প্রতীকী ছবি
মানুষ যদি নিজের মৃত্যুর সময় সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানতে পারত, তবে হয়তো অনেকেই ভাবত—এখন কিছুদিন পাপ করি, মৃত্যুর আগে তওবা করে নেব। আল্লাহ তো পরম দয়ালু, তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তওবা কবুল করেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। জীবন অনিশ্চয়তায় ভরা। আজ আমরা যাদের সঙ্গে কথা বলছি, কাল হয়তো তাদের কেউ থাকবে না অথবা আমরা নিজেরাই থাকব না।
তবে আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা না থাকলেও একটি বিষয়ের নিশ্চয়তা আছে—দয়াময় আল্লাহ আমাদের জন্য তওবার এমন এক দরজা খোলা রেখেছেন, যা প্রাণ কণ্ঠে পৌঁছে যাওয়ার আগপর্যন্ত কখনো বন্ধ হয় না।
তওবা কী
তওবা শব্দের অর্থ ফিরে আসা। অর্থাৎ পাপ ও অবাধ্যতার পথ ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। নিজের কৃতকর্মের জন্য আন্তরিকভাবে লজ্জিত হওয়া, ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই পাপ আর না করার দৃঢ় সংকল্প করাই হলো প্রকৃত তওবা।
আমরা আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হব না। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি পাপ করে কিংবা নিজের প্রতি জুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু পাবে।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ১১০)
তিনি আরও বলেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)
তওবা কীভাবে করবেন
তওবা মানে আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
> প্রথমে পাপের জন্য অন্তরে সত্যিকারের অনুতাপ থাকতে হবে।
> তারপর সেই পাপ সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিতে হবে।
> ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
> এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে দোয়া করতে হবে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সুন্দরভাবে অজু করলে মানুষের শরীর থেকে পাপ ঝরে যায়, এমনকি নখের নিচ থেকেও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৪)
পাপ করার পর অজু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব। হাদিসে এসেছে, ‘যদি কোনো বান্দা পাপ করে, অতঃপর সুন্দরভাবে পবিত্রতা অর্জন করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫২১)
তওবার দোয়া
আল্লাহ আমাদের ক্ষমা চাওয়ার ভাষাও শিখিয়ে দিয়েছেন।
কোরআনে বর্ণিত তওবার দোয়া
> নবী আদম ও হাওয়ার দোয়া: ‘হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ২৩)
> ইউনুস (আ.)-এর দোয়া: ‘আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭)
> মুমিনদের দোয়া: ‘হে আমাদের রব! আমরা ইমান এনেছি। অতএব আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬)
> অন্য আয়াতে আছে: ‘হে আমাদের রব, আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন, আমাদের ত্রুটিগুলো দূর করুন এবং নেককারদের সঙ্গে আমাদের মৃত্যু দান করুন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৩)
অজু শেষে তওবার জন্য দোয়া: ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু। আল্লাহুম্মাজ আলনি মিনাত তাওয়াবিনা ওয়াজ আলনি মিনাল মুতাতহ্হিরীন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৫)
হাদিসে বর্ণিত ইস্তিগফার: রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও প্রচুর তওবা করতেন। পাপ মাফের জন্য তিনি এই দোয়াটি পড়তে বলতেন: ‘আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাযি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৭)
ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো ‘সাইয়িদুল ইস্তিগফার’। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সকালে বা রাতে এই দোয়া পড়বে এবং এরপর মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৬)
নবীজির শেখানো দোয়া: হজরত আয়েশা (রা.)–কে নবীজি এই দোয়াটি শিখিয়েছিলেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি’ (হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন)। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩)
তওবা কবুল হওয়ার লক্ষণ
তওবা কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত জরুরি: পাপ বর্জন করা, অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করা। যদি মানুষের হক নষ্ট করা হয়, তবে তা আগে আদায় বা মিটিয়ে নিতে হবে।
মূল লক্ষণ: অনেক আলিম বলেন, তওবা কবুল হওয়ার বড় লক্ষণ হলো জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসা—যেমন নেক আমল বৃদ্ধি পাওয়া এবং পাপের প্রতি অনীহা তৈরি হওয়া।
আমরা দুর্বল বলে বারবার ভুল করি, কিন্তু আল্লাহ সেই বান্দাকেই ভালোবাসেন যে বারবার ফিরে আসে। আল্লাহ বলেন, ‘তবে যারা তওবা করে, ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭০)
রাসুল (সা.) বলেছেন, মরুভূমিতে খাদ্য-পানীয়সহ উট হারিয়ে ফিরে পাওয়া ব্যক্তির চেয়েও আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় বেশি আনন্দিত হন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৪৭)
শেষ কথা
তাই অবহেলায় সময় নষ্ট না করে আজই ফিরে আসি প্রতিপালকের দিকে। তিনি কেবল গফুর বা গফফার নন, তিনি ‘আফুউ’ (পরম ক্ষমাশীল)। তিনি চাইলে পাপ আমলনামা থেকেও মুছে দেন।
ছবি : সংগৃহীত
মানবজীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা ও পরম পাওয়া হলো বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন করা। প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ের সুপ্ত আকুলতা থাকে—কীভাবে তিনি তাঁর রবের প্রিয়পাত্র হবেন, কীভাবে লাভ করবেন তাঁর অসীম রহমত ও সান্নিধ্য। পবিত্র কোরআন কেবল নির্দেশনার কিতাব নয়; বরং এটি এমন এক জীবন্ত আলোকবর্তিকা, যেখানে আল্লাহ নিজেই সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন বান্দার কোন কোন গুণ ও আচরণ তাঁর কাছে সর্বাধিক প্রিয়।
পবিত্র কোরআনের আলোকে আল্লাহর খাঁটি ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের ছয়টি মৌলিক গুণ ও আমল আলোচনা করা হলো।
১. সার্বক্ষণিক খোদাভীতি অর্জন
আল্লাহর ভালোবাসা লাভের প্রধানতম সোপান হলো অন্তরে আল্লাহভীতি জাগ্রত রাখা। তাকওয়া কেবল নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়; বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও নজরদারির অনুভূতি নিয়ে চলাই হলো প্রকৃত তাকওয়া।
আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেন, ‘হ্যাঁ, যে ব্যক্তি তার অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭৬)
তাকওয়ার প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে তখন, যখন মানুষ লোকচক্ষুর অন্তরালে সম্পূর্ণ নির্জনতায় থাকে। যেখানে পাপকর্মে লিপ্ত হওয়ার সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধু আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সংযত রাখা এবং প্রবৃত্তির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়াই হলো খাঁটি মুত্তাকির বৈশিষ্ট্য।
২. তাওবার মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; প্ররোচনা ও দুর্বলতার বশবর্তী হয়ে মানুষের পদস্খলন ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু পাপের পর যে হৃদয় উদ্ধত না হয়ে অপরাধ স্বীকার করে, অনুতপ্ত হয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয় এবং বিনীতভাবে রবের কাছে ফিরে আসে—সেই অন্তর আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২)
পাপ যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর রহমত তার চেয়ে বহুগুণ প্রশস্ত। বান্দা যখন অনুতপ্ত হয়ে এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলে তাওবা করে, তখন আল্লাহ–তাআলা মরুভূমিতে পথহারা উট ফিরে পাওয়ার চেয়েও অধিক আনন্দিত হন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৯)
৩. পরোপকারে নিবেদিত হওয়া
আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার অন্যতম প্রধান গুণ হলো ‘ইহসান’ বা আন্তরিক সৎকর্মশীলতা। এর অর্থ হলো প্রতিটি ভালো কাজকে সুন্দর, ত্রুটিহীন ও সর্বোত্তম রূপে সম্পন্ন করা এবং সৃষ্টির প্রতি নিঃস্বার্থ সদাচরণ করা।
আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দেন, ‘আর তোমরা সৎকর্ম করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)
ইহসান কেবল নামাজের একাগ্রতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া এবং মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলাও ইহসানের অন্তর্ভুক্ত।
লোকচক্ষুর অন্তরালে নিঃস্বার্থভাবে করা একটি ছোট সৎকাজও আল্লাহর দরবারে নাজাতের অসিলা হয়ে যেতে পারে।
৪. আল্লাহর ওপর অটল নির্ভরতা
পার্থিব জীবনে মানুষের পরিকল্পনা অনেক সময় ভেস্তে যায়, প্রিয়জনেরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং চারদিকের সমস্ত পথ রুদ্ধ বলে মনে হয়। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেও হতাশ না হয়ে আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাই হলো ‘তাওয়াক্কুল’।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি কোনো সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
তাওয়াক্কুল অর্থ চেষ্টা ও কর্ম পরিত্যাগ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং সাধ্যমতো সঠিক উপকরণ ও সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করার পর চূড়ান্ত ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর সঁপে দেওয়া।
রাসুল (সা.) এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আগে তোমার উটটি রশি দিয়ে বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৭)
৫. প্রতিকূলতায় ধৈর্যধারণ
মানবজীবন পরীক্ষা ও সংকটের এক নিরবচ্ছিন্ন ক্ষেত্র। রোগব্যাধি, আর্থিক ক্ষতি, প্রিয়জন বিয়োগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা মানুষের সামনে বারবার এসে দাঁড়ায়। এই কঠিন মুহূর্তগুলোতে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল থাকার নামই হলো ‘সবর’।
কোরআনে আল্লাহ–তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪৬)
ধৈর্যশীল বান্দা জানে—দুঃখের পরই আসে স্বস্তি এবং সাময়িক এই পরীক্ষার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনন্ত কল্যাণের প্রতিশ্রুতি। এই বিশ্বাসের ওপর অটল থাকাই মুমিনকে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল করে।
৬. আপসহীন ন্যায়পরায়ণতা
আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের আরেকটি অপরিহার্য শর্ত হলো ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে সুবিচার এবং ইনসাফ কায়েম রাখা।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘...এবং তোমরা তাদের সঙ্গে সুবিচার করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত: ৮)।
ইনসাফ কেবল বিচারালয়ের কাঠগড়ায় সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। নিজ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সমতা বজায় রাখা, কর্মক্ষেত্রে অধীনদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া, নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও সত্যের পক্ষে সাক্ষী দেওয়া এবং কারও দুর্বলতার সুযোগ না নেওয়া—এসবই হলো প্রাত্যহিক জীবনের ইনসাফ।
দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যস্ততা, অলসতা কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে অনেকেরই নিয়মিত নামাজ ছুটে যায়। ইসলামে নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা ফরজ। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর সেই নামাজ আদায়ের সুযোগ আছে কি না, ইসলামি শরিয়তে কাজা নামাজ বলতে আদৌ কিছু আছে কি না, কিংবা ইচ্ছাকৃত নামাজ ছাড়লে তা কাজা করতে হয় কি না—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি রয়েছে।
কাজা নামাজ কী
ইসলামি আইনশাস্ত্রে (ফিকহ) ফরজ আমল আদায়ের দুটি রূপ রয়েছে:
আদা: শরিয়ত নির্ধারিত সময়ের ভেতরে নামাজ আদায় করা।
কাজা: নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ছুটে যাওয়া নামাজ পরবর্তীতে পড়ে দায়িত্বমুক্ত হওয়া।
আল্লাহ–তাআলা নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৩)
তবে মানুষের ভুলত্রুটি বা বাধার কারণে ওয়াক্ত পার হয়ে গেলে সেই নামাজ আল্লাহর ‘ঋণ’ হিসেবে বান্দার ওপর থেকে যায় কি না, তা-ই কাজা নামাজের মূল প্রতিপাদ্য।
কাজা নামাজের প্রামাণিক ভিত্তি
ইসলামে কাজা নামাজের অস্তিত্ব হাদিসের স্পষ্ট বিবরণ ও মুসলিম মনীষীদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) দ্বারা প্রমাণিত।
১. অনিচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছুটে গেলে: ঘুম বা ভুলে যাওয়ার কারণে নামাজ কাজা হলে তা স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করা ফরজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নামাজের কথা ভুলে যায় কিংবা ঘুমের কারণে তা ছুটে যায়, তার কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হলো—যখনই তার মনে পড়বে, তখনই সে তা আদায় করে নেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭)
খন্দকের যুদ্ধের সময় কাফেরদের তীব্র আক্রমণের কারণে রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের আসরের নামাজ ওয়াক্তমতো আদায় করা সম্ভব হয়নি। সূর্যাস্তের পর তিনি প্রথমে আসরের কাজা এবং পরে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৬)
অনিচ্ছাকৃত কাজা আদায়ের ব্যাপারে সব যুগের আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে। (আন-নববি, আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব, ৩/৬৬, দারুল ফিকর, বৈরুত, তাবি; ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ১/৪৩৫, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ১৯৯৭)
২. ইচ্ছাকৃত নামাজ ছেড়ে দিলে: কোনো যুক্তিসংগত অপারগতা ছাড়া ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগ করা মহাপাপ (কবিরা গুনাহ)। এটা চার মাজহাবের সর্বসম্মত মত। তবে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও খাঁটি তওবার পাশাপাশি পূর্বের সব ছুটে যাওয়া নামাজের কাজা আদায় করা আবশ্যক:
হানাফি মাজহাব: ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগকারীর নামাজ জিম্মায় দায় হিসেবে থেকে যায় এবং তা কাজা করা ছাড়া দায়মুক্ত হওয়া যায় না। (আস-সারাখসি, আল-মাবসুত, ১/১২৪, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৯৩)
মালিকি মাজহাব: ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগের পরও অনুতপ্ত হয়ে পূর্বের নামাজ কাজা আদায় করা ফরজ। (ইবনে আবদিল বার, আল-ইস্তিজকার, ২/৭৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)
শাফিয়ি মাজহাব: ইমাম শাফিয়ি যুক্তি দেন, ঘুমন্ত ব্যক্তির যদি কাজা লাগে, তবে অবহেলাকারীর ক্ষেত্রে কাজা আদায় আরও বেশি প্রযোজ্য। (আশ-শাফিয়ি, কিতাবুল উম্ম, ১/১৪৭, দারুল ওয়াফা, আল-মানসুরা, ২০০১)
হাম্বলি মাজহাব: অনুতপ্ত নামাজ ত্যাগকারী ইসলামের ওপর অটল থাকলে তার অতীত জীবনের নামাজ ধারাবাহিকভাবে কাজা করতে হবে। (ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ১/৪৩৮, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ১৯৯৭)
কাজা নামাজ নিয়ে সন্দেহ কেন
ইতিহাসের কিছু ফকিহ ও আলেম—যেমন ইমাম ইবনে হাজম, ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম প্রমুখ মত দেন যে ইচ্ছাকৃত নামাজ ছাড়লে পরবর্তী সময়ে আর কাজা হয় না। (আল-মুহাল্লা বিল আসার, ২/২৩৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৮; মাজমুউল ফাতাওয়া, ২২/৩৭, মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা, ১৯৯৫; কিতাবুস সালাত ওয়া হুকমু তারিকিহা, পৃ. ৬৪, দারুল ইমাম আল-বুখারি, দামেস্ক, ২০০৬)
তাঁদের মূল যুক্তিগুলো হলো:
সময়ের বাধ্যবাধকতা: ওয়াক্ত আসার আগে যেমন নামাজ হয় না, তেমনি ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পরও তা পড়ার সুযোগ নেই।
ভুল তুলনা: হাদিসে শুধু ঘুমন্ত ও ভুলোমনা ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। কোনো ক্ষমার যোগ্য অপারগ ব্যক্তির বিধানকে ইচ্ছাকৃত অপরাধীর ওপর চাপানো ঠিক নয়।
নতুন নির্দেশের অভাব: শরিয়তে সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ইচ্ছাকৃত ত্যাগকারীর জন্য নতুন কোনো কাজা করার সরাসরি আদেশ আসেনি।
নফল দিয়ে পূরণ: রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন ফরজের ঘাটতি থাকলে আল্লাহ নফল দিয়ে তা পূরণ করবেন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৪১৩)। তাই তাঁদের মতে, কাজা না পড়ে বেশি বেশি নফল পড়া উচিত।
সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহদের জবাব
চার মাজহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ (জমহুর ওলামা) এই সন্দেহের জবাব দিয়েছেন:
অগ্রাধিকারমূলক যুক্তি: কোনো অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও যদি ঘুম বা বিস্মৃতির কারণে আল্লাহর হক বাতিল না হয়ে কাজা করা লাগে, তবে অবহেলাকারী অপরাধীর ক্ষেত্রে নামাজ মাফ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তার দায় আরও কঠোর।
আল্লাহর ঋণ পরিশোধের মূলনীতি: রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর প্রাপ্য ঋণ পরিশোধ করাই সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৫৩)। নামাজ হলো একটি ঋণ; সময় পার হলেও বান্দার কাঁধ থেকে এই ঋণ দূর হয় না।
রোজার বিধানের সাদৃশ্য: রমজানের রোজা ইচ্ছাকৃত ভাঙলে সবার মতেই কাজা করতে হয়। রোজা যদি সময়ভিত্তিক হয়েও কাজা প্রযোজ্য হয়, তবে নামাজের ক্ষেত্রেও তা অবশ্য পালনীয়।
মুসলিম হিসেবে দায় বহাল: অলসতাবশত নামাজ ত্যাগকারী ব্যক্তি পাপী হলেও কাফের নয়। তাই তার অতীত জীবনের ফরজগুলোর দায় শরিয়ত অনুযায়ী বহাল থাকে।
নামাজ কাজা হলে কী করব
সংশয়ে পড়ে নামাজ কাজা না করে বসে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। চার মাজহাবের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী বিগত জীবনের কাজা নামাজ আদায় করে দায়মুক্ত হওয়াই নিরাপদ। তাই আমাদের করণীয় হলো:
আন্তরিক তাওবা: অতীতে নামাজ ছেড়ে দেওয়ার ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে কখনো নামাজ না ছাড়ার প্রতিজ্ঞা করা।
সম্ভাব্য হিসাব নির্ধারণ: প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর কত দিন বা বছর নামাজ পড়া হয়নি, তার একটি সতর্কতামূলক আনুমানিক সংখ্যা ঠিক করে নেওয়া।
দৈনন্দিন রুটিন করে বিগত কাজা পড়া: বর্তমান পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সঙ্গে পেছনের ছুটে যাওয়া এক বা একাধিক ওয়াক্তের কাজা ধারাবাহিকভাবে আদায় করা (যেমন: আজকের ফজরের সঙ্গে পেছনের একটি কাজা ফজর পড়ে নেওয়া)।
সহজ নিয়ত: মনে মনে নিয়ত করা, ‘আমার দায়িত্বে থাকা পেছনের ছুটে যাওয়া কাজা নামাজের মধ্য থেকে প্রথম বা শেষ অমুক ওয়াক্তের (যেমন: ফজর/জোহর) ফরজ নামাজ আদায় করছি।’
শুধু ফরজ নামাজের কাজা পড়া: দৈনিক পাঁচ ওয়াক্তের ১৭ রাকাত ফরজ এবং এশার সঙ্গের ৩ রাকাত বিতর—মোট ২০ রাকাত। সাধারণ সুন্নত বা নফল নামাজের কাজা পড়তে হয় না।
অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি তাওবার পাশাপাশি নিয়মিত কাজা নামাজ আদায় করে নেওয়াই একজন সচেতন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাঠগড়ায় দায়মুক্তির নিশ্চয়তা লাভ করতে পারে।
দুনিয়ার জীবনে মানুষের দুঃখ-কষ্টের সীমা নেই। তা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থিক যেকোনো ধরনের বিষয়ে মানুষের ওপর বিপদ-আপদ নেমে আসতে পারে। কারণ এই জগতে সবাইকে পরীক্ষা করাই আল্লাহর উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে আখিরাতে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিদান পাওয়া যায়। তাই পার্থিব জীবনে কোনো বিপদ-আপদে মুমিনের করণীয় হলো, ধৈর্য ধারণ করা ও কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূরণে অবিচল থাকা।
আল্লাহ বলেন, আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তার কাছেই ফিরে যাবো।' তাদের ওপরই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত, আর তারাই সঠিক পথে পরিচালিত।' (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৫-১৫৭)
আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ মুমিনদের নানাভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। আর বিপদগ্রস্তদের মধ্যে যারা আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তাদের জন্য বিশেষ সুসংবাদ রয়েছে।
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বলেছেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন কারা? তখন তিনি বললেন, নবীগণ, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী মর্যাদার অধিকারী অর্থাত্ নেককার বান্দারা। তারপর যারা তাদের পরবর্তী মর্যাদার অধিকারী। মানুষকে তার দ্বিনের দৃঢ়তা অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। তার দ্বিনের মধ্যে যদি দৃঢ়তা থাকে, তাহলে তার পরীক্ষাও কঠিন করা হয়। আর তার দ্বিনের মধ্যে যদি দুর্বলতা থাকে, তাহলে তার পরীক্ষা হালকা করা হয়। আর বান্দার ওপর একের পর এক বিপদ-আপদ আসতেই থাকে, অবশেষে সে পৃথিবীর বুকে এমন অবস্থায় চলাফেরা করে যে, তার ওপর কোনো গুনাহ অবশষ্টি থাকে না।' (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৯৮)
তাই কোনো বিবাদ ও ঝামেলায় ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহর কাছে আকুতি-মিনতি জানানো একমাত্র সম্বল। ইরশাদ হয়েছে, যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধারণ করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিজিক প্রদান করেছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভালো কাজের মাধ্যমে মন্দকে দূর করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের শুভ পরিণাম।' (সুরা রাআদ, আয়াত : ২২-২৪)
বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে অগণিত পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, আর আল্লাহর জমিন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরই তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।' (সুরা ঝুমার, আয়াত : ১০)
উম্মে সালামা (রা.) বলেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, কোনো মুসলিমের ওপর যখন কোনো বিপদ-আপদ আসে এবং সে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তার কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এই বিপদের জন্য আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। তখন আল্লাহ অবশ্যই তাকে এর পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।'
উম্মে সালামা (রা.) বলেন, যখন আবু সালামা (রা.) মারা যান, তখন আমি মনে মনে বললাম, আবু সালামার চেয়ে উত্তম কোনো মুসলিম আর কে হতে পারে?' তিনি তো ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি সর্বপ্রথম তার পরিবারসহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে হিজরত করেছিলেন। এরপরও আমি রাসুলুাল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সেই দোয়া পাঠ করলাম, হে আল্লাহ! আমার এই বিপদের জন্য আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন।' তখন আল্লাহ আমাকে আবু সালামার পরিবর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দান করলেন।
এরপর উম্মে সালামা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য সাহাবি হাতিব ইবনু আবি বালতাআ (রা.)-কে আমার কাছে পাঠালেন।' আমি বললাম, আমার একটি ছোট শিশু-কন্যা রয়েছে এবং আমি খুবই আত্মমর্যাদাশীল ও ঈর্ষাপ্রবণ।'
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার মেয়ের ব্যাপারে আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করব, যেন তিনি তাকে তোমার মুখাপেক্ষী না রাখেন। আর তোমার ঈর্ষা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করব, যেন তিনি তোমার সেই ঈর্ষা দূর করে দেন।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১৮)
মহান আাল্লাহ সবাইকে সব পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দিন।
ইসলাম মানুষের জীবনকে কৃচ্ছ্রসাধনের অন্ধকারে আবদ্ধ না করে বৈধ স্বাচ্ছন্দ্য গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। তবে সেই অনুমতির সঙ্গে শিখিয়েছে সংযম ও ভারসাম্য। মানুষ খাবে, পরবে, ব্যয় করবে এবং আল্লাহর নেয়ামত উপভোগ করবে, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই সীমা অতিক্রম কিংবা অপচয় করবে না। মানবজীবনে অপচয়ের সাতটি প্রভাব হলো-
১. আল্লাহর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়া
একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মহান আল্লাহর ভালোবাসা। সম্পদ, সম্মান, নেতৃত্ব কিংবা ক্ষমতা যত মূল্যবানই হোক, রবের সন্তুষ্টি ও ভালোবাসার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
এ সংক্ষিপ্ত নির্দেশনার মধ্যেই অপচয়বিরোধী ইসলামি দর্শনের মূল কথা নিহিত রয়েছে।
২. অপচয়কারী শয়তানের ভাই
শয়তান মানুষের মধ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা ও অকৃতজ্ঞতার প্রবণতা সৃষ্টি করতে চায়। অপচয়ও মানুষকে এমন এক মানসিকতার দিকে নিয়ে যায়, যেখানে সে প্রাপ্ত নেয়ামতের যথাযথ মূল্য না দিয়ে অবহেলায় তা নষ্ট করে।
এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই আর শয়তান তার রবের প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭)
আয়াতে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। এটি অপচয়ের চরিত্রগত বিপজ্জনক দিকটি তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষা।
৩. নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা
অপচয়ের একটি গুরুতর প্রভাব হলো অন্তর থেকে নেয়ামতের প্রকৃত মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়া। একটি খাদ্য কণার পেছনে অগণিত মানুষের পরিশ্রম আর আল্লাহর অপরিসীম করুণা জড়িয়ে থাকে। এ বোধ যার অন্তরে জাগ্রত থাকবে, তার বিবেক কোনো কিছু নষ্ট করতে সায় দেবে না। আল্লাহর এসব নেয়ামত তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার দাবি রাখে।
মহান আল্লাহ সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব আর তোমরা অকৃতজ্ঞ হলে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)
কেবল মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার নাম কৃতজ্ঞতা নয়, প্রকৃত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায় নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহারে। অর্থসম্পদের অপচয় অকৃতজ্ঞতারই বাহ্যিক রূপ।
৪. নেয়ামত পরিবর্তনের আশঙ্কা
মানুষ যখন কোনো অনুগ্রহের যথাযথ মূল্য না দেয়, তখন তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ইতিহাসে বহু জাতি প্রাচুর্য ও ক্ষমতা পেয়েও তা সংরক্ষণ করতে পারেনি, অকৃতজ্ঞতার ফলে তাদের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল।
কোরআনে এসেছে, ‘এটি এ কারণে যে আল্লাহ কোনো জাতিকে যে নেয়ামত দান করেছেন, তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন না করা পর্যন্ত তিনি তা পরিবর্তন করেন না।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৫৩)
অপচয় কোনো সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করলে তার ক্ষতি কেবল দু-একটি পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য নষ্ট হলে খাদ্যের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়, পানির অপব্যবহার করলে পানিসংকট তৈরি হয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অসংযত ব্যবহারে জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হয় এবং এর প্রভাব একসময় জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। ব্যক্তিপর্যায়ের অসচেতনতা তখন সামষ্টিক বোঝায় পরিণত হয়।
৫. প্রাচুর্যের মোহে আখিরাতবিমুখ হয়ে পড়া
অপচয়ের অভ্যাস কখনো কখনো এমন এক জীবনদর্শনে পরিণত হয়, যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে আকাঙ্ক্ষাই মানুষের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। ফলে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চাহিদা জন্ম নিতে থাকে। একটি প্রাপ্তি আরেকটি প্রাপ্তির ক্ষুধা বাড়ায়। মৃত্যু ছাড়া এ প্রতিযোগিতার কোনো শেষ গন্তব্য নেই।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফিল করে রেখেছে, এমনকি তোমরা কবরস্থানে পৌঁছে গেছ।’ (সুরা তাকাসুর, আয়াত: ১-২)
জীবনের সব অর্জন যদি ভোগবিলাস ও প্রতিযোগিতার পেছনে ব্যয় হয়, তাহলে আখিরাতের প্রস্তুতি ক্রমেই গুরুত্ব হারাতে থাকে। অপচয় কখনো কখনো মানুষের অন্তর থেকেও জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যকে বিস্মৃত করে দেয়।
৬. পরকালীন জবাবদিহি
মানুষের হাতে যে সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে সে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। উপার্জনের উৎস যেমন প্রশ্নের বিষয়, তেমনি ব্যয়ের খাতও জবাবদিহির অন্তর্ভুক্ত।
নবীজি (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, (তার মধ্যে একটি হলো) তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)
এ হাদিস মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে পরকালীন দায়বদ্ধতাকেও যুক্ত করে দিয়েছে। অপচয়ের ক্ষেত্রে এ জবাবদিহির অনুভূতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খাতে ব্যয় করা বৈধ হলেই তা সব সময় প্রশংসনীয় হয় না। তাই ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় সীমা লঙ্ঘন করার বিষয়েও মুমিনকে ভাবতে হবে।
৭. অর্থনৈতিক সংকট
অসংযত ব্যয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিণতি হলো অর্থনৈতিক সংকট। অপ্রয়োজনীয় খরচ যদি কারও নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে সে একসময় অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।
কোরআনে এসেছে, ‘তোমার হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং একেবারে পুরোপুরি প্রসারিতও করো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৯)
এখানে দুটি চরম অবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। একদিকে কৃপণতা, অন্যদিকে লাগামহীন ব্যয়। ইসলামের শিক্ষা মাঝামাঝি পথ। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উদারতা আর অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংযম।
অপচয় এমন একটি ব্যাধি, যার ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা, অসুস্থ সময়ের প্রস্তুতি কিংবা হঠাৎ নেমে আসা সংকট-এসব বিবেচনায় রেখে ব্যয় করা দূরদর্শী মানুষের গুণ। সুতরাং মিতব্যয়িতা দারিদ্র্যের প্রতীক নয়, এটি ভবিষ্যৎ-সচেতনতার পরিচয়।
ছবি : সংগৃহীত
ইমানদার আল্লাহ–তাআলার প্রিয় বান্দা। ইমানের আলোয় আলোকিত মানুষই দুনিয়ার পথচলায় সঠিক দিশা পায় এবং আখেরাতের অনন্ত জীবনে সফলতার অধিকারী হয়। পবিত্র কোরআন মুমিনদের এই সৌভাগ্যের কথা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত, আর তারাই প্রকৃত সফলকাম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৫)
তবে ইমান শুধু মুখের স্বীকৃতির নাম নয়, এর রয়েছে কিছু দৃশ্যমান আলামত, নৈতিক বৈশিষ্ট্য ও জীবনঘনিষ্ঠ দাবি। মানুষের অন্তরে ইমানের যে আলো জ্বলে, তার বিচ্ছুরণ আচরণ, চিন্তা, আমল ও জীবনদর্শনে প্রকাশ পায়।
তাই প্রকৃত মুমিনকে চেনার জন্য তার কথার পাশাপাশি কর্ম ও চরিত্রের দিকেও তাকাতে হয়।
ইমানের বাস্তবতা কেমন
এক হাদিসে মুমিনের এমন ২০টি বৈশিষ্ট্যের কথা উঠে এসেছে, যার মধ্যে ইমানের মৌলিক বিশ্বাস, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আমল এবং উন্নত নৈতিক গুণাবলি সবই অন্তর্ভুক্ত।
সাহাবি সুওয়াইদ ইবনে হারেস (রা.) বলেন, একবার তিনি তাঁর গোত্রের সাতজন লোককে সঙ্গে নিয়ে রাসুলের দরবারে উপস্থিত হন। তাঁদের চেহারা ও পোশাক দেখে সন্তুষ্ট হয়ে নবীজি জানতে চাইলেন, ‘তোমরা কারা?’
তাঁরা উত্তর দিলেন, ‘আমরা মুমিন।’
তাঁদের এ পরিচয় শুনে নবীজি মুচকি হাসলেন। এরপর বললেন, ‘প্রত্যেক জিনিসের একটা বাস্তবতা রয়েছে। তোমাদের কথার এবং তোমাদের ইমানের বাস্তবতা কী?’
তাঁরা বললেন, ‘পনেরোটি গুণ রয়েছে আমাদের মধ্যে। এর পাঁচটি বিষয়ে আপনার প্রেরিত দূতেরা আমাদের ইমান আনতে বলেছেন, পাঁচটি বিষয়ে আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আরও পাঁচটি গুণ আমরা ইসলামপূর্ব যুগে অর্জন করেছি, এখনো সেগুলোর ওপর অটল আছি। আপনি যদি এগুলোর কোনোটি অপছন্দ করেন, তাহলে আমরা তা পরিত্যাগ করব।’
রাসুল (সা.) প্রথমে জানতে চাইলেন, ‘আমার প্রেরিত দূতেরা তোমাদের কোন কোন বিষয়ে ইমান আনতে বলেছেন?’ তাঁরা বললেন,
১. আল্লাহর ওপর ইমান আনা।
মুমিনের বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু এক আল্লাহ। তাঁর সত্তা, ক্ষমতা, জ্ঞান ও কর্তৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা ইমানের প্রথম ভিত্তি।
২. ফেরেশতাদের ওপর ইমান আনা।
আল্লাহর নুরানি সৃষ্টি ফেরেশতারা তাঁর নির্দেশ পালন করেন। তাঁদের অস্তিত্ব ও তাঁদের প্রতি অর্পিত দায়িত্বে বিশ্বাস করা ইমানের অপরিহার্য অংশ।
৩. আল্লাহর কিতাবসমূহের ওপর ইমান আনা।
মানবজাতির হিদায়াতের জন্য আল্লাহ যুগে যুগে তাঁর নবীদের ওপর কিতাব ও ওহি নাজিল করেছেন। সেই আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস রাখা আকিদার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৪. রাসুলদের ওপর ইমান আনা।
মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনার জন্য আল্লাহ যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। তাঁদের সত্যতা স্বীকার করা এবং তাঁদের আনীত হিদায়াতকে সত্য বলে গ্রহণ করা ইমানের অপরিহার্য দাবি।
৫. পুনরুত্থানের ওপর বিশ্বাস রাখা।
মানুষ মৃত্যুবরণ করবে। এরপর একদিন সবাইকে পুনরায় জীবিত করে আল্লাহর সামনে দাঁড় করানো হবে এবং দুনিয়ার প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে।
এরপর রাসুল (সা.) জানতে চাইলেন, ‘আমার প্রেরিত দূতেরা তোমাদের কী কী আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন?’ তাঁরা উত্তর দিলেন,
৬. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করা।
এই তাওহিদের ঘোষণা ইমানের ভিত্তি। এর মাধ্যমে ইমানদার ব্যক্তি সব মিথ্যা উপাস্য ও পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সমর্পণ করে।
৭. নামাজ কায়েম করা।
নামাজ আল্লাহর সঙ্গে মুমিনের সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে। ইবাদতের পাশাপাশি এটি অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও জীবনকে শৃঙ্খলিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
৮. জাকাত প্রদান করা।
সম্পদ আল্লাহর দেওয়া আমানত। তার নির্ধারিত অংশ হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে মুমিন নিজের সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজের অসহায় মানুষের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করে।
৯. রমজানের রোজা রাখা।
রোজা মানুষকে প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ শেখায়। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মধ্য দিয়ে আত্মসংযম, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির যে শিক্ষা অর্জিত হয়, তা মুমিনের চরিত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
১০. সামর্থ্য থাকলে হজ করা।
আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা অর্জিত হলে আল্লাহর ঘরের হজ করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এতে মুমিন আল্লাহর আনুগত্য, ত্যাগ, ঐক্য ও আত্মসমর্পণের অনন্য শিক্ষা লাভ করে।
এরপর রাসুল (সা.) জানতে চাইলেন, ‘ইসলামপূর্ব যুগে তোমরা কোন কোন গুণ অর্জন করেছিলে?’ তাঁরা বললেন,
১১. স্বাচ্ছন্দ্যে আল্লাহর শোকর আদায় করা।
সুখ-সমৃদ্ধি মানুষের জন্য যেমন পরীক্ষা, তেমনি বিপদও পরীক্ষা। প্রকৃত মুমিন প্রাচুর্যে আত্মভোলা হয় না। নিজের প্রাপ্তিকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে দেখে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করে।
১২. বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা।
জীবনের পথ সব সময় মসৃণ থাকে না। দুঃখ, ক্ষতি ও সংকটের মুহূর্তে নিজেকে সামলে রাখা এবং আল্লাহর ওপর আস্থা অটুট রাখা মুমিনের অন্যতম সৌন্দর্য।
১৩. সম্মুখযুদ্ধে অঙ্গীকার রক্ষা করা।
ভয় কিংবা বিপদের মুখেও প্রতিশ্রুতি থেকে সরে না যাওয়া চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয়। মুমিনের কাছে অঙ্গীকার তার নৈতিক দায়বদ্ধতার অংশ।
১৪. আল্লাহর সব ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা।
আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন, তার পেছনে তাঁর প্রজ্ঞা রয়েছে। এই বিশ্বাস মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি করে। নিজের ইচ্ছা পূরণ না হলেও সে আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করে না।
১৫. বিপদের সময় শত্রুর বিদ্রূপ সহ্য করা।
প্রতিকূলতার সময় মানুষ যখন বিদ্রূপ ও কটূক্তির শিকার হয়, তখন উত্তেজিত হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো সহজ। কিন্তু অপমানের জবাবে নিজেকে সংযত রাখা এবং ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া উন্নত চরিত্রের লক্ষণ।
এই গুণগুলোর কথা শুনে নবীজি তাঁদের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার প্রশংসা করলেন। তিনি বললেন, ‘তোমরা জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। তোমাদের বোধবুদ্ধি প্রায় নবীদের কাছাকাছি।’
এরপর নবীজি (সা.) বললেন, ‘তোমরা যদি ইমানের দাবিতে সত্যবাদী হও, তাহলে আমি তোমাদের জন্য আরও পাঁচটি গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছি।’
এভাবে ইমানের বৈশিষ্ট্য পূর্ণ হলো ২০টিতে। সেই পাঁচটি গুণ হলো,
১৬. এমন সম্পদ সঞ্চয় না করা, যা নিজে ভোগ করা হবে না।
সম্পদ কেবল প্রয়োজন মেটানোর উপায়, জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে শুধু জমিয়ে রাখার নেশা মানুষকে দুনিয়ার মোহে বন্দী করে ফেলে। তাই মুমিন সম্পদের মালিক হলেও তার দাস হয় না।
১৭. এমন ঘর নির্মাণ না করা, যেখানে বসবাস করার সুযোগ হবে না।
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, অথচ অনেক সময় সে এমন ভবিষ্যতের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যার সাক্ষাৎ তার ভাগ্যে নাও জুটতে পারে। মুমিন তাই দুনিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করলেও জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্যকে ভুলে যায় না।
১৮. এমন বিষয় নিয়ে বিবাদে না জড়ানো, যা আগামীকাল ছেড়ে যেতে হবে।
দুনিয়ার অসংখ্য বিষয় নিয়ে মানুষ রাগ, বিরোধ ও শত্রুতায় জড়িয়ে পড়ে। অথচ যার জন্য আজ এত উত্তেজনা, মৃত্যুর মুহূর্তে তার কিছুই সঙ্গে যাবে না। বিচক্ষণ মুমিন তাই ক্ষণস্থায়ী বিষয়কে কেন্দ্র করে নিজের শান্তি ও সম্পর্ক নষ্ট করে না।
১৯. সেই আল্লাহকে ভয় করা, যাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।
তাকওয়া মুমিনের অন্তরের প্রহরী। মানুষ যখন একাকী থাকে, যখন তাকে দেখার মতো কেউ থাকে না, তখনো ‘আল্লাহ দেখছেন’ এই অনুভূতিই তাকে গোপন ও প্রকাশ্য উভয় পাপ থেকে দূরে রাখে।
২০. সেই চিরস্থায়ী জীবনের প্রতি আকাঙ্ক্ষী হওয়া, যেখানে অনন্তকাল অবস্থান করতে হবে।
দুনিয়া মুমিনের চূড়ান্ত ঠিকানা নয়। তার আসল আকাঙ্ক্ষা এমন জীবন, যেখানে মৃত্যু, বিচ্ছেদ, দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ এবং কোনো ধরনের অপূর্ণতা নেই। (আবু নুআইম ইস্পাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তবকাতিল আসফিয়া, ৯/২৭৯, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৪১৬ হিজরি)
প্রতীকী ছবি
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ বুধবার। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম এবং ওফাতের পুণ্য স্মৃতিময় দিন। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে, আরবি বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে তাঁর জন্ম হয়। ৬৩ বছরের জীবনে ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির পথ দেখিয়ে একই তারিখে তিনি পৃথিবী ছেড়ে যান।
আরব দুনিয়া যখন আইয়ামে জাহেলিয়াত বা পাপাচারের অন্ধকারে ডুবে ছিল, তখন আলোকবর্তিকা হয়ে জন্ম হয় আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর। মক্কার কুরাইশ গোত্রের সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। অল্প বয়সেই তিনি সত্যবাদিতা ও সততার প্রতীক হয়ে ওঠেন; শান্তি প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত হন। ক্ষমাশীলতা, দানশীলতা ও সহিষ্ণুতায় তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন। দীর্ঘ ২৩ বছর ইসলামের বার্তা প্রচার করেন। শুধু আধ্যাত্মিক শিক্ষা নয়; মদিনায় কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
সারাবিশ্বের ইসলাম ধর্মাবলম্বীর মতো বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরাও যথাযোগ্য মর্যাদায় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও মৃত্যুর দিনকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) হিসেবে পালন করেন। অনেকে নফল নামাজ আদায় করেন। কেউ কেউ রোজা রাখেন। রাসুল (সা.)-এর সম্মানে কোরআনখানি, মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো সাজানো হয়েছে কালেমাখচিত পতাকা ও জাতীয় পতাকায়।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশ ও মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তারা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিংসা-বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহার করে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। বন্ধ থাকবে সংবাদপত্রও। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন আলোচনা সভা, মিলাদ, দোয়া মাহফিলসহ বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে গতকাল মঙ্গলবার বাদ মাগরিব থেকে শুরু হয়েছে পক্ষকালব্যাপী আয়োজন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে বিএনপি। সিরাতুন্নবী (সা.) নামে জামায়াত এবং দলটির বিভিন্ন সংগঠন মাসব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে। আজ বাদ আসর বাংলামটরে দলীয় কার্যালয়ে মেহফিলে ইশক রাসুল (সা.) এবং নাত-সন্ধ্যার আয়োজন করেছে এনসিপি।
অন্যান্য বছরের মতো এবারও আশেকানে মাইজভান্ডারি জশনে জুলুসের আয়োজন করছে। আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে।