পরকালের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন
পৃথিবীতে আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবনে শুধু একটি বিষয়েরই শতভাগ নিশ্চয়তা রয়েছে, আর তা হলো মৃত্যু। মৃত্যু এমন এক বাস্তব সত্য, যা থেকে পালানোর কোনো পথ মানুষের নেই। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে।
অন্য আয়াতে এসেছে, তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের স্পর্শ করবেই; এমনকি তোমরা যদি সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরেও অবস্থান করো।
প্রশ্ন উঠতে পারে, জীবন-মৃত্যু ও পুনরুত্থানের এই অন্তহীন চক্রের উদ্দেশ্য কী? যুগের পর যুগ ধরে বড় বড় দার্শনিকদের মনে এই প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে। তবে মানুষের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অদৃশ্যের এই রহস্য ভেদ করা অসম্ভব। এর উত্তর শুধু তিনিই দিতে পারেন, যার কাছে অদৃশ্যের চাবিকাঠি রয়েছে।
সূরা মুলক-এ আল্লাহ বলছেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন যে, তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে কে সবচেয়ে উত্তম। আর তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।
ধরা যাক, আমরা যদি মাত্র কয়েক দিনের জন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রে সফরে যাই, তবে তার প্রস্তুতি নিতেই আমাদের সপ্তাহখানেক লেগে যায়। কেনাকাটা, ব্যাগ গোছানো এবং প্রয়োজনীয় রসদ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন তোড়জোড় চলে। তাহলে আমাদের যে চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী যাত্রার টিকিট নিশ্চিত হয়ে আছে, তার জন্য আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু? এই যাত্রার সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো, আমরা কেউই জানি না আমাদের কখন আসবে। এটা যেকোনো মুহূর্তে, এমনকি এখনই হতে পারে।
দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী আর পরকাল চিরস্থায়ী। জান্নাতের অসীম নিয়ামত কিংবা জাহান্নামের কঠিন শাস্তি-সবকিছুই হবে অনন্তকাল ধরে, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ থাকবে না। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো বর্তমান সময়কে কাজে লাগানো এবং আজ থেকেই পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
কেয়ামতের দিনের অন্যতম একটি নাম হলো ইয়াওমুল হাসরাহ, যার অর্থ অনুতাপ বা আফসোসের দিন। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, সেদিন যদি জান্নাতে যাওয়ার জন্য মাত্র একটি নেক আমল কম পড়ে, তবে কেমন হবে সেই পরিস্থিতি? তখন হয়তো আমাদের আফসোস করে বলতে হবে, ইশ! যদি ফজরের ঘুমের চেয়ে নামাজকে প্রাধান্য দিতাম, কিংবা যদি সেই ছোট গুনাহটি না করতাম! শুধু এই ভাবনাটুকুই অন্তরকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
অনেক সময় আমাদের ইমান যখন খুব চাঙ্গা থাকে, তখন আমরা একসঙ্গে অনেক বেশি ভালো কাজ করার চেষ্টা করি। তবে সামর্থ্যের অতিরিক্ত করতে গিয়ে একসময় আমরা হাঁপিয়ে উঠি এবং পরে অলসতার কারণে ফরজ কাজগুলোও ঠিকঠাক করতে পারি না। এই পরিস্থিতি এড়াতে আলেমরা তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রথমত, নিজের নামাজকে ঠিক করা। সময়মতো এবং নিয়মিত নামাজ পড়ার পাশাপাশি অন্তরে প্রশান্তি বা খুশু-খুজু তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সফল তো তারাই, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী ও নম্র।
দ্বিতীয়ত, একসঙ্গে অনেক ভালো কাজ করতে গিয়ে ক্লান্ত না হয়ে, ভেতরকার খারাপ অভ্যাসগুলো একে একে দূর করা। একটি খারাপ অভ্যাসকে একটি ভালো অভ্যাস দিয়ে প্রতিস্থাপন করা উচিত; যেমন লোভের জায়গায় দানশীলতা তৈরি করা।
তৃতীয়ত, সবসময় সৎ ও ভালো বন্ধুদের সাহচর্যে থাকা। কারণ মানুষ সাধারণত তার বন্ধুর আদর্শ দ্বারাই প্রভাবিত হয়।
একজন প্রকৃত মুমিনের মূল লক্ষ্য থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আল্লাহ যা ভালোবাসেন, তা ভালোবাসা এবং আল্লাহ যা অপছন্দ করেন, তা থেকে দূরে থাকাই ইমানের মূল ভিত্তি। আল্লাহর প্রতি এই ভালোবাসা তৈরি হয় আশা এবং ভয়ের সমন্বয়ে।
বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইবনুল কাইয়িম ইমানকে একটি পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যার মাথা হলো ভালোবাসা আর দুই ডানা হলো আশা ও ভয়। একটি ডানা ভেঙে গেলে বা ভারী হয়ে গেলে পাখি যেমন উড়তে পারে না, তেমনি আশা ও ভয়ের ভারসাম্য না থাকলে মুমিনও তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার গভীরতা নিয়ে শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ বলেছেন, আল্লাহর ভালোবাসা হলো স্বয়ং জীবন, যা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ হলো এক ভয়ানক মৃত্যু। এটি এমন এক আলো, যা ছাড়া মানুষ অন্ধকারের সমুদ্রে হারিয়ে যাবে। এটি অন্তরের সমস্ত রোগের একমাত্র নিরাময় এবং এটিই ইমানের মূল নির্যাস। এই ভালোবাসা ছাড়া মানুষ কখনো জান্নাতে পৌঁছাতে পারবে না।
আমাদের এই সীমিত সময়কে কাজে লাগিয়ে পরকালের চিরস্থায়ী আবাস সুন্দর করার এবং আল্লাহর প্রকৃত ভালোবাসা পাওয়ার তাওফিক দান করুন।
ছবি : সংগৃহীত
দাম্পত্য জীবনের শুরুটা সহজ, কিন্তু সেটাকে বছরের পর বছর সুন্দর রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য লাগে ধৈর্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ আর একটু প্রজ্ঞা। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজের অভিমান আর রাগ সংযত করতে হয়।
একজন স্বামীর ভূমিকা তখন হয়ে ওঠে কৌশলী আর স্নেহশীল একজন অভিভাবকের মতো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া না থাকলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে, কখনো কখনো তা গড়ায় বিচ্ছেদ পর্যন্ত।
অথচ কিছু সহজ, প্রতিদিনের অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করলে ভালোবাসা আর বিশ্বাস অনেক গভীর হয়ে ওঠে। স্ত্রীর ভুল হলে অপমান নয়, ভালোবাসা দিয়েই তা সংশোধন করা উচিত। তাঁকে অনুভব করাতে হয় যে পৃথিবীতে আপনিই তাঁর সবচেয়ে আপন মানুষ।
১. নিজের যত্ন নেওয়া, তাঁর যত্ন নেওয়া
স্ত্রীর সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকাটা ছোট বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব গভীর। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) নিজে এ অভ্যাসের কথা বলেছেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য এমনই পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমি তার কাছ থেকে সাজগোজ পছন্দ করি।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১৯২৬৩)
স্ত্রী যেভাবে দেখতে পছন্দ করেন, সেভাবে থাকার চেষ্টাটা আসলে সম্মানেরই একটা প্রকাশ।
পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাও এ যত্নেরই অংশ। সব সময় সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে বিশেষ আয়োজন করা যায়, আর এখানে কার্পণ্য না করাই ভালো।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫১)
ঘরের কাজে সুযোগ পেলে সহযোগিতা করা আর ছোট ছোট ভালো কাজেরও আন্তরিক প্রশংসা করা—এসবও একই সুতোয় গাঁথা। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি প্রায়ই খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৯)
এমনকি খাদিজার মৃত্যুর পরও নতুন স্ত্রীর সামনেই প্রশংসা করতেন। প্রশংসা কখনো পুরোনো সম্পর্ককে খাটো করে না; বরং ভালোবাসা বাড়ায়।
২. সম্মান কখনো হারাতে দেওয়া যাবে না
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হতেই পারে। প্রয়োজনে কিছু সময় দূরে থাকা যায়, বিছানা আলাদা করা যায়, কিন্তু গায়ে হাত তোলা কখনোই নয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করো। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)
এ সতর্কতা এতটাই স্পষ্ট যে এখানে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
সম্মান রক্ষার আরও কিছু দিক আছে, যেগুলো চোখে কম পড়ে, কিন্তু প্রভাব ফেলে গভীরভাবে। খারাপ নামে ডাকা, অশালীন ভাষা ব্যবহার, স্ত্রীর মা–বাবাকে নিয়ে কটূক্তি—এসব সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য; যৌতুকের দাবি বা ইঙ্গিতও তা-ই।
স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করাটাও একধরনের অসম্মান। তাঁকে বরং অনুভব করানো উচিত যে তিনি অনন্য, প্রতিস্থাপনযোগ্য নন। তাঁর ভুল সবার সামনে প্রকাশ না করে আড়ালে ভালোবাসার সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করাই ভালো, আর পুরোনো ভুল বারবার মনে করিয়ে দেওয়াও একধরনের নিষ্ঠুরতা।
ক্ষমা করতে শেখা আর সামনে এগিয়ে চলাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ।
৩. সময় দেওয়া: নবীজি যা মনে রাখতেন
দাম্পত্য জীবনে হালকা, খেলাচ্ছলে সময় কাটানোকে অনেকে গুরুত্বহীন মনে করেন, অথচ নবীজির নিজের জীবনেই এর স্পষ্ট নজির আছে।
আয়েশা (রা.) বলেন, এক সফরে নবীজি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা জিতে যান। বছর কয়েক পর, যখন আয়েশার শরীর কিছুটা ভারী হয়ে গেছে, আবার প্রতিযোগিতা হলো, এবার নবীজি (সা.) জিতলেন। তিনি হেসে বললেন, ‘এটা সেই আগের হারের বদলা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)
এই ছোট্ট ঘটনাই বলে দেয়, স্ত্রীর সঙ্গে হালকা, রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানো নবীজির নিজস্ব অভ্যাসের অংশ ছিল।
এ বিষয়ে নবীজি (সা.) একটা সাধারণ নীতিও বলে দিয়েছে, মানুষের অধিকাংশ বিনোদনমূলক কাজই অর্থহীন, তবে কয়েকটি ব্যতিক্রম আছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ যা নিয়ে খেলাধুলা করে, তার সবই অনর্থক, তিনটি বিষয় ছাড়া—তিরন্দাজি, ঘোড়া প্রশিক্ষণ আর স্ত্রীর সঙ্গে খেলা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭)
অর্থাৎ স্ত্রীর সঙ্গে হালকা সময় কাটানোকে ইসলাম নিছক অপচয় নয়; বরং সময়োপযোগী ও অর্থবহ কাজ হিসেবে দেখে।
এর আলোকেই প্রতিদিন কিছুটা সময় মন খুলে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়া, একটু হাঁটা, মাঝেমধ্যে কোথাও ঘুরতে যাওয়া—এসব ছোট অভ্যাসকে বাড়তি বিলাসিতা না ভেবে বরং সুন্নাহরই একটা অংশ হিসেবে দেখা যায়।
নতুন দাম্পত্যে স্ত্রীকে একা না রেখে সান্নিধ্যে রাখা, আবার তাঁকে মাঝেমধ্যে বাবার বাড়িতে যেতে দেওয়া—দুটোই এই একই নীতির বাস্তব প্রয়োগ: সম্পর্কটাকে জীবন্ত রাখা।
৪. রাগের মুহূর্তই আসলে পরীক্ষা
ওপরের প্রতিটি অভ্যাসের আসল পরীক্ষা হয় রাগের মুহূর্তে। নবীজি (সা.) শক্তির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন এ প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
দাম্পত্য জীবনের ঝগড়া-বিবাদে এ নীতিই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে—রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই সারা জীবনের অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; যেখানে একটু থেমে শান্ত হওয়াটাই বড় শক্তির পরিচয়।
সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমাশীলতা আর আল্লাহভীতির ওপর। অভিমান, রাগ, অহংকার আর অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া থেকে দূরে থেকে একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথি হওয়ার চেষ্টাই আসল কাজ।
সুন্দর সংসার হঠাৎ তৈরি হয় না, এটা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, ত্যাগ আর আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ–তাআলা আমাদের সবাইকে ভালোবাসা, রহমত ও প্রশান্তিতে ভরপুর দাম্পত্য জীবন দান করুন।
ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ আগামী বছরের পবিত্র হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেন
বিমান ভাড়া কমিয়ে ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ এ ঘোষণা দেন।
তিনি জানান, এবার (২০২৭) সরকারি মাধ্যমে দুটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হজ প্যাকেজ-১-এর খরচ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ১৫ হাজার ২৬৩ টাকা এবং হজ প্যাকেজ-২-এর খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা।
অন্যদিকে ‘বেসরকারি মাধ্যমের সাধারণ হজ প্যাকেজ’ নামে একটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৮ টাকা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত তিনটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা যাবে। তবে সরকার ঘোষিত হজ প্যাকেজ-২ এ উল্লিখিত সেবা-সুবিধা কমিয়ে কোনো প্যাকেজ ঘোষণা করা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
ধর্মমন্ত্রী আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে এবার হজ ফ্লাইটের বিমানভাড়া গত বছরের তুলনায় ২৪ হাজার ৮৩০ টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যক্তিত্বহীন মানুষের কোনো মর্যাদা নেই।মানুষমাত্রই সমাজে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হতে চায়। এর জন্য প্রয়োজন এমন নীতি-অভ্যাস যা তাকে ব্যক্তিত্বের আসনে উন্নীত করবে। কারণ পোশাক-পরিচ্ছদ, সহায়-সম্পদ বা বাহ্যিক সৌন্দর্য ব্যক্তিত্বের মানদণ্ড নয়, বরং এটি ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ের নাম। সুতরাং যেসব অভ্যাস মুমিন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়, লোক সমাজে তার সম্মান-মর্যাদা ক্ষুন্ন করে তা পরিহার করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।
এখানে ১০ টি অভ্যাস উল্লেখ করা হলো-
১. বেশি কথা বলা
কথা যত কম বলা যায় ভুল ততই কম হয়। অতিরিক্ত কথায় গীবত ও মিথ্যা বেশি থাকে। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করে চলা। তাই নিজের ব্যক্তিত্ব ঠিক রাখতে চাইলে স্বল্পভাষী হওয়া জরুরি।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে।' (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)
২. অতিরিক্ত হাসি
মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা সুন্নত। এটা আন্তরিকতা ও ভালোবাসার পরিচায়ক। তবে অকারণে হাসা বা অতিরিক্ত হাসার কারণে ব্যক্তির গাম্ভীর্য নষ্ট হয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘অতিরিক্ত হাসবে না। কারণ অতিরিক্ত হাসি অন্তরকে মৃত করে দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৫)
৩. মিথ্যা বলা
মিথ্যা মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয় হয়। এ জন্যই পবিত্র কোরআনে সত্যবাদীর সাহচর্য গহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১১৯)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সত্য পুণ্যের দিকে নিয়ে যায়, আর পুণ্য নেয় বেহেশতের দিকে... মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ নেয় দোজখের দিকে।’ সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৯৪)
৪. গীবত-পরনিন্দা করা
হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) গীবতকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে—তা-ই গীবত।’ সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)
অন্যের অনুপস্থিতিতে দোষ বর্ণনা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করো।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)
৫. অনিয়ন্ত্রিত রাগ
রাগের সময় ধৈর্য ধারণ করা জরুরি। অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত রাগের কারণে মানুষ দিশেহারা হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় এবং অন্যায় কাজ করে ফেলে। এতে তার ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয় মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্তও হয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে হারায়; বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১১৪)
৬. অহংকার করা
অহংকার মানুষকে মানুষের কাছে অপছন্দনীয় করে তোলে এবং আল্লাহর কাছে সে হয় নিন্দিত। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী ও দাম্ভিক ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৩৬)
হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ বলেছেন, ‘অহংকার আমার চাদর। যে তা নিয়ে আমার সাথে টানাহেঁচড়া করবে, আমি তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিব।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৯০)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)
৭. ওয়াদা খেলাফ করা
কথা দিয়ে কথা না রাখা মোনাফেকের চরিত্র। ওয়াদা ভঙ্গ করা মুমিনের কাজ হতে পারে না। এটি তাঁর চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মোনাফেকের লক্ষণ তিনটি, কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩)
৮. কটু ভাষা
কটু ভাষা রূঢ় স্বভাব ও কঠোর হৃদয়ের আলামত। মানুষ এমন স্বভাবের লোকজন সমাজে অবজ্ঞার পাত্র হয়। কথার মাধ্যমে কাউকে আঘাত করা, অশ্লীল কথাবার্তা বলা মুমিনের ইমান ও মর্যাদার পরিপন্থি। কোনো ইমানদার ব্যক্তির জন্য এই অভ্যাস শোভনীয় নয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিন ব্যক্তি দোষ দেয় না, অভিসম্পাত করে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষী হয় না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭)
৯. কৃপণতা
সম্পদ আল্লাহ দেন। বিধান মোতাবেক তা উপার্জন ও ব্যয় করা কর্তব্য। কৃপণতা করলে মন সংকীর্ণ হয় এবং লোকসমাজে ওই ব্যক্তির সম্মান-মর্যাদা নষ্ট হয়। আর পরকালের কঠিন শাস্তি হচ্ছে তার কর্মের ফল।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে, এটা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং এটা তাদের জন্য অমঙ্গল। আজ যে সম্পদে তারা কৃপণতা করছে, কেয়ামতের দিন তা তাদের গলায় বেড়ি বানিয়ে পরানো হবে। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সত্ত্বাধিকার কেবল আল্লাহরই। আট তোমরা যাই কিছু করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮০)
১০. খেয়ানত
বিশ্বস্ততা মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। খেয়ানত মানুষের চরিত্র ও মর্যাদা ধ্বংস করে দেয়। এটি মুনাফিকের কাজ। মুমিনদের জন্য আমানত সংরক্ষণ করা এবং তা প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়া কোরআনে নির্দেশ।
কোরআনে আছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দেবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)
হেদায়েত আল্লাহ–তাআলার মহান নেয়ামত, যা মানুষকে সত্যের দিকে পরিচালিত করে। তবে কিছু নৈতিক ও আত্মিক ব্যাধি এ পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এসব প্রতিবন্ধকতার কথা স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কয়েকটি প্রধান কারণ সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।
১. হিংসা ও অহংকার
হিংসা-অহংকার হেদায়েত লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আল্লাহ কোনো অহংকারীকে হেদায়েত দান করেন না। কোরাইশ নেতাদের হেদায়েত না পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এই হিংসা এবং সত্যের প্রতি বিদ্বেষ।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার করে আমি তাদের আমার নিদর্শনসমূহ থেকে বিমুখ রাখব। তারা আমার সব রকম নিদর্শন দেখলেও তাতে ইমান আনবে না। তারা হেদায়েতের সরল পথ দেখলেও সে পথ গ্রহণ করবে না। কিন্তু ভ্রষ্টতার পথ দেখলে সেটা গ্রহণ করবে। এটা এ কারণে, তারা আমার নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তারা এ থেকে উদাসীন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৪৬)
২. নেতৃত্ব বা পদমর্যাদার লোভ
নেতৃত্ব বা পদমর্যাদার লোভ হেদায়েত লাভের পথে বড় প্রতিবন্ধক। এ ক্ষেত্রে হিরাক্লিয়াসের অবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মদিনার দূত দাহিয়া কালবি (রা.) তাঁর নিকট নবীজির পক্ষ থেকে চিঠি পৌঁছান। তিনি পত্র পাঠ করে আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে নবীজির অবস্থা জানেন। কিন্তু ইমান আনার ইচ্ছা সত্ত্বেও নেতৃত্ব ও পদমর্যাদার লোভের কারণে হেদায়েতের সরল পথ গ্রহণ করতে পারেননি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭)
এই ব্যাধিই ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের ইমানের পথে বাধা হয়েছিল। সত্যের আহ্বান তাদের কাছে আসার পরে সে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বিরূপ মন্তব্য করেছিল।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা বলল, আমরা কি আমাদের মতোই দুজন মানুষের প্রতি ইমান আনব, অথচ তাদের সম্প্রদায় (বনি ইসরাইল) আমাদের দাসত্ব করছে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৪৭)
বর্তমানেও বহু মানুষ হক জেনেও তা গ্রহণ করে না শুধু পদমর্যাদা বা নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে।
৩. প্রবৃত্তির অনুসরণ
প্রবৃত্তির পূজা মানুষকে হেদায়েত থেকে বঞ্চিত করে রাখে। তাকে হক ও সত্য থেকে বিচ্যুত করে দেয়। সে মিথ্যাকে তার সামনে সুশোভিত করে হাজির করে এবং সেও অন্ধভাবে তা বিশ্বাস করে নেয়।
আল্লাহ বলেন, ‘আর আপনি প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। তাহলে তা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৬)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আপনি ওই ব্যক্তির আনুগত্য করবেন না, যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি এবং সে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে এবং তার কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ২৮)
কোরআন, সুরা মায়েদা: ১০৪
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘প্রবৃত্তিপূজারিকে তার খেয়াল-খুশি অন্ধ ও বধির করে দেয়। ফলে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য তার করণীয় কী তা ভুলে যায় এবং তা সে অনুসন্ধানও করে না। বরং আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের রাজি-খুশির প্রতি সে সন্তুষ্ট হয় না এবং তাঁদের অসন্তোষের বিষয়ে তার মনে কোনো অনুশোচনা জাগে না। বরং প্রবৃত্তির চাহিদায় সে খুশি হয় এবং নিজের খেয়াল-খুশির বিরোধিতা করাটা তার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে যায়।’ (ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মিনহাজুস সুন্নাহ, ৫/২৫৬, জামিয়াতুল ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সাউদ, ১৯৮৬)
৪ ও ৫. স্বজন ও সম্পদের সীমাহীন ভালোবাসা
পরিবার-পরিজন, ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ ইত্যাদির ভালোবাসা থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের ভালোবাসা যদি সীমা অতিক্রম করে তাহলে এগুলোই হেদায়েত বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী! আপনি মুসলমানদের) বলে দিন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা, পুত্র, ভাই, স্ত্রী, গোত্র ও ধনসম্পদ যা তোমরা উপার্জন করো, ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা করো এবং বসবাসের সেই ঘর যা তোমরা পছন্দ করো (এগুলো যদি) আল্লাহ তাঁর রাসুল এবং তাঁর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা বেশি প্রিয় হয় তবে অপেক্ষা করো, তাহলে আল্লাহর ফয়সালা আসার অপেক্ষা করো। আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ২৪)
৬. পূর্বপুরুষের অজুহাত
পূর্বপুরুষের অনুসরণ মানুষকে অন্ধ বানিয়ে দেয়। ফলে সত্য-মিথ্যা যাচাই করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে এবং বাপ-দাদার কর্মনীতিই তাদের কাছে শ্রেয় মনে হয়। রাসুল (সা.) যখন মুশরিকদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেন, তখন তারা বাপ-দাদার কথা বলে তার আহ্বান এড়িয়ে যেত।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তোমরা সেদিকে এবং রাসুলের দিকে এসো, তখন তারা বলে আমাদের জন্য তা-ই যথেষ্ট, যার ওপর আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি। যদিও তাদের পূর্বপুরুষেরা কিছু জানত না এবং তারা সুপথপ্রাপ্তও ছিল না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১০৪)
আবু তালেব সম্পর্কে হাদিস এসেছে, ‘তার মৃত্যু নিকটবর্তী হলে, রাসুল (সা.) তার কাছে এসে কালেমার দাওয়াত দিতে থাকলেন। সেখানে উপস্থিত ছিল আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়া। তারা বারবার বলছিল, তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবে? তখন আবু তালিব বললেন, আমি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের ওপর আছি, এবং তিনি কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করতে অস্বীকৃতি জানালেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭৭২)
৭. শয়তানের অনুসরণ
শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করার জন্য আল্লাহর সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করেছে। সে মানুষকে সরল পথ থেকে বিচ্যুত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। তার অনুসরণ যে করবে সে কখনো হেদায়েতের সরল পথ পাবে না।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ করো। সে তার অনুসারীদেরকে এ জন্যই দাওয়াত দেয়, যাতে তারা জাহান্নামবাসী হয়ে যায়।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ৬)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আপনি তাদেরকে ওই ব্যক্তির ঘটনা পড়ে শোনান, যাকে আমি আমার নিদর্শনাবলি দিয়েছিলাম, কিন্তু সে তা সম্পূর্ণ বর্জন করে। ফলে শয়তান তার পিছু নেয়। পরিণামে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৫)
সারকথা হলো, আল্লাহর দিকনির্দেশনা এবং নবী-রাসুলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে মানুষ হেদায়েত লাভে ধন্য হবে। এর বিপরীত হলে হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হবে।
শায়খ আহমাদুল্লাহ
পুরো পৃথিবীর মতো বাংলাদেশও এখন বুঁদ হয়ে আছে বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায়। এ উন্মাদনায় ট্রলের শিকার হয়ে, বিশেষ করে ব্রাজিল বিদায় নেওয়ার পর এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে দেশে।
উদ্বেগজনক এ বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি এক অনলাইন লাইভ প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করা হয়েছে আলোচিত ইসলামী বক্তা শায়খ আহমাদুল্লাহকে। সেখানে বলা হয়, ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনায় এ বছর ১০ থেকে ১২ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। কুষ্টিয়ায় একজন আত্মহত্যা করেছেন প্রতিপক্ষের ট্রোলিং বা বোলিংয়ের কারণে। এসব মৃত্যুর জন্য আসলে কে বা কারা দায়ী?
নিজের ইউটিউব চ্যানেলের ওই লাইভ অনুষ্ঠানে সেই প্রশ্নের উত্তরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক একটা বাস্তবতা যে, আমাদের দেশে প্রতিবছরই খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রাণ ঝরে। একজন ইমানদারের জীবন এতটা সস্তা হয়ে গেল কীভাবে যে কোথাকার কোন দেশের খেলোয়াড়রা হারলো নাকি জিতলো, তার জন্য আমরা নিজেরা মারামারিতে লিপ্ত হয়ে যাব, এমনকি খুন পর্যন্ত করে ফেলব! এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলেছে। এই উন্মাদনা যারা তৈরি করছেন এবং এই উন্মাদনাকে যারা মাত্রাহীনভাবে সীমানার বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন, তারা কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না।
খেলাধুলা মানুষের জীবনের অংশ হতে পারে, বিনোদনও জীবনের অংশ হতে পারে; শরীয়তের সীমানার মধ্যে থেকে সেটা করতে শরিয়ত নিষেধ করে না। কিন্তু সীমালঙ্ঘনকারীকে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। আল্লাহ তাআলার বেঁধে দেওয়া সীমানা ক্রস করে গেলে সেখানে আজ হোক বা কাল অকল্যাণ আসবেই। মানুষ একটা সময় হয়তো এটা বুঝবে, কিন্তু ততদিন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
কুষ্টিয়ায় বিশেষ করে যে ঘটনা ঘটেছে, গণমাধ্যম থেকে যেটুকু জানা গেল তা হলো, ওই ব্যক্তির পছন্দের দল হেরে যাওয়ায় তিনি মন খারাপ করেছিলেন। এর মধ্যে তার প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের অতিমাত্রার বুলিং বা ট্রোলিং তিনি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিয়েছেন। অথচ তার স্ত্রী আছেন, ছোট ছোট সম্ভবত দুইটা বাচ্চাও আছে। এটা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায়?
এর চেয়ে বড় ট্রাজেডি আর কী হতে পারে যে, একটা দেশে ১০-১২ জন মানুষ মারা যাচ্ছে এমন একটা খেলা নিয়ে, যে খেলায় সেই দেশের কোনো অংশগ্রহণই নেই। কোথাকার কোন দেশের খেলা, আর আমরা এমন সব দেশকে সাপোর্ট করছি যারা রাষ্ট্রীয়ভাবে রীতিমত ঘোষণা দিচ্ছে যে তারা ইহুদিবাদীদের সাথে আছে, ফিলিস্তিনের বিপরীতে অবস্থান করছে এবং তাদের সমর্থকরা গ্যালারিতে ইজরাইলের পতাকার প্রদর্শন করছে। আর মুসলমানের সন্তান তাদের জন্য এমন পাগলপারা হয়ে যাচ্ছে যে নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিচ্ছে! এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় আর কী হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই ভাইদেরকে হেদায়েত দান করুন, আমীন।
আপনাদের যাদের সুযোগ আছে, তারা সুস্থ থাকার জন্য শারীরিক কসরত করবেন, ব্যায়াম করবেন—শরীর সুস্থ রাখার জন্য এটি খুবই দরকার। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, দুর্বল ইমানদারের চাইতে আল্লাহ তাআলার কাছে সবল ইমানদার বেশি প্রিয়। আর সবল ইমানদার থাকার জন্য আপনার খাদ্য, আপনার ঘুম এবং আপনার সবকিছু পরিমিত হওয়া দরকার, স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া দরকার এবং হিসেব-নিকেশ করে হওয়া দরকার। খাদ্যের পুষ্টিগুণ বা ফুড ভ্যালু বিবেচনা করে আমাদের খাবার গ্রহণ করা উচিত, যা শরীরের জন্য উপকারী।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল ও তায়্যিব খাবার খেতে বলেছেন। এখানে তায়্যিব শব্দের আক্ষরিক অর্থ পবিত্র হলেও তাফসিরের ইমামগণ এর কয়েক ধরনের ব্যাখ্যা করেছেন। তার মধ্যে একটি ব্যাখ্যা হলো, যে খাবার মানুষের দুনিয়া এবং আখেরাতে কোনো ক্ষতির কারণ হবে না, সেটাই তায়্যিব। ইমাম ইবনে আশুর রহিমাহুল্লাহ তার তাফসিরে একই কথা লিখেছেন যে, তায়্যিব মানে হলো যে খাবারে মানুষের দুনিয়াতেও ক্ষতির কারণ হবে না এবং আখেরাতেও ক্ষতির কারণ হবে না।
জাঙ্ক ফুড, অতিরিক্ত তেলজাতীয় বা তেলে ভাজা অস্বাস্থ্যকর খাবার যা আপনার স্বাস্থ্য নষ্ট করবে, এসিডিটি তৈরি করবে এবং শরীরের জন্য ক্ষতিকর হবে—এ রকম খাবার খেতে কিন্তু ইমানদারকে আল্লাহ উৎসাহিত করেন নাই। একজন ইমানদারের উচিত সবসময় সুস্থ থাকার চেষ্টা করা এবং তার লাইফস্টাইলকে সেভাবেই সাজানো। পুরোপুরি অর্গানিক খাবার না পেলেও অন্তত প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা এবং আর্টিফিশিয়াল, প্রসেসড কিংবা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা।
সুস্থ থাকতে হবে কারণ আল্লাহর ইবাদত করতে হবে, এমন কি প্রয়োজন হলে জিহাদ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। মুমিন সুস্থ থাকার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম করবে এবং শরিয়তের সীমানার মধ্যে থেকে খেলাধুলাও করবে, কিন্তু এভাবে খেলার উন্মাদনায় মত্ত হওয়া মুমিনের কাজ হতে পারে না। যে উন্মাদনার কারণে আমরা ১০-১২ টা মানুষের জীবন হারালাম।
যে পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের হারিয়েছে, কেবল তারাই এই কষ্টের গভীরতা জানে। এই উন্মাদনাকে যারা লাগামহীনভাবে সৃষ্টি করেছে, আমার মনে হয় তাদের উচিত এটার জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং এই লাগামহীন উন্মাদনাকে কোনোভাবেই এপ্রিশিয়েট বা প্রশ্রয় না দেওয়া।
আমি আবারও বলছি, ইসলাম বিনোদনকে নিরুৎসাহিত বা নিষেধ করে না, কিন্তু প্রত্যেকটা জিনিসের একটা সুনির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। যে কাজের পেছনে দুনিয়া বা আখেরাতের কোনো লাভ নেই, এমন অনর্থকতা ইসলাম সমর্থন করে না। আপনি খেলাধুলা করলে শরীরে ব্যায়াম হবে, ঘাম ঝরবে এবং সুস্থ থাকবেন—সেটি আপনি করুন। কোনো কিছু যদি আপনার আনন্দের কারণ হয় এবং তা শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকে, তবে তা করতে পারেন, কিন্তু সীমার বাইরে গিয়ে নয়। আল্লাহ তাআলা সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।
যারা খেলার নামে এই উন্মাদনার মধ্যে লিপ্ত হচ্ছেন এবং এর পেছনের অনাচারগুলো খেয়াল করছেন না, তাদের উচিত এই উন্মাদনা অনতিবিলম্বে পরিহার করা। একজন মুসলমানের ইসলাম তখন সুন্দর হবে, যখন সে অহেতুক ও অনর্থক কাজ পরিহার করবে।
একবার নবীজির কাছে এক সাহাবি এলেন নামাজের ওয়াক্ত জানতে। সাহাবিকে নবীজি মৌখিক উত্তর দিলেন না। যেতেও দিলেন না সেদিন। নিজের কাছে রেখে দিলেন দুই দিন। এই দুই দিন ধরে চলবে তাঁর হাতে–কলমে পাঠদান।
নবীজি (সা.) বললেন, ‘দুই দিন আমাদের সঙ্গে নামাজ পড়ো, তবেই সব বুঝে যাবে।’
নবীজির এই নির্দেশ দ্বারা বোঝা যায়, সাহাবির বাড়ি ছিল মদিনার বাইরে। নয়তো তাঁর এমনিতেই নবীজির মসজিদে নামাজ পড়ার কথা।
প্রথম দিন দুপুরে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়লে তিনি বেলালকে জোহরের আজান দিতে বললেন। বেলাল আজান দিলেন। তাঁর ইকামতে নামাজ হলো জোহরের। এরপর নবীজি আবার আজান দিতে বললেন বেলালকে।
সূর্য তখনো বেশ ওপরে এবং সূর্যের শরীর ঝলমল করছে আলোয়। বেলাল (রা.) আজান দিলেন। এই আজান আসরের। সাহাবিরা বেলালের আজান ইকামতে আসরের নামাজ পড়লেন নবীজির পেছনে।
সূর্য যখন ডুবে গেল, নবীজি (সা.) মাগরিবের আজানের আদেশ দিলেন। তারপর সবাইকে নিয়ে তিনি মাগরিবের নামাজ পড়লেন। খানিক পর আকাশ থেকে যখন সূর্যাস্তের লাল আভা দূর হয়ে গেল, নবীজি এবার আদেশ করলেন ইশার আজান দিতে। বেলাল আজান দিলেন। সেই সাহাবিসহ সবাই ইশার নামাজ পড়লেন।
ইশার নামাজ শেষে রাতের অন্ধকার ছেয়ে ফেলল মদিনাকে। মুসলিম জনপদ ঘুমিয়ে পড়ল। প্রশ্নকর্তা সাহাবিও ঘুমালেন মসজিদের আশপাশে কারও বাড়িতে।
আরামদায়ক নিদ্রা শেষে এরপর যখন সুবহে সাদিক হলো, নবীজি (সা.) আদেশ করলেন ফজরের আজান দিতে। বেলাল আজান দিলেন। চরাচরে অন্ধকার থাকতেই নবীজি ফজরের নামাজ পড়লেন।
এভাবেই অতিবাহিত হলো প্রথম দিন।
দ্বিতীয় দিনে নবীজি (সা.) জোহরের নামাজ পড়লেন বেশ দেরিতে, রোদের তাপ ও তীব্রতা আরামদায়ক হওয়ার পর। আসরের নামাজও পড়লেন আগের দিনের তুলনায় দেরিতে, সূর্যের গায়ে কমলা রং ধরার কিছুটা আগে।
আর মাগরিব পড়লেন রক্তিম আভা ডুবে যাওয়ার খানিক আগে। ইশা পড়লেন রাতের এক–তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর। আর ফজর পড়লেন তখন, যখন পূর্ব দিগন্ত পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।
এরপর তিনি উচ্চকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, নামাজের ওয়াক্ত জানতে চাওয়া সেই প্রশ্নকর্তা কোথায়?
সাহাবি এগিয়ে এসে নরম কণ্ঠে বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, এই তো আমি।’
নবীজি (সা.) বললেন, গত দুই দিন যে দুই সময়ে প্রতি ওয়াক্তের নামাজ পড়া হয়েছে, এই দুই সময়ের মাঝে হলো তোমাদের জন্য সেই ওয়াক্তের নামাজ।
এই হলো একজন শিক্ষক নবীর পাঠদানের পদ্ধতি। তিনি চাইলে মুখেই সাহাবির প্রশ্নের জবাব দিয়ে বিদায় করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। শিক্ষাদানে তিনি এমন এক অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন, শিক্ষার্থী যত দুর্বল মেধার অধিকারী হোক, ভুলে যাওয়ার তাঁর কোনো উপায়ই নেই।
শিক্ষার্থী নিজের জীবন যখন উত্তরের ভেতর দিয়ে জারিত হন, তখন তাঁর আর ভুলে যাওয়ার কোনো উপায়ই থাকে না। এভাবেই নবীজি (সা.) স্থান-কাল-পাত্রভেদে একেক সাহাবিকে একেকভাবে শিক্ষাদান করতেন।