধিনায়ক লে: কর্ণেল জহিরুল ইসলাম জানান, সার এমন একটা জিনিষ যা পকেটে করে নেওয়া যায়না। কার কার সার প্রয়োজন সেটাও স্থানীয় লোকজন ভাল করেই জানেন। এছাড়া কৃষকসহ স্থানীয়রা সার পাচাররোধে বিজিবিসহ আইন শৃংখলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করতে পারেন জানিয়ে তিনি মনিটরিং বাড়ানোর পাশাপাশি সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও জনসচেতনার উপর গুরুত্বারোপন করেন।