কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল থানি
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন কোনো আকস্মিক উত্তেজনার ফল নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যকে সহিংসভাবে পাল্টে দিতে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশে এই যুদ্ধ। আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল–থানি।
আল–জাজিরাকে দেওয়া এক বিস্তৃত ও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক ওই অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর এ মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
শেখ হামাদ সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা এ যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি। তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তথাকথিত ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ গঠনের আকাঙ্ক্ষার বিষয়েও সতর্ক করেছেন। একই সঙ্গে তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজেদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বানও জানান।
শেখ হামাদ বলেন, ‘আমরা এই অঞ্চলের বড় ধরনের এক পুনর্গঠনের সাক্ষী হচ্ছি।’ আগামী কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রূপরেখা কেমন হবে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সেটা নির্ধারণ করে দেবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নেতানিয়াহুর ‘ভ্রান্ত ধারণা’ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভুল পদক্ষেপ
মধ্যপ্রাচ্যে আসন্ন সংঘাতের বিষয়ে শেখ হামাদ গত বছরই সতর্ক করেছিলেন। তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন, যাতে সামরিক হামলা প্রতিরোধ করা যায়।
শেখ হামাদ ইরানের সঙ্গে সংঘাত উসকে দেওয়ার একটি চেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। এ জন্য তিনি ইসরায়েলের ভেতরের একটি কট্টরপন্থী গোষ্ঠীকে দায়ী করেন, যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন নেতানিয়াহু।
শেখ হামাদের মতে, এই গোষ্ঠীটি সেই ১৯৯০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি যুদ্ধে টেনে আনার চেষ্টা করে আসছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদসহ আগের মার্কিন প্রশাসনগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করতে দ্বিধা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনের কাছে একটি ‘ভ্রান্ত ধারণা’ সফলভাবে বিক্রি করতে সক্ষম হন বলে মনে করেন শেখ হামাদ।
শেখ হামাদ বলেন, ‘তিনি (নেতানিয়াহু) মার্কিন প্রশাসনকে বোঝাতে সক্ষম হন, এই যুদ্ধ হবে সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে।’
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীলতার সমালোচনা করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি সব সময়ই বলপ্রয়োগ এড়িয়ে চলার সক্ষমতায় নিহিত ছিল, তা প্রয়োগ করার মধ্যে নয়।’
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সব পক্ষকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। শেখ হামাদ মনে করেন, এ বছরের শুরুতে জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান যুদ্ধ এড়াতে যে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই আলোচনাকে যদি আরও দুই সপ্তাহ বেশি সময় দেওয়া হতো, তবে এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতো।
শেখ হামাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, এই যুদ্ধের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে নেতানিয়াহু সামনে চলে এসেছেন। তাঁর মতে, নেতানিয়াহু এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে জোরপূর্বক আঞ্চলিক জোট গঠনে তাঁর ধারণা এবং ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ পরিকল্পনাকে সামনে আনছেন—যা ইসরায়েলের ডানপন্থীদের একটি ধারণা। তাদের মূল লক্ষ্য প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর আরও গভীরে ইসরায়েলের সীমানার সম্প্রসারণ।
হরমুজ প্রণালি: নতুন বৈশ্বিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু
তেহরানের কৌশল মূল্যায়ন করে শেখ হামাদ বলেন, যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে প্রতিপক্ষের প্রাথমিক সামরিক হামলার সামনে ইরান সফলভাবে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। পরে নতুন একটি কৌশলগত সুবিধা বুঝতে পেরে দেশটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সময়ক্ষেপণ করে। এই কৌশলগত সুবিধার মূল ভিত্তি ছিল, হরমুজ প্রণালিকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।
এই জলপথকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাকে যুদ্ধের ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন শেখ হামাদ। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান এখন এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংকীর্ণ জলপথকে নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করছে। তাঁর মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির তুলনায় বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এটি আরও তাৎক্ষণিক ও গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।
শেখ হামাদ বলেন, ওয়াশিংটন নয়, এই (হরমুজ প্রণালি) সংকটের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ভোগ করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার হওয়ার পর ইরান পাল্টা জবাব দিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জ্বালানি, শিল্প ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
শেখ হামাদ ইরানের ওইসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করার অজুহাতে ওইসব হামলা চালিয়েছিল। অথচ উপসাগরীয় দেশগুলো স্পষ্টভাবেই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল।
এর ফলে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের অনেক রাজনৈতিক পুঁজি হারিয়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিঘ্ন নিয়ে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয়েছে। তবে শেখ হামাদ জোর দিয়ে বলেন, ভৌগোলিক কারণ দেশগুলোর সহাবস্থানকে অনিবার্য করে তুলেছে। তাই তিনি তেহরানের সঙ্গে একটি খোলামেলা ও যৌথ উপসাগরীয় সংলাপের আহ্বান জানান—যেখানে বিচ্ছিন্ন ও এককভাবে যোগাযোগের পরিবর্তে বাস্তবসম্মত ভবিষ্যৎ কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
‘গালফ ন্যাটো’ গড়ার আহ্বান
