ছবি : সংগৃহীত
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাত থামার বদলে আবারও নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রে এসেছে। দেশটির প্রধান মালয়-মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বারিসান রেভোলুসি ন্যাশনাল (বিআরএন) জানিয়েছে, স্বাধীন ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে সম্প্রতি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন বিআরএনের শান্তি আলোচনাবিষয়ক প্রতিনিধি দলের মুখপাত্র নিকমাতুল্লাহ সেরি। তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠাই এখনো সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য।
বিআরএন ১৯৬০-এর দশক থেকেই থাইল্যান্ডের মুসলিম-অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলে একটি স্বাধীন ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে। তবে বর্তমান সংঘাতের বড় পর্ব শুরু হয় ২০০৪ সালে। ডিপ সাউথ ওয়াচের হিসাবে, এরপর থেকে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় ৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী, থাই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বেসামরিক মানুষ রয়েছেন।
ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের এই অঞ্চল মালয়-মুসলিম অধ্যুষিত পাতানি সালতানাতের অংশ ছিল। ১৯০০-এর দশকের শুরুর দিকে তৎকালীন সিয়াম রাজ্যের সঙ্গে অঞ্চলটির রাজনৈতিক সংযুক্তি ঘটে। এরপর থেকেই স্থানীয় মালয় মুসলিমদের একটি অংশ ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে।
২০১৩ সাল থেকে মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় থাই সরকার ও বিআরএনের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলছে। তবে আলোচনার প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে একটি হামলায় পাঁচ থাই সেনা নিহত হওয়ার পর ব্যাংকক শান্তি আলোচনা স্থগিত করে। ওই হামলায় ছয় বেসামরিক মানুষও আহত হন বলে থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সহিংসতায় বিআরএনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অবশ্য নিকমাতুল্লাহ নিশ্চিত বা অস্বীকার করেননি।
তবে স্বাধীনতার দাবির পাশাপাশি বিআরএন থাই সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি কাঠামোর প্রস্তাবও দিয়েছে। নিকমাতুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলের চারটি প্রদেশে বিআরএন রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে অঞ্চল পরিচালনা করতে চায়।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পাঁচ থেকে ১০ বছরের একটি অন্তর্বর্তী সময়ে ওই অঞ্চলের শাসনভার নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য শরিয়াহভিত্তিক পুলিশ ও আদালত ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে। এরপর জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নির্ধারণের কথা বলেছেন নিকমাতুল্লাহ।
বিআরএনের এই অবস্থানকে ঘিরে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের সংঘাত আবারও আলোচনায় এসেছে। তবে থাই সরকারের অবস্থান, রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই সংঘাতের সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে কোনো সমাধান গ্রহণযোগ্য নয়। থাইল্যান্ডের প্রধান শান্তি আলোচক থানুত সুওয়ার্নানন্দও বলেছেন, আলোচনার টেবিলে বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি; বরং সংঘাত কমানো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল করা এবং রাজনৈতিক অভিযোগগুলোর সমাধানের বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে।
এই সংঘাতে মালয়েশিয়ার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী হওয়ায় দীর্ঘদিনের সহিংসতার প্রভাব দেশটির উত্তরাঞ্চলেও পড়ে। শান্তি আলোচনায় মালয়েশিয়া মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে বর্তমানে নতুন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে বলে মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ খালেদ নর্দিন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মালয়েশিয়ার অগ্রাধিকার হলো শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং থাইল্যান্ডের সার্বভৌমত্বকে দেশটি সম্মান করে।
এদিকে শান্তি আলোচনা আবারও এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না বিআরএন। নিকমাতুল্লাহ জানিয়েছেন, অক্টোবর মাসে থাইল্যান্ডের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বা গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।
দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সংঘাত তাই এখন একদিকে স্বাধীনতার পুরোনো দাবিকে ঘিরে, অন্যদিকে স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতা ভাগাভাগির নতুন প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা সহিংসতার অবসানে ব্যাংকক ও বিআরএন শেষ পর্যন্ত কী ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সূত্র: এএফপি, রয়টার্স
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুবিরোধী বিক্ষোভ থেকে অস্কারজয়ী অভিনেত্রী, রাজনীতিকসহ প্রায় ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন নেতানিয়াহু। তাঁর নিউইয়র্ক সফর ও সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ ঘিরে বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভকারীরা গাজায় ৭২ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যার জন্য তাঁকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যা দেয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভ থেকে গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন অস্কারজয়ী মার্কিন অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন, এমি পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী হান্না আইনবাইন্ডার, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেসপ্রার্থী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য চি ওসে।
পুলিশের তথ্যের বরাতে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল বৃহস্পতিবার মিডটাউন ম্যানহাটন এলাকায় নেতানিয়াহুবিরোধী বিক্ষোভ থেকে প্রায় ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মানিজেহ মোরাদিয়ান (৫০) বলেন, ‘গাজায় যা করা হচ্ছে, তাতে একটি পুরো সমাজকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হচ্ছে। এটা আমাদের নামে এবং আমাদের করের অর্থে করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে কথা বলা আমাদের দায়িত্ব। এসব নৃশংসতার সাফাই গাওয়ার জন্য জাতিসংঘের মঞ্চ ব্যবহার করার কোনো অধিকার নেতানিয়াহুর নেই।’
সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু অঞ্চলটিতে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি দেন। নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিকভাবে ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি তা ঠেকানোর চেষ্টা করেন। নেতানিয়াহুর সামনে এমন একটি নির্বাচন রয়েছে, যেখানে তিনি হেরে যেতে পারেন।
নেতানিয়াহু সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দিতে মঞ্চে ওঠার পরপরই বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা ‘ওয়াকআউট’ করেন। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়, নেতানিয়াহু মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে উপস্থিত প্রতিনিধিদের একাংশ তাঁর উদ্দেশে দুয়ো দিতে শুরু করেন। তবে এ সময় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব প্রতিনিধিদল দাঁড়িয়ে তালি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে নেতানিয়াহুবিরোধী বিক্ষোভের আয়োজন করে ‘জিউইশ ভয়েস ফর পিস’ নামের একটি ইহুদি অধিকারগোষ্ঠী। তারা ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করে।
প্রায় ২০০ মানুষ জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে জড়ো হন। তাঁদের পরনে ছিল একই ধরনের সাদা টি-শার্ট। এসব টি-শার্টে লেখা ছিল, ‘বোমা নয়, মানুষের জন্য অর্থ দাও’, ‘যুদ্ধ নয়’ ও ‘ফিলিস্তিন মুক্ত করো’।
বিক্ষোভকারীরা সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পুলিশ লাউডস্পিকারে বিক্ষোভকারীদের চলে যেতে বলে। তখন কয়েকজন ফুটপাতে সরে যান। তবে বিক্ষোভকারীদের একটি দল রাস্তায় বসে থাকে। তারা নেতানিয়াহুবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। সাইকেলে করে আসা পুলিশের সদস্যরা তাদের ঘিরে ফেলেন।
পুলিশের সদস্যরা একে একে বিক্ষোভকারীদের দল থেকে টেনে বের করেন। তাঁদের হাত পেছনে নিয়ে ‘জিপ টাই’ (প্লাস্টিকের বন্ধনী) দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর তাঁদের পুলিশের বাসে তোলা হয়। বাসের বাইরে থাকা বিক্ষোভকারীরা ‘নেতানিয়াহু জাহান্নামে যাও’ স্লোগান দিতে থাকেন।
হরমুজ প্রণালি
যুদ্ধের অবসান ও সাতদিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির বরাত দিয়ে এমন তথ্য জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও গার্ডিয়ান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার অংশ হিসেবে আব্বাস আরাঘচি নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। গণমাধ্যম দুটিকে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে সাতদিনের মধ্যে প্রণালিটি খুলে দেওয়া ও আলোচনা শুরু হবে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গত মঙ্গলবার জাপানের বার্তা সংস্থা ‘কিয়োদো’ প্রথম এমন তথ্য প্রকাশ করেছিল। কিন্তু প্রতিবেদনটির দাবি তখন ইরানি গণমাধ্যম অস্বীকার করে। একইদিন নিউইয়র্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করেন আরাঘচি।
নিউইয়র্ক টাইমস আরাঘচির রবাত দিয়ে জানিয়েছে, সবশেষ পরিকল্পনায় সাতদিনের জন্য লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যে সব ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া, জব্দকৃত অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ ছাড়, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার শর্ত আছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, শর্ত পূরণ হলে সপ্তমদিনের মাথায় ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। আরাঘচি বলেছেন, পরিকল্পনাটির বিষয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জবাবের অপেক্ষায় আছেন। চীনও এই প্রস্তাবকে সমর্থন দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেছিলেন, তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে ইয়েমেনে শত্রুতা বন্ধের বিষয়টিও আছে।
যুদ্ধের অবসান ও হরমুজ খুলে দিতে গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। এর আওতায় পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা শুরুর কথা ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর ওই সমঝোতা ভেঙে যায়। এরপর দুই দেশ হরমুজ প্রণালি ঘিরে পুনরায় সংঘাতে জড়ায়।
ছবি : সংগৃহীত
চীনা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ছবি ও গোয়েন্দা তথ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তথ্যের সহায়তায় ইরান একদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ শনাক্ত ও হুমকির মুখে ফেলতে পারছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আরও নিখুঁত হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে।
সাম্প্রতিক কয়েক মাসে ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সক্ষমতায় নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের তথ্য চারজন সূত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছে সিএনএন।
সূত্রগুলোর দাবি, চীনা স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি ও ভৌগোলিক তথ্যের সহায়তায় গত জুলাইয়ে জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান এমন নিখুঁত হামলা চালাতে সক্ষম হয়, যা মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই ধরনের সহায়তা ছাড়া ইরানের পক্ষে করা কঠিন ছিল। ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন।
এছাড়া চীনা ভূ-স্থানিক তথ্যের সহায়তায় হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নজরদারির ইরানি সক্ষমতাও বেড়েছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এর ফলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা বাড়ছে।
স্যাটেলাইট তথ্য কাজে লাগিয়ে ড্রোন হামলা
দুই মার্কিন সূত্রের ভাষ্য, চীনা তথ্যের সহায়তায় ইরান তুলনামূলক সরল প্রযুক্তির তাপ-অনুসরণকারী ড্রোনও আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে। এসব ড্রোন মাঝ আকাশে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে জাহাজ কখন নির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছাবে, তা আগে থেকে বুঝে হামলার সময় নির্ধারণ করতে পারায় ড্রোনগুলোকে জাহাজের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলটি মূলত একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন উৎক্ষেপণ করা এবং সেগুলোকে জাহাজের তাপ-স্বাক্ষর অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সুযোগ দেওয়া।
এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক একটি মার্কিন নৌ-এসকর্ট অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনী এক ডজনের বেশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে এবং প্রায় ২০টি ড্রোন ভূপাতিত করে। একই সময়ে প্রণালির আশপাশে প্রায় ৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আক্রমণও চালানো হয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, চীনের গোয়েন্দা সহায়তার পাশাপাশি রাশিয়ার সহযোগিতা এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতে ইরানি বাহিনীর অর্জিত যুদ্ধ-অভিজ্ঞতাও তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
চীনের সহায়তার পরিমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা
তবে চীন ঠিক কতটা সহায়তা করছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, চীনা সরকার সরাসরি এই সহায়তার নির্দেশ দিয়েছে কি না, নাকি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তা করার ক্ষেত্রে নীরব সম্মতি দেওয়া হয়েছে- এ বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।
এ নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে। একজন মার্কিন গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট সূত্র অবশ্য জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কিছু তথ্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়াকে চীন বরং বন্ধ করতে চায়।
তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, চীনা গোয়েন্দা সহায়তা ইরানের যুদ্ধকৌশলে ইতোমধ্যে প্রভাব ফেলেছে।
হরমুজ প্রণালি ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চাপ প্রয়োগের জায়গাগুলোর একটি বলে মনে করেন মার্কিন কর্মকর্তা ও বাইরের বিশ্লেষকেরা। সেখানে মার্কিন সামরিক এসকর্ট এবং বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে ইরান নিয়মিত হামলার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোনের সক্ষমতায়ও উন্নতি
চীন ও রাশিয়ার কারিগরি সহায়তার ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গাইডেন্স বা দিকনির্দেশনা ব্যবস্থাতেও উন্নতি হয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।
এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য, যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়মিত অভিজ্ঞতা অর্জন ইরানের সক্ষমতা বাড়িয়েছে ঠিকই, তবে বাইরের সহায়তাও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে ওয়াশিংটনও চীনা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ছবি ইরানের হাতে যাওয়ার বিষয়টি ঠেকাতে পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন গত মে মাসে তিনটি চীনা স্যাটেলাইট কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, এসব কোম্পানির সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ছবি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক হামলা সক্ষম করছে।
মার্কিন ঘাঁটিগুলো আরও ঝুঁকির মুখে
যুদ্ধ সপ্তম মাসে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের কৌশলও বদলাচ্ছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর লক্ষ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সম্পদকে হুমকির মধ্যে রাখা এবং ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা।
এক গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইরান এখন নিয়মিত মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি ড্রোন তৎপরতা নিয়ে নিয়মিত সতর্কতাও জারি হচ্ছে।
আরেক মার্কিন সূত্র বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চলায় ইরানকে নিজেদের কৌশল ও সক্ষমতা উন্নত করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে।
চীনের কাছ থেকে ইরান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও পেয়েছে বলে ওই সূত্র দাবি করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো- ইরানের নিম্ন ও মাঝারি উচ্চতায় উড্ডয়নকারী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ-উচ্চতার ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করলেও অপেক্ষাকৃত নিচু উচ্চতায় আসা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় নতুন করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হচ্ছে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনায় অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে।
জর্ডানে হামলায় চীনা তথ্যের ভূমিকা
ইরান ২০২০ সালেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছিল। সে সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পর ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল তেহরান।
তবে একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, এরপর থেকে ইরানের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে ইরানের হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার মুখে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জনবল, সামরিক সরঞ্জাম ও মজুত স্থাপনার অবস্থান পরিবর্তন করেছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাইয়ে জর্ডানের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে প্রাণঘাতী হামলার ক্ষেত্রে চীনা সরবরাহ করা গোয়েন্দা তথ্যকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কিছু মার্কিন কর্মকর্তা। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও এর আগে ওই হামলার সঙ্গে চীনা স্যাটেলাইট ছবির যোগসূত্রের কথা জানিয়েছিল।
চীনা-ইরানি সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের সতর্কতা
চীনের কাছ থেকে ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বেইজিং সরাসরি কোনও অনিয়মের কথা স্বীকার করেনি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন এর আগে বলেছিলেন, চীন সব সময় আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলে এবং সংঘাতকে ব্যবহার করে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার বিরোধিতা করে।
ইরানকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে চীন সহায়তা করছে কি না- এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে এর আগে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের গতিপথে চীনের কর্মকাণ্ড কোনও পরিবর্তন আনেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে চীন সহযোগিতামূলক ভূমিকা নিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের সময় এই বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ নিয়েও উদ্বেগ
ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে চীন থেকে আমদানি করা ‘ডুয়াল-ইউজ’ বা বেসামরিক ও সামরিক- দুই ধরনের কাজে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ নিয়েও উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র।
এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, চীনা যন্ত্রাংশের সরবরাহ না থাকলে ইরানের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে একই মাত্রায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতো।
তবে আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান যেভাবে নিজেদের সামরিক মজুত পুনর্গঠন করছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আগের মূল্যায়নের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে যুদ্ধের সব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শেষ করার আগেই ট্রাম্প প্রশাসন পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল- ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের এটিও একটি কারণ বলে তিনি মনে করেন।
চীনা স্যাটেলাইট তথ্য, রুশ সহায়তা, ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘ সংঘাতে অর্জিত যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা- সব মিলিয়ে ইরানের হামলার নির্ভুলতা ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নগুলোতে উঠে এসেছে। তবে চীনা সরকারের সরাসরি নির্দেশে এসব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। সূত্র: সিএনএন
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক একাকিত্ব ও শূন্য গ্যালারির সামনে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে ইসরায়েলের সামরিক শক্তির পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে তীব্র ধিক্কার ও প্রতিবাদ দেখেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ভাষণ দেওয়ার একপর্যায়ে তিনি হাতে একটি পেজার ডিভাইস উঁচিয়ে ধরে লেবাননের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পরিচালিত বিতর্কিত ইসরায়েলি অভিযানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
হাততালির আশায় জাতিসংঘে পেজার উঁচিয়ে এমন নাটকীয় পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করলেও উপস্থিত প্রতিনিধিদের সিংহভাগেরই তোপের মুখে পড়েন নেতানিয়াহু। বক্তব্য শুরু হতেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ডজন ডজন প্রতিনিধি ও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভর্ৎসনা ও ভুয়াধ্বনি দিতে দিতে একযোগে কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে যান। সে সময় সেশনের স্পিকার চিৎকার করে সকলকে শান্ত থাকার আহ্বান জানালেও পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং কেবল নিজের দলের অল্প কয়েকজন প্রতিনিধি দাঁড়িয়ে তাকে সমর্থন জানান।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মঞ্চকে ব্যবহার করে নিজের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের তীব্র আত্মপক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি বিশ্বের একাধিক নেতা ও দেশের বিরুদ্ধে একযোগে তোপ দাগেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, বিগত তিন বছরে ইসরায়েলি সেনারা সাতটি ফ্রন্টে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়েছে। উপস্থিত অল্পসংখ্যক শ্রোতার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, আপনারা কি নিউ জার্সির আকারের এমন কোনো দেশের কথা জানেন, যা তিন বছর ধরে সাতটি ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে?
বিশ্বনেতাদের ওয়াকআউটের প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে নেতানিয়াহু তাদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে থাকা প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই হলে যদি আর কোনো ‘নৈতিক কাপুরুষ’ থেকে থাকেন যাদের প্রস্থান বাকি, তবে দয়া করে এখনই বেরিয়ে যান। তিনি আরও দাবি করেন, শত্রুরা তাদের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করলেও তারা তাদের মহান আমেরিকান বন্ধুদের সহযোগিতায় উল্টো শত্রুপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন এবং ইরানি সেনাবাহিনী ও তাদের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দিয়েছেন।
ভাষণে বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে চরম বিষোদ্গার করেন নেতানিয়াহু, দেশটির শাসনব্যবস্থাকে ‘ঘাতক স্বৈরাচার’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি দাবি করেন, প্রায় সাত মাস ধরে ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনীর যৌথ আক্রমণের কারণে তেহরান পরমাণু বোমা তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি শপথ করে বলেন, ইসরায়েলকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এবং সমগ্র বিশ্বকে হুমকির মুখে ফেলার জন্য ইরানের ঘাতক স্বৈরাচারকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়ার যে অঙ্গীকার তিনি করেছিলেন, তা রক্ষা করেছেন। অন্যদিকে, জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি তাদের ফাঁকা ডেস্কে নিহত কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানির ছবি প্রদর্শন করে নীরব প্রতিবাদ জানায়। সামরিক হামলা সত্ত্বেও ইরানের সরকার নিজ দেশের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং সুয়েজ খালের মতোই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে নিজের বক্তব্য অব্যাহত রেখে ২০২৪ সালে ব্যবহৃত বিপার বিস্ফোরণের প্রসঙ্গ টেনে নেতানিয়াহু উঁচিয়ে ধরা পেজারটি দেখিয়ে বলেন, আপনাদের বিপারগুলোর কথা মনে আছে? আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি, হিজবুল্লাহ এটি নিশ্চিতভাবেই মনে রেখেছে।
উল্লেখ্য, রিপোর্ট অনুযায়ী এই পেজারগুলোতে গোপনীয়ভাবে বিস্ফোরক সেট করে হিজবুল্লাহ সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল, যাতে শত শত যোদ্ধা পঙ্গু হওয়ার পাশাপাশি বহু সাধারণ নাগরিকও হতাহত হন।
বক্তব্য চলাকালে নেতানিয়াহু তুরস্কের তীব্র সমালোচনা করে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানকে ‘স্বৈরাচার’ বলে আখ্যা দেন এবং অভিযোগ করেন তুরস্ক হামাসকে সমর্থন দিচ্ছে। একইভাবে তিনি নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির বিরুদ্ধে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ হওয়ার অভিযোগ তুলে দাবি করেন যে মামদানি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সেখানকার বহু ইহুদি আর নিজেদের নিরাপদ বোধ করছেন না।
শুধু প্রতিপক্ষই নয়, ঐতিহ্যগত মিত্র ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অতীত ঔপনিবেশিক ইতিহাস টেনেও কড়া আক্রমণ চালান নেতানিয়াহু। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ওপর আগে থেকেই ক্ষুব্ধ নেতানিয়াহু মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, তারা ক্ষুদ্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিকতার অভিযোগ তোলে, অথচ ঈশ্বরের দোহাই, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের লোকেরাই তো এই শব্দের উদ্ভাবন করেছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নির্বাচনী প্রচারণার তুঙ্গে থাকা ইসরায়েলে দ্রুত ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিউইয়র্কে অতি সংক্ষিপ্ত এই সফর করছেন নেতানিয়াহু, যেখানে কোনো শীর্ষ মার্কিন নেতার সঙ্গে তার বৈঠকের সূচি নির্ধারিত নেই।
সূত্র: এনডিটিভি
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা করলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ভারত মহাসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পারে ইরান। বৃহস্পতিবার এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি।
আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স-এ প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় ইয়াহিয়া রহিম বলেন, এরইমধ্যে সংঘাত পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। আরও যুদ্ধ হলে সেটির জবাবে সংঘাতের ফ্রন্ট বিস্তৃত হবে। যা ভারত মহাসাগর ও এর বাইরের অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সৌদি আরবের সঙ্গে লড়াইরত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সম্প্রতি লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এর মাধ্যমে বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে তাদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। এই প্রণালি সুয়েজ খালের মাধ্যমে এশিয়াকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ আছে। তবে ইয়েমেনের সংঘাতে নিজেদের সম্পৃক্ত থাকার কথা তেহরান অস্বীকার করে আসছে।
এর আগেও ইরানি কর্মকর্তারা মার্কিন হামলার জবাবে যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর বিস্তৃত করার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে বৃহস্পতিবারের সতর্কবার্তায় প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ নেতার কোনো উপদেষ্টা সরাসরি ভারত মহাসাগরের কথা উল্লেখ করলেন। মহাসাগরটির দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি আছে। এটি ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে।
সংঘাত অবসানের প্রচেষ্টা হিসেবে চলতি সপ্তাহে দুই দেশের প্রতিনিধিরা নিউইয়র্কে বৈঠক করেছেন। সেখানে নিজেদের শর্ত তুলে ধরে ইরান। এরমধ্যে আছে- আর্থিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বিদেশে জব্দকৃত সম্পদ ছাড়।
গত মঙ্গলবার এএফপিকে বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি। তখন তিনি ইয়েমেনে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিও উল্লেখ করেছিলেন।
ছাড়া হলো ৩০ হাজার প্রজননে অক্ষম পুরুষ মশা
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০ হাজার পুরুষ মশা ছাড়া হয়েছে। বিশেষ পদ্ধতিতে মশাগুলোকে প্রজননে অক্ষম করা হয়েছে। এশিয়ান টাইগার মশার সংখ্যা কমানো এবং এর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
লিসবনের আলভালাদে এলাকায় এসব মশা ছাড়া হয়েছে। এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির এই মশা ডেঙ্গু, জিকা ও হলুদ জ্বরের মতো রোগ ছড়াতে পারে। তবে পুরুষ মশা মানুষকে কামড়ায় না। স্ত্রী মশাই মানুষের রক্ত পান করে। তাই পরীক্ষামূলকভাবে প্রজননে অক্ষম পুরুষ মশা ছেড়ে দিয়ে বন্য মশার সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রজননে অক্ষম পুরুষ মশা বন্য পুরুষ মশার সঙ্গে স্ত্রী মশার মিলনে প্রতিযোগিতা করবে। এসব পুরুষ মশার সঙ্গে স্ত্রী মশার মিলন হলেও কোনো বংশধর জন্মাবে না। ফলে ধীরে ধীরে ওই এলাকায় মশার সংখ্যা কমে আসবে।
প্রকল্পের নেতা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক চিকিৎসক আফনসো মোরেইরা বলেন, প্রথম ধাপে ছাড়া মশাগুলো কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং কতদিন টিকে থাকে, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
পরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে আগামী মে মাসে মশা ছাড়া হয়েছে এমন এলাকা এবং নিয়ন্ত্রিত এলাকার মধ্যে তুলনামূলক গবেষণা করা হবে।
পর্তুগালে এরই মধ্যে মোট ৬০ হাজার মশা ছাড়া হয়েছে। এবারের উদ্যোগটিই এ ধরনের মশা ছাড়ার শেষ ধাপ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শুধু প্রজননে অক্ষম মশা ছাড়লেই মশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আসবে না। মশার বংশবিস্তারের স্থান, বিশেষ করে জমে থাকা পানি ও অন্যান্য প্রজননস্থল ধ্বংস করাও জরুরি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: ইউরোনিউজ