যুক্তরাষ্ট্রে দুই যুদ্ধবিমানের সংঘর্ষের পর প্যারাস্যুট নিয়ে বেরিয়ে আসেন চার ক্রু।
যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম আইডাহোর ‘মাউন্টেন হোম এয়ারফোর্স বেজ’-এ গতকাল রোববার এয়ার শো চলাকালে নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধবিমানের সংঘর্ষ হয়েছে। তবে এ দুর্ঘটনার শিকার যুদ্ধবিমানের চারজন ক্রুই নিরাপদে প্যারাস্যুট দিয়ে নেমে আসতে সক্ষম হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ফ্লিটের নৌবাহিনীর মুখপাত্র কমান্ডার অ্যামেলিয়া উমায়াম এক বিবৃতিতে জানান, যুদ্ধবিমান দুটি যখন আকাশে কসরত দেখাচ্ছিল, তখনই এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুই বিমানের চারজন ক্রু নিরাপদে বের হয়ে আসতে পেরেছেন এবং দুর্ঘটনাটির তদন্ত চলছে। বিমানঘাঁটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্রুদের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল।
এয়ার শোর অন্যতম পরিকল্পনাকারী সংস্থা সিলভার উইংস অব আইডাহোর বিপণন পরিচালক কিম সাইকস বলেন, সামরিক ঘাঁটিতে থাকা অন্য কেউ এ ঘটনায় আহত হননি। বিমানঘাঁটি কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই পুরো ঘাঁটি লকডাউন (অবরুদ্ধ) করা হয় এবং এয়ার শোর বাকি অংশ বাতিল করা হয়।
দর্শনার্থীদের অনলাইনে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, বোইসি শহর থেকে প্রায় ৫০ মাইল (৮০ কিলোমিটার) দক্ষিণে ঘাঁটির কাছে বিমান দুটি যখন মাটিতে আছড়ে পড়ছিল, তখন আকাশে চারটি প্যারাস্যুট খুলছে।
‘ইএ-১৮জি গ্রোলার’ হলো আধুনিক ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তিসমৃদ্ধ ‘এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট’ ফাইটার জেটের একটি উন্নত সংস্করণ।
প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ
শেন অগডেন নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, যুদ্ধবিমান দুটি যখন কাছাকাছি আসছিল, তখন তিনি ভিডিও করছিলেন। তাঁর ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, বিমান দুটির একটির সঙ্গে অন্যটির সংঘর্ষ হয়। এরপর একসঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে নিচে নামতে থাকে। ঠিক তখনই ক্রু সদস্যরা বিমান প্যারাস্যুট নিয়ে থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর বিমান দুটি একসঙ্গে মাটিতে আছড়ে পড়ে বিশাল আগুনের গোলায় পরিণত হয়। আর ক্রু সদস্যরা পাশেই মাটিতে নেমে আসেন।
টেক্সট বার্তায় অগডেন বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম বিমান দুটি আলাদা হয়ে যাবে, তাই ভিডিও করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ ওটা ঘটে গেল এবং আমি বাকি অংশটুকুও ভিডিও করলাম।’ দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীদের কাজে যাতে কোনো বাধা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।
আয়োজকেরা জানান, এই জনপ্রিয় এয়ার শোতে বিমান চালনা ও প্যারাস্যুট জাম্পের প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিমান চালনার ইতিহাস এবং আধুনিক সামরিক সক্ষমতা তুলে ধরা হচ্ছিল। দুই দিনব্যাপী এই শোর মূল আকর্ষণ ছিল মার্কিন বিমানবাহিনীর ‘থান্ডারবার্ডস’ স্কোয়াড্রন।
মার্কিন আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় আকাশ পরিষ্কার ছিল এবং বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৯ মাইল (৪৭ কিলোমিটার)।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
মাঝ আকাশে সংঘর্ষের পরও দুই বিমানের সব ক্রুর বেঁচে ফেরাটা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। বিমানের নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ জেফ গুজেত্তি বলেন, বিমান দুটি যেভাবে সংঘর্ষের পর মাঝ আকাশে আটকে ছিল এবং একসঙ্গে মাটিতে আছড়ে পড়েছে, সম্ভবত সে কারণেই ক্রুরা বের হওয়ার সময় পেয়েছেন। সাধারণত মাঝ আকাশে সংঘর্ষ হলে ক্রুদের বের হওয়ার সুযোগ থাকে না।
গুজেত্তি বলেন, ‘এটি সত্যিই দেখার মতো দৃশ্য। মনে হচ্ছে, বিমান দুটি ভিন্নভাবে একে অপরকে আঘাত করেছিল, যার ফলে বিমান দুটি ভেঙে টুকরা না হয়ে একসঙ্গে আটকে ছিল। আর এটাই হয়তো তাদের জীবন বাঁচিয়েছে।’
গুজেত্তি আরও যোগ করেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, এটি পাইলটের কোনো ভুলের কারণে হয়েছে, যান্ত্রিক ত্রুটি নয়। ফরমেশন ফ্লাইটে (একসঙ্গে দল বেঁধে ওড়ার সময়) অন্য বিমানের কাছাকাছি যাওয়া খুবই চ্যালেঞ্জিং এবং এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এটি নিখুঁতভাবে করতে হয়।’
আরেক বিমান নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ এবং সেফটি অপারেটিং সিস্টেমের সিইও জন কক্স বলেন, এয়ার শোতে যাঁরা অংশ নেন, তাঁরা সেরা পাইলটদের অন্যতম। এখানে ভুলের কোনো সুযোগ থাকে না। তিনি আরও বলেন, ‘এয়ার শোতে বিমান চালানো খুবই কঠিন কাজ। এখানে সামান্য ভুলের মাশুল অনেক বড়। আমি খুশি যে সবাই নিরাপদে বের হতে পেরেছেন।’
অতীত দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি
২০১৮ সালের পর এই ঘাঁটিতে এটিই প্রথম ‘গানফাইটার স্কাইস’ ইভেন্ট ছিল। ২০১৮ সালের ওই শোতে হ্যাং গ্লাইডার দুর্ঘটনায় একজন পাইলট মারা যান। এর আগে ২০০৩ সালে একটি থান্ডারবার্ডস বিমান কসরত দেখানোর সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। সেবার পাইলট অক্ষত ছিলেন এবং মাটিতে আছড়ে পড়ার মাত্র এক সেকেন্ড আগে বিমানটিকে দর্শকদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিজে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ২০০টি এয়ার শো হয় এবং কয়েক বছর ধরে এর নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব এয়ার শোজ’-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও জন কুডাহি বলেন, ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মার্কিন এয়ার শোগুলোয় বছরে গড়ে ৩ দশমিক ৮ জন মানুষের মৃত্যু হতো। সেই সংখ্যা এখন অনেক কমে এসেছে।
কুডাহি বলেন, ২০১৭ সাল থেকে মৃত্যুর গড় সংখ্যা বছরে মাত্র ১ দশমিক ১ জনে নেমে এসেছে, যার মধ্যে ২০২২ সালে ডালাসের একটি দুর্ঘটনাও রয়েছে। সেখানে দুটি পুরোনো বিমানের সংঘর্ষে ছয়জন মারা গিয়েছিলেন। এ ছাড়া ২০২৩ বা ২০২৫ সালে এয়ার শোতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি এবং ১৯৫২ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এয়ার শো দেখতে এসে কোনো দর্শকের মৃত্যু হয়নি।
কুডাহি বলেন, ‘নিরাপত্তার দিক থেকে আমরা সত্যিই একটি চমৎকার সময় পার করছি, যেখানে দুর্ঘটনা অনেক কম।’
তদন্তের অগ্রগতি
গতকালের দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তকারীরা হয়তো দ্রুতই জানতে পারবেন। যেহেতু দুই বিমানের সব ক্রু বেঁচে আছেন, তাই তাঁরা সংঘর্ষের ঠিক আগে কী দেখেছিলেন এবং কী ঘটেছিল, তা বিস্তারিত জানাতে পারবেন। তদন্তের দায়িত্বে থাকবে মার্কিন নৌবাহিনী। তবে সামরিক তদন্ত হওয়ায় বেসামরিক দুর্ঘটনার মতো এর সব তথ্য হয়তো জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে না।
ইরান যুদ্ধের কারণে এই বছর বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে এয়ার শো বাতিল করা হয়েছে। কারণ, সেখানকার সামরিক ইউনিটগুলো ওই যুদ্ধের মিশনে ব্যস্ত রয়েছে।
ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থ রক্ষা করে না। শান্তি স্থাপনে চীন ব্রিকসের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে।’ ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত নিয়ে এক মন্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্রিকস জোটের দেশগুলোকে ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরোধিতা করারও আহ্বান শি জিনপিং।
আজ শনিবার ব্রিকস সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে যথাযথ ভূমিকা পালনের জন্য ব্রিকস-এর অন্য সদস্যদের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক চীন। এই যুদ্ধ ওই অঞ্চলজুড়ে জনগণের গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থের পক্ষে না।
তিনি বলেন, ব্রিকস দেশগুলোর উচিত সব ধরনের ‘সুরক্ষাবাদ’ প্রত্যাখ্যান করা। আমাদের উচিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহুমুখী বাণিজ্য ব্যবস্থাকে সমর্থন করা এবং সব ধরনের সুরক্ষাবাদ প্রত্যাখ্যান করা। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কের বিরোধিতা করারও আহ্বান জানান তিনি।
শি জিনপিং ব্রিকস জোটকে ‘গ্লোবাল সাউথের’ নেতৃত্বস্থানীয় এবং উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আত্মনির্ভরশীলতার মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এই জোটের উচিত উদ্ভাবন-ভিত্তিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করা।
ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লিতে নজিরবিহীন ও জটিল নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। বিদেশি নেতাদের নিজস্ব নিরাপত্তা দলের সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হচ্ছে।
সিসিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি জিনপিং জানান যে চীন আগামী বছর ব্রিকসের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং ১৯তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করবে।
এদিকে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শুরুর আগে জোটের সদস্যদেশগুলো একটি যৌথ ঘোষণার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এতে কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা জানানোর কথা বলা হয়। সংঘাত নিরসনে ‘সংলাপ ও কূটনীতিকে’ সামনে রাখার কথাও বলে জোটের সদস্যরা।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যৌথ ঘোষণায় কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
এবারের সম্মেলনের আগে ব্রিকসের কূটনীতিকেরা কয়েক দিন ধরে যৌথ ঘোষণার ভাষা নিয়ে আলোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত এমন একটি ভাষায় ঐকমত্য হয়েছে, যা ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-দুই দেশই মেনে নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
চলমান যুদ্ধের কারণে আগস্টে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। যুদ্ধের সময় আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরান ও আমিরাতের মতপার্থক্যের কারণে কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে এবার সদস্যদেশগুলোকে একটি অভিন্ন অবস্থানে আনতে পারাকে ভারতের কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারত এবার ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের সংকট মোকাবিলায় ‘সংলাপ ও কূটনীতিকে’ সমাধানের পথ হিসেবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহ বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ওপরও জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে ব্রিকস। জোটের কয়েকটি দেশ বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতো প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে।
তাদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব বেশি। এবারের সম্মেলনে বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানো, বাণিজ্যিক বাধা কমানো এবং ব্যবসার সুযোগ সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইসরায়েল, ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
নয়াদিল্লির এবারের সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ জোটের নেতারা অংশ নিচ্ছেন।
ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের ৪০ শতাংশের বেশি। বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তাদের অংশ প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
খবর- রয়টার্স
লেমুর চুরির ঘটনা
গাজীপুরের শ্রীপুরে সাফারি পার্ক থেকে দুটি রিং-টেইলড লেমুর চুরির ঘটনায় ভারতের শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানির প্রতিষ্ঠিত বনতারা কর্তৃপক্ষের নাম আসার পর নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বনতারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাংলাদেশের সাফারি পার্ক থেকে লেমুর চুরির ঘটনায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর বিষয়ে তারা অবগত। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো তদন্তকারী সংস্থার কাছ থেকে তারা এখন পর্যন্ত কোনো নোটিশ বা অনুরোধ পায়নি।
বনতারা আরও বলেছে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে, তাদের কারও সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ বা লেনদেন হয়নি। তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রতিটি প্রাণী ভারতের আইন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধান অনুযায়ী রাখা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের কাছে থাকা রিং-টেইলড লেমুরগুলোর সম্পূর্ণ নথিপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনে তারা প্রস্তুত। একই সঙ্গে লেমুরগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিকভাবে ডিএনএ যাচাইয়ের উদ্যোগকেও স্বাগত জানিয়েছে তারা। আইনসম্মত যেকোনো অনুরোধে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে বনতারা কর্তৃপক্ষ।
এদিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া দুটি লেমুর ভারতে নিয়ে বিক্রি করা হয়েছে। তদন্তে প্রাণী দুটির অবস্থান বনতারা এলাকায় শনাক্ত হওয়ার পর সেগুলো বাংলাদেশ থেকে চুরি যাওয়া লেমুর কি না, তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ জন্য ডিএনএ প্রোফাইলের বিষয়টি সামনে এলেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। কারণ, গাজীপুর সাফারি পার্কে থাকা ওই দুটি লেমুরের ডিএনএ প্রোফাইল আগে থেকে সংরক্ষণ করা হয়নি।
বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী জানিয়েছেন, তাদের ডিএনএ প্রোফাইল সংগ্রহের সক্ষমতা রয়েছে। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের ফরেনসিক ল্যাবও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগ করে খতিয়ে দেখতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে (ডিএফও) বলা হয়েছে।
বন্য প্রাণী চোরাচালান শনাক্ত এবং পাচার হওয়া প্রাণী দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রোফাইল গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে। একই প্রজাতির একাধিক প্রাণীর মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো প্রাণী কোথা থেকে এসেছে, তা শনাক্ত করতেও এটি কার্যকর।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান বলেন, সব প্রাণীর না হলেও মূল্যবান প্রাণীগুলোর অন্তত ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষণ করা উচিত। লেমুর দুটির ডিএনএ প্রোফাইল আগে থেকে সংরক্ষিত থাকলে বর্তমানে প্রাণী দুটির পরিচয় নিশ্চিত করে সেগুলো বাংলাদেশের বলে দাবি প্রতিষ্ঠা করা সহজ হতো।
গাজীপুর সাফারি পার্কের লেমুরগুলো ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে জব্দ করা হয়েছিল। পরে বন বিভাগের নির্দেশে সেগুলো সাফারি পার্কে পাঠানো হয়। সেখানে লেমুরের ছানাও জন্ম নেয়।
২০২২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি লেমুর মারা যায়। এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে দুটি লেমুর চুরি হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে।
নেপালে ভয়াবহ বন্যায় জল ও কাদায় ডুবে যাওয়া একটি সুড়ঙ্গে টানা নয় দিন আটকে ছিলেন সঞ্জয় সাহা। খাবার ছিল না। চারপাশে ছিল অন্ধকার, ভাঙা যন্ত্রপাতি ও ধ্বংসস্তূপ।
বেঁচে থাকতে তিনি পাহাড়ের শিলা চুইয়ে পড়া পানি ও বন্যার পানি পান করেছেন। উদ্ধার হওয়ার পর শুক্রবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৩০ বছর বয়সী এই নেপালি।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সঞ্জয় বলেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে ধ্বংসস্তূপের আঘাতে চোখে চোট লাগার ভয়েই দিনের পর দিন চোখ বন্ধ করে রাখতেন। এত বেশি সময় চোখ বন্ধ রাখার পর একসময় চোখ মেলাও কঠিন হয়ে গিয়েছিল।
সঞ্জয় সাহা নেপালের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির আওতাধীন আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে তিন বছরের বেশি সময় ধরে যন্ত্রকৌশল বিভাগের ফোরম্যান হিসেবে কাজ করছিলেন। জলবিদ্যুৎকেন্দ্রটির বহুতল পাওয়ারহাউসটি পাহাড়ের ভেতরে নির্মিত।
গত আগস্টের শেষ দিকে হিমবাহ ধসে নেপালের বিভিন্ন উপত্যকায় ভয়াবহ বন্যা ও ধসের সৃষ্টি হয়। এতে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে অন্তত ১ হাজার ৩০০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৩০০ জনের বেশি।
‘হাল ছেড়ে দেওয়ার কী দরকার’
সঞ্জয় জানান, হতাশা তাকে গ্রাস করতে চাইলে তিনি ভগবান কৃষ্ণের ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত মহামন্ত্র জপ করতেন-‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, হরে হরে’। এতে তার মনে একধরনের আধ্যাত্মিক অনুভূতি তৈরি হতো এবং ভয় অনেকটা কেটে যেত।
সঞ্জয় বলেন, ‘আমার যদি মরতেই হয়, তাহলে এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দেওয়ার কী দরকার? তাই আমি ঈশ্বরের নাম জপ করতে থাকি।’
তিনি জানান, সুড়ঙ্গের ভেতর খাবার ছিল না। পাহাড়ের শিলা চুইয়ে পড়া পানি ও বন্যার পানি পান করেই বেঁচে ছিলেন।
সুড়ঙ্গের ষষ্ঠ তলার একটি অংশে এমন একটি জায়গা ছিল, যেখান থেকে নিচের দিকে তাকানো যেত। সেখান থেকে তিনি চিৎকার করে জানতে চাইতেন, আর কেউ বেঁচে আছেন কিনা। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি।
সঞ্জয় বলেন, শুরুতে তার বিশ্বাস ছিল উদ্ধারকারী দল আসবে। দিন যত গড়িয়েছে, সেই বিশ্বাসও ধরে রেখেছিলেন। বাইরে তার পরিবার অপেক্ষা করছে- এই চিন্তাই তাকে শক্তি দিয়েছে। তার দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে।
সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছিলেন
সুড়ঙ্গে আটকে থাকার সময়ের হিসাব একেবারেই হারিয়ে ফেলেছিলেন সঞ্জয়। তার ধারণা ছিল, হয়তো দুই বা তিন দিন কেটেছে। কিন্তু উদ্ধার হওয়ার পর জানতে পারেন, তিনি প্রায় ১০ দিন সেখানে ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছিল আমি যেন অন্য একটি জগতে বাস করছি।’
বন্যার পানিতে সুড়ঙ্গটি কাদা ও ধ্বংসাবশেষে পুরোপুরি বদলে যায়। আগে যে সুড়ঙ্গের প্রতিটি অংশ তার পরিচিত ছিল, পরে সেখানে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যন্ত্রপাতি ও বাক্স, ভেঙে পড়া দেয়াল এবং জমে থাকা ধ্বংসাবশেষে তৈরি হয় গর্ত ও উঁচু ঢিবি।
সঞ্জয় জানান, প্রথম দিকে তিনি সুড়ঙ্গের ভেতরে চলাচলের চেষ্টা করেছিলেন। পরে বুঝতে পারেন, অন্য জায়গায় গেলে আরও বিপজ্জনকভাবে আটকে পড়তে পারেন। তাই তুলনামূলক নিরাপদ মনে হওয়া একটি জায়গায় ফিরে গিয়ে সেখানেই অবস্থান করেন। শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা তাকে সেখান থেকেই উদ্ধার করেন।
উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে বুঝতে পেরেছিলেন
উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে বাইরে থেকে বিভিন্ন শব্দ শুনতে পান সঞ্জয়। খননযন্ত্রের শব্দ, মইয়ের ধাতব শব্দ- এসব শুনে তার মনে আশা জাগে। তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়ার প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আগে বাইরের মানুষের কাজ করার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন। তখন তার মনে হয়েছিল, উদ্ধারকারী দল তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
সঞ্জয়ের সঙ্গে একই সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছিলেন ৪৫ বছর বয়সী কবির মহার্জন। বন্যার সময় দুজনই সুড়ঙ্গের ওপরের দিকে উঠেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, বড় ধরনের বন্যা হলেও এত ওপরে পানি পৌঁছাবে না।
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নিচ থেকে পানি ঢুকতে শুরু করে। প্রথমে বাতাসের চাপ অনুভূত হয়, পরে পানি ঢুকে পড়ে। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে দুজন আলাদা হয়ে যান। সঞ্জয়ের মোবাইল ফোনও পানিতে ভেসে যায়। কবির কোথায় গেছেন, তিনি জানেন না।
কবির পরে উদ্ধার হন এবং সঞ্জয়ের চেয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
সঞ্জয় জানান, তিনি নিজে বেঁচে ফিরলেও সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে আসার পর কয়েকজনকে বন্যার পানি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ওই ব্যক্তিদের তিনি সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটাই সবচেয়ে কষ্টের বিষয়।’
সূত্র: রয়টার্স
ছবি : সংগৃহীত
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দিল্লির পথে রওনা হওয়ার মধ্যে গুয়াংজু-নয়াদিল্লি রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিয়েছে ‘চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স’।
কোম্পানিটির বরাতে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, দীর্ঘ ছয় বছর বাদে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর থেকে তারা নিয়মিত ফ্লাইট চালু করবে।
ফ্লাইট পুনরায় চালুর পর দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের আটটি যাওয়া-আসার রুটে প্রতি সপ্তাহে ১০০টির বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করবে বলে জানিয়েছে এয়ারলাইন্সটি।
এনডিটিভি লিখেছে, কোভিড মহামারী এবং সীমান্ত এলাকা ডোকলাম ও গালওয়ান উপত্যকায় সংঘাতের পর ভারত ও চীনের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
চলতি বছর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার মধ্যে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। প্রায় ছয় বছর পর গত ফেব্রুয়ারিতে চীন ও ভারতের মধ্যে পুনরায় ফ্লাইট চালু করে ভারতীয় উড়োজাহাজ সংস্থা ‘এয়ার ইন্ডিয়া’।
এরপর এপ্রিলে বেইজিং-দিল্লি রুটে সরাসরি ফ্লাইট শুরু করে ‘এয়ার চায়না’। এর আগে কুনমিং থেকে কলকাতার মধ্যে ফের ফ্লাইট চালু করে ‘চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স’। অন্যদিকে ভারতের উড়োজাহাজ সংস্থা ‘ইন্ডিগো’ গত ৩০ মার্চ কলকাতা ও সাংহাইয়ের মধ্যে তাদের প্রথম সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে, যা দুই দেশের আকাশ যোগাযোগ জোরদারে বড় ভূমিকা রাখছে।
এনডিটিভি লিখেছে, চীনে ইন্ডিগোর কার্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর আগে কোম্পানিটি কলকাতা থেকে গুয়াংজু রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালু করে, পরে দিল্লি থেকেও কার্যক্রম শুরু করে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। শনিবার বিকালে তাদের বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে ইরাক
সৌদি আরবে সর্বশেষ ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে ইরাক। আজ শনিবার দেশটির দুটি নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, সৌদি আরবে হামলার ঘটনায় জড়িতদের ধরতে ইরাকে ব্যাপক অভিযান চলছে। এর মধ্যেই শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইরাক ও ইরানের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলসীমান্তপথ শালামচেহ। ইরান থেকে ইরাকে যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনে এই সীমান্তপথটি গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। হামলার পেছনে কারা জড়িত, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। ইরাকের সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্তকে তাই সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় বাগদাদের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে শুক্রবার সৌদি আরব জানায়, ইরাক থেকে উৎক্ষেপিত ড্রোন দিয়ে তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে’ হামলা চালানো হয়। এরপরই সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন।
হরমুজ প্রণালিতে তেল বাণিজ্যের জট কমাতে এই পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। যুদ্ধ প্রশমনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থমকে থাকার এমন সময়ে পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় তেল সরবরাহের ওপর আরও চাপ তৈরি হলো।
খবর: রয়টার্স
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে কয়েক মাস ধরেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত সংকুচিত হয়ে আছে। এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ-লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী বাব আল-মান্দাব প্রণালিও হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ইরানের বিধিনিষেধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথ ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের ভেতর দিয়ে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা এবং লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানির পথ।
কিন্তু ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা সেই বিকল্প পথেও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচল কমেছে
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে গড়ে মাত্র ১৯টিতে। বৃহস্পতিবার জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, ওই দিন মাত্র ৯টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে।
ওমানের কাছাকাছি সমুদ্রপথ দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করছে মার্কিন নৌবাহিনী। তবে এ পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। জুলাই ও আগস্টে ওমানের কাছাকাছি এলাকায় অন্তত ২৩টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২২ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচলে অভ্যস্ত জাহাজ মালিকদের অনেকেই এখন ওই পথে যেতে অনাগ্রহী।
এর প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানিতেও। বিশ্লেষক মিশেল ভিসে বকমানের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আগস্টে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
সৌদির বিকল্প পথও চাপে
হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানিতে সৌদি আরবের একটি বড় সুবিধা হলো-দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে তেল লোহিত সাগরের বন্দরগুলোতে নেওয়া যায়।
ইরান হরমুজে চলাচল সীমিত করার পর এই পথের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। লোহিত সাগরের বন্দর থেকে জাহাজ দক্ষিণে বাব আল-মান্দাব হয়ে এশিয়ায় যেতে পারে। আবার উত্তর দিকে গিয়ে সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরেও পৌঁছানো যায়।
কিন্তু এখন বাব আল-মান্দাব নিয়েই নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে হুতিরা। ইয়েমেন সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ পেরিমও দখল করেছে। এর ফলে প্রণালিটির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরির সক্ষমতা বেড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে লোহিত সাগর থেকে বাব আল-মান্দাব পেরিয়ে মাত্র দুটি সৌদি পণ্যবাহী জাহাজ গেছে।
পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও বন্ধ
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাইপলাইনটি একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
ফলে হরমুজ এড়িয়ে সৌদি তেল বিশ্ববাজারে নেওয়ার যে বিকল্প ব্যবস্থা ছিল, সেখানেও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে তেল পরিবহনের আরেকটি পথ এখনো খোলা আছে। লোহিত সাগর থেকে জাহাজ বাব আল-মান্দাব হয়ে দক্ষিণে না গিয়ে উত্তরে সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরের দিকে যেতে পারে।
সমস্যা হলো, সৌদি আরবের বড় তেল ক্রেতাদের অনেকেই এশিয়ায়। তাদের কাছে তেল পাঠাতে সুয়েজ হয়ে যাওয়ার পথ অনেক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল।
তেলের দাম ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে
পরিবহনপথ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রভাব এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে পড়েছে। শুক্রবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এই দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
শুধু অপরিশোধিত তেলের বাজারেই নয়, জ্বালানির দাম বেড়েছে অন্য ক্ষেত্রেও। যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে উঠেছে। ডিজেলের দামও ৬ ডলারের ছাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের জন্য বিশ্ববাজারে যাওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং যেসব পথ এখনো খোলা আছে, সেগুলো ক্রমেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কয়েক মাস ধরে চলা সংকট তাই এখন আর শুধু একটি নৌপথের সমস্যা নয়। বাব আল-মান্দাবেও যদি পরিস্থিতির অবনতি হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।