শেখ হামাদ জোর দিয়ে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, ইসরায়েল বা বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নয়; বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
এর মোকাবিলায় শেখ হামাদ একটি সামরিক জোট ‘গালফ ন্যাটো’ গঠনের প্রস্তাব দেন। এটি হবে একটি যৌথ রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা প্রকল্প, যা শুরু হবে কৌশলগতভাবে ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে। সৌদি আরব হবে এর নিরপেক্ষ মেরুদণ্ড।
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি, ইউরোপীয় ইউনিয়নও শুরুতে অল্প কয়েকটি রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত হয়েছিল এবং পরে তা সম্প্রসারিত হয়েছে। একই ধরনের একটি মডেলের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক আইনের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে এবং সদস্যরাষ্ট্রের জন্য আইন সমান, মেনে চলা বাধ্যতামূলক ও সম্মানযোগ্য হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি প্রসঙ্গে শেখ হামাদ স্বীকার করেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো কয়েক দশক ধরে প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, চীনকে নিয়ন্ত্রণ এবং এশিয়ার দিকে ওয়াশিংটনের কৌশলগত ঝোঁক বিবেচনায় উপসাগরীয় অঞ্চল আর দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করতে পারবে না। তাই তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোকে তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিসরের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশ
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে শেখ হামাদ সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের শাসনব্যবস্থার পতনে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিপ্লবের শুরুর দিকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাবেক প্রেসিডেন্টকে তাঁর জনগণের কথা শোনার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নতুন সিরীয় নেতৃত্বের বাস্তববাদী অবস্থানের প্রশংসা করেন, বিশেষ করে ইসরায়েলি উসকানি এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে তাদের কৌশলের কথা উল্লেখ করে। পাশাপাশি তিনি প্রায় ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধ ও আসাদ সরকারের অব্যবস্থাপনার পর দেশকে পুনর্গঠন করতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্নির্মাণের ওপর মনোযোগ দেওয়ায় আহ্বান জানান।
আল–জাজিরার সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারে শেখ হামাদ একটি গোপন কূটনৈতিক ইতিহাসও প্রকাশ করেন। শেখ হামাদ বলেন, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে বিল ক্লিনটন প্রশাসনের একটি বার্তা পৌঁছে দিতে কাতারি নেতৃত্ব তাঁকে তেহরানে পাঠিয়েছিল। ওই বার্তায় যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ইরান তার নবজাত পারমাণবিক কর্মসূচি রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করবে অথবা আন্তর্জাতিক কোনো ব্যবস্থার অধীনে তা গ্রহণ করবে।
সেখানে কাতার কেবল একজন বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেছিল। তারপরও তেহরান সে সময় দোহাকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে সমন্বিত বা সংগতিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ছবি: সংগৃহীত
হরমুজে ৭ জাহাজে মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি ইরানের। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে সাতটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এই জলপথে জাহাজ চলাচলে সহায়তা অব্যাহত রাখলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার রাতভর হামলার শিকার হওয়া সাতটি জাহাজের মধ্যে চারটি থেকে তেল স্থানান্তরের কাজ চলছিল। হামলার পর জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। অন্য তিনটি জাহাজ মাইনে আঘাত হানার পর চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে বলে দাবি করেছে ইরান। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হামলায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর কোন দেশের পতাকা ছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি। তাদের বক্তব্য, ওয়াশিংটন যদি প্রণালির অন্যান্য অংশ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে সহায়তা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংঘাত এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।’ এটিকে তারা গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই জলপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
কিম জং উন। ছবি: সংগৃহীত
সীমান্তের নতুন সেতু অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন চীনের দানদং শহরে অত্যন্ত গোপনে এক ঝটিকা সফর সম্পন্ন করেছেন। দীর্ঘ ১২ বছর আগে নির্মিত ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় এই প্রতীকী সফর অনুষ্ঠিত হলো। শনিবারের (২৪ অক্টোবর) এই একদিনের ঝটিকা সফর শেষে তিনি ইতোমধ্যেই স্বদেশে ফিরে গেছেন।
সফরকালে কিম জং উনের সঙ্গী ছিলেন চীনের চতুর্থ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ওয়াং হুনিং। তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের পক্ষ থেকে উত্তর কোরীয় নেতার কাছে আন্তরিক শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। দুই নেতা একসঙ্গে স্থানীয় একটি অটোমোবাইল কারখানা পরিদর্শন করেন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। এসময় কিম জানান, চীনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব রক্ষা এবং ব্যবহারিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রস্তুত রয়েছে পিয়ংইয়ং।
বিশেষ এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যা ১৯৫০-১৯৫৩ সালের কোরিয় যুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণের বর্ষপূর্তির ঠিক আগের দিন। সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দানদং-এর কোরিয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে যান কিম ও ওয়াং। সেখানে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করে প্রাণ উৎসর্গকারী চীনা সৈন্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কিম জং উন। সফর শেষে নতুন সেতুর গোড়ায় এসে কিমকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান ওয়াং হুনিং।
বিশ্লেষকদের মতে, ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নতুন চার লেনের সেতু চালুর মাধ্যমে চীন ও উত্তর কোরিয়ার বাণিজ্যের বড় বাধা দূর হলো। তবে কেবল অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থেকে নিজের অবস্থান শক্ত করার কৌশল হিসেবেই কিম জং উনের এই হঠাৎ ও রহস্যময় চীন সফরকে দেখছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র:আল-জাজিরা
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আবারও বড় ধরনের হামলা বা কড়া অবরোধের চিন্তাভাবনা করছেন। তবে এতে একটুও দমে না গিয়ে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পারস্য উপসাগরে তারা কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ঘেঁষতে দেবে না।
ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলি আবদুল্লাহি কড়া ভাষায় ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পারস্য উপসাগরে আবার মার্কিন সৈন্য পাঠানোর স্বপ্ন ট্রাম্পকে কবরে নিয়ে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে তারা নাকি ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করেছে, অথচ নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের সীমানার কাছে পাঠাতে তারা ভয় পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যেকোনো হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে তেহরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
চীনে কিম জং উনের ২৪ ঘন্টার ‘রহস্যজনক’ সফর
এই সংঘাতের আতঙ্কে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু-হু করে বেড়ে প্রতি ব্যারেলে ১১৭ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’-তে একের পর এক তেলবাহী জাহাজে হামলা চলছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের সঙ্গে সৌদি আরবের লড়াইও নতুন করে বেড়ে চলেছে।
সংঘাত থামাতে ইস্তাম্বুলে তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইউরোপীয় দেশগুলো বৈঠক করলেও সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান উপস্থিত ছিল না। তুরস্ক সতর্ক করেছে, ইরানে নতুন হামলা পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। তবে ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন হামলা ও অত্যাচার না থামলে তারা কোনো আলোচনায় বসবে না এবং হরমুজ প্রণালিও মুক্ত করবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা
মেগান মার্কেল ও তার বাবা থমাস মার্কেল। ছবি: সংগৃহীত
ব্রিটিশ রাজপরিবারের বধূ ও প্রিন্স হ্যারির স্ত্রী মেগান মার্কেলের বাবা থমাস মার্কেলের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়নের আপত্তিকর ছবি জমানোর এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চরম ক্ষোভ ও গভীর মানসিক কষ্ট প্রকাশ করেছেন ডাচ অব সাসেক্স মেগান। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এমন বিভৎস খবর শুনে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ও বিপর্যস্ত। ঘটনার শিকার হওয়া নিরীহ শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের ‘দ্য সান’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, মেগানের সৎ ভাই থমাস মার্কেল জুনিয়র ফিলিপাইনে তাদের বাবার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে এই আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও উদ্ধার করেন। তার দাবি, বাবার ড্রয়ার ও কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে শত শত শিশু নির্যাতনের ছবি ছিল। এরপরই তিনি ফিলিপাইন পুলিশ, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থায় গিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেন। ফিলিপাইন প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই বর্তমানে যৌথভাবে এই ঘটনার তদন্ত করছে। তবে মেগানের বাবা থমাস মার্কেল সিনিয়র তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বর্তমানে ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন ৮২ বছর বয়সি থমাস জানান, তার ছেলে সম্পূর্ণ মিথ্যা গল্প ফেঁদেছে। মেগানের বোন সামান্থা মার্কলও বাবার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, এই কম্পিউটারগুলো দুই বছর ধরে অন্য মানুষদের হাতে ছিল এবং তার ভাই বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। এই ঘটনার পর মেগান মার্কেল তার বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্বের আসল কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, আজ থেকে আট বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালেই পুলিশের পক্ষ থেকে তার বাবার বিরুদ্ধে কিছু আপত্তিকর অভিযোগের বিষয়ে তাকে জানানো হয়েছিল।
মেগান বলেন, এতদিন সংবাদমাধ্যমে নানা কথা ছড়ানো হলেও, মূলত সন্তানদের সুরক্ষার কথা ভেবেই তিনি বাবাকে নিজের পরিবার থেকে দূরে রেখেছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার অন্তত মানুষ বুঝতে পারবে যে কেন তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তিনি আশা করেন ভুক্তভোগী শিশুরা যেন দ্রুত ন্যায়বিচার পায়।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য সামনে এক বড় ধরণের ‘চমক’ অপেক্ষা করছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলার ঘটনার পর সেখানে বড় ধরণের সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি এই মন্তব্য করেন।
ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানান, ফিলিস্তিনকে কোনোভাবেই স্বাধীন রাষ্ট্র হতে না দেওয়া তাদের নির্বাচনের মূল লক্ষ্য। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের সোজা উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, হঠাৎ এবং আচমকা পদক্ষেপ নেওয়াই তার বেশি পছন্দ। নেতানিয়াহু আরও জানান, ফিলিস্তিন থেকে আসা যেকোনো সংকট মোকাবিলায় কিছু গোপন কৌশল ব্যবহার করা হবে, যা এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের জন্য খুব শীঘ্রই এক বড় ধাক্কা আসতে চলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের দাবি তুলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়াই তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় আরও কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের চুক্তি বাড়াবেন। অন্তত দুটিরও বেশি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেই দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো শর্ত দেবে না, কারণ তারা ভালো করেই জানে যে ইসরাইল তা কখনোই মেনে নেবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা